১৬০৪ বাপ-ছেলে দ্বৈরথ
[যত দিন গেছে বিশেষ করে সম্রাট আকবরের ৫ দশকজোড়া সাম্রাজ্যের শেষ দিনগুলোয়, তাঁর সঙ্গে শাহজাদা সেলিমের সম্পর্ক ক্রমাগত বিষাক্ত হয়েছে। আকবর এবং বিদ্রোহী পুত্রের সম্পর্কের বর্ণনা পাচ্ছি বেভারিজের আকবরনামার তৃতীয় খণ্ডের একটি বেনামা জোড়াপাতায় [তাকলিমা]। মুতামদ খান ইকবালনামাইজাহাঙ্গিরিতেও কাছাকাছি ঘটনার বর্ণনা আছে, কিন্তু তিনি পরোক্ষে জাহাঙ্গিরের বিরোধিতা করেছেন কারন জাহাঙ্গিরের সময় তাঁকে ইবাদতখানায় বন্দী করে রাখা হয়, যেখানে সেলিমকে বন্দী করে রাখা হয়েছিল]
শাহজাদা সুলতান সেলিমের আর সম্রাট আকবরের মুখোমুখি হওয়ার দিন এগিয়ে এল। সম্রাটের এলাহাবাদ [সেলিমের আশ্রয়] অভিযানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হলেন শাহজাদা। [ইতিমধ্যে] রাণী মা’র [মারিয়ম মাকানি — হামিদা বানু বেগম, আকবরের মা] মৃত্যু সংবাদে সেই অভিযান স্থগিত করে দিতে হয় বাধ্য হলেন সম্রাট আকবর। মা হারা শাহজাদা, স্ত্রী হারা স্বামীকে স্বান্তনা দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিজেই দরবারে আকবর সম্রাট সম্মুখে এসে পৌঁছলেন। ৯ নভেম্বর ১৬০৪এ দরবারে পিতাকে সেজদা করে শাহজাদা সেলিম, তাঁর পার্থিব ঈশ্বর এবং আধ্যাত্মিক গুরুর [বাবার] পায়ে মাথা ঠেকালেন। কৃপালু সম্রাট বাৎসল্যের রসে সঞ্জীবিত হয়ে পুত্রকে বুকে টেনেনিলেন। সম্মান জানাতে শাহজাদা সম্রাটকে এক লাখটাকার একটি হিরে, ১০০ তোলা করে ৯টা, ৫০ তোলা করে ২০০টা, ২৫ তোলা করে ৪টে, ২০ তোলার ৩টে মোহর পেশকাশ দিলেন। এছাড়া ২০০ হাতিও উপহার দিলেন। শাহজাদার সঙ্গে আসা পায়িন্দা মহম্মদ খান, মুখসুস খান, খাওয়াজগি ফাতুল্লা খান এবং অন্যান্য আমলা সম্রাটকে তাঁদের পক্ষ থেকে উপহার দিলেন এবং প্রত্যেকের উপহার সাদরে গৃহীত হল। তিনি স্বয়ং সেলিমকে রাজকীয় অন্তঃপুরে নিয়ে গেলেন। সেলিম তাঁর উদ্দেশ্যে যেভাবে অতীতে ব্যঙ্গ করে কথা বলেছেন, সে সব তিনি উল্লেখ করলেন। শাহজাদার ভুলত্রুটিগুলো ধরিয়ে দিলেন। কথা বলতে বলতে সম্রাট রেগে রেগে উঠছিলেন। শরমিন্দা শাহজাদা মাটির দিকে জলভরা চোখ নামিয়ে রেখে ঘামে পানি পানি। সেলিম জলভরা চোখে মনুষ্যত্বের ওপর বিশ্বাস প্রকাশ করে সম্রাটকে দুঃখ জানালেন। সম্রাট প্রাসাদ রক্ষীদের জানালেন মদ্যাসক্ত সেলিমকে একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে বন্দী রাখতে। তাঁকে না জানিয়ে মদ্য দেওয়ার বিষয়ে কড়া নির্দেশ জারি