আবুলফজলের হত্যা, আকবরের প্রয়াণ এবং আসাদ বেগ কাজভিনির বয়ান
আকবর এবং জাহাঙ্গিরের রাজত্বের অধস্তন আমলা আসাদ বেগ কাজভিন, আবুলফজলের হত্যা আর আকবরের মৃত্যুর অন্যতম প্রত্যক্ষ্যদর্শী। তিনি আবুলফজলের প্রশাসনের কর্মচারী ছিলেন। কাজভিন দুটো অভিজ্ঞতা বিশদে লিখে যান – আবুলফজলের হত্যাকাণ্ড তার পরে আকবরের প্রয়াণ। এ বিষয়ে তার বয়ান আমাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটি নেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হবে (মুজফফর আলম এবং সঞ্জয় সুব্রহ্মণিয়ম বলছেন, ব্রিটিশ লাইব্রেরির ১১৯৬ নং পাণ্ডুলিপি ওয়াকায়ইআসদবেগ, কিশন দাসের অনুবাদে ১২১১ আহ’ ওয়াকায়ইআসদবেগএর একটা নকল আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটির আবদুস সালাম কালেশনে আছে; এছাড়াও বইটি বিষয়ে আশিতা হিরোয়ুকির আ হিস্টিরিওগ্রাফিক্যাল স্টাডি অব দ্য সোকল্ড আহবলইআসাদবেগও দেখতে পারেন)।
আসাদ বেগ ১৬০১-১৬০৬ সময়ে, ক্ষমতা হস্তান্তরের পর্বে মুঘল দরবারি আমলা ছিলেন। তার উপাধি ছিল পেশরু খান। তিনি শেখ আবুলফজলের প্রশাসনিক কাঠামোয় প্রায় ১৭ বছর বুদ্ধিমত্তা এবং দক্ষতা — করওখিদমতএ কাজ করে প্রভূত সম্পদ এবং সম্মানলাভ করেন। আকবরের ৪৭তম রাজত্ব বছরে বিদ্রোহী শাহজাদা সেলিম, ওর্ছার রাজা বীর সিং বুন্দেলাকে দিয়ে আকবরের ঘনিষ্ঠতম আমলা, সেলিমের সিংহাসনের দাবির কঠোর বিরোধী আবুলফজলকে হত্যা করায়। সেই ঘটনা আসাদ বেগের বয়ানে মোটামুটি বিশদে বর্ণিত হয়েছে। আবুলফজলের প্রয়াণের পর আসাদ বেগ শাহী প্রশাসনে চাকরিতে সম্রাট আকবরের ঘনিষ্ঠবৃত্তে প্রবেশ করবেন। আকবরের প্রয়াণ হলে তিনি জাহাঙ্গিরের প্রশাসনেও সুনাম নিয়ে কাজ করবেন। জাহাঙ্গিরের দরবারে তাঁকে পেশরু খান উপাধি দেওয়া হবে। তবে আবুলফজলের প্রশাসনের প্রাক্তন কর্মচারী হিসেবে আসাদ বেগ আকবরের দরবারে যে সম্মান পেয়েছিলেন, সক্সেই প্রশাসনিক উচ্চতা, সম্মান তিনি জাহাঙ্গিরের সময়ে পান নি, কিছুটা বঞ্চিতই থেকেছেন।
সাধারণত এতদিন মুঘল আমলা আসাদ বেগের লেখা ব্যবহার হয়ে এসেছে দক্ষিণ ভারতের ইতিহাস বিশ্লেষণে, যেহেতু তিনি মুঘল আমলা হিসেবে আককরের আমলে দক্ষিণে সফল দৌত্য অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। তার কলমের মাধ্যমে ইব্রাহিম আদিল শাহের দরবারের বিস্তৃত বর্ণনা পাই (এস এন সেনের সম্পাদনায় মহামহোপাধ্যায় প্রফেসর ডি ভি পোতদার সিক্সটি-ফার্স্ট বার্থডে কমেমরেশন ভলিউমে পি এম যোশির আসাদ বেগ’স মিশন টু বিজাপুর ১৬০৩-১৬০৪ এবং ভি ডি রাও সম্পাদিত স্টাডিজ ইন ইন্ডিয়ান হিস্টোরি ড এ জি পাওয়ার ফেসিলিটন ভলিউমে পি এম যোশির আসাদ বেগ’স রিটার্ন ফ্রম বিজাপুর এন্ড হিজ সেকেন্ড মিশন টু দ্য ডেকান ১৬০৪-১৬০৬)। এলিয়ট এবং ডসনের হিস্টোরি অব ইন্ডিয়ায় আসাদ বেগ একাংশ অনুদিত হন। কিন্তু তার বইএর সম্পূর্ণ অনুবাদ এখনও প্রকাশিত হয় নি। অথচ আসাদ বেগের বর্ণনা ব্যবহার হতে পারত আকবর থেকে জাহাঙ্গিরের রাজত্ব কাল পরিবর্তনের সময় দরবারি রাজনীতি দল ভাঙা-গড়া ইত্যাদি বিশ্লেষণের জন্যে। এখনও পর্যন্ত সে সব কাজের উদ্যম নেওয়া হয় নি। আমাদের উদ্দেশ্য যেহেতু তুলনামূলকভাবে সীমিত, আমরা আসাদ বেগের লেখায় উপস্থিত দীর্ঘ সময়ের নানান বর্ণনা, বিশেষ করে দক্ষিণে দু’বারের দৌত্যকাণ্ড বিষয়ক জটিলতায় প্রবেশ করছি না।
আমাদের মনে হয় আসাদ বেগ সুন্নি মত বিশ্বাসী ছিলেন। নিজের নাম লিখেছেন আসাদ ইবন মহম্মদ মুরাদ রাগিনী। বীর সিং বুন্দেলার বিদ্রোহ দমনে সম্রাটের শাহী বাহিনী ব্যর্থ হল কেন, সে কারন খুঁজতে দরবার থেকে আসাদ বেগকে তদন্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এরপর তাকে দক্ষিণে আদিল শাহের দরবারে দূত হিসেবে পাঠানো হয় আবুলফজলের সঙ্গী হিসেবে। ফেরত আসার সময় তিনি সম্রাটের জন্যে নানান ধরণের পেশকাশ আর ড্যালিয়েলের সঙ্গে বিবাহের জন্যে বিজাপুর রাজকন্যাকে সঙ্গে আনছিলেন।
তাঁর স্মৃতিকথার প্রথম অংশ হঠাতই শুরু হয় সম্রাটের কাছে পৌঁছনো আবুলফজলের নিহত হবার খবরে। তিনি লিখছেন, ৭ রাবি ১০১১ হ শুক্রবারের নামাজের সময় খবরটা সম্রাটকে দেওয়া হলে তিনি গভীর হতাশায় ভেঙে পড়েন। সামনে রাখা রোজকার পানীয় মদ্য ছুঁলেন না, খাদ্যও গ্রহণ করলেন না। হতাশ হয়ে থরথর করে কেঁপে কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞাসা করলেন ‘আসাদ বেগ কোথায়?’ সম্রাটের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যে একজনও তৈরি ছিল না। ফলে উত্তর পাওয়া গেল না। ইতিমধ্যে মির্জা জাফর আসফ খান (ইনি ইতিমদৌলার প্রখ্যাত পুত্র আবুল হাসান নন। তিনি ১৬৪১-এ মারা যান। আরেক জাফর বেগ ১৬১২-য় মারা যান, তিনি খুসরু এবং শিরিনের নুর-নামা লেখেন। জাহাঙ্গির বিশ্বাস করতেন, তিনি খুসরুর বিদ্রোহের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। যদিও সম্রাট তাঁকে এবাবদে শাস্তি দেন নি) দরবারে পৌঁছলে, সম্রাটকে কান্নায় ভেঙে পড়া দেখে তিনিও চিতকার করে কেঁদে ওঠেন। সম্রাট তাঁকে আসাদ বেগের সংবাদ জিজ্ঞাসা করলেন — ‘তুমি কী আবুলফজলের সঙ্গে ছিলে না?’ আসফ খান বললেন, ‘তিনি সিরঞ্জ অবদি তিনি আবুলফজলের সঙ্গে ছিলেন। নতুন পরগণার ফৌজদার, আসাদ বেগকে পিছনে ফেলে রেখে আবুলফজলকে মালওয়ায় নিয়ে যান। আবুলফজল যখন মারা যান তখন আসাদ বেগ তার সঙ্গে ছিলেন না’। সম্রাট আসফ খানকে বলেন, আবুলফজলের বাহিনীকে পিছনে ফেলে আসাদ বেগ দ্রুত দরবারে ফিরে আসার ফরমান লিখে পাঠাতে।
আসফ বেগ আবুলফজলের হত্যাকাণ্ড বর্ণনা করেছেন অতি বিশদে এবং সুচতুর সন্তর্পণে যাতে অভিযোগের একটাও আঙুল তার দিকে না ওঠার সুযোগ থাকে। পেশাদার রাজদূত হওয়ায়, সম্রাটের সঙ্গে সওয়াল জবাবের সময় উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে দায়মুক্ত থাকার একটা সচেতন প্রচেষ্টা লক্ষ্য না করে পারা যায় না; এবং সব থেকে বড় কথা তিনি এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ থেকে নিজেকে দায়মুক্ত করতেও সফল হন। মাথায় রাখতে হবে আসাদ বেগ যখন ঘটনাটা লিখছেন, তখন কিন্তু আকবরের প্রয়াণ হয়েছে, জাহাঙ্গির সদ্য শাসক হয়েছেন। আবুলফজলের হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সেলিম, জাহাঙ্গিরের সক্রিয় নির্দেশে। আসাদ বেগের কাজ ছিল সম্রাটের কাছে সত্য না লুকিয়ে বাস্তব তথ্য বর্ণনা করা। একই সঙ্গে তাকে মাথায় রাখতে হচ্ছে যে ঘটনা অতীতের শাহজাদা বর্তমান সম্রাটের নির্দেশে ঘটেছে সেটির বয়ান যেন নতুন সম্রাট, প্রাক্তন শাহজাদার কাছে আপত্তিকর মনে না হয়। আবুলফজলের হত্যাকাণ্ড বর্ণনার পরে আকবরের মৃত্যু এবং সেই সময়ে রাজত্বের হাত বদলের ঘটমান বর্তমান এবং তাত্ত্বিক আলোচনা বয়ান করতে ফিরে আসব।
আসাদ বেগ লিখলেন আবুলফজলের মৃত্যু হয়েছিল ভাগ্যের খেলাকে এড়াতে না পেরে। তাছাড়া মৃত্যুকালে আবুলফজলের যথেষ্ট বয়সও হয়েছিল। জনৈক অদক্ষ, অসামরিক সাজে সজ্জিত গোপাল দাস তার সঙ্গী হিসেবে দেওয়া হয়েছিল। রাজপুত গোপাল দাসকে সিহবান্দি হিসেবে ৩০০ সাধারণ অস্ত্রে সজ্জিত পদাতিক সেনাবাহিনী রাজপুতইজাবুনএর প্রধান হিসেবে উত্তীর্ণ করা হয় যাতে তিনি আবুলফজলকে রাজস্ব আদায়ে সাহায্য করতে পারেন। রোজকার খবরে আবুলফজল বুন্দেলা রাজার গতিবিধি স্পষ্ট জানতে পারছিলেন। বুন্দেলারা যে মুঘল দলটিকে পথের মধ্যে অতর্কিতে আক্রমণ করবে সেই বিষয়টাও আন্দাজ করা যাচ্ছিল। এমন কী, ভাই শেখ আবুল খয়ের আবুলফজলকে সাবধান করে দেন যে তাঁর জীবনের ওপর চরম আঘাত নেমে আসতে পারে। সেই হুঁশিয়ারি চিঠির বক্তব্য আবুলফজল পাত্তা দেন নি, তিনি নিরাপত্তা না নিয়ে নিজের মত করে এগিয়েগিয়েছেন। গোপাল দাস বাহিনী নিয়ে আবুলফজলের সঙ্গে না যাওয়ার যুক্তি দিলেন, তার বাহিনী অতিরিক্ত পরিশ্রমের ভারে ক্লান্ত। আবুলফজলের সঙ্গে ইন্দ্রজিৎ বুন্দেলাকে দমন করতে আসা বাহিনীটি সিরোঞ্জি শহরে কিছু দিন বিশ্রাম নিয়ে এগিয়ে যাওয়া আবুলফজলএর সঙ্গে পরে সময়মত যোগ দেবে। গোপাল দাসের এই যুক্তি আবুলফজল মেনে নিয়ে বাহিনীকে পিছনে ছেড়ে একাই এগিয়ে যান। যেন তিনি জানতেন তার ভাগ্যে অবশ্যম্ভাবী মৃত্যু লেখা আছে, এবং তিনি সেই ললাট লিখন এড়াতে পারবেন না। আসাদ বেগ লিখছেন ‘যুদ্ধের ইঙ্গিত শোনা যাচ্ছিল/অজ্ঞদের তৈরি নিয়ম মানতে গিয়ে এক অসামান্য জীবন ধ্বংস হল’। (চলবে)