মির্জা হাকিমের উদ্যম
১৫৫৬-য় যখন আকবর সিংহাসনে আরোহন করেন, তখন তিনি মাত্র ১৩ — বেশকয়েক বছর ক্ষমতার চলন বুঝে নিতে সম্রাট হয়েও নামে মাত্র রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে থাকলেন। সে সময় সাম্রাজ্য পরিচালনার অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নিতেন ক্ষমতাকেন্দ্রে বসে থাকা পরামর্শদাতা, অভিভাবক এবং আধিকারিকেরা। ৫ বছর পরে, ১৫৬১তে সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে একের পর এক ক্ষমতাবান রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মুখোমুখি হয়ে তাদের ক্ষমতার প্রভাব নির্বিষ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রথম কাজ হল মুঘল দরবারের বাইরে প্রান্তিক কিন্তু তাঁর প্রতি কম নিবেদিতপ্রাণ দূরসম্পর্কের পারিবারিক সম্পর্কের গোষ্ঠী যেমন প্রভাবশালী তৈমুরী মির্জা অথবা উজবেগিদের ওপরে পাল্টা চাপ দেওয়ার কৌশল নিলেন। এদের প্রত্যেকের একটাই মিল, পুরোনো কাঠামোয় তৈমুরী-মুঘল ক্ষমতাকেন্দ্রকে থাকা ক্ষমতাশালী ব্যক্তি গোষ্ঠীদের রাজনৈতিক ক্ষমতার নখদাঁত ভেঙে আকবর নিজের কর্তৃত্বের নতুন যে কাঠামোটা তৈরি করতে চাইছেন, সেটার চরমতম বিরোধিতা করা। এই পরিকল্পনায় আকবরের আরেকটি রণনীতি হল, বাবর এবং হুমায়ুনের প্রশাসনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মধ্য এশিয় অভিজাত প্রশাসকদের সরিয়ে আকবর আরও বেশি হিন্দুস্তানী মুসলমান, রাজপুত এবং মুঘল অভিজাতদের কাছে টানলেন, দরবারে তাদের গুরুত্ব বৃদ্ধি করলেন।
দীর্ঘকালের মধ্য এশিয় তুর্কো-মোঙ্গল অভিজাতদের সমর্থন অস্বীকার এবং ক্ষমতা খর্ব করার রাজনীতিক উদ্যমে সাম্রাজ্য জুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেল। ১৫৬৪ থেকে ১৫৬৮ পর্যন্ত আকবরের নেতৃত্বে নতুন গড়ে ওঠা সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে একের পর এক বিদ্রোহ ঘনিয়ে উঠতে থাকে। মধ্য এশিয়দের সমর্থন থেকে বেরিয়ে আসতে চাওয়া আকবরের সমস্যা আরও বাড়ালেন কাবুলে ক্ষমতায় বসা মির্জা হাকিম। তিনি আকবরের উত্তরাধিকার অস্বীকার করে নিজেকে মুঘল পরম্পরার একমাত্র উত্তরাধিকারী হিসেবে চিহ্নিত করলেন এবং মুঘল হিন্দুস্তানে অবহেলিত, কোণঠাসা মধ্য এশিয়ার স্বার্থবাহী আমীর অভিজাতদের পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াবার প্রতিশ্রুতি দিলেন। ইকতিদার আলম খান নোবিলিটি আন্ডার আকবর… প্রবন্ধে বলছেন হুমায়ুনের শেষ সময়, ১৫৫৫র তুলনায় আকবরের সময় ১৫৬৫-৭৫এ তুরাণীদের প্রতিনিধিত্ব কমল ৫২.৯%, ১৫৮০তে আরও কমে হল ২৪.২৬%। ১৫৫৫ থেকে ১৬৮০ পর্যন্ত দেশিয় মুসলমান আর রাজপুতদের প্রতিনিধিত্ব প্রায় শূন্য থেকে বেড়ে হল ১৬.১৭% আর ১৫.৮৩%। আকবর যখন নিজের ক্ষমতার শেকড় চারিয়ে দিতে লড়ছেন, সে সময় কাবুলে বসে মির্জা হাকিম কীভাবে আকবরের রাষ্ট্রীয় নীতিকে প্রভাবিত করবেন সেই আলোচনায় আমরা এবারে প্রবেশ করব।
১৫৬৬র উজবেগ বিদ্রোহের সুযোগে মির্জা হাকিম মুঘল হিন্দুস্তান আক্রমনের উদ্যোগ মাঝপথে বাতিল করলেও উজবেগদের সমর্থন করা ছিল তার সে সময়ের সব থেকে বড় কূটনৈতিক চাল। মুঘল হিন্দুস্তান দখলের সামরিক ব্যর্থতা সত্ত্বেও তিনি মনেবল হারালেন না, বিষয়টা নিয়ে লেগে থাকেন। তিনি ক্রমশ কাবুল সাম্রাজ্যকে মুঘল হিন্দুস্তান সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তুলে ধরার কাজ শুরু করবেন। তার এই রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সফল করতে তিনি মা, মাহ চুচক বেগমের মতই কাবুলের দরবারে আকবরের হিন্দুস্তানের দরবার থেকে বিরোধিতা করে পালিয়ে আসা অভিজাত নেতৃত্ব যেমন হাসান খান, ফারিদুন বেগ খান, সুলতানি লস্কর খানের মত দ্রোহীদের পুনর্বাসন দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করলেন। ১৫৬০এর দশকে আকবর উজবেগ বিদ্রোহ দমন করার পর বহু বিদ্রোহী নেতা কাবুলের দরবারে ঠাঁই দিলেন। শুধু আকবর-বিদ্রোহীদের ঠাঁই দেওয়া নয়, তিনি নিজেকে একমাত্র মধ্য এশিয় রাজকীয় পরম্পরার উত্তরাধিকারী হিসেবে উপস্থিত করে বললেন, রাজা স্বয়ং primus inter pares — first among equals। মির্জা, আকবরের রাজনৈতিক পথ অনুসরণ না করে, সচেতনভাবে আলাদা চলার বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন তার কাজকর্মে।
তিনিই মধ্য এশিয় তুরানি রাজনীতির একমাত্র যোগ্য উত্তরাধিকারী, তিনিই সেই স্বার্থ রক্ষা করার একমাত্র যোগ্য পাত্র, মির্জা হাকিমের এই বার্তায় ভবিষ্যতে আরও অনেক রাজনৈতিক ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা লুকিয়েছিল। তাঁর এই উদ্যমের সূত্রে ক্রমশ কাবুল প্রশাসন হয়ে উঠতে থাকে মধ্য এশিয় তুর্কো-মোঙ্গল যাযাবরদের প্রশাসনিক প্রথা তুরা-ই-চাঘতাইএর একটি ডাইলুইটেড সংস্করণকে বাস্তবে ভারতীয় মুঘল সাম্রাজ্যে প্রযুক্ত করার রাজনৈতিক ভূখণ্ড। মাথায় রাখতে হবে তুরা তার এবং তাঁর সাম্রাজ্যের চরিত্র তৈরির হাতিয়ার মাত্র, বাহক নয়, যাকে প্রয়োগ করার পর নিশ্চিন্তে ঠাণ্ডাঘরে সরিয়ে রাখা যায়। মির্জা হাকিম তাঁর রাজ্যে কয়েকজন বিদ্রোহী, কিছু লোভী ব্যবসায়ী এবং হাতেগোণা অসভ্য ভৃত্যকে শাস্তি দেওয়া ছাড়া তুরার নিয়মাবলী প্রয়োগ করার উদ্যম নেন নি। কিন্তু তাতেও তার ভাবমূর্তি বিন্দুমাত্র টসকায় নি কারন ১৫৫৬তে আকবর সিংহাসনে আরোহন করার পর মুঘল হিন্দুস্তান প্রশাসনে তুরার প্রভাব শূন্য হয়ে যায়। উল্টোদিকে মির্জা হাকিমের রাজত্বে নামেমাত্র তুরা প্রয়োগ করার প্রভাব তার ভাবমূর্তি তৈরির ক্ষেত্রে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছে। তুরার সঙ্গে যেহেতু মধ্য এশিয় রাজনৈতিক পরিচয় জুড়ে ছিল, তার রাজত্বে তুরা প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি নিজেকে চেঙ্গিজি-তৈমুরী এবং মোঙ্গল পূর্বজদের একমাত্র যোগ্য বৈধ প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরলেন। এই সঙ্গে জুড়ল তার সৎভাইএর আকবরের সাম্রাজ্য তুরার প্রভাব থেকে বেরিয়ে আসার প্রভাব। আকবর যে তাঁর ভায়ের তাত্ত্বিক অবস্থান সম্বন্ধে সম্পূর্ণ জ্ঞাত ছিলেন তার প্রমান পাই ১৫৭৫এ মুঘল হিন্দুস্তানে কিছু সময়ের জন্যে তুরা-ই-চাঘতাই প্রয়োগ করার সিদ্ধান্তে। মাথায় রাখতে হবে এই সময় তার তৈমুরী আত্মীয় মির্জা সুলেইমান সিংহাসন হারিয়ে কাবুল হয়ে মুঘল হিন্দুস্তানের দরবারে হাজির হয়েছিলেন তার হারানো রাজত্ব ফেরত পাবার আশায়। মুনিস ফারুখি বলছেন, আকবর তাঁকে কিছুটা হলেও ইম্প্রেস করার চেষ্টায় তুরা প্রয়োগে উদ্যমী হন।
