১৬৪৮-৫২-য় মুলতান আর সিন্ধের সুবাদারি, মুঘল আমলে মুনসি
মুনসি পদে যোগ্য হয়ে উঠতে গেলে প্রাথমিকভাবে শিখতে হত চিঠি লেখার দক্ষতা, হিসেব রাখার নৈপুণ্য এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা নথিকরণ ইত্যাদির পদ্ধতিগুলো। মুনসি এবং মালিকজাদা ছদ্মনামে নিগারনামাইমুনসিতে আমরা পাচ্ছি মুন্সি হয়ে ওঠার যোগ্যতার বিবরণ। একই সঙ্গে এই নাম না জানা লেখক বলছেন কীভাবে পড়াশোনা করে এবং কোন পথে শিক্ষার্থী মুন্সিগিরির যোগ্যতা অর্জন করতে অগ্রসর হবেন। নিগারনামাইমুনসির লেখক নিজে বেশ কয়েক দশক মুনশিগিরি করেছেন। তিনি ১৬৭০-৭১-এ মীর বক্সী লশকর খানের পার্ষদ ছিলেন। সে সময় তিনি শাহজাদা শাহ আলমের প্রশাসন হয়ে মুঘল আমলাতন্ত্রের অন্দরে প্রবেশ করেন। মানুষটি মুঘল প্রশাসনের নানান পদ দক্ষ হাতে সামলেছেন ১৬৮০-র মাঝের দশক অবদি। সত্তরের কাছাকাছি বয়স হলে এবং প্রশাসনিক দপ্তরের কাজকর্ম, নীতি নিয়ম ইত্যাদি বিষয়ে ব্যাপক হাতে কলমে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে তিনি দপ্তরি নীতিমালার বই লিখতে শুরু করেন। নিগারনামা-র দুটো অংশ অর্থাৎ দুটি দফতরে ভাগ করা। ভূমিকাতে অতীতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মুনসির ইনশার উদাহরণ উল্লেখ করেছেন। প্রথম দফতর চার ভাগে বিভক্ত। কোন কোন স্তরের মানুষদের চিঠি এবং অন্যান্য নির্দেশ, অনুরোধ লেখার জন্যে কোন কোন নির্দিষ্ট অক্ষর ব্যবহার করতে হবে অর্থাৎ নীল রক্তের শাহজাদাদের জন্যে কোন অক্ষর, অভিজাতদের জন্যে চিঠি লিখতে কোন অক্ষর, কোন হরফ দেওয়ানদের সম্বোধন করতে ব্যবহার করতে হবে এবং তাদের লেখ্যক্রম কী হবে, নিয়োগপত্রের কাঠামোই বা কী হবে সেসব বিশদে প্রথম দফতরে আলোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় দফতরটিতে বিখ্যাত মুনসিদের ফরমান লেখার আঙ্গিক উল্লেখ করা হয়েছে। শাহ আলমের যুগে যে সব ফরমান লেখা হয়েছিল সেগুলির বিস্তৃত উদাহরণ, অন্যান্য চিঠি, সমীক্ষা ইত্যাদি সংকলন করেছেন লেখক। জনৈক মুনসি উদয় রাজ রুস্তমখানির লেখাপত্রের বিস্তৃত উদাহরণও পেশ করেছেন তিনি। আমরা আন্দাজ করতে পারি, মুনসিদের লিপিশিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে সে সময়েই একটা কার্যকর ব্যবহার কাঠামো তৈরি হয়েগিয়েছিল। কোনও আঙ্গিকই করণিকের নিজের ইচ্ছামত বেছে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। উদয় রাজ ছাড়াও শেখ আবদুস সামাদ জৌনপুরী, মীর মহম্মদ রেজা, শাদুল্লা খানের লেখা চিঠি বা অন্যান্য লেখার নমুনা বইতে বিশদে আলোচনা হয়েছে। শাহজাহানের সময়কার গুরুত্বপূর্ণ দেওয়ান মুনসি ঐতিহ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রক্ষক – শাদুল্লা খান নায়ক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন। শাদুলা খানের হাতে তৈরি হন আমাদের পূর্বে এবং পরের সময়ে আলোচ্য চন্দর ভান রাহ্মণ। বইটার প্রথম দফতরের অনুবাদ ম্যানুয়্যাল অব দেওয়ান উপনিবেশিক আমলে ছাপা হয়েছে যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে। এই বইতে কোম্পানি আমলের প্রশাসনে কীভাবে দেওয়ান হওয়া যায়, তার যোগ্যতা এবং পথ বিশদে বলা হয়েছে।
আওরঙ্গজেবের আমলের শেষের সময়ে ১৭০৩-০৪-তে মুঘল হিন্দুস্তানে করণিক, মুনসি তৈরির পাঠ্য হিসেবে, যতদূর সম্ভব কায়স্থ সমাজের সন্তান ইন্দর সেনের খুলাসাতুল-সিয়াক, নিগারনামার পরিপূরক পড়ার বই হিসেবে তুমুল জনপ্রিয় হচ্ছে, বিভিন্ন শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার জন্যে ব্যবহার করা হচ্ছে। খুলাসাতুল-সিয়াক মুখবন্ধের পরের তিনটি অধ্যায়ে শাহী প্রশাসনে হিসেব রাখার পদ্ধতি বা সিয়াকের কিছু নমুনা অঙ্ক কষে দেওয়া হয়েছে। আমাদের আগেই উল্লিখিত আওরঙ্গজেবের সময়ের শেষের দিকে নাম না জানা ‘মুনসি’ এবং ‘মালিকজাদা’ উপাধিওয়ালা এক বিখ্যাত কায়স্থর বইতে আর্থিক ব্যবস্থাপনার তিনটে দফতর, দফতর দেওয়ানইয়ালা, দফতর খানইসামান, এবং দফতর বক্সী ইত্যাদির পদাধিকার বিষয়ে আলোচনা উল্লিখিত হয়েছে। মুখবন্ধে সম্রাট আকবরের আগের সময় থেকে চলে আসা হিন্দৌভি ভাষায় হিসেব রাখা থেকে শুরু করে আকবরের সময়ে ফারসি ভাষায় প্রশাসনিক কাজ কীভাবে প্রযুক্ত হল সে সব ধাবাহিকতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। খুলাসাতুল-সিয়াকে লেখক মুনসিদের গতিশীল সময়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে টিকে থাকার উপদেশ দিচ্ছেন। নিগারনামায় বৃহত্তর পরিবেশে মুন্সিদের তুলে ধরা হলেও, এই বইতে মুনসিদের কাজকে শুধু প্রশাসনিক কাজের নাটববল্টু হিসেবে দেখানো হয়েছে। চন্দর ভান তাঁর আত্মজীবনীমূলক লেখায় কিন্তু, এই সব জাগতিক এবং প্রায়োগিক সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে মুনসিদের নৈতিক বিশ্ব তৈরির আহ্বান জানাচ্ছেন।
হস গোমানস, মুঘল ওয়ারফেয়ার বইতে বলছেন মুঘল সম্রাটেরা বছরের ৪০ শতাংশ সময় বাইরে থাকতেন। দিল্লি আগরা লাগোর, এই তিন রাজধানীকে ঘিরে ১২০০ কিমি পর্যন্ত এলাকা তারা বিশাল দলবল নিয়ে ঘুরতে বেরোতেন। থিতু হওয়া তাদের ধাতে ছিল না। এ প্রসঙ্গে তিনি কয়েকটি স্বতঃসিদ্ধান্ত বলছেন (১) দরবারকে অন্তত বছরে একবার দিল্লীতে/আগরায় ফিরতেই হত; (২) বাহিনীর গতি দৈনিক ছিল ৮ কিমি; (৩) ৯ মাস দরবার দিল্লির বাইরে থাকত থেকে ১২০০ কিমির হিসেবে উপনীত হওয়া গিয়েছে।। তো সম্রাটের সঙ্গে চরৈবেতি বাহিনী বিপুল উচ্চপদস্থ অভিজাত, জেনানার আমলাতন্ত্র তাদের প্রশাসন কানুনগো আর মুনসিদের নিয়ে সারা বছরই চলতে থাকত। এই বাহিনীর সঙ্গে যেত দরকারি সরকারি দপ্তরের কাগজপত্রও। যে জন্য হাইডেন বেলেনয় মুঘল সাম্রাজ্যকে রুশি ঐতিহাসিকদের মত বারুদ নির্ভর (গান পাউডার স্টেট) সাম্রাজ্য না দাগিয়ে দিয়ে একে কাগজ নির্ভর সাম্রাজ্য বলেছেন। দরবারে আসা যাওয়া প্রত্যেকটা কাগজ কয়েকশ নকল করে সে সবগুলো কেন্দ্রে রাজ্যে পরগণার প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে ছড়িয়ে দেওয়া হত।
মানুচি বলছেন, সাম্রাজ্যের রাজধানীর বাইরে অভিযানে যাওয়া, প্রমোদ ভ্রমণে যাওয়া সম্রাটের প্রশ্নের জবাবে যাতে তাঁর হাতের কাছে চাইবা মাত্র যে কোন সময়ে যাতে বিশদে সব উত্তর সাজিয়ে দেওয়া যায় তার জন্যে ৮০টা উট, ৩০টা হাতি এবং ২০টা গাড়ি বোঝাই করা সাম্রাজ্যের তথ্য যেত। The royal record office always accompanied the court and, according to Manucci, required eighty camels, thirty elephants and twenty carts to carry all kinds of registers and papers of account. As a result, officials were always ready to provide detailed descriptions of the territories through which the court passed.
শাহেনশার বাহিনীর সঙ্গে বিপুল পরিমাণ অভিজাতকেও সঙ্গী হতে হত। তাই শাহী মুনসিদের সঙ্গে অভিজাতদের মুনশিদেরও সেই বিশাল মিছিলে জেলায় জেলায় পরগণা পরগণায় যেতে বাধ্য হতে হয়েছে। তাদের জীবনটাই ছিল পরিযায়ীর। পরিযায়ীতাই তাঁর চাকরি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিল। সেটা চাকরির প্রাথমিক শর্তও বটে। অভিজাত পৃষ্ঠপোষকদের সাথে প্রশাসনিক নানান কাজে নানান এলাকা পরিদর্শনে যেতে হত। তাই যৌক্তিকভাবে মুনসিদের লেখা বইগুলোয় সফর বা ভ্রমণ শব্দটা বহুবার ব্যবহার হচ্ছে। এই ধরণের বই লিখছেন ষোড়শ শতকের কায়স্থরা এবং কিছুটা ক্ষত্রি সমাজের মুনসিরা। যেমন নেক রাই। তিনি লিখছেন এমন সময়ে, যখন সমাজে ফারসি শিক্ষার শেকড় অনেকদূর অবদি ছড়িয়েছে। ব্রাহ্মণেরাও ফারসি শিখছেন মন দিয়ে। আকবরের রাজত্বে টোডরমল্লের মত ক্ষত্রিরা মুঘল আমলাতন্ত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ষোড়শ শতের মাঝের দিকে মুঘল প্রশাসনে অমুসলমান মুনসিদের সংখ্যা গুণিতক হারে বাড়বে এবং কিছু পরে আরও বিপুল হারে বৃদ্ধিপাবে। তারিখ-ই-দিলখুসার লেখক ভীম সেন পরিবার নিয়ে উত্তরের মুঘল হিন্দুস্তান ছেড়ে মুঘল সেনার সঙ্গে পরবর্তী দশকেও দাক্ষিণাত্যে গিয়েছেন এবং সেখানেও থিপু হয়েছেন। আগামী কিস্তিতে তাঁকে নিয়ে আমরা আলোচনা করব। (চলবে)