| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ইফতিতাইসুলতানিওয়াশুল-ই-কুল : আকবর এবং আওরঙ্গজেব (৪৮ নং কিস্তি) : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৩০৬ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ৩ আগস্ট, ২০২২

আওরঙ্গজেবের বাল্য আর যৌবন

এবারে আমরা তার বাল্য কালের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা উল্লেখ করব, যে ঘটনাক্রমের মধ্যে দিয়ে শাহজাদা আওরঙ্গজেব নিজের স্বতন্ত্র পরিচয় তৈরি করবেন এবং তৈমুরী-চাঘতাই উত্তরাধিকারী হিসেবে, যে পরম্পরাকে আজ আমরা মুঘল বংশ হিসেবে চিনি, অন্যতম প্রধান প্রতিভূ হয়ে উঠবেন অনপনীয় প্রস্তুতিতে। নিচের ঘটনা ক’টির বর্ণনা লিখব হামিদুদ্দিন খান বাহাদুরের লেখা আহকম-ই-আলমগিরি থেকে —

১৬৩৩ হাতির সঙ্গে লড়াই

তখন সম্রাট শাহজাহান লাহোর দরবারে সময় কাটাচ্ছিলেন। শালিমার বাগানে তিনি প্রায়ই হাতির যুদ্ধ দেখতেন। বাংলা সুবার দেওয়ান তাকে একদা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ৪০টা হাতি পাঠিয়েছিল। সম্রাট ঝুল বারান্দায় বসে — তাঁর চার পুত্র ঘোড়ায় চড়ে হাতির যুদ্ধের ক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে। উল্টো দিকে দাঁড়ানো যুথের মধ্য থেকে একটি হাতি শাহজাহাদের দিকে ছুটে এগিয়ে আসতে থাকে। সম্রাটের পুত্রদের মধ্যে তিনজন সেই মূহুর্তে ডানদিকে ঘুরে পালিয়ে গেল। একটুও ভয় না পেয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেন শুধু চৌদ্দ বছরের মহম্মদ আওরঙ্গজেব। দৌড়ে আসা হাতিটি আওরঙ্গজেবের পাশ দিয়ে চলে যায়। অন্য শাহজাদারা পালিয়ে দূরে চলে যাওয়ায় সেটি আওরঙ্গজেবের দিকে ঘুরে দাঁড়ায়। আওরঙ্গজেবের হাতে তখন শুধু একটি বল্লম। তিনি অস্বাভাবিক দ্রুততায় হাতিটিকে আক্রমন করলেন। হাতির শুঁড়ের আঘাতে শাহজাদার ঘোড়াটি পড়ে গেল। পড়ে গিয়েও আওরঙ্গজেব বল্লমটি ছাড়েন নি। তিনি বল্লমটি হাতির মাথা তাক করে ছোঁড়ার ভঙ্গীমা করে ঘুরে দাঁড়ালেন। ঝুল বারান্দায় সম্রাট উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন নেমে আসছেন, এমত সময়ে প্রহরীরা ছুটে গিয়ে অবস্থা সামাল দেন। আওরঙ্গজেব আস্তে আস্তে মহামহিমের দিকে হেঁটে আসছেন। সম্রাটের মামার (বাড়ির) দিকের ভৃত্য নাজির ইতিবদ খাঁ, বৃদ্ধাবস্থায় যতটা পারা যায় দ্রুত এসে আওরঙ্গজেবের সামনে দাঁড়িয়ে [সবাইকে শুনিয়ে] চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কান্না জড়ানো গলায় বলতে থাকেন — ‘আপনি সম্রাটের দিকে ধীর পদে এগোচ্ছেন, মহামহিম বিপদাশঙ্কায় অধীর হয়ে পড়েছেন’। শাহজাদা অনুচ্চস্বরে বললেন, ‘হতিটি যদি সেখানেই থাকত আমি হয়ত দ্রুত হাঁটতাম। কিন্তু এখন তো আর উত্তেজিত হওয়ার কোন কারণ দেখছি না’। আওরঙ্গজেবের পিতার কাছে পৌঁছবার মাত্র সম্রাট তাকে এক লাখ টাকা ইনাম দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বললেন, ‘পুত্র, সর্বশক্তিমানকে ধন্যবাদ, সব কিছু ঠিকঠাক হয়ে শেষ হল। তিনি না করুন ঘটনাটা যদি অন্যদিকে মোড় নিত তাহলে কী যে অসম্মানের ব্যাপার হত বলা যায় না’। সেলাম জানিয়ে আওরঙ্গজেব উত্তর দিলেন, ‘এটা যদি অন্য ভাবে শেষ হত, তাতে কোন অসম্মান ছিলা না। আমার ভাইয়েরা যা করল, সেটাই চরম অসম্মানের’।