করলেন সম্রাট স্বয়ং। সেলিমের জীবনে সব থেকে বড় শাস্তি মদ্যপান করতে না দেওয়া। দুঃখের সাগরে শাহজাদা ভেসেগেলেন। একে একে পরিবারের নানান সদস্য তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসে সিম্প্যাথি আর কনসোলেশন জানিয়েগেলেন। শাহজাদার মিনতি এবং অনুশোচনা সম্রাটকে তাঁরা জানালেন আগ্রহভরে। অজুহাত শুনতে অভ্যস্ত সম্রাট সেসব শুনলেন মনদিয়ে। দশ দিন পেরিয়ে গেলে পিতৃত্বের বাতসল্য এবং স্বভাবিক দয়ালুতারভাব ফিরে এল। সেলিমকে মুক্ত করে রাজকীয় সাইপ্রাস বাগানে পদচারণার অনুমতি দেওয়া হল। শেষ পর্যন্ত তিনি সম্রাটের নির্দেশক্রমে নিজের প্রাসাদে ফিরে যেতে পারলেন। সম্রাটের ইচ্ছে ছিল শাহজাদা সেখানেও একইভাবে নির্জনে থাকুন। আরেক [মদে তীব্র আসক্ত হয়ে অসুস্থ] পুত্র সুলতান ড্যানিয়েলের থেকে তাঁর আর কোনও আশা ছিল না, তিনি [সেলিমের] শাস্তি রদ করে তাঁর পুজোনো মনসব এবং জায়গির ফেরেত দিলেন।
১৬০৫ সম্রাটের মৃত্যু — জৌনপুরের যুবা ব্যবসায়ীর অভিজ্ঞতা
অস্বীকার করার উপায় নেই, সম্রাটের মৃত্যুর সংবাদে সাম্রাজ্য উথালপাথাল হয়, সাম্রাজ্যজুড়ে, দরবারে, ক্ষমতার সঙ্গে থাকা বিভিন্ন ব্যক্তি গোষ্ঠীর মধ্যে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তীব্র অনিশ্চেয়তা ছড়িয়ে পড়ে। সম্রাটের মৃত্যুর খবরে জনজীবনে যে অনিশ্চেয়তার পরিবেশ তৈরি হয়, সে আতঙ্ক স্পষ্ট আমরা অনুভব করি জৌনপুরের জৈন ব্যবসায়ী সদ্য যুবা বানারসীদাসের ‘অর্ধকথনক’ [অর্ধকথা] শীর্ষক আত্মজীবনীর একাংশে। ১৯ বছরের জৈন ব্যবসায়ী বানারসীদাস ১৬০৫ সনে হিন্দি ভাষায় ‘অর্ধকথনক’ লিখেছেন। তার বর্ণনা সম্রাট আকবরের মৃত্যুর খবরে জৌনপুর শহরের মানুষদের প্রতিক্রিয়া বুঝতে সাহায্য করে। বানারসীদাস বলছেন সম্রাটের মৃত্যুর পরের রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দশ দিন ধরে চলেছে।
বিক্রম সম্বৎ ১৬৬২-তে কার্তিক মাসে বর্ষার উত্তরসময়ে ছ্ত্রপতি আকবর শাহী জালাল আগরায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। সম্রাটের মৃত্যুর সংবাদ আগরার কেল্লার পাথরের দেওয়াল টপকে দাবানলের মত মুঘল হিন্দুস্তানে ছড়িয়ে পড়ল। হতাশাজনক সংবাদ জৌনপুরে পৌঁছতে বেশি সময় নেয় নি। আতঙ্কে প্রজারা নিজেদের অনাথ ভাবতে শুরু করে। দশদিকে যেন আতঙ্কের ঘণ কালো মেঘ ছেয়ে গেল। মানুষের হৃদয় অনাগত ভবিষ্যতের আশংকায় কেঁপে ওঠে; তাদের মুখ সহসা রক্তহীন ফ্যাকাসে হয়ে যায়। …তারা