বগলানা বিজয়
আগরা থেকে দক্ষিণে ফিরে যাওয়ার পরে সম্রাট সুবাদার আওরঙ্গজেবকে, খণ্ডেশ আর সুরাট সমুদ্র উপকূলের মধ্যেকার রাজত্ব বগলানা দখলের নির্দেশ দেন। বগলানার সঙ্গে মুঘল রাজত্বের সমস্যা চলছিল আকবরের সময় থেকে। বগলনা তাপ্তি নদীর প্রান্ত থেকে নাসিকের ঘাটমাথা পাহাড় অবদি ছড়ানো লম্বা ফালি অঞ্চল। প্রায় জনশূন্য এলাকা। মাত্র ১,০০০ গ্রাম। অঞ্চলে বিখ্যাত শহর নেই বললেই চলে। পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর বাগানের সমাহার। প্রায় সব ধরণের ফল এই অঞ্চলে যারা বছর চাষ হয়। বর্ষা কাল থেকে অঞ্চলের আবহাওয়া ঠাণ্ডা। মুঘলদের বগলনা অঞ্চল দখল করার প্রয়োজনীয়তা ছিল কারন সেই কোন সুদূর থেকে গুজরাট থেকে দক্ষিণে যাওয়ার পথ বগলনা ছুঁয়ে যায়। এই সামরিক-বাণিজ্যিক পথটি নিরপদ করার প্রয়োজনে বগলনা নিয়ন্ত্রণ জরুরি ছিল। বগলনার শাসক রাঠোড় পরিবার। দাবি, তারা ১,৪০০ বছর ধরে এই অঞ্চল শাসন করছে। নিজেদের পরিচয় দেয় শাহ, আর উপাধি বাহারজী। নিজেদের নামে মুদ্রা ছাপাত। অঞ্চলে দুটো বড় কেল্লা — মুলহির আর সালহির রক্ষণের জন্যে সারা দেশে বিখ্যাত। মুলহির ছিল বগলনার রাজধানী। মুঘলেরা আকবরের সময় থেকে গুজরাট দখলের পরে পরেই বগলনা দখল করার পরিকল্পনা করে। এতে রাঠোড় পরিবার প্রমাদগোণে। আকবর সাত বছর প্রবল চেষ্টা করেও এই অঞ্চল জয় করতে পারেন নি।
রাজকীয় নির্দেশে আওরঙ্গজেব, মারাঠি দক্ষিণী সেনাপতি মালোজী, মহম্মদ তাহির খানের (ভবিষ্যতের ওয়াজির খান) নেতৃত্বে ৭ হাজার বাহিনীকে বগলনা দখল করতে পাঠান। মহম্মদ তাহির খান বগলনার রাজধানী মুলহির অবরোধ করলেন। কেল্লার পাহাড়েরতলার গ্রাম মারাঠি ভাষাড় বারি বা আরও দক্ষিণাঞ্চলীয় ভাষায় পেঠায় রাজা, তার পরিবার নিয়ে বাস করতেন। ১৬ জানুয়ারি ১৬৩৮-এ তিনটে বাহিনী নিয়ে শাহী সেনা বারি দুর্গে আঘাত করে। যুদ্ধে দুপক্ষের প্রচুর ক্ষয়-ক্ষতি হয়। কাফি খান লিখছেন অকুতোভয় মুঘল সেনাপতি সৈয়দ আবদুল ওয়াহাব খইণ্ডেশি নিজে আরও ৪-৫ জন পাহাড়ে চড়া পেশাদার সেনা নিয়ে গোপনে তিন রাত হেঁটে পরের দিন বারির পাহাড়ের তলায় পৌঁছে বারি আক্রমন করেন। পিছনে আসা বাহিনী তুরন্ত আক্রমনে যোগ দেয়। রাজা ৫০০ রক্ষী নিয়ে অন্য কেল্লায় পালিয়ে যান। আরও এক মাস অবরোধের পরে রাজা আত্মসমর্পণ করলেন। রাজার নির্দেশ মা আর মন্ত্রী এসে আওরঙ্গজেবকে অন্য ৮টা কেল্লার চাবি সমর্পণ করলেন এবং রাজা নিজেকে মুঘল সামন্ত হিসেবে ঘোষণা করলেন বাৎসরিক ৪ লক্ষ টাকার রাজস্বের বিনিময়ে। বগলনার পতন হল। আরও এক মাসের পর রাজার আত্মীয় রুদবা, পিপলা কেল্লাকে মুঘলদের হাতে তুলে দিলেন। রাজাকে মনসব দেওয়া হল, তাঁর রাজত্ব মুঘল রাজত্বে বিলীন হল। রাজা বৈরাম শাহের জামাই সোমদেব, রামনগরের রাজাকে ১০০০০ টাকা দেওয়া হল। তাকে রাজত্ব রাখারও সম্মান দেওয়া হল।
আওরঙ্গজেবের দক্ষিণের সুবাদারিত্বের আরও কিছু ঘটনা
আওরঙ্গজেবের দক্ষিণে প্রথম দফার সুবাদারির চাকরি শুরু হয় ১৪ জুলাই ১৬৩৬, শেষ হয় ২৮ মে ১৬৪৪। এই ৮ বছরে, মামা শায়েস্তা খানকে প্রশাসনিক দায়িত্ব বুঝিয়ে বাবার দরবারে মাত্র চারবার এসেছেন। অঞ্চল রক্ষায় তাঁর অবদান হিসেবে আওরঙ্গজেবের মনসব ক্রমশ বাড়ানো হতে থাকে। ১৪ আগস্ট ১৬৩৭-এ ১২ হাজার (৭০০০ জাট) থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৬৩৯-এ তাঁকে ১৫ হাজারি (৯০০০ হাট) মনসবদার পদে উন্নীত করা হয়।
শাহজীর ভাইপো খেলোজী ভোঁসলে নিজাম শাহীর বড় সামরিক আমলা ছিলেন। ১৬২৯-এ তিনি দুই ভাই মালোজী আর পারসুজীকে নিয়ে মুঘল বাহিনীতে যোগ দিয়ে ৫ হাজারি মনসবদার হন। ১৬৩৩-এ নিজাম শাহীর শেষ বড় সুরক্ষিত কেল্লা দৌলতাবাদ মুঘলদের হাতে আত্মমর্পণ করল। খেলোজী ভোঁসলে বীজাপুরের পক্ষ ছেড়ে একা একা মুঘল শক্তির বিরুদ্ধে লড়তে শুরু করেন। খেলোজীর কাজকর্মে বীজাপুরের অদৃশ্য হাত খেলা করত। খেলোজীর স্ত্রীকে মুঘনেরা গোদাবরীতে স্নান করার সময় ধরে ফেলে ৪ লক্ষ টাকা মুক্তিপণ চায়। তিনি মুঘলদের শর্ত মেনে স্ত্রীকে ছাড়িয়ে আনেন। বিজাপুর যখন শাহজাহানের সঙ্গে চুক্তি করে তাকে বরখাস্ত করল, তখন থেকেই তিনি দৌলতাবাদ অঞ্চলে তার বাহিনী নিয়ে ডাকাতি, লুঠতরাজ, খুব, জখমের রাজত্ব কায়েম করেন। আওরঙ্গজেব অক্টোবর ১৬৩৯-এ মালিক হুসেনকে পাঠিয়ে খেলোজী ভোঁসলেকে মৃত্যু মুখে পাঠান।
১৬৪০-এ গণ্ডোয়ানার জমিদার, দেওগড়ের রাজা বুরহানপুরে মুঘলদের জন্যে বরাদ্দ ৪ লক্ষ টাকা রাজস্ব জমা করে যান। তাঁকে তাঁর প্রয়াত বাবার উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকার করে নেওয়া হয়। ১৬৪২-এর ২৫ মার্চ দরবারে শাহজাহানকে দক্ষিণের বহু মনোমোহিনী অলঙ্কার, দামি রত্ন, হাতি উপহার দিলেন আওরঙ্গজেব। শাহজাহান এর মধ্যে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা রেখে সব কিছু শাহজাদাকে ফিরিয়ে দিলেন।
আওরঙ্গজেবের বিবাহ
যেহেতু মুঘলেরা কারিগর হকার এবং চাষীদের পৃষ্ঠপোষকতা করে এশিয়া, ইওরোপ এবং আফ্রিকায় দেশিয় উতপাদকদের পণ্য বিক্রির সুবৃহৎ কাঠামো তৈরি করায় দক্ষিণ এশিয়াকে বিশাল ধনী করে তোলে, তাই মুঘলদের পথ ধরে দল বেঁধে বহু মধ্য এবং পশ্চিম এশিয় অভিজাত গোষ্ঠী দক্ষিণ এশিয়ায়, মুঘল হিন্দুস্তানে এমন কী দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে চলে আসতে থাকে এবং বিপুল মাইনেয় মুঘল মনসবদারি চাকরিতে প্রবেশ করে। হস গোমানস মুঘল ওয়ারফেয়ার বইতে বলছেন, পশ্চিম বা মধ্য এশিয়ার অভিজাতদের অধিকাংশ মনে করত, সেই সব রাষ্ট্রের রাজা হওয়ার থেকে মুঘল মনসবদার হওয়া অনেক বড় লাভের চাকরি। মুঘল সাম্রাজ্যের আয়-ব্যয়ের হিসাব কিতাবের সঙ্গে মধ্য এবং পশ্চিম এশিয় রাজত্বগুলোর হিসাব-কিতাবের তুলনা করলে দেখা যাবে এশিয় ইসলামি বিশ্বে সব থেকে আমলাদের সর্বোচ্চ বেতন দিত মুঘল রাষ্ট্র। সে সময় এশিয়া জুড়ে অভিজাতরা মনে করত মধ্য এশিয়ায় অনামা গরীব রাজ্যের স্বাধীন রাজা হওয়ার থেকে মুঘল হিন্দুস্তানে মুঘলদের অধীনে চাকরি করে বড়লোক হওয়া অনেক সুখের (The