মধ্য এশিয়ার যে ক’টি রাজনৈতিক প্রথা আকবর তার রাজনীতি আর প্রশাসনে অস্বীকার করেছিলেন, সে ক’টি প্রথাই মির্জা হাকিম আঁকড়ে ধরলেন তীব্রভাবে। ১৫৬০এর পর আকবর প্রশাসনে, অর্থনীতিতে কেন্দ্রিভবন আনার উদ্যমে পুরোনো মুদ্রা ব্যবস্থা থেকে বার হয়ে নতুন মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করেন। মির্জা হাকিম পাল্টা উদ্যমে কাবুলে মুঘল হিন্দুস্তানের মুদ্রা নিষিদ্ধ করেন। মুঘল হিন্দুস্তানের মুদ্রা নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে তিনি আকবরের প্রশাসনিক সংস্কারকে অস্বীকার করলেন, কারন মুদ্রায় আকবরের পদাধিকার উল্লিখিত ছিল। তিনি কাবুলে মধ্য এশিয় শাহরুখি মুদ্রা প্রচলন করে নিজেকে আরও বেশি করে অতীতের তৈমুরী-মোঙ্গল মুদ্রা প্রথার সঙ্গে জুড়লেন, এমন কী বাবর আর হুমায়ুনের সঙ্গেও নিজের রাজনৈতিক যোগসূত্র আরও জোরদার করলেন। মির্জার রাজত্বের শাহরুখি কিন্তু কাবুলে তৈরি হত না, সেগুলি আসত উজবেগদের বলখ আর বুখারা থেকে। আকবরের রাজত্বের মুদ্রা কাবুলে ঢুকলে তিনি সেগুলোকে নতুন করে স্ট্যাম্পড করিয়ে নিতেন। আকবরের হিন্দুস্তানী মুদ্রা মোহর, রুপি আর দাম প্রথাকে অস্বীকার করলেন মির্জা। শাহরুখি তখনও মির্জার পূর্বজদের বাসস্থান, মধ্য এশিয়ায় সক্রিয় ছিল। শাহরুখিতে আশ্রয় নিয়ে তিনি নিজেকে তৈমুরী-মোঙ্গল রাজনীতির একমাত্র উত্তরসূরী হিসেবে তুলে ধরলেন।
একই সঙ্গে তিনি নিজেকে মধ্য এশিয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরার উদ্যমে মধ্য এশিয়ার জাতিগত এবং রাজনৈতিক শ্রেষ্ঠত্বকে বহন করার উদ্যম নিলেন। আকবর তখন ভারতীয় মুসলমান এবং রাজপুতদের ক্ষমতাকেন্দ্রে নিয়ে আসতে পূর্ণ উদ্যমী। মধ্য এশিয় অভিজাতদের অভিযোগ ছিল আকবর তাদের ক্ষমতা থেকে ছেঁটে ফেলে, তাদের শূন্যস্থানে দেশিয় গোষ্ঠীদের ক্ষমতা কেন্দ্রে আনার চেষ্টা করছেন। ১৫৮০-৮১তে মুঘল হিন্দুস্তানজুড়ে রাজনীতিতে প্রায় ব্রাত্য হয়ে যাওয়া মধ্য এশিয় অভিজাত আমীরেরা একজোট হয়ে আকবরের বিরুদ্ধে এবং মির্জা হাকিমের সপক্ষে প্রত্যাঘাত করার সিদ্ধান্ত নেয়। মির্জা হাকিমের প্রাক্তনীরা বিশেষ করে ১৫৭০র দশকে হিন্দুস্তানে এসে আকবরের দরবারে চাকরি নেওয়া মাসুম বেগ কাবুলি, রোশন বেগ কাকশাল মধ্য এশিয়দের বিদ্রোহের মুখ হয়ে উঠলেন। ১৫৮১তেই মির্জা হাকিম আশা করছিলেন তিনি আকবরের বিরুদ্ধে স্বউদ্যোগে মধ্য এশিয়দের একজোট করতে পারবেন। তিনি শাহী বাহিনীর মধ্য এশিয় সেনানায়কদের বিদ্রোহ করে তার অবস্থানকে জোরদার করার ডাক দেন [সেই ডাক ব্যর্থ হয়] যাতে তারা কাবুলের শাহী সেনার সঙ্গে জুড়ে হিন্দুস্তানের প্রজাদের কতল করার উদ্যম নেয়। (চলবে)