বুন্দেলা বিদ্রোহ দমনে শাহজাহানের মুন্সি চন্দর ভান ব্রাহ্মণের দৃষ্টিভঙ্গী
চন্দর ভান ব্রাহ্মণ ছিলেন শাহজাহানের ব্যক্তিগত সচিব, মুন্সি। চন্দর ভান কিন্তু ব্রাহ্মণ উপাধি নিয়েই পুত্র আওরঙ্গজেব থেকে কম নিন্দিত, কিন্তু অনেকটা ধর্মান্ধ হিসেবে খ্যাত শাহেনশা শাহজাহানের রাজত্বকাল জুড়ে তাঁর সঙ্গে কাজ করে ধর্মান্ধ হিসেবে চরমতম নিন্দিত আওরঙ্গজেবের রাজত্বে অবসর নেন, ব্রাহ্মণ উপাশি রেখেই। চন্দর ভাবের জন্মস্থান লাহোর। কিন্তু অবসরের পর জন্মস্থানে ফিরে না গিয়ে বিশ্বের উজ্জ্বলতম মকবরা, রাউজার মকবরাকে দেখাশোনা করার ভার নিয়ে আগরাতেই মৃত্যু অবদি থিতু হলেন। তিনি যেহেতু শাহজাহানের ব্যক্তিগত সচিব ছিলেন, তাই তিনি শাহজাহানকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন — এমন কী তাঁর গোসলখানায় প্রবেশাধিকার ছিল। তিনি সে সময়ের বিখ্যাত লেখকও ছিলেন। তাঁর চিঠি লেখার আঙ্গিক মুন্সি হতে চাওয়া যুবকেরা অনুসরণ করত। তাঁর চাহারচমন চার বাগান মুঘল আমল বুঝতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আজও। তাই আওরঙ্গজেবের সময় বুঝতে এবার থেকে মাঝে মাঝে চন্দর ভান উদিত হবেন।
চন্দর ভান মুঘল আমলের প্রতিহিংসাপূর্ণ নির্দয়তার কথা উল্লেখ করেছেন। শাহজাহানের রাজত্বের শুরুর সময়ে দুটো বড় বিদ্রোহ — একটি আফগান অভিজাত খান জাহান লোদি, যিনি পির খান বা পির আফগান নামে বিখ্যাত হন আর দ্বিতীয়টি রাজপুত নেতা ঝুঝার সিং বুন্দেলার নেতৃত্বে বিদ্রোহ — এই দুটি বিদ্রোহ চরম হিংসা নামিয়ে এনে দমন করেন শাহজাহান। বুন্দেলা বিদ্রোহ দমনে এই প্রথম আওরঙ্গজেবকে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হল। চন্দর ভান ঝুঝার সিং-এর প্রতি একটু বেশিই নির্দয় ছিলেন — তাঁকে অসুস্থ, নরাধম (বাদ-আখতার) বলতেও তার আটকায় নি। বুন্দেলা বিদ্রোহ সম্বন্ধে তিনি লিখবেন এই শক্তিশালী সমাজে অজ্ঞান বাসা বেঁধেছে (অজ রু-ইয়ি জাহালাতি কি দর নিহাদ-ই ইন জামাত মুতামাকিন অস্ত)। এই প্রসঙ্গে আমাদের মাথায় রাখতে হবে ঝুঝার সিংহের বাবা বীর সিংহ বুন্দেলা আকবরের প্রখ্যাত সভাসদ, হয়ত মুঘল জামানার সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিমান, জ্ঞানী, সম্রাট আকবরের ঘনিষ্ঠতম বন্ধু আবুলফজলকে ১৬০২-এ নিজের হাতে খুন করেন জাহাঙ্গিরের নির্দেশে। ঘটনাটা হয়ত মুঘল ইতিহাসে সব থেকে বড় রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার নজির। ঘটনা মুনসি হিসেবে চন্দর ভান জানতেন, আমাদের পাঠকেরাও জানেন, তবুও ছুঁয়ে যাচ্ছি। সেলিমের বিদ্রোহের প্রেক্ষিতে, আকবরের জরুরি ডাকে দাক্ষিণাত্য থেকে উত্তর ভারতে ফেরার পথে আজকের মধ্যপ্রদেশের নারওয়ারের কাছে খুন হন আবুল ফজল, ভবিষ্যতের জাহাঙ্গিরের নির্দেশে। আবুল ফজল সেলিমের সিংহাসনের দাবির বিরোধিতা করেন। আবুল ফজল জানতেন তার ওপর প্রাণঘাতী আক্রমণ হতে যাচ্ছে। তাও তিনি তার মুরিদ বন্ধু আকবরের ডাকে সাড়া দিয়ে দ্রুত রাজধানীতে আসছিলেন। আবুলফজলের কাটা মাথা এলাহাবাদে সেলিমকে পাঠানো হয়। পরে আবুল ফজলের পুত্র আফজল খান (১৫৭১-১৬১৩) বিহারের সুবাদার নিযুক্ত হন। চন্দর ভান ঝুঝার সিংহকে পিতা বীর সিং বুন্দেলার কৃতকর্মের দৃষ্টিতেই দেখেছেন।
ঝুঝার সিংহের বিদ্রোহের ঘটনাক্রম — তার দ্বিতীয় চেষ্টায় যখন তিনি চৌরাগড়ের অমুসলমান গোন্দ সমাজের প্রধান প্রেম (যদুনাথ সরকারের বয়ানে ভীম) নারায়ণকে আক্রমণ করেন, হত্যা করেন এবং তার এলাকা দখল করেন। প্রথমে শাহজাহান বিদ্রোহী ঝুঝার সিংহকে কিছুটা বোঝাবার এবং নমনীয় করার চেষ্টা করেন, বিদ্রোহীর দখল করা জমি, সম্পদের একাংশ গোন্দ সমাজকে ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেন। এই উপদেশ ঝুঝার সিংহ অগ্রাহ্য করেন। মাথায় রাখা দরকার, যে তিনজন মানুষের কথা এখানে উল্লিখিত হল — চন্দর ভান (যিনি নিজে অমুসলমান হয়ে, অমুসলমান রাজাকে রাজনৈতিক অপরাধের জন্যে তিরস্কার করলেন), ঝুঝার সিং (যিনি অমুসলমান হয়েও সে সময় বিখ্যাত অমুসলমান প্রেম সিংকে হত্যা করেন) এবং শাহজাহান (একজন মুসলমান সম্রাট, অমুসলমান রাজার পক্ষ নিয়ে নিজের মনসবদারের বিপক্ষে দাঁড়ান) — এবং এই ঘটনাক্রমে এরা কেউই শুধুই ধর্মের ছুঁকছুঁকানি মাথায় রাখেন নি। এই ঘটনার কোনও সাম্প্রদায়িক হয়ত ছিল না বা জাতীয়তাবাদী ঐক্যও ছিল না। ছিল শুধু ক্ষমতা দখলের উদগ্র বাসনা।
আট মাস ধরে চলা এই বিদ্রোহ নিয়ে চন্দর ভান খুব বেশি মুখও খোলেন নি, প্রতিশোধস্পৃহ গোন্দদের হাতে চন্দার জঙ্গলে লুকিয়ে থাকা ঝুঝার সিংএর নির্মম হত্যার বর্ণনাও চন্দর ভান দেন নি, দেন নি খানইদৌরানের হাতে উভয়ের মস্তিষ্ক ছেদনের ঘটনার বর্ণনাও। সে সময় আরেক মুন্সি নন্দ রাই সংকেতে তারিখটা ধরে রেখেছেন The head and territory and possessions of the Bundela are now in hand (আমাদ সর ওয়া মুলক ওয়া মাল-ই বুন্দেলা বা-দস্ত — ১৯৪৫ হজ্ব — ১৬৩৫-৩৬ খ্রি)। নন্দ রাই কিন্তু আফজল খান শিরাজির দপ্তরের মুনসি। আমরা ধারণা করে নিতে পারি তিনি এবং চন্দর ভান পরস্পরকে চিনতেন। হয়ত অকুস্থলে চন্দর ভান, নন্দ রাই উভয়েই উপস্থিত ছিলেন। এই ঘটনা যদি সত্য হয়, তাহলে একটা বিষয় পরিষ্কার হয়ে যায়, মুনসিরা শুধুই দপ্তরে বসে কাগজ কলম নিয়ে মুনসিগিরি ফলাতেন না, তারা অকুস্থলেও যেতেন। ঝুঝার কাণ্ড নিজের লেখায় উল্লেখ করে হয়ত চন্দর ভান সেই তত্ত্বটা বোঝেতে চেয়েছেন।
দক্ষিণ এবং মুঘলেরা
আওরঙ্গজেবের দক্ষিণ সুবায় দুকিস্তির সুবাদারির ইতিহাস, ঘটনাবলীর ব্যপ্তি, গুরুত্ব এবং সংশ্লিষ্ট মানুষজনকে বুঝতে আমাদের সম্রাট আকবর থেকে মুঘল সাম্রাজ্যের দক্ষিণ অভিযানের ইতিহাস বুঝতে হবে — নইলে আওরঙ্গজেবের দক্ষিণের কাজকর্ম বিষয়ে ধারণা তৈরিতে বেশ কিছু ফাঁক থেকে যেতে পারে।
সেই পৌরাণিক আমল থেকেই দক্ষিণ বাকি আর্যাবর্ত থেকে রাজনৈতিকভাবে এবং কৃষ্টির দিক দিয়েও সম্পূর্ণ আলাদা ভৌগোলিক অঞ্চল। ভারতবর্ষের তিনটে মূল ভৌগোলিক ক্ষেত্র উত্তর-পশ্চিম, পূর্ব এবং দক্ষিণ। অশোকের মৌর্য সাম্রাজ্য প্রথমবার দক্ষিণ দখল নিলেও দক্ষিণে রাজা অশোক সেই পকড় কায়েম রাখতে ব্যর্থ হন। পাঁচ শতাব্দ পরে সমুদ্রগুপ্ত দক্ষিণ জয় করলেও তারও একই হাল হয়। সুলতানি আমলে সুলতানেরা মোঙ্গল আক্রমণ রোখার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। আলাউদ্দিন খলজি ১৩০৯-১৩১১ মধ্যে তিনবার দক্ষিণ অভিযান করেন। সফল সেনাপতি মালিক কাফুর দক্ষিণের রাজ্যগুলো দখলে নেন। এই সময় দক্ষিণি উর্দুর জন্ম হয়। এরপর মহম্মদ বিন তুঘলক দক্ষিণে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে এলেও দক্ষিণে রাজনৈতিক দখলদারি তৈরি করতে ব্যর্থ হন। মাথায় রাখতে হবে তার শাসনের শেকড় দিল্লিতেই থেকেগিয়েছিল; দক্ষিণের লোকেরা তাঁকে উত্তরের শাসক হিসেবেই চিহ্নিত করত। এর পরে দুই শতাব্দ জুড়ে উত্তর ভারতের রাজারা দক্ষিণ ভারতকে জয় করার দিকে নজর দিতে পারেন নি। এই দীর্ঘ সময়ে বাহামনি রাজত্ব এবং তারপরে পাঁচটি অনুসারী রাজত্ব যেমন বিদর, বেরার, আহমদনগর, বিজাপুর আর গোলকুণ্ডার উদ্ভব ঘটেছে। তারা যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয়ও করেছে। দক্ষিণের শিয়া রাজত্বের সঙ্গে ইরাণের শিয়া সাফাভি রাজত্বের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। দক্ষিণে রাজ্যগুলো তৈরিতে, প্রশাসনে এবং সামরিকি কাঠামোয় আফ্রিকিয় দাস, ইরাণী এবং তুর্কি অভিবাসীদের খুব বড় ভূমিকা রয়েছে। আজও দক্ষিণ নিজেদের মত করে উত্তরের হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসন থেকে বাঁচাবার চেষ্টা করছে।