কবিতা — মৃত্যু সম্রাটের ওপরেও তাঁর ঘোমটা ছেয়ে দেয়। তাতে কোন অসম্মান নেই।

হাতির লড়াই-এর ছবি

মন্তব্য — ঘটনাটার বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায় আবদুল হামিদের পাদিশানামায় — শাহজাহান আগ্রা দূর্গের ঝুল বারান্দা থেকে হাতির লড়াই দেখতেন (২৮ মে ১৬৩৩)। লড়াই-এর ময়দানে তাঁর তিন পুত্র ঘোড়ার পিঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন। সামনে দাঁড় করানো ছিল দুটো তাজা হাতি। এক দাঁতালের নাম সুধাকর, দাঁতবিহীন অন্যটির নাম সুরতসুন্দর (মুঘল সম্রাটের কিন্তু হাতির নাম রাখছেন দেশি নামে, ফারসিতে নয়। এটা লক্ষ্য করার বিষয়)। তারা সকলে যুদ্ধ খেলার জন্য প্রস্তুত। প্রতিদ্বন্দ্বীরা (শাহজাদা) পালিয়ে যাচ্ছে দেখে সুধাকর আওরঙ্গজেবের দিকে তাক করে ছুটে এল। আওরঙ্গজেব কিন্তু তাঁর ঘোড়াকে সোজা দাঁড় করিয়ে রেখে (পালাতে দেন নি) দৌড়ে আসা হাতিটির কপালে টিপ করে বল্লম ছুঁড়ে মারলেন। হাতিটিকে নিবৃত্ত করতে না পেরে ভৃত্যরা বিভিন্ন ধরণের আতসবাজি (হাউই, চরকি ইত্যাদি) ছুঁড়তে শুরু করল। কিন্তু সেগুলি অগ্রাহ্য করেই হাতিটি তার দাঁতে (শুঁড়ে নয়) করে ঘোড়া-সহ আওরঙ্গজেবকে মাটিতে ফেলে দেয়। চরম মুহূর্তে আওরঙ্গজেব জিন ছেড়ে লাফ দিয়ে মাটিতে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সুজা হাতের চাবুক দিয়ে হাতিটিকে আঘাত করার জন্য ভাইকে সাহায্য করতে আসতে চাইলেও বাজি ফাটানোর বিপুল আওয়াজ, যুদ্ধস্থান ঘিরে থাকা ধোঁয়া, উত্তেজিত মানুষের চিৎকার, গোলোযোগের দেওয়ালে ব্যহত হয়ে, তাঁর কাছে আসতে পারছিলেন না। সেই সঙ্গে একটা চরকি সুজার ঘোড়ার কপালে আঘাত করলে ঘোড়াটি চিৎকার করে দাঁড়িয়ে পড়তে চায়, সুজা ঘোড়া থেকে পড়ে যান। জয় সিংএর ঘোড়াও স্থানুবত দাঁড়িয়ে থাকে। এই সময়ে সুরতসুন্দর, সুধাকরকে আক্রমন করে। সুধাকর পালিয়ে যায়। আওরঙ্গজেব তখন ১৪ বছরের বালক। সম্রাট তাঁকে ৫০০০ স্বর্ণ মুদ্রা, সুধাকর এবং অন্যান্য উপহার দেন, মোট উপহারের পরিমান ছিল ২ লক্ষ টাকা।

ইতিমদ খাঁকে, শাহজাহানকে সেবা করতে দেন তাঁর শ্বশুর ইয়ামিনউদ্দৌলা আসফ খাঁ (সূত্রঃ আবদুল হামিদ, পাদিশানামা)।

