| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ইফতিতাইসুলতানিওয়াশুল-ই-কুল : আকবর এবং আওরঙ্গজেব (৭৪ নং কিস্তি) : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ২৪৩ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ৩১ আগস্ট, ২০২২

ছোটবেলা থেকেই দারা-আওরঙ্গজেবের ঠাণ্ডা লড়াই পরিপূর্ণ এবং প্রকাশ্য রূপ পাবে আওরঙ্গজেবের বলখে আবদুল আজিজ খানের বিরুদ্ধে তাঁর প্রবাদপ্রতিম বিজয় এবং বিখ্যাত হয়ে ওঠার পরের সময়ে মুলতানে সুবাদারিত্বের যুগে। বিপক্ষের বিরুদ্ধে সফল যুদ্ধ মহড়া এবং দক্ষ হাতে প্রশাসন চালানোর অননুকরণীয় দক্ষতা অর্জনটি ক্ষমতার অলিন্দে নিরাপদে বসে থাকারা যে বাঁকা চোখে দেখছে, এ তথ্যটা স্পষ্ট হয়ে যায় পরবর্তী কালের ঘটনাক্রমে। দরবারি ক্ষমতা হাতে থাকায় সুলতান-দারা-জাহানারা অক্ষ আওরঙ্গজেবকে অপদস্থ করার কোনও সুযোগই বাদ দিলেন না [যদিও এই অক্ষের একমাত্র জাহানারা, ভাই আওরঙ্গজেবকে কিছুটা প্রশ্রয় দিতেন। আওরঙ্গজেব জানতেন জাহানারা তাঁর থেকে বেশি পছন্দ করেন দারাকে, তবুও তিনি তাঁর দরবার পীড়নে উৎসারিত দুঃখ কষ্ট দূর থেকে জাহানারাকেই জানাতেন]। তাঁকে প্রকাশ্যেই অপদস্থ করার বেশ কয়েকটা ঘটনা আমরা আওরঙ্গজেবের মুলতানের সুবাদারিত্বের সময় লক্ষ্য করব। শুধু মুলতানের চাকরিতেই নয়, আগামী দিনের কর্মক্ষেত্রগুলোয় সম্রাট-দারা-জাহানারার দরবারি ক্ষমতাশালী অক্ষ আওরঙ্গজেবের সাম্রাজ্য সবল করার প্রতিটা পদক্ষেপে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। দাঁতে দাঁত চেপে নিজের অধিকার এবং সাম্রাজ্যের গরিমা রক্ষায় সর্বস্ব পণ করে দরবারি অক্ষের বিরুদ্ধে সিংহাসনের লড়াই শুরু হওয়ার সময় পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবেন।

সিন্ধু অববাহিকা অঞ্চলে আইন শৃংখলা বলবত করা, রাজপথে ডাকাতদের অত্যাচার রোধ করা এবং দুর্বৃত্ত গোষ্ঠীপতিদের স্বেচ্ছাচারিতা নিবৃত্ত করার প্রকরণ পদ্ধতি প্রয়োগের অনুমতি চেয়ে আওরঙ্গজেবের সম্রাট শাহজাহানকে পাঠানো যুক্তিপূর্ণ চিঠিগুলো তাঁর প্রশাসনিক যোগ্যতার বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে। সিন্ধু অঞ্চলে বহু দুর্বৃত্ত জমিদার, গোষ্ঠীপতি এই অঞ্চলের নানান টুকরো টুকরো এলাকা তাদের মত করে নিয়ন্ত্রণ করত, আইনশৃঙ্খলা তাঁদের মত করে বজায় রাখত। তাদের কাজকর্মে বারংবার এই অঞ্চলের শান্তি বিঘ্নিত হচ্ছিল। এই অঞ্চল দিয়ে যেহেতু এশিয় বাণিজ্য রাজপথের গুরুত্বপূর্ণ অংশ গিয়েছে, তাই সুবাদারের অন্যতম লক্ষ্য ছিল রাজপথের নিরাপত্তা বিধান করা। অতীতে মুলতানে চাকরি করতে যাওয়া মুঘল সুবাদারেরা সিন্ধু অঞ্চলে ভেঙেপড়া আইন শৃঙ্খলা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে আনতে ব্যর্থ হয়েছেন। আওরঙ্গজেব প্রায় এক বছরের চেষ্টায় দুর্বৃত্ত গোষ্ঠীগুলিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং সেই অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসে।

