১৬০৫ শেষ সময়
[সম্রাট আকবরের শেষ সময়ের ১৬০৫এর অক্টোবরের বর্ণনা আমরা আকবরের খুবই গুরুত্বপূর্ণ সচিব নুরুল হক দেহলভির জুবদাতুলতাওয়ারিখ থেকে নিয়েছি। তিনি জাহাঙ্গিরের সময়েও শেখ ফরিউস বুখারি মুর্তাজা খানের অধীনে গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকার পাবেন। শেখ ফরিদ ১৬১৬য় প্রয়াত হন। আমরা ধরে নিতেই পারি নুরুল হকের লেখা আকবরের প্রয়াণের খুব বেশিদিন পরে লেখা হয় নি। এবং নিশ্চই তিনি তার চাকুরিদাতা মীর বক্সি শেখ ফরিদের থেকে প্রত্যক্ষ বর্ণনা শুনে লিখেছেন। তার বয়ানে নুরুল হক গুরুত্ব সহকারেই উপস্থিত। তবে তিনি মৃত্যুর তারিখটি উল্লেখ করেন নি, সেটা আমরা জানিয়েদিলাম ২৬ অক্টোবর ১৬০৫। নুরুল হকের ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে রাখা বই যতদূরসম্ভব এখনও প্রকাশিত হয় নি। দুটি সংস্করণ নির্ভর অনুবাদটি শিরিন মুসভির অনুবাদের অনুবাদ]।
১৬০৫এর অক্টোবরের প্রথম দিকে, মহামহিমের দেহে দুর্বলভাব এবং অজীর্ণও দেখা দিল। তার সমস্যাগুলি তাঁর সময়ের গ্যালেন, বিভিন্ন জ্ঞানের আধার, চিকিৎসাবিদ্যায় অতুলনীয় হাকিম আলি গিলানিকে বললেন। হাকিম তাঁর নাড়ি এবং আরও কিছু উপসর্গ দেখলেন। বললেন, ‘আজও আপনার উপবাসের সেরা সময়। এর ফলে আপনার যকৃতে যে বায়ু জমা হয়েছে সে সব বেরিয়ে যাবে। আগামী কাল আপনার শরীর জুতে আসলে, আপনার দেহের জোরবাড়াবার চিকিৎসা শুরু করব’। তিনি সারা দিন উপোস করলেন। পরের দিন হাকিম তাঁকে ঘি ছাড়া সুরুয়া পানের নিদান দিলেন। খাওয়ার নিদানে অসন্তুষ্ট মহামহিম হঠাতই জেনানায় চলেগেলেন। জেনানায় তাঁর অসুস্থ শরীরকে দেখাশোনায় যথেষ্ট অবহেলা ঘটছিল। মহামহিমের শরীরের অবস্থা স্বাভাবিক থেকে দুর্বল থেকে ক্লান্তির শরীরে পর্যবসিত হল। পরের দিন যত হাকিম মুঘল শাহী সুবিধে পান, তারা একজোট হলেন। চিকিৎসাবিদ্যা, ওষুধ দান ইত্যাদি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হাকিম আলি এবং হাকিম জালালুদ্দিন মুজফফরের মধ্যে মতবিনিময় মত পার্থক্যতে রূপান্তরিত হল, কোন দলই কোনও দলের চিকিৎসা পদ্ধতি মানতে রাজি নন। মতপার্থক্যের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকের গলা চরমে চড়তে শুরু করল। সম্রাটকে ঝগড়ার সংবাদ দেওয়া হলে, তিনি হাকিম আলির চিকিৎসায় ভরসা করলেন। কারন তিনিই একমাত্র মহামহিমের চিকিৎসা বহুকাল ধরে করছেন। ‘আমি হাকিম আলির ওপর ভরসা করছি। তার যেটা ভাল মনে হয়, সেটা তাকে করতে দাও’। হাকিম আলি তার সমস্ত অধীত বিদ্যা উজাড় করে চিকিৎসা শুরু করলেন। যত দক্ষতা, নিত্যনতুন ওষুধ, যাই তিনি প্রয়োগ করুন না কেন সাফল্য তার অধরাই থেকে যাচ্ছিল। তীব্র জ্বর আর উদরাময় সারার লক্ষ্মণ দেখা গেল না। মোটামুটি সকলেই প্রায় বুঝে গেল সম্রাটের জীবনের পেয়ালা পূর্ণ হওয়ার মুখে, যত জোরালো, যত কার্যকর ওষুধই হাকিম তাঁকে সেবন করান না কেন তাঁকে সুস্থ করে তোলার প্রত্যেকটা প্রচেষ্টা একে একে বিফল হল।
