আবুলফজলের হত্যা, আকবরের প্রয়াণ এবং আসাদ বেগ কাজভিনির বয়ান
আবুলফজল, আসাদ বেগকে সিরঞ্জে অপেক্ষা করতে নির্দেশ দিলে আসাদ বেগ বিনীতভাবে বলেন তাকে যেন গোয়ালিয়র অবদি আবুলফজলের সঙ্গী হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। তিনি আত্মপক্ষ সমর্থন করে লিখছেন, আবুলফজল তার প্রস্তাব অগ্রাহ্য করেন। এমন কী আসাদ বেগ ঘোড়ার জিন ধরে নিয়ে আবুলফজলের সঙ্গে অবাধ্যভাবে আসতে চাইলে আবুলফজল তার বাক্য মানতে নির্দেশ দিয়ে তাঁর সঙ্গে আসতে নিষেধ করলেন। ঠিক হল তার হাতি, নিশান এবং দমামা আসাদ বেগের সঙ্গে থাকবে। আসাদ বেগের সহকারী রুস্তম খান তুর্কোমানকে আবুলফজলের সঙ্গে যাওয়ার নির্দেশ দিলেও, সে আবেদন আবুলফজল স্পষ্টভাবে অগ্রাহ্য করলেন; আসাদ বেগ পরে তাকে আবার আবুলফজলের সঙ্গে যোগ দিতে পাঠালেও, তাকে আবুলফজল সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে আসাদ বেগের শিবিরে ফেরত পাঠান।
রাস্তায় আবুলফজল সরাই বারে তাঁবু ফেলে বিশ্রাম নেওয়ার সময় জনৈক যোগী তার সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তিনি জানান পরের দিন বীর সিং বুন্দেলা আবুলফজলকে আক্রমন করতে পারেন। তিনি যোগীকে কিছু অর্থ দিয়ে চলে যেতে বললেন। তাঁর সাথীদের বুন্দেলার অগ্রগমন বা সম্ভাব্য আক্রমনের সংবাদ দিলেন না। এটাই নাকী আবুলফজলের চরিত্র। সেজন্যে তিনি সে রাতে কোনও নিরাপত্তা ছাড়াই সরাইখানায় ঘুমিয়েছেন। পরের দিন শুক্রবার স্নান করে জুম্মাবার পালনে সাদা জামা পরিধান করলেন। জায়গিরদার, ক্রোড়ী সহ স্থানীয় বহু মানুষ তাঁর সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। এদের মধ্যে ছিলেন চল্লিশ পঞ্চাশ ঘোড়সওয়ার বাহিনীর সেনাপতি রুস্তম মির্জা। কালা বাঘ অঞ্চলের ফৌজদার শেখ মুস্তাফাও [তাঁর নিরাপত্তার জন্যে] বাহিনী এনেছেন। সব মিলিয়ে মোট ২০০ ঘোড়সওয়ারি ছিল। তিনি কাউকেই সঙ্গে নিলেন না, সকলকে চলে যেতে নির্দেশ দিলেন। আসাদ বেগ বলছেন, ভাগ্য তাকে যেন মৃত্যুর দিকে ঠেলছিল। তিনি ইয়াকুব খানকে নিয়ে এগিয়ে গেলেন। দূরে বিপক্ষ বাহিনীর দামামা শোনা যাচ্ছিল।
তার দল এসে পৌঁছতে না পৌঁছতেই বুন্দেলা বাহিনীর এক টুকরি পদাতিক সৈনিক আক্রমন শানায়। মির্জা মহসিন বক্সী এগিয়ে এলেন এবং উঁচু টিলা থেকে সম্ভাব্য আক্রমনের বহরটা আঁচ করলেন। তিনি বুন্দেলা বাহিনীর আকার বুঝে বাহিনীকে যুদ্ধের জন্যে তৈরি করার পরিকল্পনায় শিবিরে পৌঁছলে বোঝা গেল হাঁপিয়ে পড়া বাহিনী যুদ্ধের পোষাক পরে থাকলেও যুদ্ধ করার জন্যে তৈরি নয়। আলোচনা চলল, তারা কী এগিয়ে যাবে নাকী অন্য রাস্তা ধরবে। মির্জা মহসিন বক্সী বাহিনী নিয়ে বুন্দেলাদের ছাড়িয়ে দূরে চলে গেলেও আবুলফজল বাহিনীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছিলেন না। বুন্দেলাদের অগ্রগামী বাহিনী তার নিশান আর নাকাড়া দখল নিল। কিছু পরে ৫০০ ঘোড়সওয়ার, আর ভয়ঙ্কর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হাজির হল বীর সিংহ বুন্দেলা। গদাই খান আফগান অশ্ববাহিনী নিয়ে বুন্দেলাদের আক্রমন করে মারা গেল। জনৈক সেনা আবুলফজলকে দেখাল শত্রুর বর্ম আছে, তাদের নেই। ঠিক হল হাতাহাতি না করে দূর থেকেই তীর ধনুক দিয়ে যুদ্ধ চালানো হবে। সে শেখের ঘোড়াকে দূরে নিয়ে গেল।
সেই মুহূর্তে শত্রুর ঘোড়সওয়ারেরা আবুলফজলের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। তারা হিংস্রভাবে শাহী বাহিনীর ওপরে আক্রমন শানাতে থাকে। বিপক্ষ বাহিনীর জনৈক রাজপুত শেখের পিঠে বর্শা দিয়ে আঘাত করে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়। জব্বর খাসাখাইল রাজপুতটিকে হত্যা করে আবুলফজলকে ঘোড়া থেকে নামিয়ে নেয়। আবুলফজল তীব্রভাবে আহত হয়েছেন। জব্বর আবুলফজলকে দূরে নিয়ে যেতে চাইলেও, আহত আবুলফজল দাঁড়াতে না পেরে পড়ে গেলেন। বীর সিং বুন্দেলা ততক্ষণে আবুলফজলের কাছাকাছি হাজির হয়েছেন। জব্বর একটি গাছের আড়াল নিলেন। বীর সিং ততক্ষণে আবুলফজলের হাতি আর ঘোড়ার অবস্থান দেখে ফেলেছেন। তিনি এগিয়ে এসে ঘোড়া থেকে নামলেন। আহত আবুলফজলের মাথা তার উরুতে রেখে দুপাট্টা দিয়ে মুখের ওপর ভেসে থাকা রক্ত মুছিয়ে দিলেন। লুকিয়ে থাকা জব্বর দেখলেন বীর সিং আবুলফজলকে হত্যা করেছেন না, তার প্রতি দয়া দেখাচ্ছে। তিনি লুকোনো জায়গা থেকে বেরিয়ে সালাম করলেন। বীর সিং জিজ্ঞাসা করলেন তার জানুতে কার মাথা? নিজের নাম শুনে আবুলফজল চোখ খুললেন। বীর সিং সালাম জানালেন। তাঁকে হজরতইজাহাঙ্গিরের ফরমান দেখালেন। বীর সিংহ বললেন তিনি আবুলফজলের নিরাপত্তা বিধান করবেন। শুনে আবুলফজল মুখ বিকৃত করে বীর সিংহের নামে গালি দিতে দিতে যাচ্ছেতাই অপমান করলেন (দুশমনওফাহশহ)। বীর সিংহের সেনারা জানাল আবুলফজলের আঘাত খুবই গভীর, তাকে বাঁচানো অসম্ভব। মরিয়া হয়ে জব্বার তলোয়ার বার করে দুচারজন রাজপুতকে হত্যা করে বীর সিংএর দিকে এগোলেন। বীর সিং এবারে উঠে দাঁড়াল। তার সঙ্গে থাকা একজন আবুলফজলের মাথা বিচ্ছিন্ন করে দেয়। কেউ বাধা দিল না। আসাদ বেগ কবিতা উদ্ধৃত করে লিখলেন, ‘এই হতভাগ্য ছদ্ম কারাভানসরাই থেকে জ্ঞানীরা দূরে থাকে’।
