জেভিয়ার লিখছেন ‘রাজার স্বাস্থ্যের অবস্থা দিনের পর দিন খারাপ হতে থাকে’। তিনি চিঠিতে দাবি করছেন, ক্রমশ ঘটনাবলীর নিয়ন্ত্রণ সম্রাটের হাতের বাইরে বেরিয়ে যাচ্ছিল, ‘এক রাতে সেলিম বাবাকে দেখতে এলেন, যদিও কেল্লায় তার বিরোধীপক্ষের সংখ্যাই বেশি, কেল্লার দরজাও তার নিয়ন্ত্রণে ছিল না, কিন্তু জনগণের সনুভূতি শাহজাদার পক্ষে ছিল’। জেসুঈটেরা মনে করত সেলিম ছিলেন ‘মুক্তমনা এবং বিচারদায়ী’। এই সব গুণের জন্যেই তিনি একে একে আমীরদের মন জয় করেছেন। জেভিয়ার লিখছেন ‘যে সব মুসলমান আমীর সম্রাটের নাতিকে সিংহাসনে বসাতে বদ্ধ পরিকর ছিল, তারাও সব দিক বিবেচনা করে (et omnibus pensatis) মন পাল্টে সিংহাসনের আসল অধিকারীর [সেলিম] হাতে সাম্রাজ্যের ভার তুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তাদের একদল প্রতিনিধি সেলিমের সঙ্গে দেখা করে মত পাল্টানের কথা জানিয়ে দিয়ে বলল তারা শাহজাদার পুত্র বা অন্য কোনও ব্যক্তিকে সিংহাসনের দাবিদার হিসেবে গণ্য করছে না; তিনি [সেলিম] যদি মুসলমান আইন রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন তাহলে তারা সেলিমকে সাম্রাজ্যের চাবিকাঠি তুলে দিতে রাজি। তিনি উপস্থিত প্রত্যেকের কাছে এ বষয়ে কসম করলেন। সেই সন্ধ্যাতেই সম্রাটের নাতির অভিজাত মামা এবং তার শ্বশুর, সেলিমের কাছে তার পুত্রকে এনে ভবিষ্যতের সম্রাটের কদমবুসি করাল এবং তারাও একই কাজ করল। সেই মুহূর্তে শাহজাদা কেল্লার দরজায় পুরোনো রক্ষী সরিয়ে নিজের বিশ্বস্ত রক্ষী মোতায়েন করার নির্দেশ দিয়ে পরের দিন সঙ্গীদের নিয়ে সম্রাটকে দেখতে গেলেন’।
জেভিয়ার তার বয়ানে বলছেন, সম্রাট আকবর সে সময় কথা বলার অবস্থায় ছিলেন না। কিন্তু তিনি সজ্ঞানে ছিলেন, ইশারায় সেলিমের হাতে রাজদণ্ড তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। যে তরোয়াল এতদিন সম্রাটের সারাক্ষণের সঙ্গী ছিল, সেটি শাহজাদার হাতে সমর্পনের নির্দেশ দেওয়া হল। উত্তরে অভিভূত সেলিম বাবাকে সেজদা (জেভিয়ারের ভাষায় jezda) করলেন, [সম্রাটের অবস্থা দেখে] সেলিমকে ঘর ছেড়ে যেতে বলা হল। জেভিয়ার বলছেন এরপরে আকবর ‘ঘরে মাত্র কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সাথীকে পাশে রেখে প্রায় একা একা মৃত্যুবরণ করলেন; সাথীরা মহম্মদের নাম নিলেন। তিনি তাদের কোনও কথারই জবাব দিচ্ছিলেন না; শুধু কয়েকবার সর্বশক্তিমানের নাম নিলেন। তিনি পূর্বের প্রথা থেকে বার হয়ে এসে মৃত্যু পথে অভিজাতদলকে পাশে রাখলেন না; কেউ জানে না তার ধর্ম কী, তিনি নিজেও জানেন না কার অধীনে তিনি প্রাণ বিসর্জন দিলেন, তিনি যেহেতু কোনও কোনও ধর্মকেই সত্য ধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেন নি, সব ধরণের ধর্মই তিনি ধারণ করতেন, তাই তাঁর অভ্যেস ছিল সর্বশক্তিমানের সঙ্গে সূর্যের উপাসনা করা’।