২। ১৬৪৪ প্রথম জীবনেই দারার প্রতি আওরঙ্গজেবের ঈর্ষা

দারাশুকোর জন্য আগ্রায় একটি রাজপ্রাসাদ বানানো হয়েছে। সম্রাটের বড় পুত্র দাদা শুকো শাহজাহান এবং সম্রাটের অন্য তিন সন্তানকে প্রাসাদ দেখার আহ্বান জানালেন। প্যাচপ্যাচে ভারতীয় গ্রীষ্ম। তাই আরাম দেওয়ার জন্যে নদীর কাছাকাছি মাটির তলায় ঘর বানানো হয়েছে। মানুষের উচ্চতার থেকেও বেশি বড় আলেপ্পোর আয়নাটা নদীর দিকে মুখ ফেরানো। দারা, পিতা আর তাঁর ভাইদের নতুন তৈরি প্রাসাদের, মাটির নিচের ঘরের সৌন্দর্য দেখাতে নিয়ে গেলেন। মহম্মদ আওরঙ্গজেব দরজায় ঢোকা বেরোনোর পথে বসে পড়লেন। দারা আওরঙ্গজেবের ভঙ্গীমা দেখে সম্রাটকে ইশারা করে চোখ মারলেন, যেন বলতে চাইলেন দেখুন কোথায় ব্যাটা বসেছে। মহামহিম আওরঙ্গজেবকে উপদেশ দেওয়ার মত করে বললেন, ‘পুত্র, আমি জানি তুমি জ্ঞানী এবং সন্তদের মত জীবনযাপন কর, কিন্তু তোমার পদমর্যাদা তোমাকেই বজায় রাখতে হবে – কথায় বলে, যে নিজের মর্যাদা বোঝে না সে নাস্তিক। কী প্রয়োজন ছিল, যে পথে মানুষ যাতায়াত করে, সেপথে তোমার বসার, এবং তাও তোমার ছোট ভাইদের সামনে?’ আওরঙ্গজেব উত্তর দিলেন, ‘পরে আপনাকে জানাব কেন আমি এখানে মাটিতে বসেছি’। আরও কিছু সংশ্লিষ্ট কথাবার্তার পর আওরঙ্গজেব উঠে তার সান্ধ্যকালীন নামাজ, জুহরের জন্য তৈরি হতে লাগলেন, এবং সম্রাটের অনুমতি ছাড়াই নিজের বাড়িতে ফিরে গেলেন। সম্রাট বিষয়টা শুনলেন এবং আওরঙ্গজেবকে সাত মাসের জন্য সভায় দর্শকাসনে বসার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেন। সাত মাস পর সম্রাট সাম্রাজ্ঞী জাহানারাকে সম্রাট বললেন, ‘তুমি তার বাড়ি যাও, শুনে এস সে কেন সেদিন মাটিতে বসেছিল’। বেগম সাহেবা ভায়ের বাড়ি গেলেন এবং আওরঙ্গজেবকে সে দিন চৌকাঠে বসার কারন জিজ্ঞাসা করলে আওরঙ্গজেব উত্তর দিলেন, ‘আমার দাদা দারা শুকো আমাদের সক্কলকে আমন্ত্রণ জানিয়ে ছিল। সে পিতা আর তিন ভাইকে একদরজাওয়ালা মাটির তলার ঘরে বসাবার উদ্দেশ্যপূর্ণ পরিকল্পনা করে বার বার আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যের বাহানায় সেই ঘরে ঢুকছিল আর বেরোচ্ছিল। আমার সন্দেহ/ভয় হচ্ছিল, সে হয়ত আমাদের ঘরের ভিতরে ঢুকিয়ে বন্ধ করে রেখে দেবে তাহলেই সব শেষ (হয়ত সে দরজা বন্ধ করে মেরে ফেলার চক্রান্ত করছে)। সে এতবার উদ্বেগহীনভাবে ঘরবার করছিল যে, আমার মনে হচ্ছিল, আমাকে কাজটা করতেই হবে (দরজা আটকে বসাটা), যাতে সে নিজে ঘরের মধ্যে থাকে (আর আমরা বাইরে)। কিন্তু মহামহিম নিজের মর্যাদা রক্ষার জন্য আমার কাজকে ভর্তসনা করলেন। এবং আমি সর্বশক্তিমানের কাছে মার্জনা চেয়ে বেরিয়ে আসি’। এই যুক্তি শোনার পরেই সম্রাট নিজের ভুল বুঝতে পারলেন এবং শাহজাদাকে আদর করে ডেকে দয়া দেখালেন। শাহজাদা, শাহদুল্লা খাঁকে (প্রধানমন্ত্রী) বললেন, ‘আপনাদের ইচ্ছা মত আপনি রাজধানী থেকে যে কোন জায়গায় যে কোন কাজের জন্য আমায়  নির্বাসন দিন, আমি রাতের ঘুম আর মনের শান্তি হারিয়েছি’। তাঁকে মহামহিম তাঁর ইচ্ছেতেই লাহোর থেকে দাক্ষিণাত্যের সুবাদার করে পাঠিয়ে দেন।

