বিজাপুরের সুলতানকে মুঘল সম্রাট চুক্তির ধারাগুলো পাঠালেন। সুলতান কোরানের কসম করে বললেন তিনি চুক্তির ধারা অক্ষরে অক্ষরে মান্য করতে বাধ্য থাকবেন। কিন্তু বাস্তবে মাথায় রাখতে হবে আগামী দিনে আওরঙ্গজেবের সুবাদারির সময় সম্পাদিত চুক্তির ধারাগুলো মান্য করা, না করা নিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে দক্ষিণের সাম্রাজ্যগুলোর বিবাদ ঘনিয়ে উঠবে।
চুক্তির শর্ত
১) বিজাপুরের সুলতান আদিল শাহকে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের অধীনতা মেনে নিতে হবে, ভবিষ্যতে সম্রাটের সমস্ত নির্দেশ মান্য করতে হবে।
২) এখন থেকে নিজাম শাহী সুলতানের সমস্ত শাসন শেষ হবে, অধীকৃত এলাকা সম্রাট এবং বিজাপুরেরে সুলতানের মধ্যে ভাগ হবে। আদিল শাহ নতুন শাহী সীমান্তকে মান্যতা দেবেন, নতুন জুড়ে যাওয়া জেলা দখল নেওয়া এবং প্রশাসন তৈরি করার মুঘল আমলাদের কাজে বাধা দেবেন না।
৩) বিজাপুরের সুলতান তার পূর্বজদের থেকে পাওয়া রাষ্ট্র এলাকা স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন। তাঁর নিজের এলাকার সঙ্গে সদ্য লুপ্ত হওয় আহমদনগর রাজ্যের যে অঞ্চলগুলো জুড়বে তার তালিকা করা হল — পশ্চিমে শোলাপুর, ওয়াঙ্গি মহাল, ভীম (আধুনিক কৃষ্ণা) আর সিনা নদীর মধ্যেকার অঞ্চল, সঙ্গে শোলাপুর আর পারেন্দা কেল্লা; উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে ভালকি আর ছিদগুপা; পুণা আর চাকন জেলা সহ কোঙ্কনের নিজামশাহীর একটা অংশ। বিজাপুরের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এই অঞ্চলের ৫০টা পরগণা থেকে ২০ লক্ষ হুন বা ৮০ লক্ষ টাকা আদায় হবে। নিজামশাহীর বাকি অংশ মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে জুড়ে যাওয়া অঞ্চল হিসেবে গণ্য করতে হবে।
৪) শান্তি বজায় রাখার জন্যে আদিল শাহ সম্রাটকে একলপ্তে ২০ লক্ষ টাকা নগদ এবং উপকরণে ভাগ করে দেবে। বাৎসরিক রাজস্ব ধার্য হবে না।
৫) মুঘল সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে গণ্য হওয়া গোলকুণ্ডা রাজ্য ভবিষ্যতে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে, মঞ্জিরা নদীর প্রান্ত সীমান্ত মান্য করবে, সুলতানের থেকে কোনও দিন দাবি পেশকাশ চাইবে না, তার সঙ্গে ভায়ের মত ব্যবহার করবে।
৬) কোনও পক্ষ অন্য পক্ষের আমলাকে নিজের দিকে টানার চেষ্টা করবে না অথবা পক্ষ পরিবর্তন করা আমলাকে প্রশ্রয় দেবে না। শাহজাহান পুত্রদের পক্ষ থেকে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, মুঘল কর্তৃপক্ষ অন্য রাজত্বের কোনও আমলাকে নিজের প্রশাসনে নেবে না।
৭) নিজাম শাহীর ঝাণ্ডা বয়ে বেড়ানো [নিজামের শিশু পুত্রকে আশ্রয় দেওয়া] শাহজী ভোঁসলেকে বীজাপুরের প্রশাসনে নেওয়া যাবে না যতক্ষণ না শাহজী ভোঁসলে তাঁর অধীনে থাকা জুন্নার, ত্রিম্বক আরও কিছু কেল্লা সম্রাট শাহজাহানের হাতে তুলে দিচ্ছে। সে যদি এই শর্ত অমান্য করে, তাহলে তাকে বিজাপুর প্রশ্রয় দেবে না, তার সীমান্তে ঢুকতেও দেবে না।