message to put across is clear: it was better to become a wealthy servant in Mughal India than to remain an autonomous but poor king in Central Asia)। সামগ্রিক ট্রান্সঅক্সানিয়া, তুর্কিস্তান, এমন কী বলখ এবং বাদাকশনের নগদ আর শস্য মিলিয়ে রাষ্ট্র প্রধান ইমাম কুলি খান এবং নজর আহমেদ খান যে পরিমান রাজস্ব তুলতেন, তার তুলনায় মুঘল হিন্দুস্তান সরকারের উচ্চপদের মনসবদার চাকুরেরা অনেক বেশি মাইনে পেত। ইমাম কুলি খান এবং নজর আহমেদ খান যৌথভাবে ১ কোটি ২০ লক্ষ খানিস, তৎকালীন ভারতীয় মুদ্রায় ৩০ লক্ষ টাকা রাজস্ব তুলতেন। ভারতবর্ষে দোআস্পাওসিহআসপা ৭,০০০ মনসবদার ১ কোটি দাম অর্থাৎ আড়াই লক্ষ টাকা মাইনে পেতেন। উজির, প্রধানমন্ত্রী আমিনুদ্দৌলা আসফ খান একাই তুলতেন ৫০ লক্ষ টাকা। অটোমান সম্রাটেরা তার আমলাদের মুঘল মাইনের এক-চতুর্থাংশ দিত, সাফাভি সাম্রাজ্য দিত এক তৃতীয়াংশ। সব থেকে বড় কথা অটোমান বা সাফাভিদের মুদ্রার তুলনায় মুঘল সাম্রাজ্যের মুদ্রা অনেক বেশি স্থিতিশীল ছিল (The revenues of the Princes of other countries do not amount to what the servants of the Indian government receive. The revenues of Imam Quli Khan and Nazr Muhammad Khan, who held the whole of Transoxania and Turkistan, even to Balkh and Badakhshan, were from land revenue and taxes in cash and grain and also in enhancements and tithes one crore twenty lakhs [12,000,000] of khanis, which are equal to thirty lakhs [3,000,000] of rupees. The assignment for every officer of 7,000 with 7,000 horse, do-aspa-o-sih-aspa is a crore of dams (250,000 Rupees), not to mention Yamin al-Daula Asaf Khan who each year collected from his fiefs fifty lakhs (5,000,000) of rupees.)।
এই রকম বাস্তব রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক অবস্থায় পারসিক সাফাভি সাম্রাজ্যের সুলতান প্রথম শাহ তামস্প ভাইপো সুলতান হুসেনি মির্জাকে কান্দাহার জেলা এবং কেল্লায় সামন্ত রাজা হিসেবে কান্দাহারের নিরাপত্তা রক্ষা করতে পাঠান। হুসেনের পুত্র মির্জা মুজফফর হুসেইন মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চালিয়ে বড় মাইনের প্রস্তাব পেয়ে মুঘল সম্রাট আকবরের হাতে কান্দাহারের নিয়ন্ত্রণ তুলে দেন।
মুঘলেরা যেহেতু পারসিক সংস্কৃতিওর দিওয়ানা ছিল, মুঘল সম্রাটেরা সন্তানসন্ততিদের পারসিক রাজ পরিবারের সঙ্গে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন। মির্জা মুজফফর হুসেইনের কন্যার সঙ্গে শাহজাহানের বিবাহ হয় আর মির্জা রুস্তমের দুই কন্যার সঙ্গে পারভেজ আর শাহ সুজার বিয়ে হয়। মির্জা রুস্তমের পুত্র শাহজাহানের রাজত্বে শাহ নাওয়াজ খান নামে বিখ্যাত। শাহ নাওয়াজের এক কন্যার দিলরাস বানু বেগমের সঙ্গে ১৬৩৭-এ আওরঙ্গজেবের বিয়ে হয় আর আরেক কন্যা বিয়ে করেন মুরাদ বখশকে। (চলবে)