মন্তব্য — শেষ স্তবকে উল্লিখিত লাহোর আসলে মুলতান। আওরঙ্গজেব লাহোরের (পাঞ্জাব) সুবাদার কখোনোই ছিলেন না। ১৪ জুলাই ১৬৫২-তে দাক্ষিণাত্যের সুবাদার নিযুক্ত হন, মুলতান থেকে ওখানে যান। ১৬৪৫-এর ১ ডিসেম্বর দিল্লির যমুনার তীরে বাড়ি বানানোর জন্য দারাকে ৪৫ লক্ষ টাকা দেওয়া হয় (আবদুল হামিদের পাদিশানামা)। এই প্রাসাদ বানানোর সময় শাহজাহান প্রথম ঘুরে দেখেন ১৪ মার্চ ১৬৪৩। যমুনার উপকূলে আগ্রার এই বাড়িতে সম্রাট ছিলেন ২০ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট ১৬৪৪ পর্যন্ত। ২৮ মে থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত আওরঙ্গজেবকে আগ্রায় উক্তভাবে অপমান করে সভায় যোগ দেওয়ার নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, এর পরে ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৬৪৫ গুজরাটের সুবাদার করে পাঠানো হয়। সেই বছর সম্রাট আগ্রায় দারার প্রাসাদ যান ২ জানুয়ারিতে।

ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে ফ্লোরেন্টিনা সেলের আঁকা যমুনা পাড়ের দারার প্রাসাদের[দারাকি হাভেলি] এবং ভগ্ন বাড়ির ছবি আছে।

৩। যুবা আওরঙ্গজেবের অভিজাতদের সম্মান

কোনও কোনও আমীর অভিজাত শাহজাহানের খুব কাছের বৃত্তের মানুষ — যেমন আলি মর্দান খান, শাদুল্লা খান, বারহার সৈয়দ মীরণ। এরা সকলেই পাঁচহাজারি মনসবদার; এঁদের কারোর সঙ্গে দারা খুব বিনীত ব্যবহার করতেন [কারন তিনি জানতেন এরা সকলেই সম্রাটের ঘনিষ্ঠ, তাই তাদেরতিনি চটাতেন না] আবার কারোর সঙ্গে হয়ে উঠতেন চরম দুর্বিনীতও। কিন্তু এঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে আওরঙ্গজেবের সুমধুর সম্পর্ক ছিল। শাহজাহান যাকে বলতেন বিশ্বস্ত বন্ধু, সেই আলি মর্দান খানকে আওরঙ্গজেব চিঠিতে সম্বোধন করছেন, সৎ কাজের মানুষ, শাদুল্লা খানকে সম্বোধন করছেন, নানান পরিকল্পনা সফল করার মন্ত্রী এবং বিনীত ছাত্রদের মাথা, বারহার সৈয়দ মীরণকে বলছেন সৈয়দদের সৈয়দ বা নবীর উত্তরপুরুষের বিশ্বের সৈয়দ বা মুহম্মদ ইত্যাদি। এই তিনজনের প্রত্যেকে এবং অন্যান্যরা যেমন আফজল খান মুল্লা আলাউলমুলক, যিনি খানইসামান থেকে উন্নীত হয়েছিলেন উজির পদে, সক্কলে আওরঙ্গজেবকে অতি পছন্দ করতেন এবং দরবারে তাঁর অবর্তমানে মুঘল সাম্রাজ্যে শাহজাদা আওরঙ্গজেবের স্বার্থ যাতে বজায় থাকে লক্ষ্য রাখতেন। শাহইবুলন্দইকবাল বা দারা শুকোর কপালে (আগামী দিনে আগত) দুর্দিনের চিহ্ন আর আওরঙ্গজেবের কপালে উন্নতির চিহ্ন দেখে শাহজাহান দারাকে পরামর্শ দিয়েছিলেন ভুল কাজ না করতে খারাপ কথা না বলতে। কিন্তু যখন দেখলেন যে দারা শুকো তাঁর শুভ বার্তায় কান দিচ্ছে না, তখন তিনি বললেন (কবিতা) …যদি কোনও মানুষের ভাগ্য কালো রঙে বোনা হয়, তাহলে সেই কালিমা জিমজিম (মক্কার পুণ্য কুঁয়ো) বা কওসরের (স্বর্গের ঝরণা) জল দিয়ে ধুয়েও সাদা করা যায় না …তিনি মনে মনে আশা করতেন আওরঙ্গজেব আভিজাতদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করুক যাতে অভিজাতরা আওরঙ্গজেবের অবর্তমানে আওরঙ্গজেবের স্বার্থ না দেখে দারাকে সাহায্য করে’।