দেখাগেল সুবাদারিত্বের প্রথম সময় থেকেই দুই বালুচ আদিবাসী গোষ্ঠী হট এবং নুহানিদের সঙ্গে আওরঙ্গজেবের প্রশাসনিক সম্পর্ক তলানিতে ঠেকেছে। আদাবইআলমগিরি সংকলনের প্রথম চিঠিতে সম্রাটকে আওরঙ্গজেব লিখছেন ‘[দারার অনুগৃহীত] ইসমাইল, পৃষ্ঠপোষক দাদা ভায়ের [দারা] সই করা চিঠি আমায় পাঠাল, নিজে এল না।’ আওরঙ্গজেবের মুলতানে আসার আগে থেকেই হট প্রধান ইসমায়েল সুবাদারদের ডিঙ্গিয়ে সরাসরি দরবারের যোগাযোগ রাখতেন। সম্রাট, দারা এবং অন্যান্য ক্ষমতার অংশকে নানান ধরণের মনোমুগ্ধকর উপঢৌকন দিয়ে, তাদের রসেবশে রেখে প্রায় সকল ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর প্রিয়পাত্র হয়ে দরবারে বিরাজ করতেন তিনি। আওরঙ্গজেবের আগের সময়ের চাকুরিজীবি সুবাদারেরা দরবারের ক্ষমতাশালীদের সঙ্গে দহরম-মহরম করা মুলতানি গোষ্ঠী প্রধানের সুবার প্রশাসনকে উপেক্ষা করার প্রচেষ্টা দমন করতে সাহস পায় নি। স্বভাবমত কেন্দ্রীয় দরবারের প্ররোচনায় উদ্ধত ইসমায়েল প্রকাশ্যে নতুন সুবাদার শাহজাদা আওরঙ্গজেবকেও অগ্রাহ্য করলেন। তাঁর প্রশাসনিক এলাকা লাহোরের লাগোয়া। সেই অজুহাতে সুবাদারকে স্পষ্ট জানালেন, তার গোষ্ঠী এবং অঞ্চল কেন্দ্রিয় সরকারের অধীন। তিনি আর তাঁর গোষ্ঠী মুলতানের সুবাদারের নিয়ন্ত্রণ মানতে বাধ্য নন।

ইসমায়েলের এই অবস্থান স্বাভাবিকভাবে আওরঙ্গজেবের পছন্দ হয় নি। নিজের অধিকার রক্ষায় দুপক্ষের ওপরেই চাপ তৈরি করলেন। কিন্তু ইসমায়েলের হাতিয়ার আওরঙ্গজেবের দাদা ভাই দারার প্রকাশ্য প্রশ্রয় এবং দরবারি নিরাপত্তা’ [Isma’il set up a letter of Dada Bhai as an authority, and did not come.]। নানান অজুহাতে আওরঙ্গজেবের শাসন বারবার কর্তৃত্ব অস্বীকার করতে থাকলেন। ঘাড়কেঁদো আওরঙ্গজেব ঠারেঠোরে দরবারকে জানালেন সুবায় বিদ্রোহের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই অবস্থা তার পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। এই ধরণের গোষ্ঠীপতির উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে প্রশ্রয় দেওয়া যে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্মান এবং স্বার্থ হানি, সেই বাস্তবতাটা নিজের স্বার্থ দেখা দরবারি কোনও পক্ষই ক্ষমতাসীনদের জানাতে চাইছে না। সম্রাটকে বোঝালেন, তিনি মুলতানের সুবাদার, তার অধীনে এই আদিবাসী গোষ্ঠী শাসিত হওয়াটাই [তৎকালীন সময়ের সাম্রাজ্য রক্ষার দস্তুর]। সুবা পরিচালনায় এই ধরণের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ তিনি মেনে নেবেন না। হটদের বাগে আনতে তিনি পরিকল্পনা ছকলেন। এবারেও নতুন করে তাঁর নেতৃত্ব যোগ্যতা প্রমাণিত হল।

দারার আশীর্বাদ সম্বল করে ইসমাইল, আরেকটি বালুচ গোষ্ঠী বাবরির নেতা মুবারক বালুচদের তিনটে কেল্লা গায়ের জোরে দখল করেছে। মুবারক ইসমাইলের স্বেচ্ছাচার (তাজাল্লুম) আওরঙ্গজেবকে জানালেন। মুবারকের অভিযোগ পেয়েই আওরঙ্গজেব আফগান বাসাদকে পাঠিয়ে কেল্লাগুলো দখল নিয়ে তাকে এই ধরণের কাজ না করতে হুঁশিয়ারি দিলেন (দিগর পিরামুনইইন হরকত নাগারদাদ)। বিপুল সামরিক চাপ তৈরি করলেন। ঐতিহাসিক ওয়ারিশ বলছেন ইসমাইল দারাকে একটা দামি ঘোড়া পেশকাশ পাঠালেন। দারা তাকে খান উপাধি দিলেন। দারার প্রশ্রয় পেয়েই ইসমাইল মুবারকদের কেল্লাগুলো পুনর্দখল করল। অতীতে সে এরকম বহু ঘটনা ঘটিয়েছে কিন্তু শাস্তি পায় নি। মুবারক আবার আওরঙ্গজেবের কাছে বিচার চাইতে এলেন। আওরঙ্গজেব ঠিক করলেন ইসমাইলের এই বেয়াদপি মাফ করা যাবে না। শায়েখ মীরকে পাঠালেন স্বপ্নের ঘোরে থাকা মাথামোটা ইসমাইলকে গুরুতর শাস্তি দিতে। শায়েখ বাহিনী নিয়ে ইসমাইলের অঞ্চলে ঢুকতেই ইসমাইল আর স্নায়ু ধরে রাখতে পারল না। কেল্লাগুলো হাত বদল করল। শায়েখ মীরকে জানাল সে মুলতানে আসতে আগ্রহী। শায়েখ, মীর ইসমাইলের গুরুতর অপরাধ ক্ষমা করলেন। তিনি ইসমাইলকে সঙ্গে নিয়ে আওরঙ্গজেবের দরবারে এলেন। ইসমাইল বুঝল সুবার ক্ষমতাসীনকে চটিয়ে, শুধুই দূর দেশে দরবারে সম্পর্ক তৈরি করে সুবায় ক্ষমতা ধরে রাখা যায় না, অনেক সময় প্রাণও সংশয় হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। আওরঙ্গজেব জানেন ইসমাইলের আত্মসমর্পণ কান্দাহার অভিযানে সহায়ক হবে। তিনি সম্রাটকে লিখছেন ইসমায়েলের ক্ষমতা প্রচুর, প্রচুর সেনাও তার তাঁবেতে আছে। ফলে কান্দাহার অভিযানের আগে নুহানিদের শাস্তি দিতে ইসমাইলের সাহায্য মুঘলদের কাজ লাগবে। কান্দাহারে রসদ পাঠাতেও ইসমায়েলিত সাহায্য মুঘল বাহিনীর কাজে আসবে।

আরেকটি মাথা না নামানো বালুচ গোষ্ঠী নুহানি। তাদের সঙ্গেও সুবাদারের বিরোধ ছিল। আগেই বলেছি কান্দাহারে ঘটতে থাকা বেশ কিছু ঘটনায় আওরঙ্গজেব বুঝতে পারছিলেন হয়ত কিছু দিনের মধ্যেই মুঘল সাম্রাজ্যকে কান্দাহার অভিযানে অংশ নিতে হবে। মুলতান থেকে কান্দাহারে যাওয়ার রাজপথ নুহানি গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে থাকা জমির ওপর দিয়ে গিয়েছে। তাঁকে এই ভৌগোলিক এলাকার মধ্যে দিয়েই কান্দাহারে বাহিনী নিয়ে যাওয়ার যোগ্য রাস্তা তৈরি করাতে হবে। আওরঙ্গজেব নুহানি গোষ্ঠী-প্রধান আলম খানের কাছে দূত পাঠিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চাইলেন, নানাভাবে বন্ধুত্বের হাতও বাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু আলম খান সুবাদারের সঙ্গে দেখা করতে অস্বীকার করে এলেন না। শেষ অবদি আওরঙ্গজেবকে সেনা ব্যবহার করতে হল। নুহানি প্রধান আওরঙ্গজেবের নেতৃত্ব মানলেন এবং আনুগত্য প্রকাশ করলেন। এই অঞ্চল দিয়ে কান্দাহার যাওয়ার রাস্তা তৈরি করা নিয়ে আদাবইআলমগিরির অনুবাদক টিকাকার ভিনসেন্ট জর্জ এডামস ফ্লিন বলছেন The excellent arrangements Aurangzib has begun to prepare the roads to the crest of the Khojak pass for the troops and their equipment deserve close attention. There is no doubt that he was better prepared than the British forces were in 1878, for all that railways had been pushed well up into the hills.

প্রস্তাবিত বন্দর তৈরি নিয়েও দরবারের সঙ্গে বিবাদ বাধল। তাঁর এই প্রস্তাবও অস্বীকৃত হল। আওরঙ্গজেব সিন্ধের মানুষদের ব্যবসা করতে উৎসাহিত করতেন। ষোড়শ শতাব্দে থাট্টা আন্তর্দেশিয় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এই অঞ্চল সিন্ধু নদী মার্ফৎ মুলতান এবং লাহোরের সঙ্গে জুড়ে থাকত। এক সময় লরি বন্দর পর্যন্ত ৩০০ টনের জাহাজ করে বিপুল পণ্য পরিবাহিত হত। জেমস রেনেল লিখছেন, ‘গত শতাব্দে [আওরঙ্গজেবের সুবাদারির সময়ে] থাট্টা বেশ বড় এবং জনাকীর্ণ শহরের রূপান্তরিত হয়। এই শহর প্রধান আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবেও গণ্য হয়েছে। এই অঞ্চল সুতি, পশম পণ্য এবং আসবাবপত্র তৈরি করে বিভিন্ন এলাকায় রপ্তানি করেছে’।

বহুকাল ধরেই সমুদ্রগামী নদীতে পলি জমেছিল। যার ফলে এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচল কমতে কমতে, আওরঙ্গজেবের প্রশাসনিক সময়ে থাট্টায় নদীপথ ব্যবসা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। তিনি এখানে নতুন বন্দরের পরিকল্পনা করলেন। ভাবনা ছিল ১৬৫১য় সিন্ধু নদীর ওপরে নতুন বন্দর [যার নাম উল্লিখিত হয় নি] চালু হয়ে যাবে। স্বাভাবিকভাবে দরবারে তাঁর বিরোধীরা প্রবল বাধা তৈরি করে শাহজাহানকে বোঝাল আওরঙ্গজের নিজের রোজগার বাড়াবার জন্যে বন্দর তৈরির কাজে হাত দিয়েছেন। তিনি এ বাবদে দরবারকে প্রয়োজনীয় হিসেবপত্র জমা দিচ্ছেন না। তাঁর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ উঠল তিনি জাহাজ নিয়ে ব্যবসা করে বিপুল সম্পদের মালিক হচ্ছেন। প্রকাশ্যেই বিরক্তি দেখিয়ে সম্রাট শাহজাহান সুবাদার পুত্রকে চিঠি দিয়ে বন্দর বিষয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং সেটির হিসেব কিতাব দরবারে জমা দিতে নির্দেশ দিলেন।

আওরঙ্গজেব সম্রাটকে তাঁর অবস্থান বুঝিয়ে লিখলেন যে তাঁর যে জাহাজ আছে, সেটা খুব বড়ও নয়, তখনও ব্যবসার অনুকূল হয় নি। তিনি নিজের ব্যবসা বাড়াবার জন্যে বন্দর তৈরি করার প্রস্তাব দিচ্ছেন না, বরং বন্দর তৈরি করে অঞ্চলে প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া ব্যবসা বাড়াবার ভাবনা ভাবছেন। তিনি বন্দরের পরিকল্পনা এবং রোজগার বিষয়ে সম্রাটকে বুঝয়ে লিখলেন ‘The income of ports (banadir) depends upon (munhasir) two things; the duty of ten per cent upon trade-goods, (‘ushr-imal-i-tujjar) and on passengers’ fares (naul) and freight (kiraya) বন্দরের রোজগার দুটো বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল — আমদানি রপ্তানির ওপরে ১০% রাজস্ব (উসর-ইমাল-ই-তুজ্জর) এবং যাত্রীদের থেকে আদায় করা ভাড়া (নাউল) আর মালের ওপর শুল্ক (কিরায়া)। আপনার মুরিদের একটাই জাহাজ তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সেটি বর্তমানে সুরাটে আছে, এই বছর নতুন বন্দরে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছি। এখনও এটি ব্যবসাযোগ্য হয় নি। শাহী সরকারের একটি জাহাজ তৈরি হচ্ছে, কিন্তু জলে ভাসার জন্যে সেটি এখনও যোগ্য হয়ে ওঠে নি। অন্যান্য বন্দরের জাহাজ, এই বন্দরে এখনও আসা শুরু করে নি। অন্যান্য এলাকার ব্যবসায়ীও এই বন্দরে আসছে না। বন্দরের সঙ্গে একটা কেল্লা, একটা জাহাজঘাটা  তৈরি করা হয়েছে। সর্বশক্তিমানের ইচ্ছে হলে এটি সমৃদ্ধ বন্দরে পরিণত হবে, ক্রমশ আয়ের সুযোগ করে দেবে।  বন্দরটি তৈরি হলে আমি নিজের হাতে মহামহিমকে নানান ধরণের রেয়ার অদ্ভুত জিনিসপত্র আমদানি করে উপহার দিতে পারব। এইসব কাজ যদি শুরুই না হয়, তাহলে বন্দরের আয়-ব্যয় কীভাবে জানা যাবে [অর্থাত এখন যে বন্দরে কোনও আয় নেই, সেই বন্দরের আয়-ব্যয় কিসের ভিত্তিতে তৈরি হবে]’। যে বন্দর তৈরি শেষ হয় নি, সেই বন্দরের কিসের হিসেব চাইছে কেন্দ্র, সে বিষয়টা আওরঙ্গজেব বুঝে উঠতে পারেন নি – ফলে তাঁর পক্ষে হিসেব জমা দেওয়া সম্ভব হয় নি। দরবার তাঁকে বন্দর তৈরির উদ্যমকে উৎসাহিত করল না। আওরঙ্গজেবের আরও একটা পরিকল্পনা দরবারের সক্রিয় বিরোধিতায় নষ্ট হল।  সিন্ধুতে বন্দর তৈরির উদ্যম বিশবাঁও জলে ডুবল।

