ঝরোখায় সম্রাটের সম্মুখে
রামদাস উদ্যোগী হয়ে আসাদ বেগের মনোভাব সম্রাটকে জানালেন। বেশ কয়েকবার উত্তর-প্রত্যুত্তর পর্ব চলতে থাকল। আসাদ বেগ বলছেন দরবারে উপস্থিত অনেকেরই মনে হল সম্রাট যেন ক্রমশঃ ধাতস্থ হচ্ছেন। সম্রাট আসাদ বেগকে প্রশ্ন করলেন সে কেন আবুলফজলকে মৃত্যুর মুখে ছেড়ে দিয়ে এল? আসাদ বেগ তাঁকে নতুন করে পুঙ্খানুপুংখভাবে সব জানিয়ে বললেন সারা থেকে সিরোঞ্জের উদ্দেশ্যে যাত্রার প্রথম পর্বে আবুলফজলের সঙ্গে আসাদ বেগ আর মাহাদি আলি কাশ্মিরী এবং সঙ্গে মুঘল আফগান মিলিয়ে ১০০০ ঘোড়সওয়ার বাহিনী ছিল। সিরোঞ্জে গোপাল দাস আবুলফজলকে বললেন হিন্দুস্তানে তার কোনও জায়গির বা রাজস্ব আদায়ের সূত্র নেই। দক্ষিণি সেনারা তাকে রাস্তাতেই বকেয়া মাইনে চাইছে। দক্ষিণী বাহিনীকে সঙ্গে না নিয়ে আসাদ বেগের সঙ্গে এগোনোর প্রস্তাব দিলেন। আবুলফজল আসাদ বেগকে ডাকিয়ে বললেন, তারা আগরার দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। তিনি চান আসাদ বেগ এই বাহিনী নিয়ে বুন্দেলাদের বিরুদ্ধে লড়াই করুক। আসাদ বললেন তিনি শেখের সঙ্গে প্রথমে দরবারে যেতে চান। ফিরে এসে অনারব্ধ কাজ সম্পন্ন করবেন। আবুলফজল বললেন সর্বশক্তিমান তাঁর সঙ্গে আছেন। তার সঙ্গীর প্রয়োজন নেই। দরবারে সকলকে সাক্ষী রেখে আসাদ বেগ বললেন আবুলফজলের একগুঁয়ে চরিত্র এর আগে নিশ্চই সক্কলে অনুভব করেছেন। শেখ যে সিদ্ধান্ত নিতেন, সেটা কারোর পক্ষে পরিবর্তন করা সম্ভব ছিল না, আর আসাদ বেগ তো তার অধীনস্থ কর্মচারীমাত্র। আসাদ বেগের এসব উত্তর রামদাস সম্রাটকে জানালেন।
সম্রাট মন দিয়ে আসাদ বেগের উত্তর শুনলেন। উপস্থিত অন্যান্য অভিজাতও সম্রাটকে বললেন তাদের কাছে খবর আছে এই ঘটনায় আসাদ বেগের দায় নেই। তার মত মুঘল থাকবন্দীর নিচেরস্তরে থাকা এক সাধারণ চাকুরের পক্ষে যা কিছু করা সম্ভব ছিল, সে নিজের বোধবুদ্ধি প্রয়োগ করে করেছে — ‘আসাদ বেগ সাধারণ এক চাকুরে। তার মত চাকুরের পক্ষে একটা পর্যায়ের পরে ঘটনাক্রমের অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ রাখা সম্ভব হয় না। তবুও এই ঘটনায় আসাদ বেগ চাকুরির কর্তব্যের বাইরে গিয়ে বহু কর্তব্য পালন করেছেন’। আসাদ বেগের জীবন রক্ষা বিষয়ে এইসব যুক্তি এবং খানইআজমএর মত বড় আমলা আসাদ বেগের পক্ষ নেওয়ায়, সম্রাট মন পাল্টে আসাদ বেগের মৃত্যুদণ্ড রদ করলেন। আসাদ বেগকে বাড়িতে পরিবার আর সন্তানদের সঙ্গে দেখা করতে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হল। আকবর শেখ ফরিদকে নির্দেশ দিলেন যাতে আসাদ বেগ ছাড়া আবুলফজলের অন্য কোনও ভৃত্য ঝরোখার সামনে না আসে। রামদাস আসাদ বেগকে বললেন ব্যাপারটা আপাতত সামলানো গিয়েছে – আসাদ বেগ হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
আসাদ বেগ সর্বশক্তিমানকে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে রামদাসকে জানালেন, তিনি ঘরের কোনে বহু দূরে দীর্ঘক্ষণ বসে আছেন, তাঁর ইচ্ছে তিনি সম্রাটের উদ্দেশ্যে সিজদা করবেন। রামদাস নতুন করে বেগের প্রার্থনা সম্রাটের কাছে পৌঁছে দিলেন। দিনের শেষে, সন্ধ্যার দিকে সম্রাট প্রাসাদের ভেতরে তাকে সিজদা করার অনুমতি দিলেন। সম্রাটের নির্দেশে রামদাস আসাদ বেগকে চৌকন্দির কাছে নিয়ে এলেন। ততক্ষণে সম্রাট তার উপাসনা তাবিহ শেষ করেছেন। রামদাস আসাদ বেগকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। প্রথাসম্মতভাবে কুরনিশ আর সিজদা করার জন্যে তিনি এক মোহর এবং নয় টাকা দিলেন। সম্রাট শেখ ফরিদকে বললেন আসাদ বেগকে তার কাছে নিয়ে আসতে যাতে সে তাঁর পদচুম্বন করতে পারে। আসাদ বেগ তার দিকে এগিয়ে গেলেন [পদচুম্বনের জন্যে]। সম্রাট আশীর্বাণীরূপে তার পিঠে দুবার চাপড় দিলেন। আসাদ বেগ, সম্রাটের দৃষ্টিতে অসীম প্রশান্তি, বাহজত লক্ষ্য করবেন।
আসাদ বেগকে সম্রাট প্রশান্ত স্বরে তাঁর জন্মস্থানের কথা জিজ্ঞেস করবেন। নাকিব খান বললেন আসাদ বেগ, তার নিজের জন্ম শহর কাজভিনের উচ্চ পরিবারের সন্তান। সম্রাট তার দিকে অনুগ্রহের দৃষ্টিতে তাকালেন। এ সময় আসাদ বেগ আসফ খানের দিকে তাকিয়ে বোঝাতে চাইলেন তিনি তো সব কিছুই জানেন। আসফ খান এগিয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে বললেন, ‘আসাদ বেগ আমারই নিকট আত্মীয়। পিতার নাম মুরাদ বেগ আকা মুল্লা, কাজভিনে তাকে সকলে চেনে’। সম্রাট অবাক হয়ে বললেন, আসাদ বেগ যে আসফ খানের আত্মীয়, এতদিন তো তিনি সে সংবাদ জানতেন না। আসাদ বেগ বললেন তিনি সম্রাটের অনুগত ভৃত্য; তার অন্য কোনও পরিচয় নিশবাত nisbat অপ্রয়োজনীয়। সম্রাট বললেন, সত্যিকারের উদ্যোগী মানুষের পরিচয় প্রয়োজন হয় না। তিনি আসাদ বেগকে জিজ্ঞাসা করলেন, কত দিন তিনি আবুলফজলের [প্রশাসনিক] সেবায় আছেন? আসাদ বেগ বললেন সৌভাগ্যের সতের বছর। উত্তরের ঢং দেখে সম্রাট প্রশান্তি প্রকাশ করলেন। অন্যান্যরা আসাদ বেগের পক্ষে দাঁড়িয়ে অনেক কিছু ভাল্ভাল কথা বললেন। সম্রাট বললেন তিনি বহুদিন আসাদ বেগের কাজকর্মের দিকে লক্ষ্য রেখেছেন, কিন্তু আবুলফজলের অসম্মতিতে তাকে শাহী প্রশাসনের কাজে লাগাতে পারেন নি। আসাদ বেগও বললেন তার বহুকালের ইচ্ছে সম্রাটের খিদমত করার, কিন্তু অবসর মিলছিল না। তিনি প্রাচীন পারসিক জুবানইরামান্দিতে পদ উল্লেখ করলেন ‘আমার আপনাকে দেখার ইচ্ছে ছিল,/যেহেতু আমি পারিনি,/আমি এমন একটা স্থান খুঁজে পেলাম/যেখান থেকে আপনাকে দেখতে পারি’। নাকিব খান বললেন এটি প্রাচীন রামান্দি ভাষা এবং সম্রাটকে কবিতাটির মানে বুঝিয়ে দিলেন।
সম্রাট আসাদ বেগের শব্দ চয়ন এবং প্রয়োগ বিষয়ে প্রশংসা করে খাজা আমিদুদ্দিনকে আসাদ বেগের উপযোগী খেলাত আনতে নির্দেশ দিলেন। খাজার আনা কয়েকটি বাক্স থেকে সম্রাট নিজ হাতে অতি উচ্চমূল্যের শিরোপা নির্বাচন করলেন। এ ধরণের খেলাৎ সাধারণত আসাদের থাকবন্দীর স্তরের কর্মচারীদের দেওয়া হয় না। শেখ ফরিদ এবং খাজা আমিদুদ্দিন আসাদ বেগকে ঘরের কোণায় আচ্ছাদনের পিছনে নিয়ে গিয়ে শিরোপা পরিয়ে দিলেন। খেলাত পরে সম্রাটের সামনে আবার তাকে সিজদার অনুমতি দেওয়া হল। আরও কিছু এলোমেলো কথা হল। আসাদের উত্তরে সম্রাট প্রীত হলেন। আসাদ বেগ লিখছেন, সেই সন্ধ্যায় তাকে কেন্দ্র করেই দরবারে আলাপ আলোচনা চলল। বহু বন্ধু আশাপ্রকাশ করে বললেন আসাদ বেগ নিশ্চই শাহী প্রশাসনে উচ্চপদ পাবেন। সন্ধ্যা শেষ হওয়ার আগে সম্রাট রামদাসকে আসাদ বেগের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবার কথা বলে মাঝে মধ্যে তার নাম মনে করিয়ে দিতে বললেন। আসাদ খানও মাথা নামিয়ে সম্মতি জানালেন। রামদাস চিরাচরিতভাবে সম্মান দেখালে, সম্রাট আবারও উচ্চস্বরে ভবিষ্যতে আসাদ বেগের নাম তাঁকে মনে করিয়ে দেওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে অন্তরালে চলে গেলেন। রামদাস, আসফ খানের সঙ্গে দরবার থেকে বেরোলেন। তারা আবার আসাদ বেগকে মনে করিয়ে দিলেন, তিনি আজ অযাচিতভাবে সম্রাটের অনুগ্রহ পেয়েছেন এবং প্রত্যেকেই তাঁকে সতর্ক করলেন সম্রাটের সেবায় যেন কোনও ভুলচুক না হয়। তারা আরও বললেন পরের দিন থেকেই তিনি যেন নিয়মিত ঝরোখাইদর্শনে উপস্থিত থকেন। চলে যাওয়ার আগে আসাদ বেগ তার বিষয়ে মনোযোগী হওয়ার জন্যে রামদাসের কাছে আবারও প্রার্থনা করলেন। আসাদ খান, আসাদ বেগকে বললেন সম্ভব হলে পরের দিন থেকেই যেন তিনি হররোজ ঝরোখাইদর্শনে উপস্থিত থাকেন। চলে যাওয়ার আগে আসফ খান তাঁকে আরও উৎসাহ দিলেন।
সম্রাটের আহলইতাবাফ হলেন
ছ’বছর বিদেশে থাকার পর উৎফুল্ল আসাদ বেগ ঘোড়ায় চড়ে যেন উড়তে উড়তে বাড়িতে ফিরলেন। সম্রাট তাকে নিজে থেকে ঝরোখা দর্শনে উপস্থিত থাকতে নির্দেশ দেওয়ার খবরে বাড়ির সক্কলে আত্মহারা। সকলে সকলকে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করল, ভালবাসা দেখাল। পরের দিন তিনি সম্রাটের নির্দেশে, সম্রাটের দর্শন পেতে ঝরোখাইআমওখাসে এলেন। প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে পরিবার নিয়ে খাজা আমিনুদ্দিনের দর্শনে গেলেন। দিনের শেষে সম্রাট আবার ঝরোখাইআমওখাসে এলে আসাদ খান তাঁকে আবুলফজলের দেওয়া একটি রত্নপেটি তুলে দিলেন। সম্রাট প্রশ্নচিহ্ন নিয়ে তাকালে তিনি বললেন দাক্ষিণে আবুলফজল সম্রাটের জন্যে বহুমূল্য রত্নরাজি এবং মোহর সংগ্রহ করেছিলেন। মৃত্যুর আগের দিন তিনি জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা ভৃত্য নিয়াজকে দিয়ে যান। কালাবাগে অবস্থানকালে রায় চাঁদ এবং পরমানন্দ সেটি উদ্ধার করে আসাদ বেগের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। আসাদ বেগ বললেন এটা মহান সম্রাটের প্রতি প্রয়াত বন্ধুর পাঠানো নজর। সম্রাট তিক্ত স্বরে বললেন আবুলফজলের নামের সঙ্গে জুড়ে থাকা সব কিছুই তার জীবনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করছে। তিনি বাক্সটিকে আবদুল রহমানকে দেওয়ার নির্দেশ দেন। আসাদ বেগ বললেন, তিনি জানেন, আবুলফজলের নাবালক পুত্র যুবক হওয়ার আগে আবুলফজলের যা কিছু সম্পত্তি সব তহবিলদারের দেখাশোনায় থাকবে। এই পেটিকা ব্যতিক্রমী। আবুলফজল এটি সম্রাটকে দিতে বলেছেন। হাজারবার অনুরোধ করতে থাকায় সম্রাট সেটি মহলে পাঠিয়ে দিলেন, তারপরে আর এই রত্ন পেটিকার খোঁজ মেলেনি। (চলবে)