এ প্রসঙ্গে একটি রাজকীয় চিঠি ফরমানের কথা উল্লেখ করতে পারি, যে ফরমানে আওরঙ্গজেবকে শাহজাহান নিজের হাতে লিখছেন, ‘বেটা, সম্রাট আর তাদের বাচ্চাদের আত্মা হওয়া উচিত সুউচ্চ এবং মনের বিকাশ হওয়া উচিত আকাশের মত। আমি শুনেছি, আমার দপ্তরের প্রত্যেকের সঙ্গে, তুমি খুবই বিনীত ব্যবহার কর। তুমি যদি ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে এই কাজটি করে থাক, তাহলে জানবে সব ঘটনাই সর্বশক্তিমান সাজিয়ে রেখেছেন, তোমার আত্মার নম্রভাব তোমায় কোথাও পৌঁছে দেবে না, এর বদলে তুমি শুধুই অবজ্ঞা পাবে’। এর উত্তরে আওরঙ্গজেব লিখলেন, ‘দয়া, আনুকূল্য দেখিয়ে আপনার সুমিষ্ট কলমে আপনি এই বিনীত দাসকে যা আজ্ঞা দিয়েছেন, তা আমার কাছে যেন স্বর্গ থেকে নেমে আসা দৈববানী। আপনি সত্যি সন্ত এবং আত্মার পথ নির্দেশক। এই লেখা লিখে আপনি যে সম্মান আমাকে প্রদান করলেন, সেটা প্রমান করে আপনার নিরহঙ্কারতা। কিন্তু সম্মান নির্ভর করে মালিক দাস এবং শহর আর বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা তাদের ভাগ্যে কি লিখে রেখেছেন তার ওপর। আপনি যা লিখেছেন, তার বিরুদ্ধাচরণ করার ক্ষমতা আমার নেই, কিন্তু আমি বলতে চাই, আমি জানি যে, শয়তানের কাজ হল মানুষের মনে সন্দেহর বীজ উপ্ত করা, সে ভূত একজন আমাদের মধ্যেই রয়েছে’।

(কবিতা) আমার পাপ খণ্ডন কর, ছাড়া আমি কিছুই বলি না/আমার পাপ ক্ষমা কর, সাদামুখে এবং কালো স্মারকে নরাধম আমি।

দারার প্রাসাদ (ফ্লোরেন্টিনা সেলের আঁকা যমুনা পাড়ের দারার প্রাসাদ [দারাকি হাভেলি])

মন্তব্য – মুল্লা আলাউলমুলক তুনি, ফাজিল (আফজল নয়) খানকে তৈরি করেন এবং শাহজাহান তাঁকে খানইসামান পদে বসান। আওরঙ্গজেব তাকে উজিরের পদ দেন ৭ জুন ১৬৬৩-তে কিন্তু মারা যান ২৩ তারিখে। আবু হামজা আনাস ইবন মালিক ছিলেন নবী মহম্মদের শেষ সঙ্গী (এন্সাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম)।

৪। পুত্রদের প্রসঙ্গে শাহজাহান

সম্রাট শাহজাহান মাঝে মাঝে বলতেন, ‘আমার প্রথম পুত্র (দারা শুকো) ভাল মানুষদের শত্রু করে তুলছে; মুরাদ বক্স মদ খেয়েই জীবন কাটিয়ে দেবে; মহম্মদ সুজার ভালত্ব ছাড়া আর কোন গুণ নেই। কিন্তু আওরঙ্গজেবের সঙ্কল্প আর বুদ্ধিমত্তা প্রমান করেছে, সেই একমাত্র এক দুর্যোগপূর্ণ কাজটি (ভারত শাসন) সামলাতে পারবে। কিন্তু তার রোগভোগ আর দৈহিক অস্বাস্থ্য আমায় চিন্তায় ফেলেছে।

(কবিতা) তাহলে তিনি আর কাকে বন্ধু বলে ভাবতে পারেন/ এবং কাকে তিনি তার হৃদয় দিয়ে যাবেন?

আরভিন পাণ্ডুলিপিতে গল্পটা নেই। তবে গপ্পটি অনেক সংস্করণে আছে, বিশেষ করে লিথোগ্রাফ করা রুকাত-ই-আলমগিরির ৫ নম্বরে।

৫। জয়নাবাদীর সঙ্গে প্রেম

এটা বিশদে পরে আওরঙ্গজেবের স্ত্রী-পুত্র বিভাগে পড়বেন। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev