১৬৪৫-এ গুজরাটের সুবাদার
আমরা এর আগে শাহজাহানের ব্যক্তিগত সচিব, মুন্সি চন্দর ভানের বই ‘চাহার চমন’ সূত্রে বিশদ আলোচনায় বলেছি পোড়া ক্ষত থেকে পাদিশা বেগম জাহানারার সেরে ওঠার খুশির প্রতিক্রিয়ায় বিভিন্ন উপযুক্ত, সংশ্লিষ্ট মানুষ এবং দরবারিকে নানান প্রকার সম্মান এবং উপঢৌকন দেওয়া হয়। যদিও সে সময়ের ইতিহাস অনুসরণে যদুনাথ সরকার হিস্টোরি অব আওরঙ্গজেবের প্রথম খণ্ডে দাবি করছেন সুস্থ হওয়ার পর জাহানারা আওরঙ্গজেবকে ক্ষমা করার জন্যে সম্রাটকে আবেদন জানান। সম্রাট সে আবেদন মান্যতা দিয়ে আওরঙ্গজেবের থেকে কেড়ে নেওয়া পদ, উপাধি ইত্যাদি ফিরিয়ে দেন। কিন্তু এর আগে আমরা আলোচনা করে দেখিয়েছি, অন্তত আহকম-ই-আলমগিরির এনেকডোটস সূত্রে আওরঙ্গজেবকে দরবারে ফিরিয়ে নেওয়া আর পদ ফিরিয়ে দেওয়া বিষয়ে জাহানারার হস্তক্ষেপের তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না, বরং শাহজাহান ৭ মাস পর আওরঙ্গজেব কেন দারার প্রাসাদে সে রকম অপ্রথাগত কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন, তার মূল কারণ জানতে দিদি জাহানারাকে তদন্ত করে দেখতে বলেন। কন্যার তদন্ত সমীক্ষা পাওয়ার পর, ভুল বুঝতে পেরে নিজের নির্দেশ ফিরিয়ে নিয়ে আওরঙ্গজেবকে পুনর্বাসন দেন। আওরঙ্গজেবের মনসব ১৫,০০০ জাট আর ১০,০০০ সওয়ারের পদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়, আরও ১০,০০০ অতিরিক্ত ঘোড়সওয়ার রাখারও বিশেষ অনুমতি দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে দারা আর আওরঙ্গজেবের স্থায়ী মনোমালিন্য আন্দাজ করে শাহজাহান দুটো বিষয় আন্দাজ করলেন — ১) তাঁর দুই পুত্র, দারা আর আওরঙ্গজেবকে এক সঙ্গে দরবারে রাখা বিপজ্জনক হবে; ২) শাহজাহান, আওরঙ্গজেবের বুন্দেলা অভিযান সফল করানো আর দক্ষিণের সুবাদারির দক্ষতায় বুঝেছেন আওরঙ্গজেবের সামরিক দক্ষতা, অকুতোভয়তা, আগ্রাসী মানসিকতা তার এই পুত্রকে দূর সুবাদারির জন্যে যোগ্য করে গড়ে তুলেছে। এখানে ইন্টারেস্টিং বিষয় হল মুঘল সাম্রাজ্য দারাকে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সুবাদারি বরাদ্দ করলেও সম্রাটের সদিচ্ছায় কিন্তু কোনও দিনই তাঁকে নিজের হাতে সুবার প্রশাসনিক ঝক্কি সামলাতে হয় নি। তিনি একাদিক্রমে ১৬ বছর দরবারেই সম্রাটের অভয়হস্ত মাথায় নিরাপদে নিয়ে থেকেছেন আর সুবায় নিজের প্রতিনিধি রেখে কাজ চালিয়েছেন।
জাহানারা সেরে ওঠার দুমাসের মধ্যেই সম্রাট কাশ্মীরে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। আওরঙ্গজেব তাঁর সঙ্গে দিল্লি পর্যন্ত এলেন। সেখানেই সম্রাট, ১৬৪৫-র ১৬ ফেব্রুয়ারি, ফরমান জারি করে আওরঙ্গজেবকে গুজরাটের সুবাদার নিয়োগ করেন। এই পদপ্রাপ্তি আওরঙ্গজেবের কাছে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও ছিল, নিজেকে তৈরি করার ক্ষেত্রও ছিল। দক্ষিণের সুবাদারিতে তিনি হাতে কলমে যে প্রশাসনিক, সামরিক কাজ শিখেছিলেন, সেটা গুজরাটে কাজে লাগাতে পারবেন কী না সেটা তাঁর কাছে চ্যালেঞ্জের বিষয় হয়ে ওঠে। গুজরাটের প্রশাসনে কাজ করতে গিয়ে আওরঙ্গজেব নিজের