আকবরের প্রয়াণ সংবাদ
দক্ষিণে দৌত্যে যাওয়ার আগে তিনি নিয়মিত সন্ধ্যায় সম্রাটের সঙ্গে বুর্জে বা শিবিরে আমোদ-প্রমোদে সময় কাটাতেন। এরকমই এক সন্ধ্যেয় যখন সম্রাট সিংহাসন ছেড়ে মহলে যাওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছেন, জানালেন তিনি আসাদ বেগের জন্যে এক হাজার মনসব বরাদ্দ করেছেন। দক্ষিণ থেকে ফিরলে এই সম্মান তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে দরবারে অর্পণ করা হবে। আপ্লুত আসাদ সম্রাটকে তসলিম, সিজদা করে সম্মান জানালেন। তাকে সম্রাটের আস্তাবল থেকে একদিন একটি বিশেষ ঘোড়া এবং আরেক দিন একটি জরির কিংখাবের খেলাত দেওয়া হল। অন্যদিন সম্রাট কোমরে বাঁধা শাল নিজের হাতে তার মাথায় বেঁধে দিলেন। আসাদ বেগের সাম্মানিক বিদায় অনুষ্ঠান আয়োজন করা হল। যাত্রা শুরুর আগের মুহূর্তে আসাদ বেগকে বলা হল তিনি যেন কিছু দিন শহরের বাইরে অপেক্ষা করে যান। তিনি শহরের বাইরে শিবির পেতে পনের দিন অপেক্ষা করলেন। এক পক্ষকাল পরে তাঁকে সম্রাটের পক্ষে বিদায় জানাতে খাজা মহম্মদ তাউই এলেন।
মৃত্যু সংবাদ
রাস্তায় বেশ কিছু আক্রমন সামলে উজ্জয়নীতে পৌঁছে তাঁবু ফেললেন। শহরের বাইরে আরেক তৈমুরী অভিজাত মির্জা শাহরুখের সঙ্গে দেখা করলেন। শেষ দফার যাত্রা খুবই ক্লেশদায়ক হবে এমন ভাবনা ভেবে গোছগাছ চলছে, এমন সময় দক্ষিণ থেকে দরবারের দিকে যাওয়া নবাব মির্জা আলিবেগের সঙ্গে শিবিরেই দেখা হল। দুজনে দুজনকে যেহেতু বন্ধু ডাকেন, তার সম্মানে সেখানে আরও এক দিন বেশি থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। ইতিমধ্যে রাজধানী থেকে হিন্দু আমলাদের (যতদূরসম্ভব রাজপুত অভিজাতদের) থেকে সম্রাটের গভীর অসুস্থতার বার্তা নিয়ে চিঠি এল। দৌত্যের সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার মুখে। আরও কিছু খবরের আশায় আরেক দিন অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। সে রাতেই মির্জা শাহরুখের উকিলের থেকে এবং হিন্দুদের থেকে দুটো চিঠিতে এল সম্রাট আকবরের মৃত্যুর হৃদয়বিদারী সংবাদ। আসাদ বেগের সামনে বিশ্বটা যেন চুর চুর হয়ে ভেঙে পড়ল। তিনি সম্রাটের মৃত্যু দিনকে কালো দিন বললেন।
খবরের প্রতিক্রিয়ায় চারপাশে কী ঘটল সেটা আসাদ বেগের লেখাতেই পাচ্ছি। মৃত্যু সংবাদ পেয়েই আসাদের উটের দায়িত্বে থাকা ৫০ বালুচি ভাগল। আসাদের সঙ্গ নেওয়া এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে থাকা বালুচিরা ১০০ উট নিয়ে পালিয়ে গেল। মির্জা শাহরুখকে পছন্দ না করা উজ্জয়নির বাদাকশিদের থেকে বিদ্রোহের আশংকা করা হচ্ছিল। আসাদ বেগের সঙ্গী মির্জা আলি, আসাদকে দরবারে যাওয়ার পরামর্শ দিয়ে দরবারের দিকে রওনা হলেন। আসাদ বেগ বিশাল বাহিনী নিয়ে স্থানু হয়ে রইলেন। তার সঙ্গে বিখ্যাত তাব্রিজি ব্যবসায়ী আছেন। তার কাফিলাকে বুরহানপুরে পৌঁছে দিতে হবে।
আসাদ বেগের এক গায়ক-সঙ্গী বৈজু, বৈজু কালোয়াতইবাদশাহী তার ভাইদের বিরাদরান নিয়ে চলে গেল। আসাদ তাকে একসময় জীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে খুবই সাহায্য করেছেন। প্রত্যেককে তিনি খুব দামি ঘোড়া এবং অগ্রিম অর্থও দিয়েছিলেন। পরের দিন খবর এল হিসেব রাখার দায়িত্বে থাকা বক্সী, শাহ আলি কয়েকজন অশ্বারোহী এবং পদাতিককে সঙ্গে নিয়ে পালিয়ে গেছেন। এত সব সব ঝামেলা সামলে তিনি আরও ১৫০টা উট জোগাড় করলেন। দক্ষিণের দিকে যাত্রা শুরু করার জন্যে মির্জা শাহরুখের সাহায্য চাইলেন। মির্জা তাকে উকিল মীর কালাম এবং ৫০০ অশ্বারোহী দিয়ে নরমদা নদী অবদি এগিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দিলেন। খারাপ খবর আসার চতুর্থ দিনে তিনি উজ্জয়নী ত্যাগ করলেন।
খারাপ দিন তখনও শেষ হয় নি। তুর্কমানদের মধ্যে জনৈক কালোমুখো নাসির খান আসাদ বেগের বিরুদ্ধে চক্রান্ত জাল রচনা করতে থাকে। নাসির খান ছিল আসাদ বেগের উকিল। তার হাতে প্রভূত ক্ষমতা। ভাগ্যভাল তার দুই সঙ্গী ইয়াকুব আকা এবং শের আলি আসাদ বেগকে চক্রান্তের খবর জানিয়ে দিলে অনেক দুর্ভোগ থেকে বাঁচাগেল। তার মূল ভাবনা হল, তিনি তখনও মির্জা শাহরুখের নিরাপত্তায় আছেন, কিন্তু নর্মদা পার হওয়ার পর যখন মির্জার বাহিনী থাকবে না, কে তাকে সহায়তা দেবে? তিনি মীর কালামের তাঁবুতে গিয়ে তার নিজের বাহিনীর বিশ্বাসঘাতকতা হারাম খোরির বিষয়ে বিবৃত করে তাকে আরও কিছু দূর সঙ্গ দিতে অনুরোধ করলেন।
শেষ পর্যন্ত বহু সমস্যা সয়ে ক্লান্ত রিক্ত অবসন্ন আসাদ বেগ বুরহানপুর পৌঁছে বন্ধু আখুন্দ মুল্লা হায়াতির বাড়িতে শিবির ফেললেন। শহরে কয়েক দিন কাটিয়ে তিনি আবদুল রহমান খানইখানানের সঙ্গে দেখা করে কয়েকটা ফরমান দিলেন। সেখানে তিনি চমৎকার আতিথ্য পেলেন। মদ্যপেয়ালা জামহাইয়িরাহইরেহানি হাতে একের পর এক সুখদ সন্ধ্যা আসবাব-ই-আয়েশওকামরানি কাটিয়ে হারানো জোশ ফিরে পেলেন। দুঃখভরা হৃদয়েও তিনি ক্রমশ আনন্দ খুঁজে নিতে শুরু করলেন। নিজের বাহিনীতে একের পর এক বিশ্বাসঘাতকতার ক্লেশ বহনের পর তিনি কিছুটা শান্ত হলেন। কয়েক দিন পর খানই খানান তাঁকে আরও বড় মনসব দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন দক্ষিণে থেকে যাওয়ার শর্তে। বলা হল তার বৌদ্ধিকপ্রিয়তা শুবাতএর জন্যে তাঁকে মুন্সি পদ দেওয়া যেতে পারে। আসাদ বেগ ভাবার সময় চাইলেও দ্বিধা কাটাতে পারছিলেন না। খানইখানান তাকে প্রভাবিত করতে (আসাদ বেগেরও বন্ধু) দেওয়ান মির্জা আবদুল মালিক আরঘান্দিসহ কয়েকজন আমলাকে তার শিবিরে পাঠালেন। আসাদ বেগ খানইখানানকে শ্রদ্ধা এবং সম্মান জানিয়ে লম্বা চিঠি লিখে বললেন মুঘল সাম্রাজ্যের পদের তুলনায় এই লোভনীয় প্রস্তাব ছাড়া উচিৎ নয়। কিন্তু তার মন দ্বিধায় পরিপূর্ণ। প্রয়াত সম্রাট তাকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছিলেন। শাহজাদা (জাহাঙ্গির) তাঁর প্রতি যথেষ্ট সম্মান দেখিয়েছেন। কিন্তু তিনি শাহজাদার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। শাহজাদা সেলিম বর্তমানে সম্রাট। শাহজাদা তার এই বেআদপি মাফ করবেন কীনা তিনি জানেন না। তিনি যে শেখের (আবুলফজল) কর্মচারী ছিলেন সে সংবাদ নতুন সম্রাটের জানা আছে। দক্ষিণে তিনি অপেক্ষা করছেন ফিরে যাওয়ার ফরমান বা কোনও বার্তাবহের আসার দিকে তাকিয়ে। তিনি নিজ উদ্যমে ফেরত যেতে চান না।
