আওরঙ্গজেবের প্রশাসনে এক সাকসেনা কায়স্থ পরিবার
ত্রয়োদশ শতকে সুলতানি আমলে রাজতরঙ্গিণী লেখার সময়েও কায়স্থরা জাতি হিসেবে একাট্টা হয় নি, তখনও তারা শুধুই প্রশাসনিক কাজের পেশাদার। সরকারি, বেসরকারি প্রশাসনিক দপ্তরের হিসেব রাখা, তথ্য রাখা ইত্যাদি কাজে দক্ষ দক্ষ হাতে কাজ সামলাচ্ছেন। এর কয়েক শতাব্দ পরে আকবরের সময় আমরা কায়স্থদের জাতি হিসেবে স্পষ্টভাবে চিহ্নিত হতে দেখছি। কায়স্থদের কর্মদক্ষতার পাশাপাশি আমরা দেখেছি কীভাবে বিভিন্ন জাতির অমুসলমান মুনসি মুঘল শাহীর মাঝারি-ওপরস্তরের প্রশাসনে এবং বড় মুঘল অভিজাতদের প্রশাসনিক কাজ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা সামলাচ্ছেন। আমরা এই পর্বে মুঘল প্রশাসনের মাঝারিস্তরের আধিকারিক ভীম সেন সাকসেনার লেখা নুশকা-ই-দিলখুসার অবলম্বনে আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে মুঘল প্রশাসনে মাত্র একটা কায়স্থ পরিবারের সদস্যদের চাকরিপ্রাপ্তির উদাহরণ নিয়ে আলোচনা করব।
আওরঙ্গজেবের আমলে নুশকা-ই-দিলখুসার লেখক ভীম সেন ছিলেন সাকসেনা গোষ্ঠীর কায়স্থ। তিনি আওরঙ্গজেবের জীবনের শেষ সময়ে অবসর নিয়ে নুশকা-ই-দিলখুসার বই লেখা শুরু করেন। লেখা শেষ হবে আওরঙ্গজেবের প্রয়াণের পর। ভীম সেনের পরিবারের উল্লেখযোগ্য বিষয় হল প্রায় প্রত্যেক পুরুষ সদস্য আওরঙ্গজেবের সিংহাসনে ওঠার আগে থেকেই মুঘল প্রশাসনে কাজ করবেন। পরিবারের সদস্যদের চাকরি পাওয়ার ধারাবাহিকতা চলতে থাকবে আওরঙ্গজেবের প্রয়াণের সময় পর্যন্ত, যে সময়ে ভীম সেন তার লেখাটি শেষ করছেন। সেখানেই আমাদের ভীম সেনের পরিবারের চাকরি পাওয়ার বয়ান শেষ হবে।
ভীম সেনের পূর্বজরা আজকের উত্তর প্রদেশের এটাওয়ার বাসিন্দা। নুশকা-ই-দিলখুসা থেকে ঠাকুর্দার নাম স্পষ্ট জানা যাচ্ছে না — হয় ছোবাল, ছোমাল বা জমাল — যে কোনও একটা হতে পারে। জমালের বড় পুত্র ভুখনদাস। আওরঙ্গজেবের সুবাদারির সময় জীবিকা নির্বাহ করতে ভুখনদাস দক্ষিণে প্রধান মুঘল সেনা ছাউনি বুরহানপুরে অভিবাসিত হন। বৃহত্তর পরিবারকেও সঙ্গে নিয়ে যান। আওরঙ্গজেবের রাজত্বের চতুর্থ বছরে তিনি মারা যান। ভীম সেনের বড় কাকা ভুখনদাসের আমলেই ভীম সেনদের সাকসেনা পরিবার মুঘল প্রশাসনের সেবায় নিযুক্ত চাকরিজীবী পরিবার হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে – কারণ তার হাত এবং রাস্তা ধরেই পরিবারের অধিকাংশ সদস্য মুঘল প্রশাসনের নানান চাকরিতে ঢুকবেন। মুঘল প্রশাসনের সেবাদার হিসেবে পরিবারের পরিচিতি তৈরিতে ভুখনদাসেরই অবদান সর্বাধিক। তাঁর জীবন শুরু হয় সুবাদার শাহজাদা আওরঙ্গজেবের দক্ষিণের প্রশাসনের গোলাবারুদ বিভাগের মুশরিফ, এবং একই সঙ্গে দেওয়ানের দফতরের পেশদাস্ত হিসেবে। স্বয়ং শাহজাদার উদ্যোগে এবং সুপারিশে তিনি কিছুটা বড় মনসবের অধিকারী হন। সিংহাসনের লড়াইতে দেওয়ান মুলতাফত খান প্রয়াত হলে, সিংহাসনে আরোহণ করে আওরঙ্গজেব দক্ষিণের সামগ্রিক মুঘল প্রশাসনের দেওয়ানির নিয়ন্ত্রণ অর্পন করেন ভুখনদাসের হাতে। পদমর্যাদা বাড়ায় ভুখনদাসের মনসব আরও বাড়ে। সরকারিভাবে ভুখনদাস দিয়ানত রায় উপাধি পেলেন। দক্ষিণের দেওয়ানির নিয়ন্ত্রণ এল ভুখনদাসের হাতে।
