‘ভোলে বাবা পার করে গা’— এই হৃদয়ের আকুতিতে ভক্ত, পুরোহিত ও ব্যবসায়ী সকলের ডাকে সাড়া দিয়েছে বাবা তারকনাথ। সকলের মুখে হাসি। কারণ গত দু-বছর এদের চোখে-মুখে করুণ ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এবছর সেই ছাপ উধাও। সকলের মনোবাঞ্ছা পূরণ হতে চলেছে। ভক্তরা তাঁদের হৃদয়ের ইষ্ট দেবতার মাথায় দুধ ও জল ঢেলে মনের আশা পূর্ণ করে বাড়ি ফিরছেন একরাশ পুণ্য করে। আর ভক্তদের পুণ্যের সুযোগ করে দিয়ে পুরোহিত অথবা পথপ্রর্দশকরাও সম্মান দক্ষিণা নিয়ে ঘরে ফিরছেন। সেইসঙ্গে ছোট-বড়ো ব্যবসায়ীরা শিবকে তুষ্ট করার উপকরণ ভক্তদের হাতে তুলে দিয়ে আর্থিক মুনাফার কাজটাও সেরে ফেলছেন। ফলে এবারের শ্রাবণী মেলার আর্থিক চিত্রটাই বদলে গেছে।
প্রসঙ্গত, বাবা তারকনাথের মন্দিরে শ্রাবণ মাসে বাবার মাথায় জল ঢালার আচার-প্রথা শতাধিক বছর ধরে চলে আসছে। পশ্চিমবঙ্গের ভক্তরা ছাড়াও বিহার, ঝাড়খণ্ড, উত্তরপ্রদেশ থেকেও অসংখ্য ভক্ত শ্রাবণ মাসে আসেন শিবের মাথায় জল ঢালতে। এমনকী বাংলাদেশ থেকেও বহু ভক্ত এখানে জড়ো হন। একটাই উদ্দেশ্য পুণ্য সঞ্চয় করা।

উল্লেখ্য, এই জল ঢালাকে কেন্দ্র করে ভক্তদের কাছ থেকে একাধিক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আয়ের পথ দেখেন। যেমন বৈদ্যবাটি বা শেওড়াফুলিতে গঙ্গায় জল ভরার আগে ঘট থেকে শুরু করে বাঁক, ফুল, গামছা ইত্যাদি নতুন কিনে তবেই ভক্তরা তারকনাথের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। মন্দিরে পৌঁছে ফুলমালা ও নকুলদানা সহ উপকরণ নিয়ে বাবার কাছে নৈবেদ্য অর্পণ। সহযোগিতা করছেন পুরোহিত থেকে পথপ্রদর্শক। সকলেই সহযোগিতা করে আর্থিক দিকটা ষোলো কলা পূর্ণ করছেন। সেইসঙ্গে ছোট-বড়ো দোকান, হোটেলগুলি এই মেলার সময় সারা বছরের উল্লেখযোগ্য আয় করে থাকেন। গত দু-বছর মনমরা হয়ে বসে থাকার পর এবার আগের হাসিমুখ ফুটে উঠেছে। পুরসভা ও তারকেশ্বর বাবা তারকনাথ এস্টেটও একটা ভালো অঙ্কের টাকা এবারে গচ্ছিত করতে পারবেন। মূলত বাবা তারকনাথের কৃপায় অসংখ্য লোকের রুটিরুজির একটা জায়গা তৈরি হয়ে আছে। মেলা যদি বন্ধ থাকে তাহলে চিত্রটাই বিপরীত হয়ে যায়। আরও সহজ করে বললে আর্থসামাজিক চিত্রটা নির্ভর করছে তারকনাথের সঙ্গে জড়িত অসংখ্য পরিবারের। এবারে ওই সমস্ত পরিবারের মুখে হাসি ফুটেছে।

তবে উল্লেখ করতেই হয়, এবারে তারকেশ্বরের শ্রাবণী মেলার ব্যতিক্রমী চিত্র।বাবার সোমবার হল জন্মবার। পয়লা শ্রাবণ থেকে মেলা শুরু হবার কথা থাকলেও গত গুরু পূর্ণিমা থেকেই ঢল নেমেছে ভক্তদের। প্রশাসনও তৈরি। সম্প্রতি পুলিশের ডি আই জি অলোক রাজোরিয়া, এস পি আমনদীপ সিং সহ পদস্থ পুলিশ আধিকারিকরা নিরাপত্তাব্যবস্থা ক্ষতিয়ে দেখতে তারকেশ্বরে সরজমিনে আসেন। ভক্তদের নিরাপত্তাব্যবস্থা ঠিক রাখতে সিসিটিভি, সহযোগী বুথ, অ্যাম্বুল্যান্স ও পর্যাপ্ত পুলিশি ব্যবস্থা থাকছে বলে জানা গেছে। তারকেশ্বর বাবা তারকনাথ এস্টেটের ম্যানেজার প্রশান্ত জীবন ভট্টাচার্য জানান, দু ‘বছর বন্ধ ছিল শ্রাবণী মেলা।
করোনার প্রভাব কম থাকায় প্রশাসন মেলার অনুমতি দিয়েছে। প্রশাসনের নিয়মকানুন মেনে মেলা শুরু হয়েছে। স্থানীয় পুরসভা সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে। মহন্তরাজ এখন বাইরে আছেন। তবে তাঁর নির্দেশ মেনে কাজ চলছে। মেলা চালু হওয়ায় সকলে খুশি। তারকেশ্বর পুরসভার চেয়ারম্যান উত্তম কুণ্ডু বলেন, মেলার জন্য পুরসভা ২০ জনের একটি স্বেচ্ছাসেবক দল গড়া হয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মী থাকছে। দুধপুকুরে যাতে দূষণ না ছড়ায় এজন্য নজর রাখা হবে। এবারে মেলা হওয়ায় ব্যবসায়ী থেকে পুরোহিত ও ভক্তরা খুশি। এখানকার আর্থিক দিকটাও বদল হবে। ব্যবসায়ী কমিটি এবারে মেলা হওয়ায় অত্যন্ত খুশি। কারণ অসংখ্য পরিবারের রুজিরোজগার এই মেলার উপর নির্ভর করে।

এদিকে শ্রাবণ মাসের শুরুতেই জল ঢালার দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বাবা তারকনাথকে নিয়ে সিনেমা, নাটক, যাত্রা সবই হয়েছে। কিন্তু ঠাকুরের মহিমা আজও অম্লান। দুধপুকুরে মা সারদা একাধিকবার স্নান করে বাবার পুজো দিয়েছেন। সেই মন্দির, নাটমন্দির, পাশে কালী-লক্ষ্মী-নারায়ণ মন্দির সবই অটুট। আরাধনা থেমে নেই। একে ঘিরে বেড়েছে ব্যবসা। আর্থিক নির্ভরতাও বেড়েছে অসংখ্য পরিবারের। করোনা ওই সমস্ত পরিবারে গত দুবছর ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। চলতি বছরে অন্তত বাবার কৃপায় শান্তিতে ঘুমোবেন।
জয় বাবা তারকনাথ, জগতের মঙ্গল করো বাবা, জগতবাসীকে এই ভয়াবহ ব্যাধি থেকে রক্ষা করো।