আসাদ বেগ সম্রাটের প্রস্তাব মত মনসব বিষয়ে খোঁজ করতে কাথেরা বা রেলিঙের ভেতরে যাওয়ার কথা ভাবলেন। তাঁকে রামদাস আবার একবার প্রাসাদের ভিতরে গোসলখানা [মানে স্নানের জায়গা নয়] আর চৌকন্দিতে নিয়ে যান। এই আসা যাওয়া পাঁচ/ছদিন ধরে চলতে থাকে। এইরমকই একদিন। সম্রাট শেখ ফরিদকে আসাদ বেগের মনসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আসফ খানের সঙ্গে আলোচনা করার নির্দেশ দিলেন। তাদের পরমর্শে আসাদ বেগকে ১০০ জাট, ২০০ সওয়ার রাখার অনুমতি দেওয়া হল। আসাদ বেগ সম্রাটকে তসলিম জানালেন। সম্রাট আসাদ বেগের কাজে যে খুশি, সেটাও প্রকাশ করলেন। বক্সীরা [পদন্নোতির] বিষয়টা বুঝে নিলে সম্রাট [তাদের] নির্দেশ দিলেন আবুলফজলের সম্মানে আসাদ বেগের মনসব আরও ১০০/২৫ পর্যন্ত বাড়াতে। আসাদ বেগ স্বর্গের চাঁদ পেলেন।
আসাদ বেগ দরবারে নতুন এলেও মনসবের ১০০/২০০ স্তরে দাঁড়াবার ক্ষমতা বেশিদিন উপভোগ করতে পারলেন না। নতুন পদ পাওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তাঁকে অন্য দায়িত্ব দেওয়া হল। খাজা কাসিম, দিয়ানত খান এবং আসফ খানের চাচা মির্জা মুখতার বেগ ইহতিমাম দপ্তর দেখাশোনা করতেন। মুখতার বেগ শাহজাদা পারভেজের আতালিক [ব্যক্তিগত শিক্ষক] হিসেবে কাজ করায় তিনি ইহতিমামের কাজে সর্বক্ষণের সময় দিতে পারতেন না, ফলে তিনি এবং এই কাজের সর্বাধিক সময় দেওয়া খাজা কাসিম মাঝে মধ্যেই ঝগড়া করতেন। কোনও এক দিন মুখতার বেগের কাজ বিষয়ে সম্রাটের কাছে অভিযোগনামা পৌঁছলে, আসিফ খান যুক্তি দিলেন শাহজাদা পারভেজের কাজে সময় দিয়ে মুখতার বেগের পক্ষে ইহতিমামের কাজে পুরো সময় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কাসিম খান ইঙ্গিত দিলেন, মুখতার বেগের জায়গায় যদি দক্ষ আমলা আসাদ বেগকে নেওয়া যায়। প্রস্তাবে সম্রাট খুশি হয়ে আসফ বেগকে ডেকে পাঠালেন। তিনি হাতের খাসা থেকে কিছু একটা বার করে, আসাদ বেগের কাঁধে হাত রাখলেন। চাঘতাই প্রথা তুরাইচাঘতাই অনুসরণে এর অর্থ, এবার থেকে আসাদ বেগ আহলইতাবাফ অর্থাৎ সম্রাটের জাদুমুগ্ধ বৃত্তের অংশ হলেন। আসাদ বেগ লিখছেন এই সম্মান মুঘল সাম্রাজ্যে বকশিগিরির সমতুল।
এই সময়ের মধ্যে কোনো এক দিন সম্রাট আসফ খানকে বললেন এখনও আসাদ বেগের মনসব নিয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় নি, তাকে কোনও জায়গিরও দেওয়া হয় নি। খুবই ব্যস্ত মানুষ আসফ খান সময় বার করে নারনাউল সরকারের একটি গ্রাম, যেটি আগে প্রয়াত শাহ আলি খানের জায়গির ছিল, আসাদ বেগের নামে লিখে দেয়ার ব্যবস্থা করলেন। জায়গির থেকে প্রথম বছরে আসাদ বেগ ১৭,০০০ টাকা, দ্বিতীয় বছরে ২০,০০০ টাকা এবং তৃতীয় বছরে ২৩,০০০ টাকা রোজগার করলেন।
আমরা দেখলাম, সম্রাটের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ তৈরি হওয়ার প্রক্রিয়াকে বুদ্ধিমান এবং কর্মদক্ষ আসাদ বেগ নিজের জীবনের উন্নতির লক্ষ্যে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করলেন। এই পদ্ধতিতে তিনি শুধু আকবরের রাজত্বেই উন্নতি করবেন না, পরের সম্রাট জাহাঙ্গিরের রাজত্বেও উন্নতির ফসল তুলবেন। তবে তার অতটা পদোন্নতি না হলেও, শাহী প্রশাসনে জুড়ে থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করবেন। আকবরের শেষ দিনগুলিতে তিনি সম্রাট-ঘনিষ্ঠতার সমস্ত সুযোগ সুদে আসলে উসুল করে নেবেন নিজের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে। মুজফফর আলম এবং সঞ্জয় সুব্রহ্মণিয়ম বলছেন আসাদ বেগ ১৬০৩-এ বিজাপুরে যাওয়ার আগে তৌহিদইইলাহিতে অংশ নিয়ে, সম্রাটের অন্তরঙ্গ সঙ্গীর প্রতীক শস্তইমুরিদি হিসেবে পরিগণিত হবেন।
দ্বিতীয়বার দক্ষিণের দৌত্য, রাষ্ট্রবিপ্লব (আকবরের প্রয়াণ), ক্ষমতার হাত বদল
আসাদ খানের প্রথম পক্ষ বর্ণনা, দ্বিতীয় পর্বে ঢোকার আগে চুম্বকে সেরে যাব। বীর সিং দেও’র বিরুদ্ধে প্রথম অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। এবারে সম্রাট আসাদ বেগকে দৌত্যে বিজাপুরে পাঠাচ্ছেন। চঞ্চল নামক হাতি এবং আরও কিছু উপহার নিয়ে আসাদ বেগ দক্ষিণের ইব্রাহম আদিল শাহের দরবারে সফল দৌত্য শেষ করে আগরায় ফিরবেন ১৬০৪-এ। ফেরার রাস্তায় তিনি খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েন। কয়েকটি সফল গুরুত্বপূর্ণ দৌত্য, সে সব অভিযান থেকে খুবই ধণাঢ্য উপহার নিয়ে ফেরা এবং দরবারে উচ্চপদে আত্মীয়দের উপস্থিতি তাকে খুব তাড়াতাড়ি উচ্চপদে আরোহন করতে সাহায্য করবে। তিনি লিখছেন প্রায় প্রতিদিন তিনি সম্রাটের থেকে কোনও না কোনও বিশেষ অনুগ্রহ, তরবিয়াত পাচ্ছেন। একদিন তার কাছে খবর এল তাঁকে দক্ষিণের চারটি প্রদেশের প্রতিনিধি (ইলচিগিরিই চাহার সুবাইদক্ষিণ) হিসেবে পাঠানো হবে। তখনও তিনি ২০০/৫০ এবং বাৎসরিক ১৭,০০০ টাকার মনসবের অধিকারী। আসাদ বেগ স্বগতোক্তি করছেন ‘সুভান আল্লা! কী অদ্ভুত আশীর্বাদী সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি’।
এই সময় খাজা আমিনুদ্দিনের জায়গায় তিনি বুর্জে এবং গুসলখানায় দুয়া রসনিদান পদে বৃত হচ্ছেন। পদটি যৌথভাবে খাজা মহম্মদ তাকির সঙ্গে তাঁকে ভাগ করে নিতে হল। কিন্তু তিনি ব্যক্তিগতভাবে অনেক বেশি কাজের অধিকার, সম্মান পেলেন। মহম্মদ খান কাজে এলে রক্ষীরা সকলকে সতর্ক করে দেওয়ার জন্যে তাঁর নাম ঘোষণা করত, আসাদ বেগ কাজে এলে এ সবের কিছুই করা হত না [অর্থাৎ তিনি বিশ্বস্ত এবং সর্বজনমান্য ছিলেন]। বুর্জে এবং গুসলখানায় আসাদ বেগের গতিবিধি অনেক খোলামেলা ছিল। আরেকটাও গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য ছিল, আসাদ বেগের মাধ্যমে সম্রাটের কাছে কেউ কোনও অনুরোধ করলে সম্রাট সে অনুরোধ ফিরিয়ে দিতেন না। বহু সময় খাজা তাকি, বহু মানুষের অনুরোধ নিয়ে সম্রাটের কাছে যেতেই সাহস পেতেন না। আসাদ বেগ সেটা পারতেন, হয়ত তাঁকে সম্রাট পছন্দ করতেন বলেই তার পক্ষে জনসেবা করা সম্ভব হয়েছিল। আসাদ বেগের সময়ের আগে এই পদের কাজগুলি সম্পাদন করতেন আমিনুদ্দিন এবং তাকি যৌথভাবে, কিছু পরে রাজা রামদাস এবং খাজা দৌলত, যিনি নাজিরও ছিলেন। আসাদ বেগ যখন কাজে ঢুকলেন, জাবিতা, আইন/প্রথা বদলে সমস্ত দায়িত্ব তাকে সঁপে দেওয়া হল। এমন কী খাজা দৌলত এবং রাজা রামদাসের মত উচ্চপদস্থ আমলাও আসাদ বেগের অনুমতি ছাড়া বুরুজে প্রবেশ করতে পারতেন না। দ্বিতীয়বার দক্ষিণে যাওয়ার আগে অবদি তিনি এত সব কাজ একা দক্ষ হাতে সামলেছেন।
এই সময় ড্যানিয়েলের মৃত্যুর খবর দরবারে পৌঁছল। প্রয়াণ অনুষ্ঠান, স্মরণ সময় অতিবাহিত হয়ে গেলে এক রাতে বুরুজে যখন গানের অনুষ্ঠান হচ্ছে, আসাদ বেগ রাজা রামদাসকে কানে কানে বললেন, তিনি যখন বিজাপুরে ছিলেন, তখন আদিল খান তাকে প্রশ্ন করেন, প্রখ্যাত তানসেন দাড়িয়ে না বসে কালোয়াতি গান করেন। সম্রাটের কানে কথাটা গেল। অনুষ্ঠান শুনতে শুনতেই তিনি জিজ্ঞাসা করলেন এই কথাটি আসাদ বেগ কেন বলল? রামদাস সম্রাটকে জানালে সম্রাট হাসলেন। বুঝলেন আসাদ বেগ কেন এই কথা বলেছেন। তিনি রামদাসকে বললেন আসাদ বেগের আরেকবার দক্ষিণে যাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে। আমাদের তার দক্ষতা ব্যবহার করতে দক্ষিণে দৌত্যে পাঠানো উচিৎ। আসাদ বেগ নম্রভাবে উত্তর দিলেন বর্ষাটা কেটে গিয়ে রাস্তা সুসর হলেই রওনা হওয়ার জন্যে তৈরি আছেন।
দক্ষিণে দৌত্যে যাওয়ার পরিকল্পনা রূপায়নে দরবারে সাজ সাজ রব। সম্রাট রাজা কিশন দাসকে ঘোড়া কেনার জন্যে খাজাঞ্চিখানা থেকে নির্দিষ্ট অর্থ বরাদ্দ করার নির্দেশ দিলেন। আসাদ বেগের দৌত্য বাহিনীর জন্যে বেশ কিছু ইরাকি ও তুর্কি ঘোড়া কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হল। শুধু দৌত্যের উদ্দেশ্যে ঘোড়া কেনাটা আকবরের ব্যতিক্রমী নির্দেশ, সাম্রাজ্যে এর আগে এরকম সুযোগ কেউ পায় নি। এই সময়েও তিনি সরাসরি নিজের ইচ্ছেগুলো সম্রাটকে জানানোর সুযোগ করে নিচ্ছেন। একমাসের মধ্যে ১৮০টা ইরাকি ও তুর্কি ঘোড়া কেনা হল। এর মধ্যে বুরুজে সময় কাটানোর সময়ে সম্রাট তাঁকে দক্ষিণে দৌত্য সম্বন্ধে বেশ কিছু যোগ্য উপদেশ দেবেন এবং নির্দেশাবলী জানাবেন। এরমধ্যে ছিল বিজাপুর গোলকুণ্ডা, বিদর আর কর্ণাটকের (বিজয়নগর) চার দক্ষিণী হাকিম/প্রশাসক/সুলতান হুক্কম-ই-আরবায়িদখিন-এর প্রতি সাম্রাজ্যিক ফরমান পাঠানো। সম্রাট, আসাদ বেগকে জানালে এর আগের দৌত্যটি দূত মীর জামাউদ্দিনের নেতৃত্বে পেশকাশ এবং আদিলখানের কন্যাকে নিয়ে আসার ছিল। এই দৌত্যে দক্ষিণের চারটি সুবায় ব্যবসায়িক নানান প্রকল্প এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত আসাদ বেগের নেওয়ার ক্ষমতা থাকবে। দৌত্যের অন্যতম কাজ হল চার সুবা থেকে ভাল হাতি, অনুপম রত্নরাজি নিয়ে ফেরা।
ফরমানের নির্দেশ অনুযায়ী দৌত্যের রসদ তৈরি করতে দুমাস পেরিয়ে হয়ে গেল। ততদিনে আসাদ বেগের মনসব বেড়ে ২০০/৩০০ হয়েছে। অভিযানের জন্যে চার মাসের অগ্রিম বেতন দিয়ে যথেষ্ট পরিমানে ইরাকি, খুরাসানি এবং তুর্কোমান সেনা দেওয়া হল। প্রত্যেককে একটা করে ঘোড়া দেওয়া হল। পদাতিক নেওয়া হল এক থেকে দুহাজারের মধ্যে। বক্সী হলেন দক্ষ করণিক নাওয়িসিন্দা শাহ আলি ইসপশানি। বাহিনীতে একশ বন্দুকচি এবং একই অঙ্কের পদাতিক তীরান্দাজ এবং বাহিনীর অন্যান্য বিভাগ জোড়া হল। সে সময় বিদরের আমিনুলমুলক, উকিলের মাধ্যমে পেশকাশ এবং আর্জদস্ত আসত। যাত্রা শুরুর আগে তিনি আগের বারে দেখা করা, মালিক অম্বরের জন্যে একটি ফরমান চাইলেন। বলা হল খসড়া তাকেই করে নিতে। প্রয়োজনে কাজে লাগানোর জন্যে যাত্রায় কোরা কাগজ এবং তুঘ্রা আর মুহর-ই-আউযাক বা মূল পাঞ্জার মত নানান সরঞ্জাম নেওয়ার অনুমতি দেওয়া হল। মোদ্দা কথা আসাদ বেগ যে সুযোগ পেলেন, এর আগে মুঘল সাম্রাজ্যে সেই অধিকার কেউই পায় নি। (চলবে)