আকবরের দক্ষিণ অভিযান ১৫৯৯-১৬০৫
আকবরের সময় পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্যের দক্ষিণের সীমান্ত ছিল নর্মদা নদীর উত্তর তীর। আকবর সম্রাট নর্মদা নদী পার করে দক্ষিণে সাম্রাজ্য বিস্তারে উদ্যোগী হন। ১৫৯৯-তে তিনি তাপ্তি নদীর উপত্যকায় বুরহানপুরের রাজধানী খণ্ডেশ রাজ্য দখল নিলেন। আহমদনগর রাজ্যের ক্ষমতাশালীদের নিজেদের ঝগড়াঝাটির সুযোগ নিয়ে আজকের মধ্যপ্রদেশের দক্ষিণের বেরার অঞ্চল দখল নেয় মুঘলেরা। ষোড়শ শতের শেষের দিকে সম্রাট আকবর দক্ষিণের রাজ্যগুলোয় দৌত্য দল পাঠান। প্রতিটা দৌত্য দল বিফল হয়ে ফেরে। এইরকম এক দৌত্যদলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন বিখ্যাত প্রযুক্তিবিদ জ্ঞানী ফাতাউল্লাহ সিরাজি। ১৫৯৩ থেকে আকবর রাজনৈতিক দখলদারির পরিকল্পনা ছেড়ে সামরিক আক্রমণের পরিকল্পনা করতে থাকেন। কিন্তু বড় সাফল্য অধরাই থেকে যায়। সম্রাট ১৫৯৯-তে সিদ্ধান্ত নেন, দক্ষিণ বিজয় অভিযান দক্ষিণ থেকে নিজেই দেখাশোনা করবেন। ১৫৯৯-তে তিনি নর্মদা পার হয়ে বুরহানপুর দখল নিয়ে আসিগড় কেল্লা অবরোধ করেন। কিন্তু সম্রাটের দক্ষিণে থাকার সুযোগে শাহজাদা সেলিম বিদ্রোহের ঝাণ্ডা তোলায় তড়িঘড়ি দক্ষিণ বিজয় ক্ষান্ত দিয়ে আকবরকে আগরায় ফিরে আসতে হয়। ১৬০০-তে চাঁদ বিবি খুন হওয়ার পর বালক সুলতানকে উচ্ছেদ করে মুঘল বাহিনী আহমদনগর, পরের বছর আসিগড় দখল করে। ১৫৯৬-তে বেরার দখল হয়েগেছে। নতুন বিজিত রাজ্য — আহমদনগর বেরার খণ্ডেশকে নিয়ে দক্ষিণে নতুন তিনটে আলাদা আলাদা সুবা তৈরি হল। দক্ষিণে মুঘল সাম্রাজ্যের সীমান্ত এখন নর্মদা পেরিয়ে কৃষ্ণা বা ভীমা নদীর পর্যন্ত বাড়ল। আকবরের দক্ষিণে মুঘল দখলদারির সূচনা থেকে শুরু হল দীর্ঘ এক দশকের দক্ষিণের ওপর মুঘলদের যুদ্ধ চাপিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া। মুঘলদের সমস্যা হল, নতুন বিজিত রাজ্য আকারে এতই বড় যে, তাদের পক্ষে সহজে তিনটি রাজ্য আক্ষরিকভাবে দখলে রাখা সমস্যা হয়ে উঠল। নতুন প্রদেশে পুরোনো প্রশাসনের আমলারা মুঘল সাম্রাজ্যের নতুন দখলদারিকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করলেন। বিজাপুর আর গোলকুণ্ডার সম্রাটেরা আশেপাশে মুঘল কব্জায় থাকা এলাকা দখলে নিলেন। (চলবে)