১৫৯৫ পানীয় এবং খাদ্য
[‘আবুলফজলের আইনিআকবরির মূল কাঠামো লেখা শেষ হয় ১৫৯৫-তে। ব্লখম্যান বা জেরেটের অনুবাদে আইনি আকবরি খুবই জনপ্রিয় হয়। সম্রাটের আকবরের প্রশাসন, রাজস্ব, ভুগোল, কৃষ্টি ইত্যাদি বুঝতে প্রাথমিক সূত্র আইনিআকবরি। শিরিন মুসভি বলছেন, আবুলফজল লেখনির আঙ্গিক, ভাষা ইত্যাদির মাধ্যমে আকবরের চরিত্রকে অনেক সহজ মানুষ হিসেবে উপস্থিত করেছেন।]
মহামহিম শিবিরেই থাকুন বা পথযাত্রায়, তিনি শুধুই গঙ্গাজল পান করতেন। বিশ্বাসী এক ভৃত্যর ওপর দায়িত্ব দেওয়া ছিল চরম সতর্কতায় গঙ্গা নদীর ঘটে জল ভরে সেটির মুখ সিল করে দিয়ে শিবিরে/প্রাসাদে বয়ে নিয়ে আসার। তিনি যখন আগরা বা ফতেপুর সিক্রিতে থাকতেন, তখন সরন থেকে [গঙ্গার] জল আনা হত। এখন উনি পাঞ্জাবে [লাহোর] আছেন। এখন জল আসছে হরিদ্বার থেকে। রান্নার জল আসত যমুনা আর চেনাব থেকে। তাছাড়া বর্ষারও জল ধরা হত। এইসব জলের সঙ্গে একটু একটু করে গঙ্গা জল মিশিয়ে মহামহিম জল পান করতেন বা রান্না হত।
এখন যখন তিনি ঐহিক আর পরমার্থিক গোষ্ঠীগুলোর নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তার জন্য কী কী ধরণের খাবার তৈরি হবে সে বিষয়ে নির্দেশনা দেন না। দিনে বা রাতে তাঁকে যে ধরণের খাবার দেওয়া হোক না কেন, তিনি সে সব খুশি মনে খেতেন। তার খাওয়ার নির্দিষ্ট সময় ছিল না, তবে রসুই ঘরের কর্মীরা শতখানেক পদ রেঁধে তৈরি থাকতন, খাওয়ার পাঠানোর নির্দেশ এলেই যাতে এক ঘন্টার মধ্যে খাবার পাঠানো যায়। হারেমে/জেনানায় যে খাবারই যেত, তার রান্না শুরু হত ভোর থেকে, চলত মাঝরাত পর্যন্ত।
মহামহিম মাংস খুব একটা পছন্দ করতেন না। খাওয়ার জন্যে যেহেতু পশুপাখী মারতে হয় তিনি চাইতেন না, তার খাবারে মৃত জন্তুর মাংস দিয়ে রান্না কোনও পদ থাকুক। ক্রমশ তিনি মাংস খাওয়া ছেড়ে দিলেন, তাছাড়া এখন তো তাঁর বয়স হয়েছে। প্রথমে তিনি শুক্রবার মাংস খাওয়া বন্ধ করেন। এর সঙ্গে আসতে আসতে জুড়তে থাকে সৌর মাসের প্রথম দিন, রবিবার, রজম মাদের সোমবার, ইলাহি মাসের প্রথম দিন, ফারয়াদিনের গোটা মাস। অবন মাসে যেহেতু তিনি জন্মেছিলেন, সে মাসেও তিনি মাংস খাওয়া বন্ধ করেদিলেন।
১৫৯৬ অনুবাদকদের ওপর নজরদারি
[আকবর মহাভারত অনুবাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাতে তার বিদেশ থেকে আদত আমলারা যে দেশ শাসন করছেন, সেই দেশের রীতিনীতি ইত্যাদি জানতে, বুঝতে পারেন। হিন্দি থেকে পারসিকে অনুবাদ করার পরে কবি ধর্মতাত্ত্বিক বাদাউনির ওপর দায়িত্ব দেওয়া ছিল সেটিকে কাব্য ভাষায় রূপান্তরিত করা। অনুবাদের কাজ দীর্ঘ সময় ধরে চলতে থাকে। সম্রাট অনুবাদের কাজ নিজে সময় নিয়ে শুনতেন। তাঁর এই অভ্যেসের ফলে বাদাউনির জীবনে একটা অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যায়। বাদাউনির বয়ান থেকে অনুবাদ করেছেন শিরিন মুসভি]
১৯ মার্চ ১৫৯৬-তে সূর্য মেষরাশিতে প্রবেশের সময় থেকে মহামহিমের স্বর্গীয় রাজত্বের ৪০তম বছরের সূত্রপাত ঘটল। অতীতের মতই এ উপলক্ষ্যে যেরকম জাঁকালো উৎসব আয়োজিত হয়, এবছরও তার কোনও ব্যত্যয় হল না। সম্রাট দিওয়ানিখাসওআমের ঝরোখায় আমায় ডেকে নিয়ে আবুলফজলকে বললেন, ‘সুফি অধ্যাত্ম ভাবনার অমুক [অর্থাত এই বর্ণনার লেখক] যুবকের কথা অনুবাদক হিসেবে ভেবেরেখেছি, কিন্তু মানুষটা ধর্মতাত্ত্বিকভাবে খুবই গোঁড়া প্রকৃতির; কিন্তু কোনও তরবারিই তার এই ঘাড়কেঁদো ধর্মান্ধতা/গোঁড়ামিকে নমনীয় করতে পারবে না’। শেখ প্রশ্ন করলেন, ‘মহামহিম, আপনি যে তার সম্বন্ধে যে গোঁড়ামির কথা বললেন, সে সেটা কোন বইতে লিখেছে?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘কেন, রাজমনামা [মহাভারত]; গত রাতে আমি নাকিব খানকে ডেকে হাতেকলমে দেখিয়েছি’। শেখ সম্মতি প্রকাশ করে বলল, ‘সত্যিই সে ত্রুটি করেছে’। আমি তাদের সামনে আসার অনুমতি চেয়ে নম্র ভাবে বললাম, ‘আমি একজন সাধারণ অনুবাদকমাত্র, আমার আর এই কাজে অন্য কোনও ভূমিকাই নেই, ভারতের মুনিঋষিরা যা বলেছেন, আমি সেগুলোর ভাবের কোনও পরিবর্তনা না করে অনুবাদ করেছি; আর যদি আমি আমার কথাই লিখতাম তাহলে আমার ভুল হত, আমার ভুল বের করানো যেত’। শেখ আমায় সমর্থন করলেন; সম্রাট চুপ করেগেলেন।
সমস্যার শুরু আমার রাজমনামার নির্দিষ্ট একটি স্তবক অনুবাদের সময়; সেই স্তবকে ভারতের কোনও এক ঋষি মৃত্যুমুখে সামনে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গকে উপদেশ দিয়ে বললেন, মানুষকে তার অজ্ঞতা আর অবহেলার সীমান্ত ছেড়ে বেরিয়ে আসতে হবে; অতুলনীয় স্রষ্টাকে স্বীকার করতে হবে; জ্ঞানের পথে এগোতে হবে; এবং হাতেকলমে প্রয়োগ করা ছাড়া জ্ঞানার্জন করে সন্তুষ্ট থাকলে হবে না; কারন তাতে প্রয়োজনীয় ফল মেলে না; তাকে পুণ্য বা উতকর্ষের পথে হাঁটতে হবে; মিথ্যা আর শয়তানির কাজ থেকে তাকে সরে যেতে হবে; প্রত্যেক কাজ পরীক্ষিত হবে, এই কথা যেন তার যেন মাথায় থাকে’। এর পরে আমি একটি শ্লোক লিখলাম—
প্রত্যেক কাজের পারিতোষিক আছে/প্রত্যেক কর্মের প্রতিদান আছে।
এই কবিতার দুটি স্তবক মহামহিম মুনকির এবং নানকির সাধারণ পুনরুত্থান, আর শেষ বিচার হিসেবে গণ্য করে দুভাবে দেখলেন; এই ধারণাটা মহামহিমের তাত্ত্বিক অবস্থানের বিরোধী, তিনি অধ্যাত্মবাদে বিশ্বাস করে না, তাই তিনি আমার গোঁড়া ধর্মান্ধ দেগে দিলেন [যেন আমি হিন্দুদের ওপর মুসলমান সম্প্রদায়ের বিশ্বাস চাপিয়ে দিচ্ছি]
কত দিন আর আমার চিজে চোখ আমায় কলঙ্কে ডুবিয়ে রাখবে/কেউ তো আমায় গভীর কালো চোখে সহানুভূতি দেখাক।
শেষ অবদি আমি উপস্থিত দরবারিদের বুঝিয়ে বিশ্বাস করাতে পারলাম যে ভারতের সাধারণ মানুষ ভাল আর খারাপ কাজের জন্যে পারিতোষিক এবং শাস্তি দান/পাওয়ায় বিশ্বাস করে। তারা মনে করে — যখন কোনও মানুষ মারা যান, তখন তার জীবনের নানান কাজের হিসেব লেখা মানুষটা, সেই খাতাটি, মানুষের আত্মার দখলদার দেবদূতের সামনে খুলে ধরেন এবং দেবদূত তাকে বিচারকের সামনে নিয়ে যান। তার পুণ্য এবং পাপের তুল্যমূল্য বিচার করার পরে সর্বশক্তিমান মানুষটিকে বলেন, ‘এই ব্যক্তিটির এটাই পছন্দ ছিল’। তিনি তখন জিজ্ঞাসা করেন, ‘ভাল কাজের জন্যে তুমি বেহেস্তে যাবে, সেখানে ভাল কাজের জন্যে তোমার বরাদ্দ সব কিছু তুমি উপভোগ করবে, এরপরে তোমায় [খারাপ কাজের জন্যে] জাহান্নামে পাঠানো হবে; কোথায় তুমি আগে যেতে চাও’। এই সময় শেষ হলে তাকে আবার পৃথিবীতে পাঠানো হয়। আবার তার খাতা চালু হয়, এইভাবে অনন্তকাল চলতে থাকে। একসয় তুল্যমূল্য করতে করতে সে মুক্তি পায়, আর বিশ্বে ফিরে আসা আর ফেরত যাওয়ার চক্র শেষ হয়। আমি এইভাবে বিষয়গুলো তাদের বোঝালাম।
১৫৯৮ গুরু অর্জুনের সঙ্গে আলাপচারিতা
[১৫৯৮তে গুরু অর্জুনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেই তিনি লাহোর থেকে শেষ বারের জন্যে বেরিয়ে যান। আবুলফজল গুরু অর্জুনকে ব্রাহ্মণ গুরু বলছেন; বুলফজল সম্রাটের সঙ্গে সেই বৈঠকে ছিলেন না, আখবারনবিশদের থেকে পাওয়া তথ্য অবলম্বনে তিনি ঘটনা বর্ণনা করেছেন]
৪ নভেম্বর মহামহিম গোবিন্দাওয়ালের কাছে হাতিতে চড়ে বিতস্তা পেরোলেন। তার বাহিনী পন্টুন সেতু দিয়ে নদী পার হল। ওই দিনই গুরু অর্জুন তার বাড়িতে আনন্দের সঙ্গে মহামহিমকে আমন্ত্রণ জানালেন। তার পূর্বজরা ব্রাহ্মণ্যধর্ম অনুসরণকারী ছিলেন। (চলবে)