শুধু মধ্য এশিয় পরম্পরার যোগ্য এবং একমাত্র উত্তরসূরী হিসেবেই নয়, মির্জা হাকিম স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বললেন, তার কাবুল রাজত্বই মুঘল পারিবারিক প্রথা-পরম্পরাগুলোর একমাত্র ধারক বাহক। পরম্পরা রক্ষায় বাবরের ঔজ্জ্বল্য খুঁটি ধরলেন মির্জা। তাঁর এই রাজনৈতিক অবস্থান কীভাবে আকবরের নীতি ইত্যাদি প্রভাবিত করেছিল, সেই আলোচনা আকবরের বিভিন্ন কাজ, তাত্ত্বিক পরিবর্তন বোঝার জন্যে জরুরি।
বাবরের শৌর্য, উদ্দেশ্যপূরণে লেগে থাকার অনমনীয়তা, দুঃসময়ে সাথীদের নিয়ে টিকে থাকার দক্ষতা এবং চরম বিরুদ্ধ পরিবেশকে নিজের দিকে টেনে আনার ক্ষমতা মুঘল সাম্রাজ্যজুড়ে প্রশংসাসূচক স্বীকৃতি লাভ করেছিল। বাল্যকালে বাবাকে হারিয়ে, ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের বিশ্বাঘাতকতা, বিরোধিতা অগ্রাহ্য করে, বছরের পর বছর শেকড় ছেঁড়া যাযাবরের জীবন কাটিয়ে, তার থেকে সামরিক দিক থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী আফগান আর রাজপুতদের বিরুদ্ধে একের পর এক অসম যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে তিনি দীর্ঘস্থায়ী সাফল্য লাভ করবেন এবং মুঘল হিন্দুস্তানে সাম্রাজ্য বিস্তার করলেন। তবুও মাথায় রাখতে হবে বাবরের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়েছিল তাঁর অনুগামীদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ্যের সারল্য আর মধ্য এশিয় স্তেপ অঞ্চলের পিতৃপুরুষের পরম্পরার প্রতি দায়বদ্ধ থাকার চরিত্রবিকাশে। মুঘল হিন্দুস্তানে সাম্রাজ্য তৈরি করেও বাবর বারবার স্বপ্ন দেখতেন মধ্য এশিয়ার ফরঘনায় ফিরে গিয়ে বা ফরঘনার ওপর বিজয়লাভ করে সেখানকার ফল, বাগান আর সামাজিক সম্পর্কগুলোকে নতুন করে গড়ে তোলার। তাঁকে হিন্দুস্তানে নয়, কাবুলেই কবর দেওয়া হয়। ১৫৬০-এর দশক থেকে মির্জা হাকিম স্পষ্টভাবে নিজেকে বাবরের একমাত্র যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে উপস্থিত করার উদ্যম নিলে আকবর তার সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার সূত্র অন্য পারিবারিক বৈধতার খোঁজে লাগলেন।
তিনিই একমাত্র বাবরের উত্তরাধিকার বহন করছেন, সেটা স্পষ্টভাবে বোঝাবার জন্যে মির্জা হাকিম বেশ কয়েকটা পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন। তারমধ্যে একটা কাবুলে বাবরের মাজার এবং তার সঙ্গে জুড়ে থাকা বাগানের সংস্কার করতে বিপুল অর্থ ব্যয়। এছাড়াও বাবরের বার্ষিক উরসে আগত গরীব দুঃখী বিনামূল্যে খাওয়ানো আর হাত খুলে দানধ্যান করার উদ্যোগও নিলেন তিনি। সচেতনভাবে আত্মচরিত্রটি তার ঠাকুর্দা বাবরের ধাঁচে ঢেলে সাজিয়ে নিজেই দ্বিতীয় বাবর হয়ে উঠলেন। ফলে তিনিই একমাত্র হিন্দুস্তান সাম্রাজ্য শাসনের একমাত্র দাবিদার, সে তথ্যও পরোক্ষে বোঝাতে কসুর করলেন না। বাবরের তুর্কি স্তেপ অঞ্চলের চরিত্রকে আত্মীকরণ ঘটিয়ে নিজের গাজির চরিত্রটি বিকাশ ঘটালেন। তাছাড়া তিনি বাবরের মত ঝুঁকি নেওয়ার যোগ্য, সেই চরিত্রটা বোঝাতে তিনি বাবরের মতই সঙ্গীসাথীদের নিয়ে কাবুলের আশেপাশের জঙ্গলে দিন কাটাতেন, আমোদপ্রমোদ এবং রঙদার ভ্রমণে বেরোতেন। তিনি বোঝালেন, বর্ণিল পূর্বজ বাবরের মত পারসিক আঙ্গিকের বাগানেই অনুষ্ঠান আয়োজন করা তার তীব্র পছন্দ। তিনি বাবরের কবরে পুত্র জাহাঙ্গির মির্জার লাগানো খুবানি [এপ্রিকট] গাছে ধরা ফলের রসালো বর্ণনা দেবেন এবং বলবেন এই গাছের ফল কেন অন্যান্য সব গাছের ফলের থেকে আলাদা। এতসব প্রচেষ্টার মধ্যে বাবরের চরিত্রকে আত্মীকরণ করার সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম ছিল নক্সবন্দী সুফিদের পৃষ্ঠপোষণা।
মধ্য ১৪০০ সময়ে বাহালুদ্দিন নক্সবন্দের আবির্ভাবের (প্র ১৩৮৯) পরে মধ্য এশিয় অঞ্চলের সামাজিক এবং ধর্মীয় জগতে নক্সবন্দী তরিকা খুবই প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করতে থাকে। তাঁরা মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন সমাজের নানান স্তর যেমন যাযাবর আদিবাসী, কারিগর গিল্ড আর কৃষকদের একসূত্রে বাঁধার কাজ করলেন। তবুও মাথায় রাখতে হবে নক্সবন্দী তরিকার অদ্ভুত সাফল্যের কারন ছিল বিভিন্ন তৈমুরী শাসকের শাসনকে তাদের রাজনৈতিক সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রাখা, তার পরিবর্তে নক্সবন্দী গোষ্ঠী পেত শাসকের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা। খাজা আবদুল্লা আহরর (প্রয়ান ১৪৯০) ছিলেন যেমন প্রবল শক্তিশালী ধর্মগুরু, অন্যদিকে ট্রান্সঅক্সিয়ানা অঞ্চলের সব থেকে বড় ভূমিদারও। এই তথ্য থেকে আমরা বুঝতে পারি ১৪০০-র শেষের দিকে এই অঞ্চলে নক্সবন্দী তরিকার রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি কতটা বিস্তৃত হয়েছিল। উল্লেখযোগ্য ১৫০০-র শুরুর দিকে ট্রানসঅক্সানিয়া অঞ্চলজুড়ে তৈমুরি শাসনের পতনের পরেও নক্সবন্দী সুফি তরিকার পতন ঘটে নি। নক্সবন্দী তরিকা নতুন অবলম্বন খুঁজে পেল উজবেগ শাসনে। সমস্যা হল উজবেগদের শাসকদের এলাকা খুব বড় ছিল না, তাই বিকল্প হিসেবে ছোট ছোট কয়েকটা অঞ্চলে যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পুরোনো তৈমুরি শাসন ছিল, বা নতুন তৈমুরী-মুঘল শাসন তৈরি হচ্ছিল, সেগুলোকেও এই তরিকা অবলম্বন করে নিজেদের বিকাশ ঘটাতে থাকে। ১৫০৪-এর পরে বাবরের শাসনে কাবুল এমন এক অঞ্চল। একে তাঁরা অবলম্বন করবেন। বাবরের সাফল্য বিশ্লেষণ করে অনেকেই বলেছেন, বাবরের ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ জীবনে অন্যতম সাহারা ছিল নক্সবন্দী তরিকার প্রতি অচল আস্থা। আমীর তৈমুরের (১৪০৫) সময় থেকেই তাদের পরিবারে নক্সবন্দীদের প্রভাব শুরু হয়। খাজা আহরার ১৪৮৩-তে বাবরের নাম রাখলেন। বাবরের দাবি ১৫২৬-এ পানিপথের যুদ্ধে আফগানদের বিরুদ্ধে অলৌকিক জয় পেয়েছিলেন নক্সবন্দী সন্ত খাজা আহমদ কাসানির বদৌলত। তাঁর তীব্র অসুস্থতার সময় তাঁর একমাত্র কাজ ছিল খাজা আহরারের রিসালা-ই-ওয়ালিয়া পাঠ; এই পাঠই তাঁকে সুস্থ করে। নুরুদ্দিন মহম্মদ নক্সবন্দীর সঙ্গে তার কন্যার বিয়ে দেন বাবর; বাবরের দরবারে বহু নক্সবন্দী তরিকার বিখ্যাত মানুষের উপস্থিতি ছিল। বাবরের নক্সবন্দীদের নির্ভরতায়, এই তরিকা কাবুলে বিপুল অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় প্রভাব সৃষ্টি করে।
১৫৩০-এ বাবরের মৃত্যুর পর নক্সবন্দীয়াদের আশা ছিল বড় ছেলে হুমায়ুন, বাবার পথে তাঁদের পৃষ্ঠপোষকতা করবেন। কিন্তু হুমায়ুন হিন্দুস্তানের সাম্রাজ্যে অন্য পথ ধরেন। শাত্তারি তরিকার প্রতি তাঁর আকর্ষণে নক্সবন্দীরা তীব্র হতাশ হয়। কিন্তু বাবরের দ্বিতীয় ছেলে কাবুলের শাসক মির্জা কামরান নক্সবন্দী তরিকা অনুসরণ করলেন। কাবুল হয়ে উঠল নক্সবন্দীয়া তারিকার অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। কাবুলে বিপুল জমি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া ছাড়াও কামরান খাজা আহরারের নাতি খাজা আবদুল হকের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন (এ বিষয়ে বিশদ জানতে স্টিফেন ফ্রেড্রিক ডেল আলম পাইইন্দের দ্য আহরারি ইন কাবুল ইন দ্য ইয়ার ১৫৪৬ এন্ড দ্য মুঘল নক্সবন্দীয়া আর খালিক আহমেদ নিজামির নক্সবন্দী ইনফ্লুয়েন্স অন মুঘল রুলার্স এন্ড পলিটিক্স দেখতে পারেন)। তরিকার প্রতি পৃষ্ঠপোষকতা আর নিবেদনের সুফল মির্জা কামরান পেলেন ১৫৪০ দশকের শুরুতে। হুমায়ুনের সঙ্গে রাজনৈতিক বিরোধে, তরিকা সমস্ত ক্ষমতা নিয়ে কামরানের পাশে দাঁড়ায়। ১৫৪৫-এ হুমায়ুনের কাবুল দখলের ফলে তরিকা এবং কামরানের ওপরে আঘাত নেমে আসার আশংকা কররে নক্সবন্দীরা। সম্পত্তি সুরক্ষার জন্যে উদগ্রীব হয়ে প্রকাশ্য ঘোষণা করে মির্জা কামরানের সংসর্গ ত্যাগ করে। ১৫৫৬-য় তার মৃত্যু পর্যন্ত নক্সবন্দীদের বেশ কিছু গোষ্ঠী হুমায়ুনের বাহিনীতে কাজ করেছেন, কিন্তু সার্বিকভাবে নক্সবন্দী তরিকার সঙ্গে কোনও দিনই হুমায়ুনের আত্মীয়তার সম্পর্ক তৈরি হয় নি। হুমায়ুনের মৃত্যুর পর বৈরাম খান ১৫৫৬ থেকে ১৫৬০ পর্যন্ত নতুন বালক সম্রাট আকবরের আতলিক হয়ে প্রায় সমস্ত ক্ষমতা কুক্ষিগিত করলে নক্সবন্দীদের মুঘল-তৈমুরী সাম্রাজ্যে নতুন পৃষ্ঠপোষকতার আশা উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। তিনি নিজে নক্সবন্দী তারিকার পীর মৌলানা কামানগারের অনুগৃহীত শিষ্য। কিন্তু আকবর রাজত্বের প্রথম দিক থেকেই নক্সবন্দীদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করেন নি। হতাশ নক্সবন্দী তরিকার কাছে নতুন আশার আলোক রেখা হয়ে ওঠেন কাবুলের নতুন শাসক হুমায়ুনপুত্র মির্জা হাকিম। (চলবে)