বলখ আর বাদাকশান
মুঘল হিন্দুস্তানের উত্তরে দুর্ভেদ্য হিন্দুকুশ পর্বত। তারও উত্তরে বলখ আর বাদাকশন অঞ্চল। আবার বলখ আর বাদাকশনের উত্তরের সীমা নির্ধারণ করেছে আমুদরিয়া বা অক্সাস নদী। ইতিহাসে আমরা পড়েছি বাদাকশনের খ্যাতি ছিল রুবি বা পদ্মরাগমণির উৎপাদক অঞ্চল হিসেবে, কিন্তু আজকালের ঐতিহাসিকেরা বলছেন এই তথ্যে মিথের থেকে ফানুস বেশি। বলখের মাটি অনুর্বর, শক্ত এবং ছোটখাটো পাহাড় দিয়ে ঘেরা। বড় বসতির সংখ্যা নেই বললেই চলে, চাষবাসও প্রায় নেই। বলখের তুলনায় বাদাকশানের জমি তুলনামূলকভাবে উর্বর। হিন্দুকুশ থেকে নেমে আসা বেশ কিছু নদী, নালার জলে স্নাত হওয়া এই অঞ্চলের জমিতে বেশ ভাল পরিমান চাষ হয়। আফগানিস্তানের সীমান্ত থেকে শুরু হওয়া বিশাল বিশাল পাহাড়শ্রেণী এবং তার সঙ্গে জোড়া দিগন্তবিস্তৃত উপত্যকা নিয়ে এই অঞ্চল দেশের বাকি অঞ্চল থেকে প্রায় চিরকালই বিচ্ছিন্ন হয়ে থেকেছে। দক্ষিণ থেকে এই এলাকায় বাহিনী নিয়ে আসার একমাত্র রাস্তা হল সরু পাহাড়ি বিপজ্জনক গিরিপথ। সন্তর্পণে পার হতে হয়।
বলখ আর বাদাকশনের মোট বার্ষিক রাজস্ব মাত্র ২৫ লক্ষ টাকা। এই দেশের জনসংখ্যার ভোগ্যপণ্য, জীবন জীবিকা ইত্যাদি অনেক কিছুই বুখারা রাজত্বের ওপর নির্ভর। মুঘল ঐতিহাসিক আবদুল হামিদ লাহোরি মন্তব্য করছেন ‘সর্বশক্তিমানের আশ্রিত এই [মুঘল] সরকারের ৫,০০০ জাট, ৫,০০০ সওয়ার দোয়াস্পা সি আস্পার মনসবের অধিকারী একজন সেনাপতির জন্যেই বরাদ্দ হয় বার্ষিক ২৫ লক্ষ টাকা[অথচ বলখ আর বাদাকশনের মোট বার্ষিক রাজস্ব মাত্র ২৫ লক্ষ টাকা]। [মুঘল আমলে] এই অঞ্চলে যে মনসবদার পাঠানো হয়, সে আদতে [মুঘল প্রশাসনিক থাকবন্দীত্বের] তৃতীয় শ্রেণীর আমলা হিসেবে গণ্য’।
ট্রান্সঅক্সিয়ানার যাযাবর হানাদার
এই অঞ্চলের শাসকদের সম্পদ যেহেতু খুবই কম ছিল, ফলে প্রশাসকের পক্ষে দক্ষিণ থেকে আগত হানাদারদের হাত থেকে অঞ্চলকে রক্ষা করা জরুরি বিষয় ছিল। হিন্দুকুশে নিরাপত্তা বলয়ে ঠিক রেখে তাকে নিয়মিত আক্রমণের সংবাদ পেতে হত। মোঙ্গল আর তুর্কোমানদের মত যাযাবর হানাদার উজবেগীরা আমু দরিয়া পেরিয়ে বলখ বাদাকশন অঞ্চলে আক্রমন করে গাছপালা, চাষবাস গ্রাম-গঞ্জ পুড়িয়ে দিত, চাষীদের দাস হিসেবে ধরে নিয়ে যেত। যাযাবরদের মোকাবেলা করার সমস্যা ছিল, এই হানাদারদের স্থায়ী সম্পদ ছিল না, তাদের দুর্গ ছিল না, তাদের দেশে কোনও নামী এলাকা শহর ছিল না, কোনও বড় নামি বাসস্থান ছিল না যে তাদের দুর্বল স্থানে আক্রমন শানিয়ে পালটা ভয় ধরিয়ে দেওয়া যায় – যে অঞ্চল, বাসস্থান, সম্পদ লক্ষ্য করে আক্রমনকারীরা ট্রান্সঅক্সিয়ানায় হানা দিতে পারে … যাযাবর হানাদারেরা জোর দিত তীব্র গতির ওপরে – আক্রমণ করত ঝটিকা গতিতে এবং মার দিয়ে পিছিয়ে আসত আরও দ্রুত। ফলে শত্রুরা যাযাবর উজবেগীদের লড়াই করার ক্ষমতায় নয়, তাদের গতিশীলতায় পাজলড হয়ে যেত’। যখন যাযাবরেরা দেখত তারা শত্রুর সঙ্গে লড়াই করে পারছে না, তারা পালিয়ে যেত আমু দরিয়া পেরিয়ে তাদের বাড়ির অঞ্চলে, যেখানে তাদের তাড়া করে পৌঁছনো সমস্যার। মুঘল বাহিনী মনে করত উজবেগীদের লড়াই করার স্টাইল অনেকটা মারাঠাদের মত গেরিলা পদ্ধতির, কিন্তু উজবেগীদের ধাক্কা দেওটার প্রাবল্য ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
উজবেগীরা বর্বর। অদ্ভুত তাদের চরিত্র। চির শত্রু ভারতীয় মুঘলদের মত তারা ইসলামে বিশ্বাসী সমাজ। কিন্তু তুর্কোমানেরা, যাদের ভুল করে আলামান বলা হয়, তারা আরও খারাপ। এরা ইসলামেও বিশ্বসী নয়। লুঠ করাই একমাত্র জীবিকা। বসতি আক্রমন করে, কোরাণ পোড়ায়, দয়ামায়া না দেখিয়ে সন্ত আর শিশুদের ফালা ফালা করে ছিঁড়ে ফেলে উৎসব করে। কোথাও নাকী তারা মসজিদের মধ্যে ৪০০ জন ‘বিধর্মী’কে বন্দী করে জীবন্ত জ্বালিয়ে দিয়েছিল। প্রত্যেকটা অঞ্চলে আক্রমণ নামিয়ে এনে একই ধরণের ভীতিপ্রদ অত্যাচার করার জন্যে তারা এশিয়াজোড়া ঘেন্নার পাত্র হয়ে ওঠে। তাদের অভিযানের জন্যে তেমন কিছুই রসদ প্রয়োজন হত না, যে কোনও শুকনো খাবার খেয়ে জীবনধারণ করতে পারত, গভীরতম নদী পথ তারা লম্বা লাইন করে ঘোড়াকে ভাসিয়ে সামনের ঘোড়সওয়ারের লেজের সঙ্গে পিছনের ঘোড়সওয়ারের লাগাম বেঁধে অনায়াসে পেরিয়ে যেত — বহুক্ষণ জলে ভেসে থাকলেও কয়েকটা কাঠি দিয়ে যেহেতু জিন তৈরি হয় তাই সেগুলো জলে ভিজে ক্ষতি হত না, ভিজলেও অসুবিধে না কারণ সে সব শুকোনো করার দরকার পড়ত না। নৌকো দরকার হলে নদীর পাশের খাগড়াকে জড়ো করে তাকে বেঁধে নৌকো বানাত। ঘোড়াও মালিকদের মতই কঠিন কষ্ট সহিষ্ণু, স্তেপের তেতো গাছ [ওয়ার্ম উড] খেয়ে দিনে ১০০ মাইল দৌড়োতে পারে। বুখারা থেকে আমুদরিয়া পেরিয়ে তারা খুরাসান অবদি অবলীলায় চলে আসে, সুসজ্জিত পারসিক ঘোড়সওয়ারেরাও উজবেগীদের গতিবেগের সঙ্গে পেরে ওঠে না।
বলখের রাজা নজর মহম্মদ, ক্ষমতাচ্যুত হলেন
বহু শতাব্দ ধরে বাদাকশানের প্রতিবেশী বলখ, বুখারার নিয়ন্ত্রণে ছিল। অস্ত্রাখান পরিবার, তাদের পরিবারের রক্তের বন্ধনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সদস্যকে এই অঞ্চলের প্রশাসক, সুবাদার নিযুক্ত করত আর সেনার দায়িত্ব দিত আমু দরিয়া অঞ্চলের চোখের পলক না ফেলে অত্যাচার নামাতে পারা কোনও ভীতিপ্রদ সেনাপতিকে। সপ্তদশ শতকের প্রথম থেকে সন্ত, পূণ্যাত্মা বুখারার ইমাম কুলি খান এই অঞ্চল ৩২ বছর ধরে শাসন করে ১৬৪২ থেকে [শাহজাহান যখন মুঘল হিন্দুস্তানের ক্ষমতায়] মদিনায় স্বেচ্ছায় অবসর জীবন যাপন করছেন। বলখ এবং বাদাকশনের শাসক হিসেবে ইমাম কুলি খানের ভাই নাজির মহম্মদ সিংহাসনে আরোহন করেন। দাদার আমলে তিনি বলখের সামন্তে নিযুক্ত ছিলেন। কিন্তু বাদাকশনের প্রশাসক হয়ে সেনা আমলাদের মধ্যে খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা হারান। তা সত্ত্বেও তিনি প্রতিবেশী খোয়ারিজম দখলের পরিকল্পনা করলেন। উজবেগী গোষ্ঠী নেতাদের হাত থেকে সমস্ত ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে নিজের হাতে ক্ষমতা কুক্ষিগত করায় উজবেগীরাও তাকে ঘেন্না করতে শুরু করে। সঙ্গে সঙ্গে তাদের অঞ্চলের ওপরে বিপুল রাজস্বের ভারও চাপিয়ে দিলেন। অথচ সেনাদের মাইনে কমল, খাদ্য বরাদ্দ কমল, রাজস্বমুক্ত জমির নিয়ন্ত্রণ কমল। বুখারার সেনা প্রধানেরা ১৭ এপ্রিল ১৬৪৫-এ তাঁর পুত্র আবদুল আজিজকে সিংহাসনের বসানোর পরিকল্পনা করে। বিভিন্ন এলাকায় যাযাবর হানাদারদের এলাকায় বিদ্রোহ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। সেনার অসন্তোষ সংবাদে হানাদারদেরা বিভিন্ন এলাকায় লুঠতরাজ শুরু করে। এবারে পুত্র বিদ্রোহ করে। অসহায় পিতা বলখ আর বাদাকশনের শাসন নিজের হাতে রেখে পুত্রের হাতে ট্রান্সঅক্সিয়ানা শাসনের ভার ছেড়ে দিলেন।
এই পরিস্থিতিতে শাহজাহান মাত্র ২৫ লক্ষ টাকা বার্ষিক রাজস্ব আদায়ী অঞ্চল বলখ আর বাদাকশন জয়ে ৩০টি বসন্ত না পেরোনো শাহজাদা আওরঙ্গজেবের নেতৃত্বে মুঘল বাহিনী পাঠাবার ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্ত নিলেন। সাম্প্রতিক মুঘল অতীতে কোনও বাহিনীই হিন্দুকুশ পর্বত পেরোয় নি। এই অভিযান বিষয়ে বিশদে আলোচনা করেছেন যদুনাথ সরকার [হিস্ট্রি অব আওরঙ্গজেব], বি পি সাক্সেনা [হিস্ট্রি অব শাহজাহান ইন দেহলি] এবং মুঘল দৌত্য নিয়ে আলোচনা করেছেন আবদুর রহিম[ দ্য মুঘল রিলেশনস উইথ পারসিয়া এন্ড সেন্ট্রাল এশিয়া প্রবন্ধে]। তবে অধিকাংশ ঐতিহাসিক শাহজাহানের বলখ আর বাদাকশন অভিযানের নীতির নিন্দা করেছেন, একে হঠাৎ নেওয়া লোক দেখানো সিদ্ধান্ত হিসেবে অভিহিত করেছেন। কিন্তু আমরা বিস্তৃতভাবে বোঝার চেষ্টা করব বাদাকশনে অভিযান পাঠাবার পিছনে শাহজাহানের ভাবনাটি এম আতহার আলির দ্য অবোজেক্টিভ বিহাইন্ড মুঘল এক্সপিডিশন অব বলখ এন্ড বাদাকশন ১৬৪৬-৪৭ প্রবন্ধ অনুসরণ করে।
হিন্দুকুশের ভূ-আঞ্চলিক রণনৈতিক ভূমিকা মুঘল আমলে বারবার স্বীকৃত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে আমরা মুঘল দরবারি ঐতিহাসিক তাত্ত্বিক আবুল ফজলের ভাবনা বোঝার চেষ্টা করছি। তিনি লিখছেন ‘কাবুল অঞ্চল মূলত পাহাড় দিয়ে এক দিকে ঘেরা। ফলে শত্রুপক্ষের হঠাৎ আক্রমন মোকাবিলা করা খুব সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। কাবুল আর বাদাকশনকে ভাগ করেছে হিন্দুকুশ পর্বত। তুরাণের মানুষেরা এই অঞ্চলে যাতায়াতের জন্যে মোট ৭ খানা রাস্তা ব্যবহার করে। তিনটে পাঞ্জশির উপত্যকায়, যার সব থেকে উঁচু রাস্তাটা খাওয়াক গিরিপথ হয়ে যায়, সব থেকে নিচেরটি তুল হয়ে যায়। পরের নিচু এলাকাটা বাজারক হয়ে গিয়েছে। এদের মধ্যে সব থেকে ভাল হল তুলের রাস্তা – সমস্যাহীন। কিন্তু বহুত ঘুরপথ — প্রচুর সময় লাগে। সব থেকে উঁচুতে হফত বাচ্চা বা সাত ছোট রাস্তা। আন্দেরাব থেকে মূল গিরিপথ থেকে দুটো রাস্তা মিলে হফত বাচ্চা হয়ে গিয়েছে। এই রাস্তা খুবই শ্রমসাধ্য। পোরেয়ান থেকে তিনটে রাস্তা ঘোরবন্দ উপত্যকা অবদি গিয়েছে। ইয়াঙ্গি-ইয়ুলি [নতুন রাস্তা] গিরিপথের পাশ দিয়ে রাস্তাটা গিয়েছে ওয়ালিয়ান এবং কিঞ্জনে; আরেকটা কিপচাক গিরিপথ হয়ে কিছুটা উৎরাইওয়ালা রাস্তা আর তৃতীয়টা শিবারতু হয়ে। গ্রীষ্মে নদীর জল ফুলে ওঠে। তাই তারা এই গিরিপথ হয়ে বামিয়ান আর তালিকানে নেমে আসে। কিন্তু শীতের সময় আবডোরা রাস্তাই খোলা থাকে, অন্য সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়’।
আধুনিককালে গেটস অব ইন্ডিয়ার লেখক হোল্ডিশ হিন্দুকুশকে অভেদ্য নিরাত্তার বেষ্টনী হিসেবে গণ্য করছেন — ‘আমাদের মনে হয় আগামী দিনেও আত্মরক্ষার অন্যতম হাতিয়ার হিন্দুকুশ লঙ্ঘন করার সুযোগ খুবই কম। অতীতেও সে নিরাপত্তা দেওয়ার কাজ করেছে। মুঘল হিন্দুস্তানে অভিযান করতে হলে একমাত্র বাদাকশন অঞ্চলে বহু বছরের চেষ্টায় বিশাল বাহিনী তৈরি করে আর পূর্ব সতর্কতা নিয়ে হিন্দুকুশ পাহাড় লঙ্ঘন করা সম্ভব’। (চলবে)
সমৃদ্ধ হলাম