১৬৪৮-৫২-য় মুলতান আর সিন্ধের সুবাদারি, মুঘল আমলে মুনসি
আগেই আমরা দেখেছি, মুঘল আমলের তুঙ্গ সময়ে অর্থাৎ ষোড়শ শতকের মাঝখান থেকে সপ্তদশ শতজুড়ে মুঘল রাজস্ব বিভাগের হিসাবরাখার দপ্তর (সিয়াক) এবং হস্তলেখ বিভাগের (ইনশা) অধিকাংশ মুহুরি এবং মুনসি পদের করণিক আর আমলার বর অংশই ছিলেন দেশিয় কায়স্থ এবং ক্ষত্রি সমাজের প্রতিনিধি। প্রখ্যাত দুই মুনসি হরকরণ দাস এবং চন্দর ভান ব্রাহ্মণের লেখ্য আঙ্গিক শুধু তাদের সময়েই নয় পরবর্তীকালে, এমন কী উপনিবেশিক সময়ে শুরুর দিকে বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্র প্রধান পাঠ্যপুস্তক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। মুঘল আমলে আলোচ্য মুনসিদের স্থান ছিল শেখ আবুল ফজল ইবন মুবারক (১৫৫১-১৬০২খ্রি:) এর মত আমলা মীর মুনসিদের ঠিক পরের থাকবন্দীর ধাপটিতে। হরকরণ এবং চন্দর ভান ছাড়াও সে সময় মুনসি হিসেবে যথেষ্ট বিখ্যাত হয়েছিলেন মাধো রাম, সুজন রাই, মালিকজাদা, ভূপত রাই, খুশহাল চাঁদ, আনন্দ রাম মুখলিস, বৃন্দাবন দাস খুসগু প্রভৃতি। এরা প্রত্যেকেই ফারসি ভাষা এবং সাহিত্য বিকাশে সুনির্দিষ্ট অবদান পেশ করেছিলেন (এই বিষয়ে আরও জানতে মুজফফর আলমের ক্রাইসিস অব এম্পায়ার ইন মুঘল নর্থ ইন্ডিয়া দ্রষ্টব্য)। এদের লেখাপত্রের নমুনা বিভিন্ন মাদ্রসায় পড়ানো হত। তবে আমলাতন্ত্রে ক্ষত্রি এবং কায়স্থদের অবদান নিয়ে বর্তমান ইতিহাসে খুব বেশি কাজ হয় নি। ১৭০০র শতকে শব্দতত্ত্ব বিষয়ে আনন্দ রাম মুখলিসের মিরাতুল-ই-সতিলা, টেক চাঁদ বাহারের বাহার-ই-আজম, শিয়ালকোটি মাল ওয়ারাস্তার মুতালহতঅলশুয়ারা প্রখ্যাত রচনাগুলোর মধ্যে প্রথমসারির। ফারসি ব্যকরণ, বাগধারার ওপর টিকা, শব্দসমষ্টি এবং কাব্যিক প্রবাদ ইত্যাদি নিয়ে উপরিউক্ত লেখকদের অসামান্য কাজগুলি ফারসি ভাষার ঐশ্বর্য তৈরি করেছে।
প্রশাসনের অক্ষহৃদয়ে বসে এই সব মানুষ, নিজেদের বুদ্ধিবৃত্তি প্রয়োগ আর চর্চা করে যোগ্যতম, আদর্শবদ্ধ এবং নিখুঁত মুনসি হয়ে ওঠার চেষ্টা করতেন। সেই পথের চলন বুঝে নেওয়া যাক মুনসি চন্দর ভানের চিঠিপত্র সূত্রে। একজন সাধারণ মানুষের আদর্শ মানুষের মুনসি হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া আমরা স্পষ্ট লক্ষ্য করি পুত্র খাজা তেজ ভানকে লেখা মুনসি চন্দর ভান ব্রাহ্মণের চিঠি সংগ্রহ থেকে। এই চিঠি সূত্রেই সে সময়ের চাকুরিমুখী ভদ্রবিত্ত সমাজের মধ্যস্তরেরশিক্ষাক্রমের একটা ঝাঁকি দেখতে