আসাদ বেগ যা চাইছিলেন সেটাই ঘটল। সম্রাট জাহাঙ্গিরের দরবার থেকে আসাদ বেগের ভাষায় ‘উদাসদীন, নির্বিকার একটা ফরমান’ এসে হাজির। দরবার থেকে ফরমান বয়ে এনেছেন আসাদ বেগের উকিল ইয়াকুব আকা; সঙ্গে আরও কয়েকজন বন্ধুর চিঠিও এল। ফরমানটা খানইখানানকে দেওয়া হল। লেফাফা খুলে দেখা গেল আসাদ বেগের প্রতি নির্দেশ, তিনি যে দৌত্যে হিজাবত গেছেন, সেখানে তিনি যে অবস্থাতেই থাকুন, তাকে দরবারে ফিরে আসার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। খানইখানান বুঝলেন আসাদ বেগের ভবিষ্যৎ প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি ইয়াকুবকে জজ্ঞাসা করলেন কেন তাকে এরকম নির্দেশ পাঠানো হল? জানাগেল প্রয়াত সম্রাট যে গায়ক কলাবন্ত বৈজুকে আদিল খানের দরবারে পাঠাচ্ছিলেন আসাদ বেগের বাহিনীর সঙ্গে দক্ষিণি আঙ্গিক তাসনিফাত শেখার জন্যে, সে সম্রাটের মৃত্যুর সংবাদে দৌত্য বাহিনী ছেড়ে আগরা দরবারে ফিরে যায়। জাহাঙ্গির তাকে চিনতে পারেন। তিনি প্রশ্ন করেন কোথায় সে আসাদকে ছেড়ে এল? সে উত্তর দিল উজ্জয়নী। বৈজুর দাবি সে জাহাঙ্গিরের সিংহাসনের আরোহনের সংবাদ শুনে কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে দরবারে ফিরে আসে, কিন্তু গোঁয়ারের মত আসাদ বুরহানপুরের দিকে এগিয়ে যায়। জাহাঙ্গির আসাদ খানকে সেই মুহূর্তে ফিরে আসার নির্দেশ দিলেন। আসাদের বন্ধু প্রধান উজির বললেন আসাদকে প্রয়াত সম্রাট নির্দিষ্ট একটি কাজ দিয়েছেন, সে নিশ্চই কাজ সমাধা করেই ফিরবে।
দক্ষিণে থেকে মির্জা আলি বেগ দরবারে ফিরেছেন, তার থেকে তিনি নিশ্চয়তা পেয়েছেন কাজ শেষ করেই আসাদ বেগ ফিরবেন। তিনি সম্রাটকে জানালেন মহামহিমের মৃত্যুর খবর পেয়ে আসাদ বেগের বাহিনীর বহু সেনা কাজ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে। তার সঙ্গে বিশাল বাণিজ্য কাফিলা ছিল, আর কিছু দক্ষিণীও ছিল। তার পক্ষে সব দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে সহজে দরবারে ফিরে আসা সম্ভব ছিল না। তিনি যদি বড় বাণিজ্য কাফিলাটি ছেড়ে চলে আসতেন, তাহলে সেটি ধ্বংস হয়ে যেত। প্রশ্ন উঠল তিনি কেন কাফিলাটি বুরহানপুরে পৌঁছে দিয়ে ফিরলেন না? মির্জা বললেন দক্ষিণ বহু দূরের ভূখণ্ড। উত্তরে জাহাঙ্গির বললেন, ‘আল্লা মালুম সে কোথায় গেছে’। তখন কথাবার্তায় ঢুকলেন তৃতীয় ব্যক্তি মির্জা জান বেগ, তিনি আসাদকে পছন্দ করতেন। তিনি বললেন আসাদের উকিল মার্ফৎ তাকে এই মুহূর্তে ফরমান পাঠানো হোক। তখন ইয়াকুব আকা খানকে ফরমানের খসড়াটা করে দেওয়া হয়। আসাদকে অদরবারি অসরকারি আরও এক চিঠিতে যততাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরে আসতে নির্দেশ দেওয়া হল। কিন্তু সবার আগে ফরমানটিই পৌঁছল পৌঁছল। জাহাঙ্গিরের রাজত্বে দক্ষিণে পৌঁছনো এটাই প্রথম মুঘল সাম্রাজ্যের ফরমান। মুঘল ফরমান আসাদ বেগের সামনের সমস্ত বিকল্প রুদ্ধ করে আগরায় ফিরে আসতে বাধ্য করল। (চলবে)