ভুখনদাস দিয়ানত রায়ের দুই পুত্র যোগরাজ, সুখরাজ। যোগরাজ ফিলখানা বা হাতির আস্তাবলের মুশরিফ নিযুক্ত হন। বাবা মারা যাওয়ার পরে তাঁর মনসব বাড়ে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে বাবা, ঠাকুর্দার মৃত্যুর পরে পরেই আওরঙ্গজেবের শাসনকালের চতুর্থ বছরে ১৬৬০-এ তিনিও মারা যান। সুখরাজকে মনসব দিয়ে আবদারখানা আর তাম্বুলখানার মুশরিফ নিযুক্ত করা হল। আওরঙ্গজেব পাকাপাকিভাবে ১৬৮০তে দক্ষিণে চলে আসবেন। মদ্যপানজনিত রোগের কারণে সুখরাজের স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটতে থাকে। ১৬৮৭তে সুখরাজ মারা যান। সুখরাজের একমাত্র পুত্র দয়ালদাসও বাচ্চা বয়সে মারা যান।
ভীম সেনের আরেক কাকা গোকুলদাস বেশ কিছু কাল বেকার ছিলেন। দক্ষিণে মুঘল বাহিনীর প্রধান সেনানায়ক জয় সিংহকে অনুরোধ করে তাঁর ভাই রঘুনাথদাস, গোকুলদাসকে দক্ষিণের বাহিনীর মুশরিফের চাকরি পাইয়ে দেন। তিনি ১৬৭০-এ অপুত্রক অবস্থায় মারা যান। ভীম সেনের আরেক কাকা শ্যমাদাস। ১৬৫৮-য় তাঁকে দক্ষিণের বখশির পেশদাস্ত পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
রাজা যশোবন্ত সিংহর সেনাপতিত্বের সময় ভীম সেনের নাম আমরা প্রথম শুনি। যশোবন্ত সিংহ শাহজাদা মুয়াজ্জমের প্রশাসনে ভীমসেনের নাম সুপারিশ করেন তাঁর পরিবারেরই শ্যামাদাস বকশিগিরির সিলমোহর লাগিয়ে। ১৬৮০-তে শ্যামাদাস অসুস্থ হলেন। অসুস্থতার সংবাদ পুত্র হর রাইকে দেওয়া হয়। তিনি শ্যামাদাসকে আওরঙ্গাবাদে নিয়ে আসেন। দক্ষিণের বকশি দপ্তরের পেশদাস্ত বিভাগ হর রাইয়ের চাকরির সুপারিশ করোলে তাঁর চাকরিটি হয়। শ্যামাদাসও চাকরি করতেন। তিনি ১৬৮০-তে মারা যাবেন। শ্যামাদাসের পুত্র হর রাই গোলান্দাজি বিভাগের মুশরিফ হিসেবে কাজ করে ১৭০২-তে মারা যাবেন। তাঁর মৃত্যুর পরে কন্যার ছেলেকে (ভীম সেন নামোল্লেখ করেন নি) মনসব দিয়ে এই পদে নিযুক্ত করা হবে।
ভীম সেনের ছোট কাকা ধর্মদাসও গোকুলদাসের মত পুত্রহীন। তিনি বুরহানপুরে মুঘল কারখানার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ধর্মদাস ১৬৬০-এ খণ্ডেশের মুশরিফ নিযুক্ত হন। ভীম সেন সূত্র জানছি তাঁর কিছু আত্মীয় চাকরিতে ঢোকেন, কিন্তু বইতে তাদের নাম পাওয়া যায় না। যতদূরসম্ভব ভীম সেনের মৃত্যুর পর তিনি মারা যান, কারণ ভীমসেনের লেখায় কাকা ধর্মদাসের মৃত্যুর সংবাদ পাই নি।

ভীম সেন সাকসেনাদের বংশলতিকা
ভুখনদাসের ছোট ছেলে ভীম সেনের বাবা রঘুনন্দনদাস বুরহানপুরে নগদ অর্থে মাইনের বিনিময়ে বুরহানপুরে মুঘল প্রশাসনে চাকরি করছেন। এ সময় তার দপ্তর সম্বন্ধে বিশদ জানা যায় না। মুলতাফত খানের মৃত্যুর পরে ভুখনদাস দেওয়ানি দপ্তরে নিযুক্ত হলেন, তোপখানার মুশরিফ হলেন রঘুনন্দনদাস। তিনি বুরহানপুরে পরিবার রেখে আওরঙ্গাবাদে শাহজাদা মুয়াজ্জমের প্রশাসনে মুশরিফের কাজ করতে থাকেন। শাহজাদা মুয়াজ্জমকে দরবারে ডেকে নেওয়ার বছরে তিনি ১৫০ জাট আর ১০ সওয়ারির মনসবের অধিকারী হলেন। দেওয়ান আমানত খানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হল। তিনি মন দিয়ে তাঁর কাজ সমাধা করতেন। সেই ঘনিষ্ঠতার সুযোগ তিনি কাজে লাগাবেন।
আওরঙ্গজেবের তৃতীয় শাসন বছরে শায়েস্তা খানের বাহিনীর সঙ্গে আরও ১০হাজার অশ্বারোহী, পদাতিক, বন্দুকচি (এবং গোলান্দাজি) বাহিনী যুক্ত করার নির্দেশ জারি হলে বাহিনীর প্রধান জাফর খান বাহিনীটির তদারকি এবং অন্যান্য কাজের সম্পর্ণ দায়িত্ব অর্পণ করেন রঘুনন্দনদাসকে। রঘুনন্দনের কর্মদক্ষতার সুনাম তাঁকে আরও কিছু দপ্তরের কাজে নিযুক্ত করাল। রঘুনন্দনদাস দক্ষিণের সুবার তোপখানার মুশরিফ ছিলেন, তাকে বদলি হওয়া গোকুলদাসের জায়গায় এনে অতিরিক্ত দায়িত্ব দেওয়া হল দক্ষিণের বাহিনীর তোপখানার মুশরিফের পদে।
১৬৬৭-তে যশোবন্ত সিংহ দক্ষিণ সুবার মুঘল বাহিনীর প্রধান সেনাপতির ভার নিলেন। তাঁর অধীনে দক্ষিণের সুবার তোপখানা মুশরিফের কাজ সামলে রঘুনন্দনদাস অবসর গ্রহণ করেন ১৬৬৭-তে। সেই পদে পুত্র ভীম সেনকে নিযুক্তির ব্যবস্থা করেন। রঘুনন্দনদাস ১৬৮০-তে মারা যান।
রঘুনন্দনদাসের বড় ছেলে, আমাদের আলোচ্য লেখক ভীম সেন। অন্য দুই পুত্র শীতলদাস আর হামির সেন। রঘুনন্দনদাস পুত্র ভীম সেনকে কাজে নিযুক্ত করলেও বহুকাল তাঁর চাকরি হয় নি। প্রচুর ঘোরাঘুরি করার পর যশোবন্ত সিংহের সেনা প্রশাসনে দাগ আর তাশিহা দপ্তরের দায়িত্ব পান দক্ষিণের দাউদ খানের সেনার বকশিগিরি আর ওয়াকিয়ানবশি মীর আবদুল মাবুদের সুপারিশক্রমে। তিনি মনসবও পান। ১৬৬৯ থেকে পেশদাস্ত আর ওয়াকিয়ার [তথ্য রাখার দপ্তর] ভার ভীম সেনকে দেওয়া হয়। ভীম সেন জানাচ্ছেন একদা হরকরাদের [খবরদার, যারা সংবাদ আনত] দপ্তর ছিল না, তিনি কয়েকজন হরকরার দায়িত্বে ছিলেন।
ভীম সেনের চাকরির সুপারিশদাতা মীর আবদুল মাবুদ পরিখায় পড়ে আশংকাজনকভাবে আহত হলে তাঁকে দপ্তরে আসা বন্ধ করে দিতে হয়। তার দপ্তরের দায়িত্ব ভীম সেনকে দেওয়া হয়। মীরের সিলমোহর ভীম সেন নিজের কাছে রাখার অনুমতি পেয়েছিলেন [মাথায় রাখতে হবে ভীম আর মীর দুজনেই দাউদ খানের প্রশাসনের অধীনে ছিলেন]। আওরঙ্গাবাদ থেকে সেনার বেতন আসছিল না, ফলে বেতন বিতরণের হিসাব কিতাব রাখা হচ্ছিল না। দাউদ খান ভীমকে বললেন, ‘সম্রাটের