ক্ষমতা পরিধির আন্দাজ পেলেন। তিনি বুঝলেন, সাফল্য পেতে গেলে, অতীতে হঠাৎ হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়ে যে সব ভুল নিজের জীবনে ঘটিয়েছেন, সে সব ভুলের রিপিটেশন করা তাঁর কেরিয়ারের পক্ষে বিপজ্জনক হবে — যেহেতু দরবারে তাঁর পাশে দাঁড়াবার মত কিছুটা জাহানারা ছাড়া আর কেউই নেই। তাঁকে নিজের দক্ষতা প্রদর্শন করেই টিকে থাকতে হবে। একটা ছোট্ট অসতর্ক বিশ্রী ভুল, এই হোস্টাইল সাম্রাজ্য দরবারে দারা-সম্রাট-জাহানারা অক্ষ তাঁর পতন নিশ্চিত করবে। বিশাল, সমৃদ্ধশালী মুঘল সাম্রাজ্যের ক্ষমতা কেন্দ্রে যাওয়ার জন্যে নিজেকে গুজরাট প্রশাসনে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ফেলে তিলে তিলে তৈরি করলেন। আওরঙ্গজেবের গুজরাটে সুবাদারির মেয়াদ শেষ হবে জানুয়ারি ১৬৪৭-এ। সেখান থেকে তাকে বলখের সুবাদার হিসেবে বদলি করা হবে। এই দুবছরে আওরঙ্গজেব প্রমান করলেন, তিনি কঠিন ধাতুর তৈরি মানুষ এবং শক্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে কর্মচারীদের কাজ করিয়ে নিতে তাঁর বিন্দুমাত্র অসুবিধে হয় না। সম্রাট মুখে স্বীকার না করলেও সেটা বুঝলেন। তিনি আওরঙ্গজেবের মত মানুষের চরিত্র পরীক্ষা করার জন্যে বারবার তাঁকে জ্বলন্ত আগুণের মুখে ছুঁড়ে দিয়েছেন এবং আওরঙ্গজেব প্রত্যেকবারেই বিরুদ্ধ পরিবেশকে নিজের অনুকূলে টেনে এনে বিজয়ী হয়েছে, নিত্য নতুন চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জন্যে তৈরি করেছেন নিজেকে। উলটো দিকে, দাদা দারাকে কোনও দিনই সুবার চ্যালেঞ্জ সামলাবার দায় নিজের ঘাড়ে তুলে নিতে হয় নি, সম্রাট যতদিন সক্রিয় ছিলেন, ততদিন তিনি মুঘল দরবারে নিরাপদে থেকেছেন, সম্রাটের পাশে বসে রাজত্ব চালিয়েছেন, আওরঙ্গজেবের সামনে যতটা বাধা তৈরি করা যায় করেছেন, তাঁকে অপদস্ত করেছেন, আওরঙ্গজেবের বিরোধীদের অযাচিত আনুকূল্য দেখিয়েছেন। কিন্তু যখনই সম্রাট অসুস্থ হয়েছেন, সাম্রাজ্যর সমস্ত সিদ্ধান্ত দারা নিজেই নেওয়া শুরু করেছেন, তখন থেকেই গোলমাল পাকতে শুরু করেছে। সাম্রাজ্যের সঙ্গে জুড়ে থাকা একের পর এক জটিল ইস্যু সামলাতে না পেরে মুঘল হিন্দুস্তানকে তীব্র গোলযোগের আবর্তে নিয়ে ফেলেছেন, আর একের পর এক ভুল সিদ্ধানতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলে নিজের জীবন আর নিজের পরিবারের অস্তিত্বকে প্রশ্ন চিহ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। এই বিষয়টা আমরা পরে বিশদে উদাহরণ দিয়ে আলোচনা করব।
বাংলার মতই গুজরাট মুঘলদের কাছে ছিল বুলগাখানা বা বিদ্রোহের না হলেও নিয়মিত গোলযোগের ঘাঁটি। কুলি এবং কাঠি আদিবাসী সমাজের পেশা ছিল ডাকাতি করা। আইন শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যর্থতার এই সমস্যা চলে আসছে সম্রাট আকবরের রাজত্বের সময় থেকেই। শাহজাহানের সময়ে মুঘল সুবাদার আজম খান (১৬৩৫-৪১) গুজরাট রাজ্যে গন্ডগোল এবং অরাজক অবস্থা রুখতে কড়া ব্যবস্থা নিয়ে নওনগরের প্রধানকে রাজস্ব দেওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাজ্যে গোলযোগ কমানোর ব্যবস্থা