এইভাবে আওরঙ্গজেবের মুলতান এবং সিন্ধু প্রদেশের সুবাদারির কালে প্রায় প্রত্যেকটি প্রস্তাবে বাধা তৈরি করতে থাকে কেন্দ্রীয় শাহজাহান সরকার। অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার উদ্যম নিয়ে আওরঙ্গজেবের মনে হচ্ছিল এই অঞ্চলে তাঁর হাতে যে পরিমান বাহিনী আছে সেটা আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার কাজে যথেষ্ট নয়। তাছাড়া আগামী দিনে তাঁকে কান্দাহার অভিযানে নেতৃত্ব দিতে হতে পারে। তার আরও বড় বাহিনী দরকার। সেনা সংখ্যা বাড়ানোর জন্যে তাকে আরও একটু বড় জায়গির বরাদ্দ করার প্রস্তাব দিলেন। জায়গির বাড়ানো তো দূরস্থান, জায়গিরের এলাকা সম্রাটের নির্দেশে কমানো হল। তিনি লিখলেন, ‘আমার হাতে যে পরিমাণ জায়গির আছে, তাতে আমি ১০ মাসের মাইনে জোগাড় করতে পারছি, নতুন জায়গিরে খুব বেশি হলে আমার ৭ মাসের মাইনের সংকুলান হচ্ছে… তাছাড়া বিগত তিন বছর এই অঞ্চলে বিপুল প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে এসেছে[এই অবস্থা আমি সামাল দেব কী করে জানি না]’। সমস্যার সমাধানে সম্রাটকে আর্থিক সাহায্য প্রার্থনা করলেন সুবাদার। উত্তরে সম্রাট শাহজাহান ব্যাঙ্গের স্বরে লিখলেন, ‘[তোমার যদি অর্থ যথেষ্ট না থাকে] কেন তুমি সেনাদের সোনার মোহর [মাইনে হিসেবে] দিচ্ছ না?’ ক্ষুব্ধ আওরঙ্গজেব দিদি জাহানারাকে লিখলেন, ‘সম্রাট সোনার মোহরে মাইনে দেওয়ার কথা বলছেন, কিন্তু সম্রাট কী জানেন না বিধিবদ্ধ কর্জ মেটাবার পরে আমার কাছে সেনাদের বেতন দেওয়ার জন্যে মাত্র ১ মাসের অর্থ জমা আছে?’

মুলতানে তীব্র দরবারি বাধার মুখোমুখি হলেন শাহজাদা বন্দর তৈরি করা নিয়ে। বাধ্য হয়ে সেই পরিকল্পনা জলাঞ্জলি দিলেন। দরবারি অভয়হস্ত মাথায় রাখা এক বালুচ গোষ্ঠীকে তিনি নিজের শর্ত মানতে বাধ্য করলেন। তার নিজের রোজগার বাড়াবার প্রস্তাব তো মানাই হল না, বরং রোজগার কমিয়ে দেওয়া হল। দরবার তাঁর প্রশাসনিক জীবনে যে সব সমস্যা তৈরি করছে, সেসব সমাধান একমাত্র তাকেই সমাধান করতে হচ্ছে। তো সেই সব সমস্যা জানিয়ে দিদি পাদিশা বেগম জাহানারাকে ঘন ঘন আওরঙ্গজেবের চিঠি লেখা থেকে কী আমরা আন্দাজ করতে পারি সম্রাট-আওরঙ্গজেবের সম্পর্ক ক্রমশ শীতল থেকে শীতলতর হওয়ার দিকে এগোচ্ছে! সেই সম্পর্ক আরও খারাপ হবে কান্দাহার অভিযানে আর দক্ষিণের সুবাদারিত্বের দ্বিতীয় পর্বে। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev