আলিমর্দান খান
কিন্তু অকম্প হৃদয় আওরঙ্গজেব বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট করলেন না। ভাগ্য তাঁকে বিখ্যাত হওয়ার সমস্ত রসদ দিয়ে অতুলনীয় আন্তর্জাতিক মঞ্চে তুলে দিয়েছে — তাঁর নেতৃত্ব যোগ্যতা, তাঁর সামরিক দক্ষতা, প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যমের ঝাঁকি প্রকাশ্যে দেখানোর সুযোগ তৈরি করেছে বিশ্বকে এবং মুঘল হিন্দুস্তানের তার বন্ধু , বিপক্ষ আর যারা তাঁর দক্ষতার প্রতি কিছুটা হলেও সন্দিহান ছিলেন, তাদের সামনে। তিনি ঠাণ্ডা মাথায় সেই চ্যালেঞ্জ দুহাতে আঁকড়ে ধরলেন। এর আগের বছরের অভিযানে ভাই শাহজাদা মুরাদের তুলনায়, সম্রাট আওরঙ্গজেবকে অর্ধেক পরিমাণ বাহিনী দিলেও সেইটুকু বাহিনীকেও তিনি সদর্থকভাবে ব্যবহার করতে তৈরি হলেন। ৩০ বছরের শাহজাদা আওরঙ্গজেব পোড় খাওয়া সেনাপতির মত ছোট শাহী বাহিনী নিয়ে আন্তর্জাতিক সামরিক পভিযানে চললেন। যাত্রা শুরু করে ৭ এপ্রিল শিবপুর গিরিখাত পেরিয়ে, আক রাবাত হয়ে বলখ পৌঁছনোর অর্ধেক রাস্তা কামরদ রসদ শিবিরে পৌঁছলেন। আওরঙ্গজেবের পাঠানো খলিল বেগের নেতৃত্বে ৫০০ জনের অগ্রগামী দল দেহরা-গজ গিরিখাতে উজবেগ গোষ্ঠী নেতা নাজির মহম্মদের পুত্র কুতলুগ মহম্মদের বাহিনীর হাতে অচকিতে আক্রান্ত হল। আক্রমণের খবর পেয়ে ২০ মে শিবির থেকে বড় রাজপুত বাহিনী পাঠানো হলে আক্রমনকারীরা পালিয়ে যায়। শিবিরে বেশি দিন অপেক্ষা করা অনুচিত, এই কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে শাহজাদা আওরঙ্গজেব পরের দিন সকালে তাঁর বিশাল বাহিনীকে দেহস নদীর তীর ধরে এগোতে নির্দেশ দিলেন। বাহিনীর সুরক্ষায় তিনি আলিমর্দান খানকে নির্দেশ দিলেন বিভিন্ন পাহাড়, গিরিকন্দরে লুকিয়ে থাকা ছোটখাটো উজবেগ বাহিনীর ঝটিকা আক্রমণ মোকাবিলা করার। এলাকাকে হাতের তালুর মত চেনেন আলিমর্দান। শাহজাদার নির্দেশ আলিমর্দান যোগ্য দক্ষতাতেই সম্পন্ন করলেন। বাহিনীর সুরক্ষা নিশ্চিত হল।
কাবুল থেকে বলখ
পাদিশানামায় কাবুল থেকে বলখ পর্যন্ত রাস্তার দূরত্ব বলা হয়েছে ১২৩ কোস (২৪৬ মাইল)। প্রধান সেনাপতি আওরঙ্গজেব কাবুল থেকে আবদারা আর গজ গিরিপথ হয়ে বলখে পৌঁছলেন। রাস্তাটার ক্রম হল কাবুল — (ঘোরবন্দের রাস্তা) থেকে আক রাবাত (কাহামার্দ থেকে দুই স্টেজ) — বাজঘা — বাদার হামিদ (বাবর বর্ণিত খুলুম রোডের ওপর মাদার স্টপ?) — কিশব দেহ খুর্দ — পুনি (বা বুনি) কারা (গজ উপত্যকার শুরু) — বলখ। যদুনাথ বলছেন আওরঙ্গজেব কাবুল থেকে উত্তরে চারিকর অবদি গিয়ে পশ্চিমদিকে ঘোরবন্দ থেকে যোহক এবং বামিয়ান পৌঁছলেন। সেখান থেকে উত্তরের দিকের দান্ডা-শিকান গিরিপথ থেকে কাহামার্দ বা কারা কোটাল হয়ে দেহস নদীর একটি শাখা নদী পেরিয়ে উত্তর-পশিমে গজ উপত্যকার মুখে পৌঁছলেন। সেখান থেকে বলখে ঢোকা সামান্য ব্যাপার।
