আলিমর্দান খান
আমাদের মনে হয়েছে মুঘলদের বলখ আক্রমণ প্রসঙ্গে মুঘল উচ্চপদস্থ আমলা পারস্যের কুর্দ সম্প্রদায়ের জিগ গোষ্ঠীর আমীর আলিমর্দান খানের জীবন এবং কৃতি বিষয়ে সংক্ষেপে পাঠকের কাছে তুলে ধরা দরকার। শাহজাহানের শাসনকালজুড়ে মুঘল সাম্রাজ্যের মধ্য এশিয়া নীতি নির্ধারণে আলিমর্দান খানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উপনিবেশিক ইতিহাসে খুব বেশি আলোচিত হয় নি। আলিমর্দান খানের মুঘল রাজত্বে অভিবাসিত হয়ে আসা নিয়ে বহু মিথ তৈরি হয়েছে। সেই মিথটা ভাঙা দরকার। স্টিফেন ফ্রেডরিক ডেলের শাহজাহানাবাদ, হস গোমানসের মুঘল ওয়ারফেয়ার বা শাহজাহানের যুগের ঐতিহাসিক আবদুল হামিদ খান লাহোরি সূত্রে জেনেছি মুঘল আমলের অর্থনৈতিক বিকাশের ফলে পশ্চিম এশিয়া, মধ্য এশিয়া, ট্রান্সঅক্সিয়ানা, কাজভিন এলাকার আলিমর্দান খানের মত বহু আমীর অভিজাত আরও বেশি রোজগার, আরও বেশি ক্ষমতা পাওয়ার আশায় বা শাসকদের জীবনঘাতী হামলার আশংকায় মুঘল হিন্দুস্তানে অভিবাসিত হয়ে আসেন। এই আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা আলিমর্দান খানের জীবন এবং কৃতি বিষয়ে দু’চার কথা আলোচনা করব।
আলিমর্দান খান ১৬২৪-এ প্রয়াত গঞ্জআলি খানের ছেলে। প্রথম জীবনে পারসিক শাসক প্রথম শাহ আব্বাস এবং শাহ সাফির উচ্চপদস্থ কর্মচারী। গঞ্জআলি খান ছিলেন সাফাভি রাজত্বে প্রথম শাহ আব্বাসের (১৫৮৮-১৬২৯) সময়ের কেরমান, সিস্তান আর কান্দাহার প্রদেশের সুবাদার। প্রথম শাহ আব্বাস তাঁকে সম্মান জানিয়ে ‘আরজুমন্দ বাবাই’ আকাঙ্ক্ষিত বাবা নামে সম্বোধন করতেন। কান্দাহার ছিল মুঘল এবং সাফাভি, দুই রাজত্বের জন্যে রণনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ শহর। ইসকান্দার বেগের তারিখইআলমআরাইআব্বাসি [Tārīk̲h̲-i ʿĀlam-ārā-yi ʿAbbāsī (Alamara-i Abbasi)] সূত্রে জানছি শাহ আব্বাস তাঁকে কান্দাহার সুবাটি সুরক্ষার দায়িত্ব দেন। কান্দাহারে তিনি প্রায়াত হন ছ-বছর পরে ১৬২৪এ। আলিমর্দান খানের বাল্য বয়সের খুব বেশি তথ্য পাই না, কিন্তু বাবার মৃত্যুর পর সাফাভি সম্রাট যে কান্দাহারে তাঁকে ১৬২৪এ তাঁর বাবার পদে নিযুক্ত করছেন সম্মানিত বাবাইয়াতানি [মহম্মদ আফজল খান বলছেন বাবাইশানি] (দ্বিতীয় বাবা) নামে, সেটা আমরা ইসকান্দারের তারিখ-ই-আলমআরা-ই-আব্বাসি সূত্রে জানছি। ১৬২৫ এ তাহমাস্প কুলি খান তাঁকে কারমান প্রদেশে শাসক নিযুক্ত করেন।

আলিমর্দান খান
মুঘল আর পারসিক ইতিহাসে আলিমর্দান খানের নাম আবার উদয় হচ্ছে ১৬৩৮এ কান্দাহার প্রদেশ মুঘল শাসক শাহজাহানের হাতে তুলে দেওয়ার ঘটনায়। তিনি কেন প্রদেশটা মুঘলদের হাতে তুলে দিলেন, সে বিষয়ে দুটো মত আছে, একটা তাঁর ওপরে সাফাভি সুলতানদের হামলার আশংকা আর দ্বিতীয়টা মুঘল হিন্দুস্তানের আর্থিক স্বচ্ছলতা আর এশিয়াজোড়া মুঘল সাম্রাজ্যের সুনাম। তবে পারস্যে গঞ্জ আলি খানের পরিবারের সুনাম এবং শাহ সফির প্রথম ৮ বছরের রাজত্বকালে আলিমর্দানের সঙ্গে মুঘল যোগের ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। আমাদের মনে হয় প্রথম ধারণাটিই সত্য, তবে মুঘল স্বচ্ছলতাও এই সিদ্ধান্তে বড় ফ্যাক্টর হলেও হতে পারে। আবদুল হামিদ লাহোরি বলছেন মুঘল দরবারে প্রথম পৌঁছে তিনি নিজেকে শাহের বফাদার কর্মচারী হিসেবে উপস্থিত করেছেন। আমাদের মাথায় রাখতে হবে আলিমর্দান খানের নিজের এবং পরিবার জীবন নিয়ে আশংকার একটা কারণ ছিল শাহ সফি নিজের পরিবারের বহু সদস্য এবং প্রায় সব প্রদেশের উজির, বড় আমলা, সেনাপতিকে হত্যা করান। আলিমর্দান মুঘল রাজত্বে চলে আসার কিছু আগে, শাহ আব্বাস এবং শাহ সফি আমলের উজির এবং আলিমর্দানের সম্বন্ধী মির্জা তালেব ওরদুবাদী আর তার পরিবারকে সুলতান সমূলে নিকেশ করেন। এমনও হতে পারি আলিমর্দানের সঙ্গে ওরদুবাদীর পারিবারিক যোগের জন্যে তাঁর জীবন সংশয় হওয়া বিচিত্র নয়। হয়ত সাফাভি সাম্রাজ্যের নতুন উজির মির্জা তাকি মাজান্দারানি, মির্জা তালেব ওরদুবাদীর প্রতিপক্ষ হিসেবে ওরদুবাদীর আত্মীয় আলিমর্দানকে হত্যা করার পরিকল্পনা করছিলেন।
১৬৩২এ আলিমর্দান শাহজাহানকে চিঠিতে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতি তাঁর নিবেদন জানিয়ে সাফাভি রাজত্বে প্রাণ সংশয়ের সম্ভাবনার বিষয় উল্লেখ করেন। সেই বছরেই শাহজাহানের কান্দাহার দখল পরিকল্পনার অন্যতম কারণ ছিল হয়ত আলিমর্দানের উল্লিখিত চিঠিটি। কাবুলের প্রশাসক সৈয়দ খানকে অবিলম্বে আলিমর্দানের দরবারে দূত পাঠাবার নির্দেশ দিলেন সম্রাট। দূতের মাধ্যমে আলিমর্দান জানালেন, পারসিকেরা কান্দাহারে সামরিক অভিযান পাঠাতে পারে। মুঘলেরা যদি পারসিকদের আক্রমণের আগে কান্দাহারে বাহিনী পাঠায় তাহলে তার পক্ষে কান্দাহার মুঘলদের হাতে তুলে দেওয়া সহজ হবে। তারপরেও তিনি কিন্তু কান্দাহার হাত বদল নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। তিনি শাহ সফিকে সম্ভাব্য মুঘল আক্রমণ বিষয়ে সতর্ক করে এবং আরও বড় সামরিক সাহায্য চেয়ে চিঠি লিখলেন, কান্দাহার কেল্লার মেরামতের উদ্যোগ নিলেন। শাহ সফি মুঘল আক্রমণ নিয়ে আলি মর্দানের সম্ভাবনাকে খুব একটা গুরুত্ব দিলেন না বরং তাঁর উদ্যোগে কেল্লা মজবুত করা নিয়ে সন্দিহান হলেন।

