আওরঙ্গজেবের বাল্য আর যৌবন
প্রথম পর্ব : শিক্ষা
প্রথম আলমগির নাম নিয়ে দিল্লির সিংহাসনে আরোহন করা মুহিউদ্দিন মহম্মদ আওরঙ্গজেব ছিলেন শাহজাদা খুররম, পরে শাহেনশাহ শাহজাহান আরজুমন্দ বানুর [মুমতাজমহল] ষষ্ঠ পুত্র। আওরঙ্গজেবের জন্ম হয় দোহাদে (প্রাক্তন বম্বে প্রেসিডেন্সির, আজকের মহারাষ্ট্রের দোহাদ রেলস্টেশনের দক্ষিণে। পরিণত বয়সেও তিনি দোহাদকে ভোলেন নি। রুকাতইআলমগিরির ৩১ এবং ৫৮ চিঠিতে পুত্র আজমকে উদ্দেশ্য করে লিখছেন, ‘দোহাদ গ্রামের মানুষের সঙ্গে দয়ালু ব্যবহার কোরো’) ১৬১৮-য়। ১৬২৩-এ তাঁর বাবা খুররম সম্রাট জাহাঙ্গিরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে তেলেঙ্গানা থেকে বাংলায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, তখনও আওরঙ্গজেবের শৈশব কাটে নি। দক্ষিণ থেকে ফেরার পথে আরজুমন্দ বানুর ঔরসে আওরঙ্গজেবের জন্ম হয়। বহু বছর বিদ্রোহী খুরম-আরজুমন্দকে তাদের শিশুপুত্রদের নিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে, এমনকী জাহাঙ্গীরের শাহী বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে বাচ্চাদের সঙ্গে রেখে।
১৬২২ থেকে পিতা জাহাঙ্গীরের মৃত্যু পর্যন্ত দীর্ঘ ৬ বছর খোলা আকাশের নিচে তেলেঙ্গানা, ওডিসা, বাংলা হয়ে জৌনপুর এই ভৌগোলিক এলাকা জুড়ে পালিয়ে বেড়াবার সময় খুররম তাঁর স্ত্রীকে সঙ্গে পেয়েছেন। আমরা মনে করি মুমতাজমহলই পুত্র আওরঙ্গজেবের প্রথম জীবনের প্রথম শিক্ষক। পালিয়ে থাকার সময় শাহজাদা আওরঙ্গজেবের শিক্ষার জন্যে আতলিক নিয়োগ করার সংবাদ পাচ্ছি না। তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরির জোড়াপাতায় মির্জা হাদি লিখছেন জাহাঙ্গির শাহজাদা খুররমকে লিখে পাঠান, খুররম যদি তার দুই পুত্রকে দরবারে বন্ধক হিসেবে পাঠায় এবং রোহতাস দুর্গ শাহীবাহিনীর হাতে সমর্পণ করে, তাহলে তিনি তার বিদ্রোহী অতীত ভুলে যেতে পারেন। তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরিতে পাচ্ছি সম্রাটের নির্দেশ মান্য করে ১৬২৬-এ ৮ বছর বয়সে, দাদা দারার সঙ্গে আওরঙ্গজেব জাহাঙ্গিরের লাহোর দরবারে উপস্থিত হন এবং নুরজাহানের দেখাশোনায় জীবন কাটান। ১৬২৭-এর অক্টোবরে জাহাঙ্গির মারা যান। খুররম তখন দক্ষিণে ছিলেন। উজির সাদুল্লা খান শাহজাদাকে জরুরি বার্তা পাঠিয়ে আগরা দরবারে অবিলম্বে উপস্থিত হতে নির্দেশ দিলেন। ১৬২৮-এর ৪ ফেব্রুয়ারির আগে খুররম সিংহাসনে আরোহন করেন নি, এই তথ্য পরিষ্কার। শাহজাহান সিংহাসনে আরোহন করার সময় দুই শাহজাদা আগরার দরবারে উপস্থিত ছিলেন। বহুকাল নুরজাহানের জেনানায় থাকা দুই বালক পুত্রকে অভ্যর্থনা জানাতে ২৬ ফেব্রুয়ারি মমতাজমহল সেকান্দ্রা পর্যন্ত এগিয়ে যান এবং প্রকাশ্যেই দুই বালক পুত্রকে জড়িয়ে ধরে তাঁর অপত্যস্নেহ উজাড় করে দেন। পরের দিন দুই শাহজাদাকে সম্রাটের সামনে উপস্থিত করা হলে সম্রাট দুজনকেই পিতৃস্নেকে গ্রহণ করেন। আবদুল হামিদ লাহোরি পাদিশানামায় লিখছেন আওরঙ্গজেবের জন্যে দৈনিক ৫০০ টাকা হাত খরচ বরাদ্দ হল।