দেড় মাস পরে ২৫ মে আওরঙ্গজেবের নেতৃত্বে মুঘল বাহিনী প্রায় প্রতিরোধহীনভাবে বলখে ঢোকে। শাহজাদা বলখ শহরের নিরাপত্তা নিশ্ছিদ্র করলেন মধু সিংহ হাদাকে কেল্লার দায়িত্ব দিয়ে। গায়ে পড়ে গণ্ডগোল করে আগেই চিহ্নিত হয়ে যাওয়া বিক্ষুব্ধ কিছু বলখি প্রজা ভবিষ্যতে যাতে বাহিনীকে সমস্যায় না ফেলতে পারে, সেজন্যে তাদের শিবিরে আটকে রাখা হল। কাবুল থেকে স্বয়ং সম্রাট শাহজাদার যুদ্ধযাত্রার ওপরে নজর রেখেছিলেন। বলখ প্রবেশের শুভ সংবাদে খুশি হয়ে তিনি বেশ কিছু রসদ, অর্থ আর বাহিনী পাঠালেন।
বুখারার সুরক্ষায় ছিলেন দুর্বল রাজা নজর মহম্মদের বড় ছেলে, যুদ্ধপরীক্ষিত সেনাপতি আবদুল আজিজ খান। তিনি বেগ উঘিলের নেতৃত্বে আমু দরিয়া পার করে বলখের উত্তর-পশ্চিমের ৪০ মাইল দূরে আকচায় বাহিনী পাঠালেন। গজ উপত্যকা থেকে হেরে পালিয়ে আসা কুতলুঘ মহম্মদ তাঁর সঙ্গে মিলিত হবেন।
সর্বাধিনায়ক আওরঙ্গজেব তিন দিন বলখে থেকে দীর্ঘযাত্রায় বাহিনীর যে সব সমস্যা, ফাঁক ফোকর তৈরি হয়েছিল সে সব সমাধান, মেরামত করলেন। ওয়াকিয়ানবিশদের খবর অনুযায়ী ভবিষ্যতে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিকল্পনা ছকলেন। অঞ্চলের ভূপ্রকৃতি অনুযায়ী বুঝলেন মুঘল হিন্দুস্তানে যে ধরণের ভারি রসদের প্রস্তুতি নিয়ে শাহী বাহিনী যুদ্ধ করে, সেই ভারি হাতিয়ার ব্যবহার করা যাবে না। যেহেতু এখানে কেল্লাভিত্তিক লড়াই হবে না, তাই কেল্লার অবরোধ ভাঙ্গার অস্ত্রশস্ত্র যেমন বড় ভারি কামান, হাউই ছোঁড়ার বাহিনী, প্রাকার ধ্বংস করার যন্ত্র ইত্যাদির প্রয়োজন নেই। তাছাড়া উজবেগীদের গেরিলা লড়াই আর হঠাত আক্রমণের বিরুদ্ধে বড় ভারি কামান বা অন্যান্য হাতিয়ার অকেজো।
বড় ছেলেকে শহরে রসদের শিবিরে বসিয়ে, অধিকাংশ ভারি রসদ তার জিম্মায় সুরক্ষিত রেখে কম ওজনের হালকা রসদ অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আকচায় উজবেগীদের মুখোমুখি হওয়ার জন্যে রওনা হলেন। আওরঙ্গজেবের রণকাঠামো ছিল সামনে বাহাদুর খানের অগ্রগামী বাহিনী, পিছনের দিক সামলাচ্ছেন আলিমর্দান খান আর মাঝখানে আওরঙ্গজেব, হাতির পিঠে রাজকীয় হাওদায় বসে সামগ্রিক বাহিনী পরিচালনা করছেন। বিশাল বন্দুকচি বাহিনী হালকা গোলান্দাজ বাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তায় এগোচ্ছে। রাস্তায় মাঝেমধ্যেই উজবেগেরা শাহী বাহিনীকে হঠাত আক্রমণে ব্যতিব্যস্ত করলেও আলিমর্দান খান সে সব আক্রমন কঠোর হাতে রুখে দিচ্ছিলেন। আওরঙ্গজেব বিপক্ষের ছোটখাটো আক্রমণ সামলাতে সামলাতে লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হলেন দৃঢ় পদক্ষেপে কিন্তু সতর্ক হয়ে। তিমুরাবাদের আগেই বেশ কয়েকটা নদী আর খালের বেড়াজালের সুরক্ষায় অপেক্ষা করা উজবেগ বাহিনীকে উচ্ছেদ করে ২ জুন মুঘল বাহিনী শহর দখলে নিল। বিপক্ষের গেরিলা রণনীতির ঝটকা আক্রমন সহ্য করতে করতে শাহী বাহিনী পরিকল্পিত নীতিতে এগিয়ে চলল। পাসাইতে বিপক্ষ সেনাপতি উগিল বেগের নেতৃত্বওয়ালা বাহিনীকে পরাজিত করায় উজবেগীদের বিপুল রসদের শিবির মুঘল বাহিনীর দখলে এল।