১৬৩৬-এর ৬ মে সম্রাট শাহজাহান, সর্বশক্তিমান এবং নবীজীকে সাক্ষী রেখে, সিঁদুর রাঙা হাতের পাঞ্জার ছাপওয়ালা ফরমান হিসেবে মূল চুক্তিটির বয়ান আদিল শাহকে পাঠালেন। আদিল শাহের প্রার্থনা মান্য করে মুক্তা আর এমারেল্ডের ফ্রেমে, মুক্তার দড়িতে সুচারুরূপে বাঁধা সম্রাটের একটি অবয়ব ফরমানের সঙ্গে উপহার হিসেবে পাঠানো হল। সেই মাসের ২০ তারিখ আদিল শাহ ফরমানটি পেলেন। চুক্তিকে মান্য করার নিদর্শন হিসেবে নিজের স্বাক্ষরওয়ালা এই ফরমানের নকলটি সুরক্ষিত অবস্থায় সম্রাটের কাছে পাঠালেন। চুক্তি বয়ে নিয়ে আসা দূতের উপস্থিতিতে সুলতান কোরানে হাত রেখে চুক্তির ধারাগুলো মান্য করার শপথ নিলেন।
গোলকুণ্ডার সুলতানের সঙ্গে সম্রাট শাহজাহানের অতীত সম্পর্ক খুব খারাপ ছিল না। সম্রাট জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে শাহজাদা খুররমের বিদ্রোহে গোলকুণ্ডা তাঁকে সাহায্য করে পাশে দাঁড়ায়। ১৬৩১-এ শাহজাদা খুররম, ভবিষ্যতের সম্রাট শাহজাহান হয়ে দক্ষিণে এলে গোলকুন্ডার সম্রাট তাঁকে উপঢৌকন, নজরানা ইত্যাদি প্রেরণ করেন। কিন্তু সুলতান কুতুবুলমুলক শিয়াদের দিয়ে তাবাররা পাঠ করানো এবং খুতবায় পারস্যের রাজার নাম থাকার সংবাদ শাহজাহানের কানে পৌঁছলে দুই রাজার মধ্যে সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে। সম্রাট বিশাল বাহিনী নিয়ে সুলতানের সঙ্গে রাজনৈতিক মোকাবিলা করার জন্যে তৈরি হয়ে দক্ষিণে এলেন। সম্রাটের বিশাল বাহিনীর উপস্থিতি গোলকুণ্ডার ওপর তীব্র রাজনৈতিক চাপ তৈরি করল। ৬ মে ১৬৩৬-এ মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে গোলকুণ্ডার নতুন করে চুক্তি সম্পাদন করা হল। এই চুক্তির বয়ান বিজাপুরী রাজ্যের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তির শর্ত থেকেও কঠিন শর্তের হল। গোলকুণ্ডার সুলতানেরা শুধু মুঘল সম্রাটের সার্বভৌমত্বই স্বীকার করে নিতে বাধ্য হল তাই নয়, বাৎসরিক ২ লক্ষ হুন [স্বর্ণমুদ্রা] রাজস্ব পাঠানো, তাবাররা পাঠ বন্ধ করে খুতবায় পারস্যের সুলতানের নাম তুলে মুঘল সম্রাটের নাম অন্তর্ভূক্তির স্বীকৃতি এবং বিজাপুরের বিরুদ্ধে মুঘলেরা যুদ্ধ করলে সামরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতিও দিতে হল।
শাহজীর বিদ্রোহ শায়েস্তা করতে বেশ কয়েক মাস লাগল। মারাঠা প্রধান মুঘল সেনাপতির প্রতাপে আত্মসমর্পণ করলেন। সুলতান হিসেবে শাহজী জনৈক বালকের দাবি প্রতিষ্ঠা করার জন্যে গেরিলা লড়াই লড়ছিলেন। বালকের বৈধ সিংহাসনের দাবি তিনি তুলে নিতে বাধ্য হলেন এবং বিজাপুরের প্রশাসনে চাকরি নিতে বাধ্য হলেন। সোনার পাতায় চুক্তির প্রতিরূপ সুলতান আদিল শাহের দরবারে পাঠানো হল।
২৫ জুন গোলকুণ্ডার সুলতানের পক্ষ থেকে ৪০ লক্ষ টাকা মুঘল খাজাঞ্চিতে পৌঁছল, সঙ্গে এল নিশঃর্ত আত্মসমর্পণের বার্তা দিয়ে সুলতানের নিজের হাতে স্বাক্ষরিত চিঠি। ঠিক হল প্রতি বছর তিনি সম্রাটকে যে ৪ লক্ষ হুন রাজস্ব জমা দেবেন, তার অর্ধেক তিনি আহমদনগরের রাজাকে দেবেন, অর্ধেক আসবে সম্রাটের কাছে, বাকি অর্ধেক ভবিষ্যতের জন্যে তুলে রাখতে হবে। পেশকাশ দক্ষিণের স্বর্ণমুদ্রা ৫২ গ্রেন ওজনের হুনে শোধ করতে হল। এই চুক্তিতেও সুলতান হুন আর টাকার বিনিময়ের নীতিতে একটা খোঁচ রেখেদিলেন ভবিষ্যতের গণ্ডগোল তৈরি করার সুতো ছেড়ে রেখে।