যতক্ষণ সম্রাটের হোঁস ছিল, যখণ তাঁর জ্ঞান ছিল, যতক্ষণ তিনি কথা বলতে পারছিলেন, ততক্ষণ হাসবুলহুকুম [সম্রাটের নির্দেশে এই কাজটি প্রতিপালিত হচ্ছে] নির্ভর করে সাম্রাজ্যের কাজকর্ম উচ্চপদের অভিজাত আমীরদের জারিকরা রিসালা দ্বারা পরিচালিত হচ্ছিল। কিন্তু যখন সম্রাট সব কাজকর্ম থেকে নিজেকে বিচ্যুত করে নিচ্ছেন, যখন তিনি জ্ঞান হারালেন, তখন সাম্রাজ্য জুড়ে উথালপাথাল শুরু হল, রাস্তাঘাটে শান্তি বিঘ্নিত হল, সীমান্ত উপদ্রুত হয়ে উঠল, শান্তি বজায় রাখা দায় হপয়ে উঠল। মহামহিমের চিকিৎসায় অভিজাত এবং উচ্চপদের আমলারা অবহেলা দেখাতে শুরু করলেন। তাদের মনে নানান পরিকল্পনা খেলা করতে লাগল। প্রত্যেকের নিজের স্বার্থ বুঝে নিতে উৎসাহী, প্রত্যেকের মাথায় শয়তানি বুদ্ধি কিলবিল করতে করতে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া শুরু হল। তারা বিভিন্ন শাহী ক্ষমতাধরের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিতে শুরু করলেন — কারন অধিকাংশ জানেন না, কে সম্রাট হবেন।
প্রাসাদের এইসব ঘটনা ঘটে চলার মধ্যেই সম্রাটের ঘনিষ্ঠতম মহামহিম শাহজাদা সুলতান বললেন সম্রাটের স্বাস্থ্যের অবস্থা জানতে তিনি স্বয়ং সম্রাটের সঙ্গে দেখা করবেন। কিন্তু ভেদবুদ্ধিওয়ালা আমীর অভিজাতরা তার সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে থাকেন। এই সময়ের মহামহিম শেখ ফরিদ বুখারি শাহজাদা সেলিমের কাছে গিয়ে তাঁকে অন্তর্বর্তী সম্রাট হিসেবে সালাম জানালেন, এবং কেল্লার দরবারে প্রহরী নিযুক্ত করলেন। পরের দিন যুবা সম্রাট সালিম ভাগ্যের এবং পারিপার্শ্বিক উপাদানের সহায়তায়, ভালবাসার টানে নিজেকে মহামহিমের বিছানার কাছে গিয়ে তাকে দেখার সৌভাগ্য অর্জন করলেন। হঠাতই মহামহিমের অবস্থান কিছুটা উন্নতি ঘটলে স্বর্গীয় আলোক সেলিমকে চোখের সামনে সম্রাট আনন্দিত হয়ে উঠলেন। মহামহিমের চোখ বেয়ে অশ্রু নেমে এল। তিনি মাথা ঘুরিয়ে ইঙ্গিতে চন্দনকাঠের পালঙ্কে, সার্বভৌমত্বের প্রতীক কারুকার্যময় তরোয়ালের দিকে ইঙ্গিত করে সেটি শাহজাদার হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। এরপরের সম্রাটের মৃত্যুর হৃদয়ভাঙ্গা সংবাদ রাজ্যব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে সারা সাম্রাজ্য থমকে গেল। ভারাক্রান্ত হৃদয় নিয়ে তিনি প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এসে নিজের প্রাসাদের দিকে চলেগেলেন। বাপ ব্যাটার সেই শেষ দেখা।
যে ঘটনাকে এড়ানো যাবে না, সেই ঘটনার মুখোমুখি হতে হল তাঁকে। সম্রাট প্রয়াত হলেন। সমস্ত কাজ শেষ হলে নতুন সম্রাট জানাজায় যাওয়ার পোষাক পরে বেরিয়ে এসে ছয় ফুটের কফিনটা একা এক দিকে এবং অন্যান্য শাহজাদারা অন্য তিনদিক নিজেদের কাঁধে তুলে কেল্লার দরজা পর্যন্ত গেলেন। সেখান থেকে যতক্ষণনা তাঁরা আগরা থেকে এক ফরসাং দূরে সিকান্দ্রায় পৌঁছচ্ছেন, অনুগত আমলারা প্রয়াত সম্রাটকে বয়ে নিয়ে চললেন। সেখানে তাঁকে কবর দেওয়া হল। (চলবে)