করেন। এর পরে বিস্তৃত গুজরাট সুবায় আইন শৃঙ্খলার অবস্থা কিছুটা শুধরোয়। ১৬৪৫এ আওরঙ্গজেব সম্রাটের নির্দেশে সুবাদার হয়ে গুজরাটে এলেন। রাজপথে ডাকাতি রোখা ছিল তার প্রথম বড় কাজ। এদের মোকাবেলা করার জন্যে তিনি বড় বাহিনী তৈরি করেন, তারা সফল হওয়ায় আইনশৃংখলার অবস্থা বেশ কিছুটা উন্নতি ঘটে। সম্রাট পুত্রের কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তার মনসব আরও কিছুটা বাড়িয়ে দেন। যদিও কোনও দিনই খোলা মনে শাহজাহান আওরঙ্গজেবের কাজকর্মের জোরের জায়গাগুলোকে সমর্থন দেন নি, কিন্তু এবারে তিনি তাঁর প্রশাসনিক এবং একই সঙ্গে সামরিক যোগ্যতা স্বীকার করে নিলেন। আওরঙ্গজেব গুজরাটে খুব বেশি হলে ১৮ মাস ছিলেন — ১৬৪৫-এর এপ্রিল থেকে ১৬৪৬-এর সেপ্টেম্বর। ৮ জুন ১৬৪৬-এ আওরঙ্গজেবের মাইনে বেড়ে হল ৬০ লক্ষ টাকা। সম্রাট তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতাকে আবারও স্বীকার করলেন। ৪ সেপ্টেম্বর গুজরাটের ভার শায়েস্তা খানকে তুলে দিলেন সম্রাট। ২০ জানুয়ারি ১৬৪৭-এ আওরঙ্গজেব সম্রাটের নির্দেশে লাহোরে দরবারে পৌঁছলেন। ১৬৪৭-এর পেশোয়ারের রাজকীয় দরবারের নথিতে আওরঙ্গজেবের নাম পাচ্ছি। পরের দিনই তাঁকে আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়ে দূরের দুর্গম বলখ আর বাদাকশনের বিপজ্জনক সুবায় সুবাদার নিয়োগ করা হল। তিনি রুটি ভাজা চাটু থেকে তন্দুরের আঁচে ঢুকলেন।
মধ্য এশিয়ায় মুঘলেরা, মুঘল সাইকিতে কান্দাহার
মুজফফর আলম এবং সঞ্জয় সুব্রহ্মণ্যম, দ্য মুঘল স্টেট ১৫২০-১৭৫০-এর ভূমিকায় বলছেন ঔপনিবেশিক সময় থেকে আজ অবদি মুঘল আমল নিয়ে বিপুল বই লেখা হয়েছে, বিপুল গবেষণা হয়েছে, সেই গবেষণার উপাত্তগুলি অধিকাংশ মুঘল আমলের বিপুল পরিমান লিখিত ইতিহাস থেকে আহৃত — এবং এই পরিমান লিখিত ইতিহাস রচনা যতদূর সম্ভব অন্য কোনও এশিয় সাম্রাজ্যের ক্ষেত্রে ঘটে নি। তো, এশিয়ার বিপুল অংশে তৈমুরী-চাঘতাই সাম্রাজ্য তৈরি করেন সাহেবি কিরণ আমির তৈমুর গুরগান। তার লেগাসি বয়ে এশিয়াজুড়ে অনেকগুলি সাম্রাজ্য তৈরি হয়, যার একটা ছিল বাবরের হাত ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় মুঘল হিন্দুস্তানে মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা। বাবরের সময় থেকেই শাহী পরিবারে মধ্য এশিয় প্রথাগুলোর পরম্পরা রক্ষা বিষয়ে দক্ষিণ এশিয়ার মুঘলেরা খুবই সচেতন ছিল। বাবর বার বার স্বপ্ন দেখতেন ফরগণায় ফিরে যাওয়ার। তারপরের মুঘল সম্রাটেরা তাঁদের জন্মভূমির দিকে সাম্রাজ্য বিস্তারে চেষ্টা করেছেন। কাবুল আর কান্দাহার দখল মুঘল সাইকিতে চিরস্থায়ী হয়ে যায়। সৎ ভাই মির্জা হাকিমের মৃত্যুর পর কাবুল দখল করতে পারলেও কান্দাহার বহুবার হাত বদল হয়েছে সাফাভি আর মুঘল সাম্রাজ্যের মধ্যে। মুঘল সম্রাটদের মানসিকতায় তৈমুরের প্রভাব এত বেশি ছিল যে শাহজাহান দ্বিতীয় সাহেবিকিরণ উপাধি নেন। শাহজাহান আওরঙ্গজেব এবং দারাকে বলখ ও কান্দাহার দখল করতে পাঠিয়েছিলেন। কান্দাহার অভিযান নিয়ে শাহজাহানের আমলে মুঘল ৩ ভায়ের মধ্যে বিপুল দূরত্ব তৈরি হবে। (চলবে)