চুক্তিতে ৪০ বছরের যুদ্ধের পরে মুঘল-দক্ষিণ রাজ্যগুলোর মধ্যে আপাত শান্তির পরিবেশ তৈরি হল। সম্রাটকে চ্যালেঞ্জ জানাবার দক্ষিণী সাম্রাজ্যগুলোর শক্তি অবশিষ্ট থাকল না। রাজত্বগুলোর সীমান্ত নির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত হল। রাজধানী তৈরি হল। মুঘলদের বিরুদ্ধে শাহজীর দুর্বল গেরিলা লড়াই চলল ঠিকই কিন্তু আপাত শান্তির পরিবেশে সব পক্ষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তবে উদগীর আর আউসা দুর্গ থেকে পুরোনো নিজামশাহী আমলারা মুঘলদের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে গেল। শাহজীর হাতে থাকা ৫টা কেল্লা আদিল শাহ উদ্ধার করে শাহজাহানের হাতে তুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন। চুক্তি শেষে দক্ষিণে আর সম্রাট শাহজাহানের কোনও কিছুই করার নেই। বিজাপুরী সুলতান শাহজাহানকে অনুরোধ করলেন দক্ষিণে তাঁর কাজ মিটেছে, অতএব তিনি উত্তরে রাজধানীতে বিশাল বাহিনী নিয়ে ফিরে যান। বিশাল মুঘল বাহিনী দক্ষিণের মানুষকে সন্ত্রস্ত করে রেখেছে।
দক্ষিণে আওরঙ্গজেবের সুবাদারি
বিজাপুর এবং গোলকুণ্ডার সমস্যার সমাধান করে, দক্ষিণ সুবার ভার শাহজাদা আওরঙ্গজেবের ওপর ছেড়ে সম্রাট শাহজাহান ১১ জুলাইতে ১৬৩৭-এ দরবারে ফিরলেন। শাহজাহানের দরবারের ঐতিহাসিক আবদুল হামিদ লাহোরি লিখছেন বিজাপুরের সুলতান শাহজাহানকে বলেন বিশাল বাহিনীর উপস্থিতি দক্ষিণের মানুষদের জীবনে অভিশাপ বয়ে আনছে। তিনি সম্রাটকে বিশাল বাহিনী নিয়ে উত্তরে মুঘল হিন্দুস্তানে ফিরে যাওয়ার জন্যে অনুরোধ করলেন। দক্ষিণ ছেড়ে যাওয়ার আগে, সম্রাট শাহজাহান বুন্দেলখন্ড এবং দক্ষিণের সফল অভিযানে আওরঙ্গজেবের দক্ষতাকে যথাযোগ্য স্বীকৃতি দিলেন। আওরঙ্গজেবের দক্ষিণী প্রশাসনের আওতায় এল পাহাড়ের চূড়ায় কয়েকশ কেল্লা আর এক কোটি টাকা মূল্যের ভূএলাকা। দক্ষিণের মুঘল সুবাকে চারটি প্রদেশে ভাগ করা হল খণ্ডেশ, বেরার, তেলেঙ্গানা, দৌলতাবাদ। এগুলোর সীমান্তও আলাদা করে নির্দিষ্ট করা হল —
ক) খণ্ডেশ বা তাপ্তি উপত্যকার উত্তরে সাতপুরা আর দক্ষিণে সহ্যাদ্রির ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাহাড় শ্রেণী। রাজধানী বুরহানপুর এবং কেল্লা আসিরগড়।
খ) বেরার খণ্ডেশের দক্ষিণপূর্ব অঞ্চলে, উত্তরে মহাদেব পাহাড় আর গোন্দ অঞ্চল, দক্ষিণে অজন্তা পাহাড় এবং পাইনগঙ্গা নদী। রাজধানী এলিচপুর আর কেল্লা গাউলিগড়।
গ) তেলেঙ্গানা পাহাড় আর জঙ্গল ঘেরা অনির্দেশ্য ভূমিভাগ, ছড়িয়ে থাকা জনপদ অধিকাংশই দেশজ মানুষের বাস।
ঘ) দৌলতাবাদ আহমদনগর এবং অন্যান্য নির্ভরশীল রাজ্য। এটাই মূল দক্ষিণ। দৌলতাবাদ কেল্লায় সুবাদারের বসতি। খিরকি নামে মালিক অম্বর সে শহরের মত একটা ভৌগোলিক এলাকা তৈরি করেছিলেন, আওরঙ্গজেব তাকে আওরঙ্গাবাদ শহরে রূপান্তরিত করে নিজের দক্ষিণের বসতি তৈরি করলেন। প্রদেশেরর উত্তর সীমান্ত হল অজন্তা পাহাড় এবং পাইনগঙ্গা নদী, পূর্বে নান্দের থেকে কান্দাহার এবং উদগীর পর্যন্ত ছড়ানো মঞ্জিরা নদী। (চলবে)