আওরঙ্গজেবের শিক্ষা এবং সাহিত্যবোধের উদাহরণ আমরা তাঁর বিভিন্ন চিঠিতে পাচ্ছি। তাঁর আগের কোনও মুঘল শাহজাদা আওরঙ্গজেবের তুলনীয় জ্ঞানী, পণ্ডিত ছিলেন না। যদিও তিনি বাবর বা জাহাঙ্গিরের মত লেখক ছিলেন না, কিন্তু তার চিঠিপত্র ফরমান ইত্যাদি থেকে আমরা তাঁর সাহিত্যবোধ, পাণ্ডিত্য এবং জ্ঞানচর্চার ভুরি ভুরি উদাহরণ দিতে পারি। চিঠিতে তিনি কোরান এবং হাদিস থেকে উদ্ধৃতি তুলে দিতেন। তিনি যদি এই বিষয়ে জ্ঞানী শিক্ষক দ্বারা প্রশিক্ষিত না হতেন, তার পক্ষে প্রেক্ষিত নির্ভর উক্তি উদ্ধার করা সম্ভব হত না।
মুঘল শাহী পরিবারের শিশুদের জন্যে আতলিক বা ব্যক্তিগত দিগদর্শকের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকে। আকবরের আতলিক ছিলেন বৈরাম খান, জাহাঙ্গীরের ছিলেন বৈরাম খানের পুত্র আবদুল রহিম। আগেই বলেছি তাঁকে যেহেতু জন্মের পরের কয়েক বছর পালিয়ের বেড়াতে হয়েছে বাবা-মা’র সঙ্গে আমরা মনে করি সুশিক্ষিত আরজুমন্দ বানু বেগম তাঁর প্রথম আতলিক ছিলেন। মুঘল জেনানার শাহী, অশাহী প্রায় প্রত্যেকজন মহিলা শিক্ষিত ছিলেন — এক একজন অন্তত ৫টা ভাষা জানতেন — চাঘতাই, পারসিক, আরবি হিন্দৌভি এবং সাম্রাজ্যের অন্য কোনও স্থানীয় ভাষা। অধিকাংশ মহিলার গ্রন্থাগার ছিল ঈর্ষা করার মত। নিজেদের মধ্যে বই দেওয়া নেওয়া খুব বড় ব্যাপার ছিল। হামিদা বানু বেগমের বই-এর ওপর প্রচুর ছাপ দেখে গ্রন্থাগার থেকে বই গ্রন্থাগারে আসা বেরোনোর একটা উদাহরণ পাচ্ছি। ফলে আমরা মনে করি তাঁর মা ছিলেন আওরঙ্গজেবের সম্ভাব্য প্রথম আতলিক।
আওরঙ্গজেবের সমসাময়িক এবং তাঁর পরবর্তী যুগের নানান সাহিত্য থেকে তাঁর শাহজাদা বয়সে যে সব জ্ঞানীর নাম পাওয়া যাচ্ছে তাদের নাম উল্লেখ করা গেল। এই বিখ্যাত জ্ঞানীদের মধ্যে অনেকেই শাহী পরিবারের সঙ্গে জুড়েছিলেন এবং বালক আওরঙ্গজেবের শিক্ষক বা আতলিক হিসেবে কাজ করতেই পারেন
১। মুল্লা আবদুল লতিফ সুলতানপুরী। তিনি যখন মারা যান আওরঙ্গজেব তখন ৯ বছর বয়সী। তিনিও হয়ত তাঁর প্রথম জীবনের শিক্ষক।
২। মীর মহম্মদ হাসিম গিলানি — চিকিৎসাবিদ্যা এবং অঙ্কবিদ্যায় তার সময়ে তুলনীয় জ্ঞানী খুবই কম ছিল। মক্কা মদিনায় ১২ বছর পাঠ শেষ করে হিন্দুস্তানে আসেন। চিকিৎসাবিদ্যা শেখেন আহমেদাবাদের বিখ্যাত হাকিম আলি গিলানির মক্তবে। শাহজাহান তাঁকে সদর এবং প্রধান চিকিতসা বিষয়ক আমলা পদে নিয়োগ করেন। আবদুল হামিদ লাহোরির পাদশানামায় পাচ্ছি তিনি কোরানের বিখ্যাত ভাষ্য তফসিরুলবাইদাউইএর প্রণেতা। তিনি শাহজাহানের রাজত্বের শেষ সময় পর্যন্ত শাহজাদা আওরঙ্গজেবের প্রশাসনে কাজ করবেন।
৩। মুল্লা মুহোন বিহারী। তিনি ১৬৫৭-য় মারা যান।
৪। সৈয়দ মহম্মদ কান্নাজি — আওরঙ্গজেবকে তিনি ইমাম গজ্জালির ইহায়াআলউলুম পড়িয়েছেন। তিনি সিংহাসনে আরোহন করেও সপ্তাহে তিনিবার সৈয়দ মহম্মদের কাছে পাঠ নিতেন। মাসির-ই-আলমগিরি সূত্রে জানছি তিনি সম্রাটের সঙ্গে ১৬৮১-তে আজমেঢ়ে দেখা করেন। তিনি তার প্রাক্তন শিক্ষককে সাম্মানিক হিসেবে ৩ হাজার টাকা এবং দুই রেকাব ভর্তি ফল উপহার দেন। ফতোয়া-ই-আলমগিরি সংকলন দলে তিনি অংশ নিয়েছিলেন।
৫। শায়েখ আহমদ মুল্লা জীবন — লক্ষ্নৌ-এর আমেথিতে জন্ম। বিখ্যাত পণ্ডিত। আওরঙ্গজেবও তার কাছে হয়ত পাট নিয়েছেন। অদিনা প্রবাসে তিনি নুরউলআনোয়ার নামে মানার ভাষ্য লিখেছেন। তফসিরইআহমদি, তাঁর লেখা প্রখ্যাত কোরান ভাষ্য। তিওনি ১৭১৭-য় আমেথিতে প্রয়াত হন।
৬। শায়েখ আবদুল কাদির বুরহানপুরী — আওরঙ্গজেব তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন। সিংহাসনে আরোহন করে তিনি শায়েখ আবদুল কাদির ১৫০০ মনসবদারি অর্পণ করেন। বিভিন্ন সমস্যায় তাঁর পরামর্শ গ্রহন করতেন। চতুর্থ রাজত্ব বছরে তিনি আবদুল কাদির বুরহানপুরীকে ইতিমদ খান উপাধি দেন।
৭। দানিশমন্দ খান — জন্ম ইরাণে। দক্ষিণ এশিয়ায় এসেছিলেন ব্যবসাসূত্রে। তিনি মুঘল প্রশাসনে যোগ দিয়ে মীর বক্সী পদে আরোহন করেন। শাহজাহান তাঁর জ্ঞানচর্চা সম্বন্ধে উচ্চধারণা পোষণা করতেন। আওরঙ্গজেব তাঁকে ৫০০০ মনসবদারে উন্নীত করেন।
৮। মুল্লা সালিহ [বাদাকশানি] — বার্নিয়ে বলছেন, মুল্লা সালিহ’র সামনে লম্বা বক্তৃতা করে আওরঙ্গজেব তাঁর পাঠদান পদ্ধতির সমালোচনা করেন। গবেষকেরা এটাকে গপ্প আখ্যা দিচ্ছেন, কারন এ ধরণের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা কোনও পারসিক নথি/সাহিত্যে পাওয়া যায় নি। এই ঘটনাটা যদি সত্যও হয়, তাহলেও বার্নিয়ে আওরঙ্গজেবের মুখে যে ধরণের ভাষা বসিয়েছেন, আওরঙ্গজেবের চরিত্র বিশ্লেষণ করলে, সে ধরণের ভাষা তাঁর মুখ থেকে বার হওয়া খুবই আশ্চর্যজনক। মুল্লা শাহ আওরঙ্গজেবের দাদা, দারার আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন। তাঁর সঙ্গে আওরঙ্গজেবের বেশ ভাল সম্পর্ক ছিল। কিন্তু পাদিশানামা বলছে, তিনি বলখ থেকে শাহজাহানের দরবারে প্রথম আবির্ভূত হন ৪ জানুয়ারি ১৬৪৭-এ, আওরঙ্গজেবের তখন ২৯ বছর বয়স। তখন বোধহয় আওরঙ্গজেবের ছাত্র হওয়ার বয়স শেষ হয়েগেছে।
৯। সাদুল্লাহ খান — হামিদুদ্দিনের আহকমইআলমগিরি বলছে শাহজাহানের উজির এবং হয়ত আওরঙ্গজেবের শিক্ষকও ছিলেন। কিন্তু পাদিশানামায় পাচ্ছি তিনি শাহজাহানের প্রশাসনে প্রবেশ করেন ১৬৪০-এ। ফলে সম্ভাব্য আতলিক হিসেবে তাঁর নামটা সন্দেহের কাঁটায় বিদ্ধ থাকল।
বৌদ্ধিক বিশ্লেষণী মনন এবং দীর্ঘ স্মৃতিশক্তি অবলম্বন করে তিনি শিক্ষা এবং জ্ঞানচর্চায় ডুব দিয়ে হয়ে উঠলেন অসামান্য পণ্ডিত। সিংহাসনে আরোহন করেও তাঁর শিক্ষা নেওয়ার ইচ্ছে চলে যায় নি। ৪৩ বছর বয়সে সিংহাসনে আরোহন করে তিনি হৃদয় দিয়ে কোরান অন্তঃস্থ করে হাফিজ হলেন এবং তাঁর আগে এই সম্মান কোনও মুঘল সম্রাট অর্জন করেন নি। (চলবে)