মুরাদের ১৬৪৫-৪৬-এর অভিযান
ক্ষমতায় আসার পর থেকে মধ্য এশিয়া দখলে শাহজাহানের অতিউৎসাহ সত্ত্বেও বলখ-বাদাকশন অভিযান করার প্রথম নির্দেশ কিন্তু তাঁর দরবার থেকে জারি হয় নি। বলখে মুঘল আক্রমন সূচনা করলেন ঘোরবন্দের মুঘল থানেদার। তিনি আমীরউলউমারার থেকে বিধিবদ্ধ অনুমতি নিয়ে বড় বাহিনী ছাড়াই ১৬৪৫-এর জুন মাসে কামরাদের দুর্গ দখল নিলেন। বেশিদিন কেল্লার নিয়ন্ত্রণ মুঘলেরা হাতে রাখতে পারে নি, বিপক্ষের আক্রমণের মুখে তাকে সেই ঘাঁটি ছেড়ে পিছিয়ে আসতে হয়। শাহজাহান তাঁর মাঝারি আমলার কামরাদ কেল্লা দখল নেওয়া বা চাপের মুখে কেল্লা ছেড়ে পিছিয়ে আসার ঘটনার সমর্থন বা নিন্দে কোনও কিছুই চাপিয়ে দেন নি। সম্রাটের আচরণ স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয় তিনি নিজে এই অঞ্চল আক্রমণে বেশ উৎসাহী ছিলেন। ছোট আমলার টেস্ট কেসটা তাকে বিশদ পরিকল্পনা সাজানোর সুযোগ করে দিল। বলখ-কান্দাহার অঞ্চলের রাজনৈতিক ঘটনাক্রমের দরুন এই অঞ্চলে অভিযানের সময়-সারণি নিয়ে মুঘল প্রশাসনের উচ্চস্তরে বহু কাল ধরেই চিন্তাভাবনা চলছিল। কাবুল থেকে মুঘল অগ্রগামী বাহিনীকে হিন্দুকুশ পেরিয়ে রাজনৈতিক অবস্থা দেখে আসা এবং অভিযান সংশ্লিষ্ট এলাকা বিষয়য়ে বিশদ তথ্য জোগাড় করার নির্দেশ দিয়ে পাঠানো হল।
সেই সমীক্ষার ফল হাতে নিয়ে ১৬৪৫-এর অক্টোবরে ২২ বছরের শাহজাদা মুরাদ বখশ ৫০ হাজার সেনা বাহিনী নিয়ে হিন্দুকুশ টপকানোর প্রস্তুতি সারলেন। মুরাদের প্রধান উপদেষ্টা আমীরউলউমারা আলি মর্দান খান। তিনি হাতের তালুর মত এই এলাকা চেনেন। তিনি কান্দাহার শহর মুঘলদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। পথে শাহজাদাকে প্রায় কোনও প্রতিরোধের মুখে পড়তে হল না। ২২ জুন কুন্দুজ কেল্লা দখলে আসে। ১০ দিন পরে বলখে শাহী বাহিনী প্রবেশ করে কোনও রকম প্রতিরোধ ছাড়াই। নাজির মহম্মদ খানকে বলা হয়েছিল যে যদি বন্ধুভাবাপন্ন হয়, তাহলে তাকেই মুঘলেরা সিংহাসনে দেখতে চায়। কিন্তু মুঘল বাহিনী ঢোকার আগেই সে ভয়ে সেই এলাকা থেকে চম্পট দিয়ে পারস্যে পালিয়ে যায়। আসালত খান আর বাহাদুর খানকে তার পিছনে পাঠানো হলেও তারা তাঁকে ধরতে সফল হল না।
দেশটা দখল হল একটাও গুলি না ছুঁড়ে। কিন্তু সমস্যা এক মুঘল শিবির থেকে। শাহজাদা মুরাদের বিদেশ বাস অসহ্য মনে হচ্ছিল। ২২ বছরের সদ্য যৌবনে প্রবেশ করা মুরাদ মনে করছিলেন, তিনি তাঁর ওপরে চাপিয়ে দেওয়া সমস্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। আর বেশি দিন বিদেশে থাকতে রাজি নন। সম্রাটকে পাঠানো প্রথম চিঠিতেই মুরাদ দাবি করলেন তাকে এই দূর দেশ থেকে তুলে নেওয়া হোক — সম্রাট রাজি হলেন না। বার বার অনুরোধ করা সত্ত্বেও সম্রাট তার প্রস্তাব বাতিল করলেন। এর পরোক্ষ প্রভাব পড়ল সেনাবাহিনীতে। দলের নেতা যেখানে বিদেশ বিভুঁইতে থাকতে গররাজি সেখানে নেতার ছোট মেজো বড় সেনাপতি, সেনা অনুগামীও বিদেশ বিভূঁইতে থাকতে নিম রাজি হল। মুরাদ ঠিক করলেন সম্রাটের নির্দেশ ছাড়াই তিনি এলাকা ছেড়ে চলে যাবেন। সম্রাট এই বিপজ্জনক সংবাদ পেয়ে উজির শাদুল্লা খানকে বিষয়টা মিটমাট করার জন্যে পাঠালেন। প্রধানমন্ত্রী মুরাদকে বোঝাবার চেষ্টা করলেও, বোঝা গেল মুরাদ কোনও যুক্তিই বুঝতে রাজি নয়। সম্রাটের বারণ সত্ত্বেও সে বলখ থেকে কাবুলের উদ্দেশ্যে রওনা হল। শাদুল্লা খান শাহজাদার জায়গায় বলখে নতুন সেনানায়ক নিযুক্ত হল। বলখের প্রধান করা হল যৌথভাবে আসালত খান আর শাদুল্লা খানকে। বাদাকশনের দায়িত্ব দেওয়া হল কুলিচ খানের ওপর। প্রধানমন্ত্রী কাজটা ২২ দিনের মধ্যে সেরে রাজধানীতে ফিরলেন। শাস্তিস্বরূপ মুরাদের মনসব কেড়ে নেওয়া হল, দরবারে আসা নিষিদ্ধ হল।
মুঘল ছাউনি এখন নিরাপত্তাহীন, নেতৃত্বহীন — উজবেগীদের আক্রমণের আশংকার মুখে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছে। সকলেই শীতের শেষে কোনও এক শাহী রক্তের প্রধান নেতৃত্বের জন্যে হাপিত্যেস করে তাকিয়ে আছে। মুঘল সেনাপতিরা বলখের রাজনৈতিক অবস্থা আন্দাজ করে শাহী কর্তৃপক্ষ ১৬৪৭-এর বসন্তে নতুন করে বলখ অভিযানের পরিকল্পনা করলেন। সুজা আর আওরঙ্গজবকে সুবা থেকে ডাকিয়ে আনা হল। বিপুল পরিমান অর্থ জড়ো করা হল আফগানিস্তান অভিযানের উদ্দেশ্যে। পেশোয়ার থেকে কাবুল পর্যন্ত নানা সেন ছাউনিতে যুদ্ধে যাওয়ার জন্যে সাজোসাজো রব। মুঘল বাহিনী বলখ অভিযানে যাওয়ার জন্যে তৈরি।
১৬৪৭-এর আওরঙ্গজেবের অভিযান
বলখ অভিযানে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে যতরকম সমস্যা খাড়া করা যায়, সম্রাট সেটা সেই দফার মুঘল অভিযানজুড়ে যেন বিরোধী পক্ষ নিয়মিত আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করে গেলেন। ছোটবেলা থেকেই শিরদাঁড়া সোজা আওরঙ্গজেব শাহজাহানের চক্ষুশূল হয়ে ছিলেন — আহকম-ই-আলমগিরির বেশ কিছু গল্পে আমরা দেখিয়েছি কীভাবে শাহজাদাদের বেড়ে ওঠার সময় শাহজাহান ক্রমশ বেশি বেশি করে দারার পক্ষ নিচ্ছেন। প্রথম এবং তৃতীয় ভায়ের মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াই চূড়ান্ত আকার ধারণ করবে জাহানারার পুড়ে যাওয়ার সময়। দাদা, দারার সঙ্গে আওরঙ্গজেবের ছোটবেলার ঠাণ্ডা যুদ্ধ প্রকাশ্যে এল আগরায় ৪৫ লক্ষ টাকা ব্যয়ে যমুনার তীরে দারার নতুন প্রাসাদ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সম্রাট আর তিন ছেলের উপস্থিতিতে। তিনজনের উপস্থিতিতে সম্রাট আওরঙ্গজেবের অসদাচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। সম্রাটকে তসলিম না করেই তিনি মুরাদের প্রাসাদ ছেড়ে যান। সম্রাটের সমস্ত রোষ গিয়ে পড়ল দক্ষিণের সুবাদার সেজো ছেলে আওরঙ্গজেবের কেরিয়ারের ওপরে। প্রকাশ্য দরবারে আওরঙ্গজেবের সমস্ত পদ, সুযোগ সুবিধে সম্রাট কেড়ে নিলেন। সাত মাস পরে নিজের ভুল বুঝে সম্রাট জাহানারাকে পাঠিয়ে তাঁকে পুনর্বাসন দেবেন। এই পর্বটা আমরা আগেই বিশদে আলোচনা করেছি। এখানে শুধু উল্লেখ করলাম পাঠককে শাহী পরিবারের মধ্যে টেনশন কীভাবে ভবিষ্যতে সাম্রাজ্যের কাজে প্রভাব ফেলবে সেটা বোঝাবার জন্যে।
৪ সেপ্টেম্বর ১৬৪৬-এ গুজরাটের সুবা দরবারে সুবাদার আওরঙ্গজেব, নতুন পদে যোগ দেওয়ার উদ্দেশ্যে সম্রাটের তলবি চিঠি পেলেন। শাহী নির্দেশ, মালোয়ার সুবাদার, শাহজাদাদের মামা শায়েস্তা খানকে গুজরাটের সুবাদারির দায়িত্ব দিয়ে যত শীঘ্র সম্ভব দরবারে পৌঁছনোর। ২০ জানুয়ারি ১৬৪৭ আওঙ্গজেব দুই পুত্র নিয়ে লাহোরে সম্রাটের সামনে দরবারে পৌঁছে তসলিম দিলেন। পরের দিন আওরঙ্গজেবকে বলখ আর বাদাকশানের সুবাদার পদে নিয়োগ করা হল। অভিযানের খরচ বরাদ্দ হল ৫০ লক্ষ টাকা। ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি ৫ লক্ষ টাকা পেশকাশ নিয়ে পেশোয়ারের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। বলখ রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে আওরঙ্গজেব কাবুলে পৌঁছলেন ৩ এপ্রিল ১৬৪৭। চার দিন থেকে সেনা সজ্জা করে বাহিনী নিয়ে বলখের উদ্দেশ্যে রওনা হলেন। তখন বলখ-কান্দাহারের সুবাদার শাহজাদা আওরঙ্গজেরবের বয়স মাত্র ৩০। তাঁর প্রধান উপদেষ্টা আর ডান হাত হিসেবে রইলেন আলি মরদান খান। এই কাজে এই বিষয়ে তাঁর থেকে যোগ্য রাজপুরুষ আর মুঘল হিন্দুস্তানে অন্তত সে সময়ে আর কেউ ছিল না।
এখানে আরেকটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, বলখ অভিযানের জন্যে কিন্তু দুই পুত্র গুজরাটের সুবাদার আওরঙ্গজেব আর বাঙলার সুবাদার শাহ সুজাকে ডাকিয়ে আনা। কিন্তু বলখ অভিযানের দায়িত্ব পেলেন যোগ্য আওরঙ্গজেব। সম্রাট তাঁর হাতে বাহিনীর লাগাম তুলে দিলেন। তলব করিয়ে এনেও সুজাকে অভিযানে অংশ নেওয়ানো তো দূরস্থান, তাকে দরবারের পক্ষ থেকে পাত্তাই দেওয়া হল না — বসিয়ে রাখা হল। সম্রাট-দারা-জাহানারা জোটের প্রতি সুজা মনে মনে ক্ষুব্ধ হলেন। এই সুযোগে তিন ভাইয়ের সম্রাট-দারা-জাহানারা জোট বিরোধী একটা অলিখিত একটা জোট তৈরি হল। আরও ১০ বছর পরে সিংহাসনের যুদ্ধে তিন ভায়ের জোট দারাকে কোণঠাসা করবে।
প্রথম থেকেই বলখ অভিযানে সম্রাট শাহজাহান আওরঙ্গজেবের হাত বেঁধে রেখেছিলেন। মুরাদ বলখ জয়ে সম্রাট ৫০ হাজার সেনা পেয়েছিলেন। মুরাদ চলে আসার পরে বড় বাহিনী সেখান থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল। সেই অঞ্চলে বাকি বাহিনী ছড়িয়েছিটিয়ে শিবির করে ছিল। কিছু বাহিনী আফগানিস্তানের মধ্যে দিয়ে কাবুলে যোগাযোগের রাস্তা পরিষ্কার রাখার জন্যে নিযুক্ত ছিল। বড় সেনাপতিদের নেতৃত্বে কিছু বাহিনী ছিল পূর্বের জেলা তালিকান আর কুন্দুজ, উত্তর-পূর্বের রুস্তাক, আমুদরিয়ার বলখ আর তারমিজে, বলখের উত্তরে, দক্ষিণ পশ্চিমের মনিমানায় আর উত্তর-পশ্চিমের আন্ধখুয়িতে। দেশের নিয়ন্ত্রণ যাতে হাতের বাইরে বেরিয়ে না যায়, ৩০ বছরের প্রধান সেনানায়ক আওরঙ্গজেব বাহিনীকে বিভিন্ন সামরিক থানা তৈরি করে মোতায়েন রেখেছিলেন। ফলে তার হাতে যুদ্ধ করার মত সেনার সংখ্যা অনেক কমে গেল। যাত্রার আগেই আওরঙ্গজেবকে আরও একটা খুচরো, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমাধানহীন সমস্যার মুখোমুখি হতে হল। আওরঙ্গজেবের অভিযানে যোগ দেওয়ার নির্দেশ পাওয়া কিছু আমীর, বাহিনী নিয়ে [কার নির্দেশে জানা যায় না, হয়ত দারার হাত ছিল] আফগানিস্তান ছাড়লেনই না। সম্রাটের বরাদ্দ বাহিনীর পুরো সংখ্যা তিনি বলখ অভিযানে সঙ্গে নিতে পারলেন না।
ফলে আওরঙ্গজেব বাস্তবে হাতে পেলেন মুরাদের জন্যে বরাদ্দ মোট সেনার অর্ধেক ২৫,০০০ সেনা। তবে কাফিখানের হিসেবে আওরঙ্গজেব পেয়েছিলেন ৩৫,০০০ সেনা আর উজবেগীদের সংখ্যা ছিল ১,২০,০০০। অর্থাৎ মুঘলদের বাহিনীর সেনা সংখ্যা কাফিখানের দেওয়া অঙ্কে আরও ১০,০০০ বাড়ালেও, মুঘল বাহিনীর বিপক্ষের উজবেগী সেনাবাহিনীর ওজন তিনগুণেরও বেশি। অর্থাৎ একজন মুঘল সেনাকে মুখোমুখি হতে হবে তিনজন উজবেগীর। যদিও মুঘল-উজবেগীরা বলখে হাতে হাতে মুখোমুখি লড়াই করেন নি, মূলত মাস্কেটওয়ালা বন্দুকচিদের মধ্যে লড়াই হয়েছিল, কিন্তু উজবেগীদের ‘কসাক রণনীতি’ মুঘলদের যুদ্ধক্ষেত্রে মাত করেছে। তাছাড়া সামরিক বাহিনীর সংখাধিক্য সে সময়ের যুদ্ধের গতিবিধিতে বিপুল প্রভাব ফেলত। উজবেগীরা স্বভাবতই মুঘলদের তুলনায় অনেক বেশি কষ্ট সহিষ্ণু। তাই তারা মুঘলদের তুলনায় যুদ্ধে ১০ গুণ বেশি ক্ষতি সহ্য করার যোগ্য মানসিকতার বাহিনী হিসেবে তৈরি হয়েছিল। এই বিশাল বাহিনীর বিপরীতে মুঘলেরা যে সহজে জিততে পারবে না সেটা তারা জানত। তাছাড়া আওরঙ্গজেবের আগে বাহিনী নিয়ে বলখে আসা মুরাদের অযোগ্য নেতৃত্বের জন্যে বাহিনী নিয়ন্ত্রণ না করতে পারায় বেশ কিছু বেপরোয়া মুঘল সেনাপতি স্থানীয় অঞ্চলে লুঠ চালায় এবং জনগণের সঙ্গে দুর্বিনীত আচরণ করে। ফলে বলখের মানুষজনের মধ্যে তখন তীব্র মুঘল বিরোধী মনোভাব ছড়িয়ে গিয়েছে।
তাছাড়া সেনাবাহিনীর মধ্যে কামান সামলানো শাহজাদার যোগ্যতা নিয়ে দ্বিধা তো ছিলই। আওরঙ্গজেব এখনও কী দেশের মাটির বাইরে সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রণের জন্যে সেই যোগ্যতা অর্জন করেছেন? বিশেষ করে যেখানে উজবেগীদের মত ভয়ঙ্কর বিশাল বাহিনীর মুখোমুখি হতে যাচ্ছে মুঘল বাহিনী। বলখে কী হবে মুঘল বাহিনীর ভাগ্য? তবে অনেকেরই আশা, ভরসাযোগ্য আলি মর্দান খান সঙ্গে আছেন। (চলবে)