আওরঙ্গজেবের স্ত্রী-পুত্র – যদুনাথ সরকারের বয়ান
ঔরঙ্গজেবের প্রথমা স্ত্রী দিলরাস বানু বেগমের মৃত্যু ঘটে ৮ অক্টোবর ১৬৫৭, জেবুন্নেসা, আজম এবং আকবরকে ঔরসে সন্তান ধারণ করার পর। তার দ্বিতীয় স্ত্রী, মহল, নবাব বাঈ, সুলতান আর মুয়াজ্জমের মা। তিনি কোনওদিন আওরঙ্গজেবের স্নেহ পান নি, সিংহাসনে আরোহণ করে তিনি কোন দিন তাঁকে নিয়ে পাশে বসান নি। তিন স্ত্রীর(পরস্তার) মধ্যে হীরাবাঈ, যিনি যৌবনেই মারা যান, একমাত্রই তাকে আওরঙ্গজেব পাগলের মত ভালবেসেছিলেন। মেহেরুন্নিসার মা আওরঙ্গাবাদী ১৬৮৮এ প্লেগে মারা যান। কাম বক্সের মা এবং সম্রাটের শেষ বয়সের সাথী উদয়পুরী আওরঙ্গজেবের সিংহাসনে আরোহনের পরে তার হারেমে ঢোকেন। শোনা যায় তিনি ককেসাসিয় দাস কন্যা – দারার উপপত্নী ছিলেন। দারার বিরুদ্ধে গিয়ে যুদ্ধ অবশেষ হিসেবে আওরঙ্গজেব তাঁকে পান। সে সময়ে পারসিক ইতিহাস জানাচ্ছে মহিলা কাশ্মীরি ছিলেন। সেটাই হয়ত সত্য। কারণ মাশিরইআলমগিরিতে তাকে বাঈ রূপে সম্বোধন করা হয়েছে, যা হিন্দু মহিলার ক্ষেত্রে করা হয়ে থাকে। তাঁকে আধুনিক লেখক/ঐতিহাসিকেরা মেওয়ার রাজপরিবারের কন্যা হিসেবে কষ্ট কল্পনা করেছেন, যা সত্যি নয়।
সিংহাসনের লড়াই চলতে চলতে আওরঙ্গজেবের জৈষ্ঠপুত্র সুলতান, তার পিতার প্রিয় আমলাদের অধীনে থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে সুজার কাছে পালিয়ে গিয়ে তার কন্যাকে বিয়ে করেন। কিন্তু কয়েক মাস পরে বাবার কাছে ফিরে আসেন। সে ভাগ্যহীন সেই সময় ২০ বছর বয়সী। বাবা তাকে সারাজীবন কায়েদ করেই রাখেন(মৃ ৩ ডিসে ১৬৭৫)।
দ্বিতীয় পুত্র মুয়াজ্জম/শাহ আলম, তার মৃত্যুর পর প্রথম বাহাদুর শাহ নাম নিয়ে সিংহাসনে আরোহন করেন ১৭০৭এ, বিজাপুর গোলকুণ্ডা অবরোধের সময় পিতাকে কুপিত করে নজরবন্দী হন, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৬৮৭-তে। তার উৎসাহ লক্ষ্যণীয়ভাবে কমে গেলে, তাকে বন্দীত্ব থেকে আস্তে আস্তে মুক্ত হন ১৬৯৫-র ৯ মে। প্রথমে পাঞ্জাবেরে সুবাদার পরে আফগানিস্তানেরও সুবাদার হন।
তৃতীয় পুত্র শাহজাদা আজম মুয়াজ্জমের আসম্মানের সময় নিজেকে উত্তরাধিকারী (শাহ-ই-আলিজা) হিসেবে উপস্থিত করান, কিছুট পিতার সম্মতিও পান। কিন্তু তিনি ছিলেন রগচটা, বেদম রাগী, নিজেকে সামলাতে পারতেন না।
চতুর্থ আকবর ১৬৮১-তে বাবার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। পারস্যে পালিয়ে ১৭০৪ সালে মারা যান। ভারতের খোরাসান সীমান্তে তার অবস্থান বহুকাল প্রসাসনের অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
শেষতমটি কাম বক্স, বাবার শেষ বয়সের উন্মার্গগামী, কাপুরুষ, বুদ্ধিহীন, সন্তান। জিঞ্জিতে খারাপ ব্যবহারের জন্যে তাকে আন্তরীণ করে রাখা হয়। তার সৎভায়ের সঙ্গে দহরম মহরম করতে গিয়ে এবং এক নিবেদিতপ্রাণ সেনানায়ককে হত্যা করতে গিয়ে আবার বন্দী হন। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তৃতীয় এবং চতুর্থ সন্তান পরস্পরের বিরুদ্ধে মারপিট করতে করতে মৃত্যুমুখে পতিত হন।
জয়নাবাদী-আওরঙ্গজেব প্রেম
দাক্ষিণাত্যে সুবাদার হওয়ার পর তিনি মুঘল হিন্দুস্তান থেকে সদর আওরঙ্গাবাদের দিকে যাচ্ছিলেন আওরঙ্গজেব। বুরহানপুর ছুঁয়ে যেতে হবে, বুরহানপুর ছিল দক্ষিণের সব থেকে বড় মুঘল সেনা শিবির। বুরহানপুরের শাসক ছিলেন সাইফ খাঁ (তিনি আসফ খাঁয়ের কন্যা, শাহজাদা আওরঙ্গজেবের মামি, সালিহা বানুকে বিয়ে করেছিলেন)। মামীর সঙ্গে আওরঙ্গজেব সৌজন্যে সাক্ষাৎকার করতে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। আওরঙ্গজেব আসছেন শুনে সালিহাও তাকে তাঁদের বাড়ি আসার জন্যে নেমন্তন্ন করলেন। শাহজাদা যেহেতু ঘনিষ্ঠ আত্মীয়া মামীর প্রাসাদে আসছেন, তাই আওরঙ্গজেবের চোখের সামনে থেকে হারেমের-কন্যাদের সরিয়ে রাখার প্রয়োজনীয়তা ছিল না। কাউকে না জানিয়েই শাহজাদা চুপিচুপি মামা-মামীর প্রাসাদে পৌছলেন। জৈনাবাদী, যার জন্ম নাম হীরা বাঈ, ডান হাতে একটি গাছের বড় ডাল ধরে দাঁড়িয়েছিলেন। আওরঙ্গজেবকে তিনি না দেখার ভান করে নিচুস্বরে গান গাইছিলেন। প্রথম দর্শনেই প্রেমশরে কুপোকাত আওরঙ্গজেব। ভাবাবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে শাহজাদা ন যযৌ ন তস্থৌ হয়ে বসে পড়লেন, তার পরেই মাটিতে চিৎপাত। শাহজাদা প্রেমের ঘায়ে মূর্ছা গেলেন। শাহজাদার মূর্ছা সংবাদ মামীর কানে পৌঁছল। খালিপায়ে ছুটতে ছুটতে এসে আওরঙ্গজেবকে বুকে তুলে নিয়ে দীর্ঘস্বরে কেঁদেই চললেন কেঁদেই চললেন। তীব্র প্রেমশরে মূর্ছা যাওয়া শাহজাদা জ্ঞান ফিরে পেলেন ৩-৪ ঘড়ির পর।
বিখ্যাত ভাগ্নের জ্ঞান ফিরে আসায় মামীর ধড়ে প্রাণ এল। উদ্ভ্রান্ত মামী তাকে প্রশ্নের বাণ ছুঁড়তে শুরু করলেন, ‘এই রোগটা তোমার হল কি করে? এরকম মুর্ছা কি তুমি এর আগে গিয়েছনাকী’ইত্যাদি ইত্যাদি। শাহজাদা উত্তর দিলেন না। চুপ করে রইলেন। কারোর প্রশ্নেরই উত্তর দিচ্ছিলেন না। আনন্দ, বিনোদন, আতিথেয়তা, উচ্ছ্বাস সব যেন নার মন থেকে বিদায় নিয়েছিল চিরতরে। চারদিকে সক্কলেই কেমন যেন থম মেরে গিয়েছেন। মধ্যরাত্রে শাহজাদা বাক্যশক্তি ফিরে পেয়ে বললেন ‘আমার যে রোগ হয়েছে, সেই রোগের নাম আপনাকে বলি তাহলে কী আপনি তার নিদান দিতে পারবেন’ আওরঙ্গজেবের মুখ থেকে বাক্য বেরোনোয় মামী কিছুটা স্বস্তিতে। তিনি তাড় মন রাখতে উত্তেজিত স্বরে বললেন তার সমস্ত কিছু উজাড় করে কুরবান এবং তাসদ্দক দেবেন। বললেন, ‘আপনি কী ধরণের নিদান চাইছেন? আমি আপনাকে সুস্থ করে তুলতে আমার জীবন কুরবান দেব’।
শাহজাদা এই প্রথম তাঁর মনের দরজা খুলে ধরলেন মামীর সামনে। সমস্যা শুনেই মামীর জিভ আটকে গেল, কী বলবেন বুঝতে পারছিলেন না। আওরঙ্গজেব বললেন, ‘আপনি আমার স্বাস্থ্য-কল্যাণ করতে গিয়ে বেকার অনেক কথা বলেছেন। আপনি যদি আমার নিদানের বার্তা না দিতে পারেন, তাহলে আপনি কী করে আমায় সুস্থ করবেন ভাবছেন!’ উত্তরে মামী বললেন, ‘আমি কি আপনার জন্য বলি হব? আপনি অমানুষ সইফ খানকে তো জানেন। তার মত রক্ত খেকো মানুষ মুঘল হিন্দুস্তানে একতাই নেই। আপনি কেন, স্বয়ং সম্রাট শাহজাহানকেও তিনি পাত্তা দেন না। আপনার অনুরোধ শুনে তিনি প্রথমে হিরা বাঈকে কাটবেন, তাঁরপরে আমাকে কুপিয়ে কুপিয়ে মারবেন। তাকে আপনার প্রেমের কথা বলা মানে আমার জীবন কুরবান করে দেওয়া। আমার কথা ছাড়ুন। কিন্তু কোনও দোষ না করে কেন জয়নাবাদীর জীবন যায়?’ শাহজাদা বললেন, ‘আপনি সত্য বলেছেন। আমাকে অন্য কোন পথ নিতে হবে’। তিনি দিশা দেখতে পেয়ে মন বাঁধলেন।
সন্ধ্যার পরে শাহজাদা বরাদ্দ ঘরে ফিরে এলেন। কিচ্ছুটি খেলেন না। দাক্ষিণাত্যের দেওয়ান প্রথম মুরশিদকুলি খানকে ডেকে তিনি প্রেমে পড়ার ঘটনা বিশদে বললেন – অভিজ্ঞ প্রশাসক যদি তার থেকে কোনও সূত্র মেলে। মুরশিদকুলি কাট কাট উত্তর দিলেন, ‘প্রথমে আমি বর্বর সইফ খানকে ঠিকানা লাগাই (হত্যা করি)। তার পরে যদি কেউ আমায় আমার সন্ত, আমার পথ প্রদর্শকের [আওরঙ্গজেব] কাজ সিদ্ধ করার জন্য হত্যাও করে, আমার বিন্দু মাত্র হতাশা হবে না, কেননা আমি মরার আগে জেনে যাব আমার রক্তের দামে আপনার ইচ্ছে পূরণ করা গেল’। উত্তরে শাহজাদা বললেন, ‘আমি জানি তুমি আমার কোনও কাজ সমাধা করতে নিজেকে কুরবানি দিতে প্রস্তুত। কিন্তু আমার হৃদয় চাইছেনা আমার মামীকে বিধবা করতে। কোরানিয় আইনে হত্যা করা মহাপাপ। তুমি সর্বশক্তিমানের নাম নিয়ে দুর্মুখ সইফ খানের সঙ্গে এই বিষয়টা আলোচনা কর।’ মুখের একটা রেখা না বদলে, সেই মূহুর্তে মুরশিদকুলি বেরিয়ে পড়লেন সইফের সঙ্গে কথা বলতে। সইফ উত্তর দিলেন, ‘শাহজাদাকে আমার সালাম জানাবে। আমি তাঁর মামিকে উত্তরটা দেব’। সঙ্গে সঙ্গে তিনি জেনানা মহলে গিয়ে তাঁর স্ত্রীকে বললেন, ‘এই প্রস্তাবে ক্ষতি কোথায়? আমার আওরঙ্গজেবের বেগম, শাহ নওয়াজ খানের কন্যার প্রতি বিন্দুমাত্র লোভ নেই। তাকে বল গিয়ে তাঁর হারেম থেকে উপপত্নী ছত্তর বাঈকে (হীরা বাঈয়ের সঙ্গে) বদল করতে’। সইফ, আওরঙ্গজেবের মামিকে একটা চিঠি ধরিয়ে আওরঙ্গজেবের কাছে যেতে বলল; স্ত্রী নিমরাজি হতেই সইফ হুমকি দিল, ‘নিজের জীবন যদি বখশ চাও তাহলে চিঠি নিয়ে যাও’। নির্দেশ পালন করা ছাড়া আর কিছু করার ছিল না। তিনি শাহজাদার সামনে গিয়ে সব বলতে বাধ্য হলেন। খুশি হয়ে উত্তেজিত স্বরে শাহজাদা বললেন, ‘আমার হারেম থেকে একজন মহিলা দিতে কী ক্ষতি? তাকে এক্ষুনি পালকি বাহনে পৌঁছে দিন, এবং আপনারা দুজনে চলে আসুন, আমার কোন আপত্তি নেই’। একজন খোজাকে দিয়ে সেই বার্তা পাঠালেন তাঁর স্বামীর কাছে। সইফ উত্তর দিলেন, ‘আর কোন ঘোমটা থাকল না’; বিলম্ব না করেই তিনি বাঈকে শাহজাদার কাছে পাঠিয়ে দিলেন।
মন্তব্য — এই বর্ণনায় তথ্যে বহু ভ্রান্তি রয়েছে। সইফ খান, মমতাজ মহলের বড় দিদি মালিকা বানুকে বিয়ে করেন (সালিহাকে নয়)। শাহজাহানের সিংহাসনে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই খন্দেশ থেকে তাঁর কর্মচ্যুতির নির্দেশ হয়, আর তিনি সরকারি কাজ ফিরে পান নি। ১৬৪১-এর ২৫ আগস্ট মালিকা মারা যান। ১৬৪০-এ তাঁর পতি সইফ খাঁ মির্জা সফি বাংলায় প্রাণ হারান। (চলবে)