মুন্সি-কবি চন্দর ভানের দৃষ্টিতে জাহানারার পুড়ে যাওয়া এবং মুঘল দরবারে জ্ঞানচর্চা
১৬৪৪ পর্যন্ত আওরঙ্গজেব প্রথম দফায় দক্ষিণের সুবাদার ছিলেন। ১৬৪৪-এর মার্চে জামাকাপড়ে প্রদীপের আগুণ লেগে জাহানারা ভীতিপ্রদভাবে পুড়ে যান। তাঁর জীবন সংশয় হয়। ২ মে আওরঙ্গজেব সম্রাটের অনুমতি ছাড়া আগরায় উপস্থিত হলেন অসুস্থ দিদি জাহানারাকে দেখার জন্যে। জাহানারা অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত দরবারে বিভিন্ন ইস্যুতে যে দুজন সম্রাটকে প্রভাবিত করতে পারতেন, তারা হলেন দারা শুকো এবং স্বয়ং জাহানারা। দারা ছিলেন চরম আওরঙ্গজেব বিরোধী আর জাহানারা যদিও দারা পক্ষীয়, কিন্তু কিছুটা হলেও আওরঙ্গজেবকে প্রশ্রয় দিতেন। বিভিন্ন ইস্যুতে দরবারে আওরঙ্গজেবের ফরিয়াদ জানাবার একমাত্র মানুষ ছিলেন জাহানারা।
আওরঙ্গজেব বিনা অনুমতিতে জাহানারাকে দেখতে আসা সত্ত্বেও তাকে দরবারে খেলাৎ দিয়ে সম্মানো জানানো হয়। ৪ সপ্তাহ পরে ২৮ মে তাঁকে আওরঙ্গজেবকে মুঘল প্রশাসনের সমস্ত দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়, দরবার থেকেও নির্বাসন দেওয়া হয়। আবদুল হামিদ লাহোরি সম্রাটের ফরমানের বয়ান উল্লেখ করে লিখছেন ‘অবিলম্বে তাঁকে [আওরঙ্গজেব] রাষ্ট্রের সমস্ত কাজ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে, এরপর তিনি অবসর জীবনযাপন করবেন। বেশ কিছু বেতমিজ, জ্ঞানহীন মানুষের নির্দেশে তিনি যে কাজগুলো করেছেন, সেসব মহামহিম সম্রাট বিন্দুমাত্র পছন্দ করেন নি’। সালিহ কাম্বু এই নির্দেশনামা কিছুটা পাল্টে লিখছেন, দরবেশেরা আওরঙ্গজেবের পরামর্শদাতা ছিলেন, শাহজাদার মনে দরবেশের মত জীবনযাপন করার বীজ বপন করেন এই ফকিরেরা। তাই সম্রাট আওরঙ্গজেবকে নির্বাসন দেন। তবে আমাদের মনে হয় আওরঙ্গজেবের দরবেশের মত সর্বত্যাগী জীবনযাপন হয়ত শাহজাহানের খুব একটা আপত্তির বিষয় ছিল না, বিষয়টা তার অপছন্দেরও ছিল না। কাফি খান লিখবেন ‘শাহজাদা তার খারাপ কাজের ফলস্বরূপ পিতার দিতে চাওয়া শাস্তির বিষয়টা আন্দাজ করছিলেন, তাই তিনি তরোয়াল খুলে রেখের সন্তের মত দিন কাটাতে লাগলেন’। কিন্তু তিনি কোন বদ কাজ করেছেন, সে বিষয়ে সে সময়ের অধিকাংশ ঐতিহাসিক রা কাড়েন নি। তাকে কাজ থেকে অবসর নেওয়ানোর মূল কারনটা আমরা খুঁজে পাই দশ বছরে পরে তাঁরই লেখা একটি চিঠি থেকে।