খসে পড়লে বিশ্ব যেমন কেঁপে ওঠে; খবরটা পেয়ে আমারও দেহ অনিয়ন্ত্রিতভাবে থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে; সহসা বসে থাকা অবস্থায় সিঁড়ির নিচের ধাপে সংজ্ঞাহীনভাবে গড়িয়ে পড়ে মাথায় চোট পেলাম, বেশ কিছুক্ষণ অজ্ঞান হয়ে রইলাম’। …[সংবাদের প্রথম প্রতিক্রিয়ায়] গোটা জৌনপু্র বাজার যেন থর থর করে কেঁপে উঠল। কিছু সময় যেতে না যেতেই তড়িঘড়ি আতঙ্কে সক্কলে বাড়ির জানলা-কবাট বন্ধ করে দেয়। দোকানদারেরা দোকানের ঝাঁপ ফেলে দেয়। তীব্র জ্বরের আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে ধনীরা ধরতি তলে তাদের সম্পদ পুঁতে ফেলে, নগদ টাকা সশস্ত্র বাহিনীর পাহারায় গাড়িতে তুলে, শহরের থেকে দূরে সুরক্ষিত স্থানে পাঠিয়ে দেয়। স্বচ্ছলেরা মোটা কাপড় পরে গরীব সেজে রাস্তায় চলাফেরা করছে; রাস্তায় নামলে তারা চট, মোটা সুতির চাদর গায়ে জড়িয়ে নিচ্ছে – মহিলারা গয়নাগাটি খুলে লুকিয়ে রাখছে, গরীবদের মত কাপড় চোপড় পরতে শুরু করছে – যাতে কাপড় দেখে তার সামাজিক অবস্থান বোঝা না যায়। সম্রাট আকবরের প্রয়াণে ধনী দরিদ্র ভেদ সমান হল। সমাজ জুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে গেল। অথচ এত আতঙ্কের কারন ছিল না; সে শহরে ডাকাত বা চোরের উপদ্রব ছিল না’।
সম্রাট আকবর মারা যাওয়ার পরে বানারসী, অভিজ্ঞতা কাব্যাকারে লিখেছেন (মূল হিন্দি বানারসীদাস, ইংরেজি মুকুন্দ লাঠ/ ফ্রান্সেসকা ওরসিনি, ক্যাথেরিন বাটলার; বাংলা অনুবাদ আমার)
ghar-ghar dar-dar kiye kapaaT (At all the houses, doors were kept closed, বাড়িঘরের দেউড়ি বন্ধ),
haTavaanii nahi.n baithe haaT(merchants stopped sitting at the shops ব্যবসায়ীদের দোকান বন্ধ).
bhale vastra aru bhuushaNa bhale(Nice clothes and ornaments were দামি কাপড় গয়না),
te sab gaaDhe dharatii tale(all buried under the ground মাটির তলায় লুকোলো).
ghar-ghar sabani visaahe shashhtra(People started keeping their swords ready, সক্কলে তরোয়াল শান দিয়ে রাখল),
logan pahine moTe vastra(they started wearing coarse clothes, প্রত্যেকেই মোটা কাপড় পরা শুরু করে).
u.nch niich kouu nahi.n pahichaan(You could not recognize the status of a person, কাপড় দেখে মানুষের শ্রেণী বোঝা দুষ্কর),
dhanii daridrii bhaye samaan(the rich and poor looked alike গরীব ধনী এক হল).