খাজাঞ্চিখানা থেকে আমীর অভিজাত আর মনসবদারদের বেতন হয়। আমাদের হাতে কিছু নগদ অর্থ আছে আর তোপখানার নিয়ন্ত্রণ আছে। মাইনে না পেয়ে কর্মচারীদের অবস্থা খারাপ। একাউন্ট এখানে আসার আগেই মীরের সিলমোহর লাগিয়ে কর্মচারীদের মাইনে দাও’। ভীম সেন দাউদ খানকে জানান সাধারণত করণিকেরা [কায়স্থ] হিসেব রাখার কাজ করেন, তাঁর অধীনে একজনও করণিক নেই। ১৬৭০-এ দাউদ তাঁকে স্বাক্ষর করে লিখিতভাবে জানান দপ্তরের হিসাব কিতাব রাখার দায় তাকে নিতে হবে না, এবং ভবিষ্যতে তার থেকে কোনও কৈফিয়ত চাওয়া হবে না। কর্মচারীদের রিজার্ভ ফান্ড থেকে কয়েক মাসের মাইনে দেওয়া হল। ১৬৭০-এ যখন সেনার একাউন্ট আসার পরে ভীম সেনের থেকে হিসেব চাওয়া হলে তিনি আর দাউদ খান তাদের সন্তুষ্ট করেন।
১৬৭১-এ মোহাব্বত খান দক্ষিণে এলেন, দাউদ খানকে কেন্দ্রে সম্রাটের কাছে ডেকে নেওয়া হল। দক্ষিণ ছাড়ার সময়েও তিনি ভীম সেনকে তাঁর সঙ্গে উত্তরে যেতে বললেন এবং তাঁকে বড় পদ পাওয়াবার প্রতিশ্রুতি দিলেন। কিন্তু ভীম সেন যান নি। ১৬৭২-এ ভুখনদাসের বন্ধু শুভকরন বুন্দেলার সঙ্গে ভীম সেনের আলাপ হয়। শুভকরন বুন্দেলার ছেলে দাতিয়ার রাজা রাও দলপত বুন্দেলা। শুভকরন ভীম সেনকে ভাইপো ডাকতেন। ১৬৮৯ থেকে ভীম সেন দলপতের মুন্সি হিসেবে বাকি জীবন কাজ করবেন, তার সঙ্গেই থাকবেন। ১৭০৭-এ রাও দলপতের যুদ্ধে মৃত্যু হলে তিনি অবসর নিলেন। ভাই শীতলদাসের দুই পুত্র শম্ভুনাথ আর বিরঝুখানকে জাহান্দারশাহ বাহাদুরের প্রশাসনে নিয়োগ করে, নিজে গোয়ালিয়রের দাতিয়ায় বাস করে স্মৃতিকথা লেখার কাজ শুরু করবেন।
ভীম সেনের ভাই শীতলদাস মুঘল প্রশাসনে কাজ করতেন। তাঁর বাবা শীতলদাসকে ১৬৬৯-তে দক্ষিণের গিয়াসুদ্দিন খানের বকশি হিসেবে মুঘল হিন্দুস্তানে পাঠালেন। গিয়াসুদ্দিন সুরাটের মুতাসাদ্দি নিযুক্ত হলে, তাঁর প্রশাসনে শীতলদাস কাজ করয়েছেন। তিনি আওরঙ্গাবাদে ১৬৮০-তে মারা যাবেন। ভীম সেনের ছোট ভাই হামির সেনও মুঘল প্রশাসনে কাজ করেছেন। হামির সেনের ছেলের নাম হিম্মত রাই, জন্ম ১৬৯৫-তে। তাঁর সম্বন্ধে কিছুই জানা যায় না।
আমরা দেখলাম আওরঙ্গজেবের রাজত্বজুড়ে একটিমাত্র হিন্দু পরিবারের প্রায় প্রত্যেকটি পুরুষ সদস্য চাকরি করেছেন মূলত মুঘল প্রশাসনের মুশরিফ আর মুস্তৌফি পদে। স্বয়ং আওরঙ্গজেব ভুখনদাসের মত দক্ষ কিন্তু অমুসলমান কায়স্থকে দক্ষিণের সামগ্রিক দেওয়ানির দায়িত্ব দিতে সংকোচ বোধ করেন নি। আমরা এম আতাহার আলি সূত্রে জেনেছি আওরঙ্গজেবের রাজত্বকালে ওপরেরতলার মনসবদের ৩১% ছিলেন অমুসলমান। ভীম সেনের পারিবারিক ইতিহাস এবং আগে আলোচিত হিন্দু মুনশিদের সূত্রে দেখলাম প্রস্বানের মাঝারিস্তরের পদগুলোতেও হিন্দু কর্মচারীদের সংখ্যা খুব একটা কম ছিল না — একটি পরিবার থেকেই দুই অঙ্কের মুঘল আমলার নাম পাচ্ছি। (চলবে)