১৬৫৬-য় তিনি দ্বিতীয়বারের জন্যে দক্ষিণের সুবাদার নিযুক্ত হলেন। যদিও যদুনাথ হিস্ট্রি অব আওরঙ্গজেব খণ্ডগুলোয় তাঁর পার্শ্ব নায়ক দারার পক্ষে বারবার দাঁড়িয়ে নায়ক আওরঙ্গজেবকে অভিযুক্ত করেছেন। কিন্তু ঘটনাবলী প্রমান দারার পরামর্শে স্বয়ং সম্রাট আওরঙ্গজেবকে প্রায়শই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতেন এবং আওরঙ্গজেব দক্ষিণ থেকে যে সব প্রস্তাব সম্রাটকে চিঠিতে লিখে পাঠাতেন, তার অধিকাংশই তিনি বড় ছেলের পরামর্শে বিবেচনা করতে অস্বীকার করতেন। এই ক্ষমতা চক্রে কিছুটা জড়িয়ের ছিলেন জাহানারাও — কিন্তু জাহানারা নিজের বুদ্ধিকে যুযুধান দুপক্ষ দারা আর আওরঙ্গজেবের কাছে অপরিহার্য এবং নিরপেক্ষভাবে উপস্থিত করার রেয়ার ক্ষমতা অর্জন করেছিলেন। দশ বছর পরে আওরঙ্গজেব জাহানারা বেগমকে লিখলেন, ‘গত দশ বছর ধরে, [সম্রাটের] এই চেলা বুঝেছিল, সে নিজেই এই পথের (মুখ-ই-মতলব) মূল প্রতিবন্ধক, তাই সে [প্রশাসন থেকে] পদত্যাগ করেছিল। পরে আমি বুঝেছিলাম আমার প্রধান কাজ হল আমার জীবনের সত্যকারের পথপ্রদর্শককে (পীর ইয়া মুর্শিদ হাকিকি) খুশি করা, সেটাই আমার জীবনের প্রধান লক্ষ্য, আমি সেই অবস্থাটি স্বীকার করে নিয়েছিলাম, এবং আমি আমার জীবনে যা কিছু সহ্য করার করে নিয়েছি। সম্রাট যদি সে সময় আমায় সত্যকারের [প্রশাসনিক] পদভার থেকে অবসর নিতে দিতেন, তাহলে আমি বাস্তবিকভাবে অখণ্ড অবসর যাপন করতে পারতাম এবং অন্য কারোর হৃদয়ে ধুলিকনা হয়ে আমায় থাকতে হত না, এইসব দৈনন্দিনের ঝঞ্ঝাট থেকে মুক্তি মিলত। এখনও এই সমস্যার নিদান মহামহিম সম্রাটের হাতেই ন্যস্ত আছে, এবং তাঁর বিবেচনা ঠিক পথ নির্দেশ করুক। এই অভাগা চেলার জন্যে আভ্যন্তরীণ বা বহিরাঙ্গের যে কোনও অবস্থা বিবেচনা করে যে কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হোক না কেন, আমি যদি জানি সেই সিদ্ধান্তটা মহামহিমের নেওয়া, আমি সেই সিদ্ধান্ত অনুসরণ করে চলতে বাধ্য’। সে সময়ে পারসিক ইতিহাসে ব্যবহৃত শব্দবন্ধ ‘অবসরের জীবনযাপন করা’ (ইনজিভা ইখতিয়ার কারদাঁ) অর্থ ছিল সম্রাটের অনুমতি না নিয়েই সামস্ত রাজকীয় পদ, দপ্তর বা উর্দি ছেড়ে দেওয়া। সাম্রাজ্যের রক্তচক্ষুর নিচে বহু উচ্চপদের সামরিক আমলা সন্ত (মানজাভি) হয়েছেন এবং মাথা ঠাণ্ডা হওয়ার পর সম্রাট বা হুজুরের ক্ষমা পেয়ে আবার বাহিনীতে, প্রশাসনিক কাজে ফিরে এসেছেন।