এরপর জেভিয়ার আকবরের সম্বন্ধে বহু ভাল ভাল কথা লিখবেন, কিন্তু সেই বর্ণনার পরতে পরতে জুড়ে থাকবে ১৬০৬এর মে মাসে খসরুর বিদ্রোহী হুওয়ার গল্পটি। সে বিশাল ঘটনা আমাদের এই প্রবন্ধে আলোচ্য নয়। মূল লেখায় পাচ্ছি ‘এক মহান রাজা সম্রাট আকবরের, কার্যকালের মেয়াদ শেষ হল। নতুন সম্রাট ক্ষমইতার সঙ্গে জুড়ে থাকা নানান বিষয় বোঝার চেষ্টা করলেন এবং ক্ষমতা হাতে নেওয়ার উদ্যম নিলেন। তিনি কেল্লায় এসে তার থেকে অনেক বেশি ভেঙে পড়া বোনেদের সান্ত্বনা দিয়ে নিজের প্রাসাদে ফিরে গেলেন। আট দিন শোকের শেষ তিনি রাজপ্রাসাদে রাজকীয় কর্তৃত্বে রাজত্বের ভার নিজের হাতে তুলে নিলেন। খোলা আম-দরবারটি (terreiro) অপূর্ব সাজে সজ্জিত করা হয়েছিল; প্রাসাদের ভিতর থেকে বার হয়ে তিনি খোলা আকাশের তলায় রাখা সিংহাসনে বসলেন; সক্কলে বলে উঠল পাদশা সালামত (Padja çalamat বা Salve rex) রহে [এবং] তাকে উপহারে উপহারে ভরিয়ে দেওয়া হল। [অনুষ্ঠান শেষে] তিনি আবার ভেতরে গেলেন এবং কেল্লার বিভিন্নস্তরে নিজের অধিকার সুরক্ষিত করলেন। রাজা পরিবর্তনের ফলে দরবারেও পরিবর্তন হল; ওপরে থাকা বহু অভিজাত নিচের স্তরে গেলেন, নিচে থাকারা মাথায় পৌঁছলেন। সিংহাসনে বসে তিনি নানান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, উত্তেজনা থিতোলে দেখাগেল, সম্রাট অধিকাংশই ভুলেগেছেন। [জনগণের] আশা, শীঘ্রই নিরাশায় পরিণত হল।
আমাদের ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না এই পর্বে সব থেকে বেশি নিরাশ হয়েছিল জেসুঈটে পাদ্রিরা। কয়েক দিন আগেও তারা নিশ্চিত ছিল জাহাঙ্গিরের ধর্ম পরিবর্তন সময়ের অপেক্ষামাত্র। পাদ্রিরা মনে করত জাহাঙ্গির গোপনে খ্রিষ্টিয় ভাবধারায় চরম বিশ্বাস পোষণ করছেন। সম্রাটের ধর্ম পরিবর্তন সময়ের অপেক্ষামাত্র। ঠিক যেমন সম্রাট আকবরের আশেপাশের মানুষজন জেসুঈটদের প্রায় বিশ্বাস করিয়ে ফেলেছিল যে সম্রাট খ্রিষ্টবিশ্বাসী হয়ে পড়েছেন। জেভিয়ারের বিশ্বাস করতেন জাহাঙ্গিরের মূল মাথাব্যথা ছিল রাজা মান সিংহ (‘অভিজাত সেনাপতি এবং অভিজাতদের নেতা’), নষ্টের গোড়া মানুষটির প্রভাব নিকেশ করতে, সম্রাটকে বাধ্য হয়ে গোঁড়া মোল্লাদের পাশে টানতে হয়েছে। ‘মুসলমান অভিজাতরা ধর্ম রক্ষার শর্তে তাকে সিংহাসনে বসিয়েছে, ফলে তাদের বিশ্বাস জিততে সম্রাটকে সাম্রাজ্যের শুরু থেকেই গোঁড়া মোল্লাদের অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি সাম্রাজ্যের সমস্ত মসজিদ পরিষ্কার করে মসজিদের দখলদারদের উচ্ছেদ করার নির্দেশ জারি করলেন। প্রাসাদেই মুসলমান অভিজাতরা ধর্ম প্রচার এবং উপাসনা উভয়ই করতে শুরু করলেন’। ধর্মপ্রচারে ঘঁটি গেড়ে লাহোরে বাস করা জেসুঈটদের মনে হল, তারা সম্রাটকে ধর্মপরিবর্তনের জন্যে অতিরিক্ত চাপ দেয়ায় রাজসভায় গোঁড়া মোল্লাদের উত্থান সম্ভব হল; মোল্লাদের সম্রাটের এই চাপ উত্তর ভারতে দিক পরিবর্তিত হয়ে খ্রিষ্টধর্মাবলম্বীদের ওপরে এসে পড়ায় তারা উদ্বেগে রইল। তবে জেভিয়ারের চিঠি পড়ে মনে হয় এই উদ্বেগ বেশি দিন ছিল না। রাজনীতির উত্তেজনা থিতিয়ে গেলে, সময়, ঘটনাবলী পুরোনো দিনের মত ঢিমেতালে চলতে লাগল।
এখানে একটা অপ্রাসঙ্গিক, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা জরুরি, জন রিচার্ডস এবং আনমেরি স্কিমেলের মত বহু মুঘল গবেষক পর্তুগিজদের ‘গোঁড়া মোল্লা’ মন্তব্য অনুসরণে মনে করেছেন আকবরের প্রয়াণের পরে মুঘল দরবার ক্রমশ গোঁড়া মোল্লাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেল, যে প্রবণতাটা দুই প্রজন্মের পরে আওরঙ্গজেবের সময় চূড়ান্ত আকার ধারণ করবে এবং যদুনাথ সরকারের মত ঐতিহাসিক মনে করবেন মুঘল আমল পতনের জন্যে আওরঙ্গজেবের ধর্মান্ধ নীতি দায়ি। অথচ আমরা দেখব সিংহাসনে বসে জাহাঙ্গির রাজা রামদাসকে কেল্লা আর খাজাঞ্চিখানার সার্বিক দায়িত্ব দেবেন। (চলবে)