শাহজানের দরবারে আলিমর্দান
ঐতিহাসিক আবদুল হামিদ লাহোরি জানাচ্ছেন পারস্যের সুলতান আলিমর্দানের বড় ছেলে আলি বেগকে দরবারে জামিন থাকার জন্যে তলব করলেন, একই সঙ্গে আলিমর্দানকে সাহায্য করার ছলে তাঁকে হত্যা বা বন্দী করতে পারসিক সাম্রাজ্যের প্রধান সেনাপতি সিয়াভস কুলার আগাসিকে (Siāvoš Qollār Āḡāsi) কান্দাহারে সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিলেন। যে মুহূর্তে আলিমর্দান শাহজাহানের কান্দাহার অভিযানের পরিকল্পনা অবগত হলেন সঙ্গে সঙ্গে তিনি সময় নষ্ট না করে তাঁর পূর্ব পরিচিত সম্রাট শাহজাহানের প্রতিনিধি সৈয়দ খান এবং গজনী আর মুলতানের সুবাদারকে তাঁকে সামরিক সাহায্য পাঠাবার চিঠি লিখলেন। চতুর্থ চিঠিটা তিনি শাহজাহানকে পাঠালেন। আলিমর্দানের পাশে দাঁড়াতে মুঘলেরা কান্দাহারে চারটি বাহিনী পাঠাল। গজনীর সুবাদার প্রথম কান্দাহারে পৌঁছলে সম্রাট শাহজাহানের নামে খুতবা পড়া হল, সম্রাটের নামে মুদ্রা ছাপানো হল। সম্রাটের নির্দেশে সৈয়দ খান আলিমর্দান খানকে ১ লক্ষ টাকা পেশকাশ দিলেন এবং তাকে কাবুল হয়ে লাহোরে নিয়ে এলেন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ফরমান জারি করে প্রচুর উপহার দিয়ে মনসবদার পদে নিয়োগ করা হল। কান্দাহারে মুঘল বাহিনী রাখা হল সাফাভিদের সম্ভাব্য আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়ার জন্যে। ১৬৩৮-এর ১৯ মার্চ তিনি মুঘল দরবারে ৫০০০ (কম্বু বলছেন ৬০০০) মনসবদার হলেন। পরে মনসব আরও বেড়ে ৭০০০ হবে, বার্ষিক প্রাপ্য হবে বলখ কান্দাহারের বার্ষিক রাজস্বর ৫ লক্ষ টাকা বেশি ৩০ লক্ষ টাকা [১২ কোটি দাম; তাঁর থেকে বেশি পেতেন আসফ খান]। ১৫ জানুয়ারি আমীরউলউমারা, আমীরদেরআমীর আর ইয়ার-ই-বফাদার উপাধি পাবেন।
শাহজাহান আলিমর্দানকে খুবই পছন্দ করতেন। তাঁর প্রাসাদে সম্রাট অন্তত ৫বার এসেছেন। ১৬৪৬এ কাবুল থেকে বলখ যাওয়ার পথে সম্রাট আলিমর্দানের প্রাসাদে রাত কাটান। প্রথমে কাশ্মীরের সুবাদার, পরে লাহোর তারপরে আমৃত্যু তিনি রণনৈতিকভাবে কাবুলের সুবাদার নিযুক্ত হবেন। এই তিন এলাকায় রণনৈতিকভাবে মুঘলদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কাবুল শিবির থেকে মধ্য এশিয়ার উজবেগীদের বা সাফাভি রাজত্বের বিরুদ্ধে সেনা পাঠানো হত বা মধ্য এশিয়া থেকে মুঘল হিন্দুস্তান রক্ষায় সেনা রাখা হত। ফলে এই অঞ্চল বিষয়ে তাঁকে পরামর্শ দেওয়ার দায় শাহজাহান প্রাথমিকভাবে আলিমর্দানের ওপরেই ন্যস্ত করেছিলেন। ১৬৪৯-এ কাশ্মীরকে আলিমর্দানের জায়গির ঘোষণা করা হয়। ১৬৫৭-য় দক্ষিণ এশিয়াজোড়া যে মহামারী দেখা দিলে [যার ফলে স্বয়ং সম্রাটও অসুস্থ হবেন] আলিমর্দান মারা যাবেন ১৬ এপ্রিল। তাঁর মরদেহ লাহোরে নিয়ে আসবেন পুত্র ইব্রাহিম খান। তাঁকে আলিমর্দানের মায়ের সমাধির পাশে গোর দেওয়া হবে। তাঁর মৃত্যুর পর, তার সঞ্চয়ের এক কোটি টাকা কেন্দ্রীয় খাজাঞ্চিতে নেওয়া হবে। পরে ৬০ লক্ষ টাকা ফেরত দেওয়া হবে, তার মধ্যে ৩০ লক্ষ টাকা পাবেন ইব্রাহিম খান আর বাকি ২০ লক্ষ অন্য তিন পুত্রের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়।

পারস্যের কুর্দদের জিগ গোষ্ঠীর আমীর আলিমর্দান খানের বংশলতা মহম্মদ আফজল খানের আলিমর্দান খানের জীবনী প্রবন্ধ অবলম্বনে।
১৬৩৮-এ মুঘল প্রশাসনে যোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আলিমর্দান তার বৃহত্তর পরিবার পরিজন নিয়ে মুঘল হিন্দুস্তানে চলে আসবেন। ইরানে আর গঞ্জআলি খান পরিবারের নামোনিশান রইল না। কয়েক স্তবক আগেই আমরা তার বড় ছেলে আলি বেগের নাম উল্লেখ করেছি সাফাভি দরবারে তলব সূত্রে। Chardinএর Voyages du chevalier Chardin en Perse, et autres lieux de l’ (পারস্যে শেভালিয়ার শার্দিনের ভ্রমণ এবং প্রাচ্যের অন্যান্য স্থান…) সূত্রে জানছি তিনি ইসফাহানে আলি বেগের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। শাহজাহান তাঁর মুক্তির জন্যে চিঠি লিখলেও তাঁর বিষয়ে পারসিক বা মুঘল নথি নীরব। আরেক পুত্র ইব্রাহিম বেগকে শাহজাহান ইব্রাহিম খান উপাধি দেন এবং আওরঙ্গজেবের আমলে বাঙলার সুবাদার নিযুক্ত হন [তাঁর সময়ে মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বিফল হয়ে বাঙলা থেকে বহিষ্কার হওয়া ব্রিটিশেরা নতুন করে ব্যবসার সুযোগ পায়। ১৬৯৫-১৬৯৬-এ চন্দ্রকোনা জমিদার শোভা সিংহের বিদ্রোহ দমনে ব্যর্থ হওয়ায় তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয় এবং আওরঙ্গজেবের নাতি আজিমুশ্বান সুবাদার হবেন এবং বাংলায় নবাবি আমল তৈরির দরজা খুলে যাবে আজিমুশ্বানের কুশাসনের প্রভাবে]। অন্য পুত্র করমুল্লা শাহজাহানের প্রশাসনে কাজ করেছেন। চতুর্থ পুত্র আবদুল্লা বেগ নিজের নাম নিলেন ঠাকুর্দার নামে গঞ্জআলি বেগ। অন্য দুই পুত্র ইশাক বেগ আর ইসলামিল বেগ আওরঙ্গজেবের প্রশাসনে কাজ করেছেন। (চলবে)
সূত্র এনসাইক্লোপিডিয়া ইরানিকা