আওরঙ্গজেবের লেখা এই ব্যথাভরা চিঠির একটি অন্য পশ্চাদপট আছে। সেটি আবদুল হামিদ লাহোরি লিখেছেন পাদিশানামায়। যদিও যদুনাথ সরকার বলছেন দারার প্রতি আওরঙ্গজেব ঈর্ষায় তিনি সম্রাটের বিরাগভাজন হয়েছেন, কিন্তু লাহোরির বর্ণনায় এবং শেষে সম্রাটের রিয়াকশানে পরিষ্কার স্পষ্ট যে সম্রাট আওরঙ্গজেবের বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নিজেই তুলে নিয়েছিলেন। আওরঙ্গজেবের পুনর্বাসনে জাহানারার সক্রিয় ভূমিকা অন্তত পাদিশানামার এনেকডোটে দেখি না।
ঐতিহাসিক আবদুল হামিদ লাহোরি লিখছেন — “দারাশুকোর জন্য আগ্রায় একটি রাজপ্রাসাদ বানানো হয়েছে। নতুন প্রাসাদ দেখতে সম্রাটের বড় ছেলে দারা, সম্রাট শাহজাহান এবং অন্য তিন শাহজাদা শাহজাদীকে আমন্ত্রণ করলেন। ভারতীয় গ্রীষ্ম। নদীর কাছাকাছি মাটির তলার ঘর বানানো হয়েছে। মানুষের উচ্চতার থেকেও বেশি বড় আলেপ্পোর আয়নাটা নদীর দিকে মুখ ফেরানো। দারা, পিতা আর তাঁর ভাইদের সেই ঘরের সৌন্দর্য দেখাতে নিয়ে গেলেন। আওরঙ্গজেব দরজার বাইরে [চৌকাঠে] দাঁড়িয়ে থাকলেন, ঘরে ঢুকলেন না। দারা আওরঙ্গজেবের রকম সকম দেখে সম্রাটকে ইশারা করে বলতে চাইলেন, দেখুন কোথায় সে দাঁড়িয়ে আছে। মহামহিম আওরঙ্গজেবকে বললেন, ‘পুত্র, আমি জানি তুমি জ্ঞানী এবং সন্তদের মত জীবনযাপন কর, কিন্তু তোমার পদমর্যাদা তোমাকেই বজায় রাখতে হবে – কথায় বলে, যে নিজের মর্যাদা বোঝে না সে নাস্তিক। কী প্রয়োজন ছিল, যে পথে মানুষ যাতায়াত করে, সেপথে তোমার দাঁড়ানোর, এবং তাও তোমার ছোট ভাইএর সামনে?’ আওরঙ্গজেব উত্তর দিলেন, ‘পরে আপনাকে জানাব কেন আমি এখানে বাইরে দাঁড়িয়ে আছি’। আরও কিছু সংশ্লিষ্ট কথাবার্তার পর আওরঙ্গজেব উঠে সান্ধ্যকালীন নামাজ, জুহরের জন্য তৈরি হলেন, এবং সম্রাটের অনুমতি ছাড়া নিজের বাড়িতে ফিরে গেলেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবকে এই বেতমিজির জন্যে সাত মাস সভায় দর্শকাসনে বসায় নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। সাত মাসের পর জাহানারাকে সম্রাট বললেন, ‘তুমি তার বাড়ি যাও, শুনে এস সে কেন সেদিন দরজার বাইরের [চৌকাঠে] দাঁড়িয়েছিল’। বেগম সাহেবা আওরঙ্গজেবের বাসস্থানে গেলেন এবং কারণ জিজ্ঞাসা করলেন। আওরঙ্গজেব উত্তর দিলেন, ‘সে দিন দারা শুকো আমাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে পিতা আর তিন ভাইকে একদরজাওয়ালা মাটির তলার ঘরে বসাবানোর উদ্দেশ্যপূর্ণ পরিকল্পনা করে। বার বার আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য ঘর থেকে ঢুকছিল আর বেরোচ্ছিল, আমার সন্দেহ/ভয় হচ্ছিল, সে হয়ত আমাদের ঘরের ভিতরে ঢুকিয়ে রেখে দেবে তাহলেই সব শেষ (দরজা বন্ধ করে মেরে ফেলার চক্রান্ত করছে — অনুবাদক)। সে এতবার উদ্বেগহীনভাবে ঘরবার করছিল যে, আমার মনে হচ্ছিল, আমাকেই দায়িত্ব নিয়ে নিরাপত্তার কাজটা লক্ষ্য করতেই হবে (দরজার বাইরে দাঁড়ানো), যাতে সে নিজে ঘরের মধ্যে থাকে (আর আমরা বাইরে)। কিন্তু মহামহিম নিজের মর্যাদা রক্ষার জন্য আমাকে ভর্তসনা করলেন। আমি সর্বশক্তিমানের কাছে মার্জনা চেয়ে বেরিয়ে আসি’। বয়ানটা শোনার পরেই সম্রাট [নিজের ভুল বুঝতে পেরে] শাহজাদাকে আদর করে ডেকে দয়া দেখালেন। শাহজাদা, (প্রধানমন্ত্রী) শাহদুল্লা খানকে বললেন, ‘আপনাদের ইচ্ছা মত রাজধানী থেকে যে কোন জায়গায় যে কোন কাজের জন্য আমায় নির্বাসন দিন, আমি রাতের ঘুম আর মনের শান্তি হারিয়েছি’। তাঁকে মহামহিম লাহোর থেকে দাক্ষিণাত্যের সুবাদার করে পাঠিয়ে দেন। (যদুনাথ সরকার মন্তব্য লিখছেন — শেষ স্তবকে উল্লিখিত লাহোর আসলে মুলতান। আওরঙ্গজেব লাহোর-এর (পাঞ্জাব) সুবাদার ছিলেন না। ১৪ জুলাই ১৬৫২তে দাক্ষিণাত্যের সুবাদার নিযুক্ত হন, মুলতান থেকে সরাসরি দক্ষিণে যান। অন্যান্য তথ্য — ১৬৪৫-এর ১ ডিসেম্বর দিল্লির যমুনার তীরে বাড়ি বানানোর জন্য দারাকে ৪৫ লক্ষ টাকা দেওয়া হয় (আবদুল হামিদের পাদশানামা)। এই প্রাসাদ শাহজাহান প্রথম ঘুরে দেখেন ১৪ মার্চ ১৬৪৩। যমুনার উপকূলে আগ্রার বাড়িতে সম্রাট ছিলেন ২০ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট ১৬৪৪ পর্যন্ত। ২৮ মে থেকে ২৫ নভেম্বর পর্যন্ত আওরঙ্গজেবকে আগ্রায় উক্তভাবে অপমান করে সভায় যোগ দেওয়ার নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, এর পরে ১৬ ফেব্রুয়ারি ১৬৪৫ গুজরাটের সুবাদার করে পাঠানো হয়। সেই বছর সম্রাট আগ্রায় দারার প্রাসাদ যান ২ জানুয়ারিতে।] আওরঙ্গজেবকে যেভাবে ১৬৪৪-এ অনুচিতভাবে পদচ্যুত করা হয়, সেটা যুবা আওরঙ্গজেবের মনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলার জন্যে যথেষ্ট বলেই আমার মনে হয়েছে।
আবদুল হামিদ লাহোরির সূত্রে দেখলাম আওরঙ্গজেবের পুনর্বাসনে যদুনাথ সরকার জাহানারার যে হাত দেখছেন, সেটি সত্য নাও হতে পারে। বরং সম্রাট আওরঙ্গজেবকে নির্বাসন দিয়ে যে ভুল করেছিলেন সেটা আবদুল হামিদ লাহোরি তার এনেকডোটে স্পষ্ট উল্লেখ করছেন। (চলবে)