পাই। মুনসি হওয়ার যোগ্যতা বিষয়ে চন্দর ভান ছেলেকে লিখছেন, ‘শুরুতে মুঘল প্রশাসনিক প্রথা (আখলাক) বুঝে নেওয়ার প্রশিক্ষণ নেবে। খুব ভাল হয়, একই সঙ্গে এবিষয়ে যদি তুমি জ্ঞানী প্রবীণদের থেকে পরামর্শ এবং উপদেশ গ্রহণ কর। আখলাক-ই-নাসিরি, আখলাক-ই-জালালি, গুলিসস্তাঁ, বুস্তাঁর মত বই তোমার জ্ঞান সঞ্চয়ের মূলধন হিসেবে গণ্য করবে। তোমার শিক্ষণীয় বিষয়গুলো নিরন্তর মকশ এবং পরীক্ষা করার পরে তোমার মনে নির্দিষ্ট আচরণবিধি নিশ্চিতরূপে প্রতিষ্ঠিত হবে। বয়ানগুলো শুদ্ধ, সুসঙ্গতভাবে লিখতে শেখার সঙ্গে সঙ্গে পরিশিলীত হস্তলেখশৈলীও আত্মীকরণ করতে হবে। তবেই তুমি সমাজ আর প্রশাসনের উচ্চকোটির মানুষের সঙ্গে একাসনে বসতে পারবে। আমার প্রিয় পুত্র! এই সব দক্ষতায় শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন কর। এর পাশাপাশি যদি তুমি হিসাব রাখা (সিয়াক), লিখন এবং একই সঙ্গে করণিক (নাউ-ই-সিংদাগি) হওয়ার দক্ষতা অর্জন কর তাহলে সোনায় সোহাগা। প্রশাসনে কাজ করা অধিকাংশ মুনসি হিসাব-কিতাব রাখার পদ্ধতি সম্বন্ধে অজ্ঞ। যে করণিক সুন্দর গদ্য লেখার যোগ্যতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে হিসেবরক্ষা শাস্ত্র জেনে নিয়েছে সে আলোকের মধ্যে আরও বেশি আলোকজ্জ্বল হয়ে অভিজাতদের সমাবেশে উজ্জ্বল রত্ন হয়ে বিরাজ করে। একজন মুনসির বিচক্ষণ এবং চরিত্রবান হওয়া জরুরি। আমি যখন মুনসি হিসেবে দরবারে থাকি তখন আমি খলিফার প্রতীক এবং প্রতিনিধি, যদিও আমি করণিক হিসেবে বেশ কিছু প্রচলিত ভুল করি, কিন্তু যে সব ভুল সাধারণত প্রকাশিত হয় না, হররোজ লিপিবদ্ধ করা হাজারো মানুষের মুখের কথার সঙ্গে সারাজীবন কুঁড়ির মত না খোলা অবস্থায় গুটিয়েই রয়ে যায়’।
পুত্রকে লেখা চিঠিতে তিনি আরও গভীরে ডুব দিয়ে মুনসি হিসেবে নিজেকে তৈরি করার জন্যে যে অতিরিক্ত উপদেশগুলো পেশ করছেন, সেটা হয়ত শুধু তাঁর পুত্রের উদ্দেশ্যে বলা নয়, মুঘল আমলে মুনসি পদে চাকরিতে যোগ দেওয়ার স্বপ্ন দেখা বৃহত্তর পাঠককের উদ্দেশ্যেও লেখা, ‘পারসিক খুবই গভীরতাপূর্ণ ভাষা। দক্ষতম মানুষের পক্ষে এই ভাষার তল খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবু ভাষা শেখার জন্যে শুরুর দিকে প্রয়োজনে গুলিস্তাঁ, বুস্তাঁ এবং মুল্লা জামির চিঠি অধ্যয়ন করবে। যখন ভাষা দক্ষতায় কিছুটা শান পড়বে, তাঁদের লিখন গুণাবলীর ভাগ্নাংশ আয়ত্ত হবে, তখন নীতি মাণদণ্ড জানানোর বই, তার সঙ্গে হাবিবুলসায়ের, রিয়াজুসসালাতিন, তারিখ-ই-গুজিদা, তারিখ-ই-তাবারি, জাফরনামা, আকবরনামার মত ইতিহাস বই এবং এই ধরণ ও মানের আরও কিছু বই মন দিয়ে পড়বে। এই পাঠক্রিয়ায় তোমার ভাষা মোলায়েম হবে, বিশ্বদৃষ্টি জন্মাবে এবং বিভিন্ন দেশের মানুষ সম্বন্ধে জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে। প্রখ্যাত জ্ঞানীর সঙ্গে মেলামেশা করার সময় অধ্যয়ন করা গভীর জ্ঞান ব্যবহার করো। যে সব প্রখ্যাত কবির সৃষ্টি রস আমি যৌবনে আস্বাদন করেছি, তাঁদের নাম আমি উল্লেখ করলাম। হাতে কিছু সময় পেলে তাঁদের লেখা পড়ে দেখো। তাঁদের কাজ তোমায় আনন্দ দেবে, মুক্তি দেবে, তোমার ভাষা জ্ঞানের বিকাশ ঘটাবে। কবিদের মধ্যে প্রথম সারির কাব্যকারেরা হলেন হাকিম সানাই, মুল্লা রুম, শামস-ই-তাবরিজ, শেখ ফারিদ আলদিন আত্তার, শেখ সাদি, খওয়াজা হাফিজ, শেখ কিরমানি, মুল্লা জামি, উনসুরি, ফরদৌসি, জামালুদ্দিন, আবদুল-রজ্জাক, কামাল ইসমাইল, খাকানি, আনওয়ারি, আমীর খুসরু, হাসান দেহলভি, হাজির ফারাবি, কামাল কুজানদি, আমির বুঝারি, নিজামি আরজুই সমরখন্দি, আবদুল ওয়াসি জাবালি, রুকন সাইন, মুহায়ি অলদিন, মাসুদ বেক, ফরিদ অলদিন, উসমান মুখতারি, নাসির বুখারি, ইবন ইয়ানিম, হাকিম সুজানি, ফারিদ কাতিব, আবিল আলা গজনওয়ি, আজরাকি, ফালাকি, সউদায়ই, বাবা ফিঘানি, খ্বাজা কিরিমানি, আসাফি, মুল্লা বানাই, মুল্লা ইমদ খোয়াজা, উবায়িদ জাকানি, বিসাতি, লুফত-আল্লা হালাউই, রশিদ ওয়াতওয়াত, আসির আখশিকাতি, উসির উম্মানি এবং আরও অনেকে। আমার প্রিয় এবং পবিত্র পুত্র মনে রেখো আমি প্রাচীন কবিদের বইগুলি পড়া শেষ করার পরে যেন আরও জ্ঞান অর্জনের ক্ষুধা তীব্র হল, মনে হল তাঁদের পরের সময়ের কবি, লেখকদের আরও আরও বই পড়ি। এ সময় থেকে আমি তাদের কবিতা এবং মসনভি সংগ্রহ শুরু করলাম। তাদের বহু গ্রন্থের নকল জোগাড় করলাম। সেসব কবির লেখা পাঠ সাঙ্গ করার পর আমার লিখনশৈলী আর কাব্য আঙ্গিক অনুসারী কবি যেমন আহলি, হিলালি, মুহতাশম, ওয়াহশি, কাজি নুর, নারগিস, মাখিফি উম্মিদি, মির্জা কাশিম গুনাই, পারতাবি, জাবরানি, হিসাবি, সাবরি, জামিরি রশিকি, হাসানি, হালাকি, নাজিরি, নাউই, নাজিম ইয়াঘমা, মীর হায়দার, মির মওসম, নাজিম মুশাদি, ওয়ালি দস্ত বাজায়ি এরকম আরও অনেকর সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে আমাদের পূর্ববর্তী সময়ের কবিদের লেখাগুলো চর্চা করলাম, সে সব বই তাদের পড়তে দিলাম। এরা ততদনে নিজেদের যোগ্য করেছে, কারণ ততদিনে সকলেই দিওয়ান বা মসনভি সংগ্রহ করেছে, তার স্বাদও পেয়েছে। এই ধরণের ছোট চিঠিতে প্রত্যেকের নাম উল্লেখ করা অসম্ভব’।
যে বিপুল সংখ্যক কবির নাম চন্দর ভান পুত্রের উদ্দেশ্যে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, তাতে মুঘল আমলে মুনসি পদে যোগ্য হয়ে ওঠার পথের সন্ধানের সঙ্গে সঙ্গে, আমরা সেযুগের অসামান্য সাহিত্যিক বৈচিত্র এবং শিল্প পরিকল্পনা, শিল্প কাব্য সাহিত্য চর্চার একটি ঝলক দেখতে পাই। শুধু ভাষাচর্চাই নয়, বিদ্যাচর্চাই নয় সমাজে নানা স্তরের মানুষের মধ্যে কাব্যচর্চার ধারারও একটা জীবন্ত উদাহরণ আমরা পেলাম সে সময়ের গুরুত্বপূর্ণ আমলা, গুরুত্বপূর্ণ এক সাহিত্যিক চন্দর ভান ব্রাহ্মণের নিজের এবং তাঁর অনুগামীদের কাব্য চর্চা আলোচনায়। চন্দর ভানের অনুগামী কবিরা পড়াশোনা চালাবার সঙ্গে কাব্যচর্চাও চালিয়ে যাচ্ছেন সাহিত্যিক হয়ে ওঠার মনোবাসনা পূর্ণ করতে। সে সময় চন্দর ভানের মত আরও মান্য বহু কবি ছিলেন এবং কবি যশোপ্রার্থী অনুগামীরাও ছিলেন।
ইরানী ভাষা চর্চার অনুরণন পৌঁছে গিয়েছিল প্রশাসনিক স্তরের এক্কেবারে ভূমিস্তরে কর্মরত মুঘল করণিকদের মধ্যে। ফরমান লেখা থেকে শুরু করে নানান ধরণের মুচলেকা, তমসুক, কাবুলিয়ত ইত্যাদি যে কাজগুলি গ্রামমধ্যস্থ বা চতুর্ধুরীণেরা করত সেগুলিও ফুলেল কাব্য সুরভিত ফারসিতে লেখা হচ্ছে। আগরা, দিল্লি বা লাহোর এমন কী বিভিন্ন সুবার মূল বাজারের এমন কোনও কিতাবখানা পাওয়া যেত না যারা ফারসি কবিতার সংগ্রহের নকল বিক্রি না করত। ১৮৩৬-এর এডাম সমীক্ষায় পাচ্ছি, দিল্লি থেকে বহুদূরের বাংলায় যেখানে কোনও দিন একজনও মুঘল পাদশাহের পদধুলি পড়ে নি সেখানেও স্থানীয় অমুসলমান মধ্যস্থরাও ফারসিতে চিঠিপত্র লিখত। পরমেশ আচার্য, ‘পেডাগগি এন্ড সোসাল লার্নিং — টোল এন্ড পাঠশালা ইন বেঙ্গল’এ লিখছেন, বাংলার গদ্যও অনেকটা ফারসি ইনশা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। মাদ্রাসায় প্রাথমিকভাবে ফারসিই পড়ানো হত। উত্তর ভারতে ফারসিই প্রধান ভাষা হিসেবে পরিগণিত হত। যারা ফার্সি ভাষা সবে শিখেছে, তাদেরও অধিকাংশ ইরানী, অইরানী মুসলমান বন্ধুদের মত পারসো-ইসলামিক অভিব্যক্তি যেমন বিসমিল্লা (আল্লার নামে), লাব-বাগুর (গোরের দরজা) বা বা জাহান্নুম রশিদের (জাহানামে অভিশপ্ত) মত শব্দবন্ধ উচ্চারণ করত। কায়স্থ, ক্ষত্রিরা বিভিন্ন ভাষায় ধর্মীয় রচনা ফারসিতে অনুবাদের কাজ শুরু করলেন। (চলবে)