আকবর যখন মারা যাচ্ছেন, তার কিছুটা আগে বানারসীদাস জৈন পন্থ থেকে শৈবপন্থে আশ্রয় নিয়েছেন। ধর্মপরিবর্তনের অদেখা সামাজিক উদ্বেগের সঙ্গে জুড়ল বাহ্যত সম্রাট প্রয়াণের পরের রাষ্ট্রবিপ্লবের উদ্বেগ। দুই উপপ্লব, গুজবের বাহার, আগামী দিনের আশংকা – সব মিলেমিশে তাকে সংজ্ঞাহীন করে দেওয়ার জন্যে যথেষ্ট ছিল। যৌবনে পা দেওয়া ১৯ বছর বয়সী এক বালকের লেখা মার্ফৎ আমরা সে সময়ের জৌনপুর বাজারের বর্ণনা পাচ্ছি, ‘দশদিন পরে আগরা থেকে আসা চিঠি মার্ফৎ সম্রাটের প্রয়াণ সংবাদ পৌঁছল; সেই চিঠির বয়ানটা ছোট করে জানাচ্ছি, জালাল [আকবর] ৫২ বছর রাজত্ব করার পর মারা গেলেন কার্তিক মাসের ১৬৬২ বিক্রম সম্বতে। বর্তমানে আকবরের বড় ছেলে সাহেব শাহী সালিম, বাবার পথ অনুসরন করে আগরার সিংহাসনে বসেছেন। সালিম নতুন নাম নিয়েছেন নুরুদ্দিন জাহাঙ্গির সুলতান; তিনি সাম্রাজ্যজুড়ে অপ্রতিহত গতিতে নিজের ক্ষমতা বিস্তার করছেন। তার ক্ষমতা প্রতিহত করার মত কোনও মানুষ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। চিঠিতে সিংহাসনে আরোহণের সংবাদ আসামাত্র সকলের ধড়ে যেন প্রাণ এল। সক্কলে হৃদয়ের অন্তঃস্থল থেকে [আকাশ-বাতাস মুখরিত করে] নতুন রাজার নামে জয়জয়কার ধ্বনি তুলল’।
সম্রাট আকবরের মৃত্যুর পরের সময়ে অশান্তি এবং গোলযোগ চলেছিল দশ দিন ধরে। যে কোনও রাজত্বে অমিত প্রভাব ছড়িয়ে ৫২ বছর রাজত্ব করা কোনও রাজা মারা গেলে সেই রাজত্বের জনমানস যে অনিশ্চয়তায় উদ্বেল হয়ে উঠবে সেটা খুব আশ্চর্যের ঘটনা বোধহয় বলা যাবে না। অন্যদিক থেকে দেখতে গেলে আকবরি যুগে জনগণের মনে যে স্থায়িত্বের রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, সেটাই কিন্তু এই ঘটনাটি ঘটিয়েছে; মানুষের হয়ত আশংকা হয়েছিল আকবরের মৃত্যুতে স্থায়িত্বের পরিবেশ বিঘ্নিত হবে। ফলে দরবারের বাইরে এক অভিজাত ব্যবসায়ীর দৃষ্টিতে রাজনৈতিক রাজনৈতিক ক্ষমতা হাত বদলের বিষয়টা দেখা, চার শত বছর পরে উৎসুক ইতিহাস পাঠকের কাছে নতুন ধরণের অভিজ্ঞতা বয়ে আনে। কেন্দ্রিয় দরবারে নয়, যে অভিজাত ব্যবসায়ী বৌদ্ধিক মানুষটা আগরা থেকে দশ দিনের চিঠি আসার দূরত্বে বসে আছেন, তিনি ব্যাপারটাকে কীভাবে দেখছেন সেটা আমরা বুঝলাম। (চলবে)
(সূত্র ১) Mukund Lath, Ardhakathanaka, Half a Tale: A Study in the Interrelationship Between Autobiography and History; ২) Francesca Orsini;, Katherine Butler Schofield, eds(1981), Tellings and Texts: Music, Literature and Performance in North India; ৩) CONFESSIONS OF A 17TH-CENTURY JAIN MERCHANT: THE ARDHAKATHANAK OF BANARASIDAS Rupert Snell; ৪) The Ardhakathanaka by Banarasi Das : a Socio-cultural Study EUGENIA VANINA)।