আওরঙ্গজেবের বাল্য আর যৌবন
দক্ষিণে রাজত্ব বিস্তারে পূর্বসূরীদের ব্যর্থতা কাটিয়ে সেনা অভিযানে উদগ্রীব সম্রাট শাহজাহান আগরা থেকে দাক্ষিণে যাওয়ার পথের মাঝে বিদ্রোহী ঝুঝার সিংহ বুন্দেলার বুন্দেলা রাজ্য কাঁটা তুলে ফেলার কাজে সক্রিয়ভাবে উদ্যোগী হলেন। বাবা হুমায়ুনের দেখানো বুন্দেলা-বন্ধুত্বের পথ ছেড়ে বেরিয়ে এসে তিনি চিরতরে মুঘল বিরোধী বুন্দেলাদের উপড়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিলেন। বুন্দেলা রাজত্ব দখল আর ক্ষমতাসীন বিদ্রোহী রাজাকে বন্দী করার পরিকল্পনা করলেন শাহজাহান। বিদ্রোহ দমন করতে তিন সেনাপতির বাহিনী — উত্তরের সেনাপতি আবদুল্লা খান বাহাদুর ফিরোজ জঙের নেতৃত্বে ৬,০০০ বাহিনী, বুদাউনের সৈয়দ খানইজাহানের ১০,৫০০ সেনাবাহিনী এবং দক্ষিণ-পশ্চিম থেকে খানইদৌরাণের ৬,০০০ বাহিনী রণসাজে সজ্জিত করে বুন্দেলা রাজ্যে পাঠাবার সিদ্ধান্ত নিলেন। বুন্দেলাদের বাহিনীর সংখ্যা অনেক কম ১৫,০০০ কিন্তু তারা নিজেদের অঞ্চল চেনে, পাহাড় জঙ্গলে লুকিয়ে লড়াই করার অভিজ্ঞতা, তাদের বড় আকারের মুঘল বাহিনীর থেকে রণনৈতিকভাবে অনেকটাই এগিয়ে রেখেছিল।
ঝুঝার দমনে তৈরি মুঘল দলের সঙ্গে ছিলেন একজন ইন্টারেস্টিং অমুসলমান দেবী সিংহ। দেবী সিংহ ওর্ছা রাজ পরিবারের উৎখাত হওয়া রাজার পরিবার। জাহাঙ্গীর, দেবী সিংহের পরিবারকে বুন্দেলা রাজ্যের সিংহাসন থেকে উৎখাত করে বীর সিংহের পরিবারকে ক্ষমতায় বসিয়েছিলেন। দেবী সিংহ মনে করেন ঝুঝার তার পিতৃরাজ্য দখলকারী উপদ্রব। ঝুঝার কাঁটা তুলে ফেলতে দেবী সিংহর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ক্ষোভ ব্যবহার করলেন জাহাঙ্গীর পুত্র সম্রাট শাহজাহান। তিনি ঘণ জঙ্গলে পরিপূর্ণ বুন্দেলা রাজ্যে মুঘল বাহিনীকে অঞ্চলে পথ দেখানোর জন্যে দেবী সিংহ আর তার বাহিনীকে সেনাবাহিনীর সঙ্গে নিলেন। আওরঙ্গজেব তখন ১,০০০ মনসব এবং ৫,০০০ সওয়ারের পদে আসীন।
তিন সেনাপতির পদমর্যাদা খুবই কাছাকাছি ছিল। তারা সকলে একস্তরের মুঘল সেনাপতি ছিল বলেই তিন সেনাপতির অভিযান পরিকল্পনায় তালমিল আনতে সম্রাট শাহজাহান পুত্র ১৬ বছরের অকুতোভয় আওরঙ্গজেবকে নেতৃত্ব দেওয়ার কাজে নিয়োগ করলেন। তাঁকে দেওয়া হল ১০,০০০ পদাতিক, ১,০০০ ধনুকধারী সেনা আর একই সংখ্যায় ঘোড়সওয়ার। নির্দেশ দেওয়া হল তিনি মূল বাহিনী থেকে দূরে এবং পিছনে থাকবেন। তিন সেনাপতি আওরঙ্গজেবের সঙ্গে আলোচনা করেই সমস্ত সিদ্ধান্ত নেবেন, আওরঙ্গজেবের নেওয়া যে কোনও সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত, তাঁর সঙ্গে আলোচনা না করে কোনও সামরিক, প্রশাসনিক পদক্ষেপ করা যাবে না।
১৩ বছর বয়সে গুরুতর সাম্রাজ্যভার সামলেছিলেন বালক সম্রাট আকবর। ১৬ বছর বয়সী আওরঙ্গজেবকে যুদ্ধ আগুণের মুখে ছুঁড়ে দিলেন শাহজাহান। কঠিনতম বুন্দেলা যুদ্ধ শেষে পুড়ে নিখাদ সোনা হয়ে বেরিয়ে এলেন আওরঙ্গজেব।
মুঘলদের পক্ষ থেকে ঝুঝার সিংহকে আত্মসমর্পণের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলা হল প্রাণ বাঁচাতে তাকে শাহী বাহিনীর হাতে রাজত্ব সমর্পণ করতে হবে। বিদ্রোহের জরিমানাস্বরূপ ৩০ লক্ষ টাকা রাজস্ব শাহী তহবিলে দিতে হবে। ঝুঝার সিংহ শাহী প্রস্তাব ফুৎকারে উড়িয়ে দেওয়ায় ঠিক হল বর্ষার ঠিক পরে, ঝাঁসির ৪০ কিমি উত্তরপূর্বের ভাণ্ডের হয়ে বুন্দেলা রাজত্বে মুঘল বাহিনী ঢুকে তাজধানী ওর্ছার দিকে অভিযান শুরু করবে। মধ্য ভারতের বিপুল গভীর জঙ্গল মহলে বড় বাহিনী নিয়ে মুঘল সেনাপতিরা গভীর সমস্যায় পড়ে। প্রতিদিন প্রতিপদে রাস্তা তৈরির কাজে নিযুক্ত বেলদারদের দিয়ে গভীর জঙ্গল কাটতে কাটতে এগোলেন। সঙ্গে অনুপান হিসেবে ছিল বুন্দেলা বাহিনীর চোরাগোপ্তা আক্রমন। সে সব সমস্যা সামলে মুঘল বাহিনী ধীর গতিতে ঘণ জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলল। ১৬৩৫-এর ২ অক্টোবর ওর্ছার ৩ কিমি দূরের গ্রামে পৌঁছল তারা। অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে মুঘল বাহিনী ঝুঝারের রাজধানী ওর্ছা অবরোধ করে। ঝুঝার মুঘল বাহিনীর আক্রমণের চাপ সহ্য করতে না পেরে ধামুনিতে পরিবার নিয়ে পালিয়ে যায়। বিদ্রোহী বুন্দেলা বাহিনী সেখানেও কয়েক দিন থেকে সেই শিবিরও ত্যাগ করতে বাধ্য হয় শাহী বাহিনীর অগ্রগমনের দ্রুততায়। ৪ অক্টোবর ভোরবেলায় মুঘল বাহিনী ওর্ছা কেল্লা সহ রাজধানী দখল নেয়। পিছনের দরজা দিয়ে ছোট বাহিনী বুন্দেলা রাজা পিট্টান দেয়।

ঝুঝার সিংহ
সারা দিন ধরে রাজধানী হস্তগত করে দেবী সিংহকে বুন্দেলা রাজত্বের রাজা হিসেবে অভিষেক ঘটিয়েই পলাতক ঝুঝারকে তাড়া করে। বাহিনী বেতোয়া নদীর দক্ষিণে ধামুনিতে পৌঁছয়। সেখানে ঝুঝার ছিল না। সে বিন্ধ্য পাহাড় পেরিয়ে নর্মদা পেরিয়ে চৌরাগড়ের গোন্দ রাজত্বে আশ্রয় নিয়েছে। মুঘল বাহিনী তার পিছন নিয়ে বিন্ধ্য পাহাড়ের একটি রণনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ দখলে নেয় ১৮ অক্টোবর। ঝুঝার সেখান থেকেও পালিয়ে যায়। তার নতুন আশ্রয় ধামুনি মুঘলদের দখলে আসে খানইদৌরাণের বাহিনীর প্রচেষ্টায়। সেখানে বোমার গুদাম ঘর বিষ্ফোরণে ২০০ ঘোড়া ৩০০ রাজপুত বাহিনী মারা যায়। কেল্লার নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে ঝুঝারের পালানোর রাস্তার মানচিত্র পাওয়ার জন্যে উদগ্রীব হয়ে ওঠে মুঘল বাহিনী। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঝুঝারের পালিয়ে যাওয়ার রাস্তার সংবাদ মুঘল ক্যাম্পে আসতে থাকে।
২৭ অক্টোবর থেকে নতুন করে ঝুঝারের পিছনে তাড়া করে মুঘল বাহিনী চৌরাগড়ে পৌঁছায়। সেখানেও ঝুঝারকে পাওয়া যায় না। দেখা গেল দুর্গ, প্রাচীন গোন্দ প্রাসাদ এবং সমস্ত সম্পদ মাটিতে মিশিয়ে ঝুঝার পালিয়ে গিয়েছে। সেখানে একটি ছোট বাহিনী রেখে মূল শাহী বাহিনী ৬ কিমি দূরে শাহপুরে শিবির পেতে আশ্রয় নেয়। এখানে সংবাদ পাওয়া যায় ঝুঝার আরও দক্ষিণে দেওগড় এবং চান্দার গোন্দ রাজত্বে ৬,০০০ সেনা আর ৬০টি হাতি নিয়ে রোজ বিপুল ২৪ কিমি গতিবেগে পালিয়ে যাচ্ছে। ঝুঝার এখন ১৪ দিনের দূরত্বে। মুঘলেরা সাহাপুর শিবির থেকে ছোট বাহিনী সাজিয়ে দৈনিক ৪০ কিমি মার্চ করে ঝুঝারের পিছনে তাড়া করে। ক্লান্ত বিধ্বস্ত ঝুঝার চান্দার সীমান্তে পৌঁছলেন। কিন্তু রাতে বিশ্রাম নেওয়ার সময়েও শান্তি নেই, দূর থেকে মুঘল বাহিনীর ক্রমান্বয়ে এগিয়ে আসার শব্দ পাচ্ছেন। মুঘল বাহিনী দ্বিগুণ গতিবেগে ঝুঝারের পিছনে তাড়া করে, ঝুঝারকে অবাক করে হঠাত চান্দায় আবির্ভূত হয়।
শ্রান্ত ঝুঝার বুঝলেন তার আর পালাবার অন্য কোনও পথ নেই। তাঁর সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। হেরে গিয়ে ঝুঝার আরও গভীর জঙ্গলে আশ্রয় নিলেন — তাঁর সঙ্গে বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্পদ কয়েকটা হাতিতে চাপিয়ে মুঘল বাহিনীকে ভুল পথে চালিত করার জন্যে অন্য রাস্তায় পাঠিয়ে দেন। সে অন্য রাস্তায় ঝাড়াহাতপায়ে জঙ্গলে ঢোকে। তাঁর আশা ছিল মুঘল বাহিনী লুঠের প্রণোদনায় তাঁকে আক্রমন না করে সম্পদের পিছনে দৌড়বে। দীর্ঘ এক মাস পালিয়ে বেড়াতে থাকা ক্ষমতাচ্যুত বুন্দেলা বাহিনীর বিশ্রাম নেই, পরিশ্রান্ত ঘোড়ার জল খাওয়ার যায়গা এবং সুযোগও নেই। মুঘল বাহিনী বিভ্রান্ত হল না। তারা সব কিছু ভুলে, সম্পদ লুঠ করার প্রণোদনা ছেড়ে ঝুঝারের পিছনে লেগে রইল।
ঝুঝার সিং বুন্দেলারা গোন্দ সমাজের ওপর তীব্র অত্যাচার নামিয়ে এনেছিল। তাদের বিরুদ্ধে গোন্দ সমাজ ক্ষুব্ধ ছিল। গোন্দেরা মুঘলদের সহায়তায় এগিয়ে আসে। মুঘলদের আর ঝুঝারের খোঁজ করার জন্যে অগ্রগামী বাহিনী পাঠানোর দরকার হল না, বুন্দেলাদের ওপর চরম ক্ষুব্ধ গোন্দেরা মুঘল বাহিনীকে ঝুঝারের পালিয়ে যাওয়ার রাস্তা বলে দিতে থাকে। ঝুঝার বুঝলেন গোন্দদের থেকে সাহায্য পাওয়া শাহী বাহিনীকে ঝেড়ে ফেলা মুশকিল। গোন্দদের থেকে ঝুঝারের সাহায্য পাওয়ার আশা দুরাশায় পরিণত হল।
ঝুঝারের ছেলেরা মুঘল বাহিনীর হাতে ধরা পড়ার ভয়ে বুন্দেলা রাজ পরিবারের মহিলাদের খুন করা শুরু করে। ইতিমধ্যে ঘটনাস্থলে মুঘলেরা পৌঁছে গিয়ে আহত মহিলাদের উদ্ধার করে আর রাজ পরিবারের সদস্যদের গ্রেফতার করে। ঝুঝারের বড় ছেলে বিক্রমজিৎ জঙ্গলের মধ্যে পালিয়ে যায়। শুধু পথ দেখানোই নয়, জঙ্গল যুদ্ধে গোন্দরা মুঘলদের সাহায্য করতে থাকে। গোন্দেরা ঝুঝার আর বিক্রমজিতকে হত্যা করে। গোন্দ প্রধান দুই বুন্দেলা নেতার মাথা মুঘল শিবির সাইহারে উপহার হিসেবে পাঠায় এবং সেদুটি বেশ কিছু দিন প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রেখে ১৬৩৫-এর ডিসেম্বরে আগরায় সম্রাটের কাছে উপহার হিসেবে পাঠানো হয়। মুঘল বাহিনী ঝুঝারের অন্যান্য সম্পদ দখল নেওয়া ছাড়াও, বুন্দেলাদের পালিয়ে যাওয়ার সময় জঙ্গলে লুকিয়ে রাখা ১ কোটি টাকার সম্পদ উদ্ধার করে। মুঘল সরকারের রাজস্ব বাড়ল ৫০ লক্ষ টাকা।
শিবির থেকে আওরঙ্গজেব সম্রাটকে ওর্ছায় ঝুঝারের বাবার তৈরি মন্দির ধ্বংস করার প্রস্তাব দেন। বিদ্রোহী রাজার বাবার স্মৃতিতে তৈরি মন্দির ধ্বংস করার নির্দেশ দেওয়া হয়। অথচ এস মৈনুল হক, প্রিন্স আওরঙ্গজেব আ স্টাডি বইতে দাবি করছেন দ্য হিস্ট্রি অব আওরঙ্গজেব বইতে যদুনাথ সরকার আবদুল হামিদ লাহোরির ইতিহাসকে ভুল পড়ে আওরঙ্গজেবের নির্দেশে মন্দিরকে মসজিদের রূপান্তরিত করা হয় লিখলেন। এরকম কোনও ঘটনাই ওর্ছায় ঘটে নি। ঝুঝার সিংহ ওর্ছার সিংহাসন দখল করা এক দুর্বৃত্ত। সে নিজেকে বুন্দেলাদের রাজা হিসেবে পরিচয় দিতে ভালবাসত। তাছাড়া তার হাত আবুল ফজলের হত্যাকণ্ডে রক্তে রাঙা।
ধামুনি থেকে ওর্ছায় এসে আওরঙ্গজেব বাবার জন্যে অপেক্ষা করলেন। সম্রাট শাহজাদাকে সঙ্গে নিয়ে এলাকায় ঘুরলেন, তাঁকে এলাকাটা চেনালেন — সেই অঞ্চলের হ্রদ, কেল্লা, জঙ্গলের সৌন্দর্য দেখলেন, শিকার করলেন। সিরঞ্জে যাওয়ার পথে তাঁরা উভয়েই দৌলতাবাদ পৌঁছলেন। সেখান থেকে ১৪ জুলাই প্রথাগতভাবে আওরঙ্গজেব সম্রাটের থেকে বিদায় নিয়ে মুঘল সুবাদার হিসেবে পদভার সামলে অবিজিত দক্ষিণ বিজয়ে রওনা হলেন। (চলবে)