আগরায় আসাদ বেগ
আসাদ বেগ লিখছেন ক্ষমতাহীন আবুলফজল অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসে শত্রুর ক্ষমতা ওজন না করে, নিজের অক্ষম বাহিনীর ওপর অতিশয় নির্ভর করে অবিবেচকেরমত এগিয়ে গিয়েছিলেন। আসাদ বেগ জানেন আবুলফজলের হত্যাকাণ্ডের সমস্ত দায় এসে পড়বে তাঁর কাঁধে। তিনি পরিকল্পিতভাবে দায়মুক্ত হতে তাঁর মত করে যুক্তি সাজিয়েছেন। তিনি অভিযুক্ত করেছেন চার বিষয় – ভাগ্য, আবুলফজলের চরিত্র, জাহাঙ্গিরের পরিকল্পনা এবং কিছুটা বীর সিং বুন্দেলার আক্রমন। আসাদ বেগ রাজদূত। তিনি কথা নিয়ে খেলতে জানেন। সময়, পরিবেশ, ঘটনাক্রম যখন তাঁর বিরুদ্ধে চলে যায়, সেসবের মোড় ঘুরিয়ে নিজের পাশে নিয়ে আসার দক্ষতা তিনি অর্জন এই সময়ে তিনি তাঁর এই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে শুধু আবুলফজলের মৃত্যুকালীন বর্ণনাতেই নয়, পরেও তার নিজের জীবন সাজিয়ে নিতে আসাদ বেগ অসামান্য চাতুর্যময় যুক্তিবুদ্ধি প্রয়োগ করবেন। রাজদূতের বুদ্ধিচাতুর্যে সূক্ষ্মযুক্তির দড়ির ওপর হেঁটে রাজনীতিকসুলভ মানসিকতায় নিজেকে রাজরোষ থেকে বাঁচবেন।
আসাদ বেগ সিরোঞ্জ থেকে ইন্দ্রজিৎ বুন্দেলার রাজত্বের দিকে অগ্রসর হলেন। কামারদের নাকাড়া বানাতে দেওয়ায় কিছুটা দেরি হচ্ছিল। তাছাড়া বর্ষা থামার জন্যেও অপেক্ষা করছিলেন। নাকাড়া তৈরি হওয়ার দিন তিনি মহম্মদ নাসিরের থেকে ঘটনাটা শোনেন। নাকাড়া বাজালেও সেটা প্রার্থিত শব্দ না করায় বুঝলেন ভাগ্য সাথে নেই, খুব খারাপ খবর শুনতে হতে পারে। একজন এসে নাসিরকে ফিসফিস করে কিছু বলায় নাসিরের মুখ রক্তশূন্য হয়ে কিছুই বলতে পারছিলেন না। আসাদ বেগের ভৃত্য আকা আলি বেগকে সরাই বরের দিকে পাঠানো হল। তিনি ফিরে এলেন ক্লান্ত ঘোড়া টানতে টানতে। মহম্মদ নাসির যুদ্ধের খবরটি জানালেন। শের আলি নবাব আবুলফজলের মৃত্যুর খবর এনেছেন। খবর শুনে আসাদ বেগ সিরোঞ্জে শাহী বাহিনীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। কয়েক দিন বাদে ফরমান আসায়, গোপাল দাসকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে আর দেরি না করে দরবারের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েগেলেন। আসাদ বেগ সরাই কালা বাগে পৌঁছে দেখলেন রায়চাঁদ বক্সীঁ এবং পরমানন্দ সেখানে আবুলফজলের রেখে যাওয়া পর্বতপ্রমান জিনিস নিয়ে থানা গেড়ে আবুলফজলের নির্দেশের জন্যে অপেক্ষা করছেন। সেখানেও আবুলফজলের হত্যার খবর পৌঁছল। তারা সেই মুহূর্তে আবুলফজলের রেখে যাওয়া ৪/৫ লক্ষ টাকার জিনিসপত্র হাতি ঘোড়ায় চাপিয়ে আগরার দিকে রওনা হলেন।
আসাদ বেগ রায়চাঁদ ইত্যাদিদের পিছনে ফেলে ২০০ ঘোড়সওয়ার বাহিনী নিয়ে দ্রুত চালে চলে আগরা পৌঁছলেন। সম্রাট তখন ঝরোখাইখাসওআমে বসেছিলেন। আসাদ বেগ বাহিনীকে কেল্লার বাইরের দরজায় ছেড়ে পাঁচ/ছজনকে নিয়ে ঝরোখার কাছাকাছি এসে দাঁড়ালেন। সরবরাহ খান বক্সীকে আসাদ বেগের আগমনের খবর জানিয়ে রেখেছিলেন। শেখ ফরিদ তাকে প্রথম ধাতুর বেড়ার ভেতরে একা আসতে বললেন এবং উঁচু গলায় তার নাম উচ্চারণ করলেন। আসাদ বেগের নাম শুনে, তার ওপরে চোখ পড়ায় সম্রাট তীব্রস্বরে কেঁদে উঠে ঝরোখা ছেড়ে ভেতরে চলে গেলেন। সম্রাটের আচরণে উপস্থিত সকলে হতবাক।
আবুলফজলের মৃত্যু সংবাদ পৌঁছনোর দিন থেকে যেন বিলাপের, শোকের দিন শুরু হল।
এর মধ্যেই সম্রাট, রামদাসের মাধ্যমে আসাদ বেগকে ডেকে পাঠালেন। ততক্ষণে তিনি উপস্থিত সকলকে আসাদ বেগকে নিজের হাতে খণ্ড খণ্ড করে কেটে ফেলার সিদ্ধান্তও উচ্চৈঃস্বরে জানিয়ে দিয়েছেন। ঘটনার গতিপ্রকৃতিতে হতবুদ্ধি রামদাস, আসাদ বেগকে নিয়ে এসে কোণায় দাঁড় করালেন। খানইআজম আসফ খান এবং শেখ ফরিদ সম্রাটকে অন্য কিছু ভাবাতে চাইছিলেন। সম্রাট, রামদাসের মাধ্যমে কথা চালাচ্ছিলেন। তিনি আসাদ বেগকে বলতে বললেন – ‘আবুলফজলের নেতৃত্বে তুমি বহুবার সাহস দেখিয়েছ, কিন্তু প্রাণ বাঁচানোর জরুরি সময়ে তুমি কেন কাজে এলে না? এখন তুমি আমার কাছে জান বাঁচাতে ছুটে এসেছ। আমি তোমাকে বেঁচে থাকতে দেব না, এমন শাস্তি দেব বিশ্ব বহুকাল মনে রাখবে’। বিহ্বল রামদাস সম্রাটের কথাগুলো আসাদ বেগকে জানালেন। চারদিক অদ্ভুত শান্ত শব্দহীন নির্জনতা। আসাদ বেগ সম্রাটের প্রশ্ন শুনে হতবাক হতবুদ্ধি হয়ে যেন শব্দ হাতড়ে বেড়াচ্ছেন। আসাদ রামদাসকে জিজ্ঞাসা করলেন ‘তিনি কী উত্তর দেবেন’? এই তুঙ্গ মুহূর্তে তিনি রামদাসকে পাশে থাকতে এবং তাঁকে বাঁচাতে অনুরোধ করলেন। পাশে থাকা আসাদ খান বললেন তার বুদ্ধি কাজ করছে না। যদিও তিনি ভবিষ্যৎ ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন, কিন্তু তিনি জানেন সম্রাট সুবিচারক, সম্রাট নিশ্চই অন্যায়ভাবে আসাদ বেগের প্রাণ নেবেন না। ‘তিনি যদি আমাকে হত্যা করে শান্তি পেতে চান, তবে তাই হোক’। কিন্তু আসাদ বেগ জানালেন মৃত্যুদণ্ড শোনার আগে আগে তিনি সম্রাটের সম্মুখে সত্য তুলে ধরতে আগ্রহী। তার নির্দোষিতা সম্রাটের সামনে তুলে ধরতে চান। তিনি চান এই কাজে রামদাস তাকে সাহায্য করুন। (চলবে)