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে সামরিক সাফল্যে শাহী বাহিনী উত্তেজিত, কিন্তু দীর্ঘ পাহাড়ি রাস্তা পেরোনোর ধকল, বলখে তীব্র যুদ্ধ, বিপক্ষের চোরাগোপ্তা আক্রমণ সামলে ক্লান্ত বিদ্ধস্ত বাহিনী কিছু দিন বিশ্রাম দাবি করল। বাহিনীর ছোট মাঝারি সেনানায়কদের আশায় জল ঢেলে, এলাকার প্রাক্তন প্রশাসক আলিমর্দান খান এবং প্রধান সেনাপতি আওরঙ্গজেব বাহিনীকে নিরন্তর এগিয়ে চলার নির্দেশ দিলেন। সেনাপতিদের বোঝালেন কেন কিছু ঘণ্টারও বিশ্রাম আত্মঘাতী হতে পারে, তাঁরা যে সাফল্য পেয়েছেন, তাঁকে চিরতরে মুছে দিতে পারে কিছু সময়ের বিশ্রাম। নেতার কথা মান্য করে, মুঘল বাহিনী না থেমে এগিয়ে চলল। কিন্তু বিপক্ষ চোরাগোপ্তা আক্রমন তাকে সামলাতে হচ্ছিল। বার বার গেরিলা আক্রমণ শানিয়ে উজবেগেরা খুব একটা সুবিধে করতে না পারায়, এক জোট হয়ে মুঘল বাহিনীর বিরুদ্ধে আলিয়াবাদে মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। শুবান কুলি খানের নেতৃত্বে একটি বড় বাহিনী বুখারা থেকে বলখ আক্রমণের উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসার সংবাদ আওরঙ্গজেবের কাছে পৌঁছয় ৫ জুন। তিনি পাশাই থেকে সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধান্ত নিয়ে ত্বরিতগতিতে পূর্বের দিকে, রাজধানী বলখে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ জারি করলেন। দুদিনের মধ্যেই ফেরত আসার রাস্তায় ৭ তারিখে ফায়াবাদ শহরের একটু দূরে শাসক রাজা আবদুল আজিজ খান, ভাই শুবান কুলি খান, বেগ উঘিলের যৌথ উজবেগী বাহিনীর মুখোমুখি হল মুঘল শাহী বাহিনী। বন্দুকচিদের দুরন্ত শৌর্যের যুদ্ধে মুঘলেরা বিজয়ী হয়। তাদের বলখ শহরে পিছিয়ে আসার ধারা চলতে থাকে ৯ তারিখ পর্যন্ত। পথে শত্রু বাহিনী চোরাগোপ্তা আক্রমন ছিল। কিন্তু গোলান্দাজি আর বন্দুকচি বাহিনীর অভাবে তাদের আক্রমনের তেমন ধার ছিল না। মুঘল বাহিনীর সার্বিকভাবে খুব বেশি ক্ষতি বৃদ্ধি না হলেও, শান্তি ছিল না। ১১ জুন বিজয়ী বাহিনী নিয়ে আওরঙ্গজেব বলখে প্রবেশ করলেন। শাহী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিজয়ের সমস্ত রাস্তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সুলতান আবদুল আজিজ খান, বাধ্য হয়ে আওরঙ্গজেবকে শান্তি বার্তা পাঠালেন। (চলবে)