কান্দাহারে আওরঙ্গজেবকে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হল
আদাব-ই-আলমগিরির ২৫ তম চিঠিতে দেখছি সম্রাট আওরঙ্গজেবকে উজির, প্রধানমন্ত্রী শাদুল্লা খানের অধীনে সেনাপতি নিয়োগ করলেন। কান্দাহারের যুদ্ধে এই দুর্ভাগ্যজনক নির্দেশের প্রভাব পড়ল মুঘল বাহিনীর ওপর। মুঘল সেনাবাহিনীতে শাহজাদাদের মধ্যে আওরঙ্গজেবের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে কোনও প্রশ্নই ছিল না। বলখ জয়ের পরে আওরঙ্গজেবের নেতৃত্ব সেনাবাহিনীতে স্বাভাবিকভাবে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছয়। তাছাড়া এতদিন মুঘল সাম্রাজ্যর অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দিতেন হয় শাহজাদা না হলে খানজাদা। বিদেশের মাটিতে এরকম এক অভিযানে আওরঙ্গজেবকে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া এবং কাবুল থেকে যুদ্ধক্ষেত্রের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কী প্রভাব পড়বে সেটা আমরা এবারে দেখব। তাছাড়া আওরঙ্গজেবকে যে সেনাপতির বাহিনী দেওয়া হয়েছিল তাদের অধিকাংশ ছিল দারা পক্ষীয়। কোন কোন সেনাপতিকে কোন কোন এলাকায় মোতায়েন করা হল সেটা নিচের স্তবকে দেখব।
লাখ কেল্লার উলটো দিকে থাকলেন প্রধান সেনাপতিত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া আওরঙ্গজেব, কালিচ খান, শাহনাওয়াজ খান, রাজা পাহার সিং বুন্দেলা (বুন্দেলা রাজপুত। বীর সিং দেও’র ছেলে। শাহজাহানের সিংহাসনে ওঠার সময় ৩০০০/২০০০ মনসবদার। ঝুঝার সিংহের বিরুদ্ধে অভিযানে ছিলেন। ঝুঝারের জমির কিছু অংশ তাঁকে দেওয়া হয়। ১৬২৯-৩০-এ শায়েস্তা খানের সঙ্গে দক্ষিণে যান। তাঁকে রাজা উপাধি দেওয়া হয়। আওরঙ্গজেবের প্রথম দফার দক্ষিণ সুবাদারিত্বে খানইজামানের সঙ্গে ছিলেন, তারপরে সরাসরি আওরঙ্গজেবের অধীনে। ১৬৪৬-এ মুরাদ বখশ পালানোর বলখ অভিযানে আলিমর্দান খানের সঙ্গে যান। তিনি উজবেগী আর আলামানদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে যুদ্ধ করেন। ১৬৫৩-তে আওরঙ্গজেবের সঙ্গে আর পরে দারার সঙ্গে কান্দাহার অভিযানে যান। ফিরে আসার পরে তাঁকে নিজের বতনে ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। ১৬৫৩-৫৪-এ ‘তাঁর জীবনের পেয়ালা পরিপূর্ণ হল’ [মারা যান]); আলি কাবি দরজার উল্টোদিকে থাকলেন বাকি খান; চল্লিশ সিঁড়ির উলটো দিকে থাকলেন রাজা রাজরূপ(রাজা জগত সিংহের ছেলে। রাজা বাসুর নাতি। যদুনাথ সরকার লিখছেন, রাজরূপের বাবা ‘ভাও সিংহ’ ১৬৩৯-এ কান্দাহার অভিযানে যান। শাহজাহানের সময় ১৬৩৮-৩৯-এ কাংড়ার ফৌজদার নিযুক্ত হন। বলখ অভিযানে বাবা মারা গেলে তাঁকে ১৫০০/১০০০ মনসবদার আর রাজা উপাধি দেওয়া হয়। কান্দাহার থেকে প্রথমবার সেনা অপসারণের পর তাকে সীমান্ত চৌকি কামরুদের কেল্লার দায়িত্ব দেওয়া হয়। দ্বিতীয়বারও তাকে পাঠানো হয়। তৃতীয় অভিযানে তাঁকে কান্দাহারে পাঠানো হয়। তিনি শেষ অবদি দারার সঙ্গে মুলতানের যুদ্ধ পর্যন্ত ছিলেন। শেষে নিজের রাজ্যে [বতন] ফিরে যান; বিতস্তার তীরে খালিলুল্লা খানের সঙ্গে যোগ দেন। পরে আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে যোগ দেন। তাঁকে সুলেইমান শিকোহকে তাড়া করতে পাঠানো হয়, দেওরাইতে তিনি দারার বিরুদ্ধে দক্ষিণ-পূর্ব দিকের অক্ষের যুদ্ধ জেতেন। তাকে ১৬৬০-৬১-তে আওরঙ্গজেব কান্দাহারের সীমান্তে গজনীর দক্ষিণে পাঠান। সেখানকার লড়াইতে তিনি মারা যান); বাবা ওয়ালি দরজার উলটো দিকে মহব্বত খান এবং রাজা অনিরুদ্ধ; ওয়াইসকরন দরজার উলটো দিকে থাকল নাজাবত খান; খাজা খিজির দরজা থেকে মুসুরি দরজায় থাকল গোলান্দাজ বাহিনীর প্রধান মহম্মদ কাশিম খান (দারা পক্ষীয় সেনানী, জাহাঙ্গীরের সময়ে কাশ্মীরের সুনাদার হাসিম খানের ছেলে। ঠাকুর্দা কাশিম খান মীরইবহর ছিলেন আগরা কেল্লার স্থপতি; ঠাকুর্দার উপাধিতে তাঁকে ভূষিত করা হয় ১৬৫৮-য় মুরাদ বখশের জায়গায় তাঁকে গুজরাটের সুবাদার নিযুক্ত করেন। ধারমাত আর সমুগড়ের যুদ্ধে পালিয়ে যান। দারার পালানোর পরে তিনি আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে যোগ দেন, তাঁকে রুস্তম খান উপাধি দিয়ে সুলেইমান শুকোকে ধরার জন্যে শ্রীনগরে পাঠানো হয়। মথুরা ফেরার পথ তাঁকে ভায়েরা হত্যা করে), শাদুল্লা খান, জয় সিংহ; মাটিখোঁড়াখুঁড়ির কাজের দায়িত্ব দেওয়া হল রুস্তম খানকে। আদাবই আলমগিরি যদিও রুস্তম খানের অবস্থান মুসুরি দরজায় বলছে, কিন্তু তিনি ছিলেন দক্ষিণ-পশ্চিম কোণায়। কাশিম খানকে সরিয়ে দিয়েছিল উজির শাদুল্লা খান [সম্রাটের নির্দেশে আওরঙ্গজেবকে অন্ধকারে রেখে?] আর নাসিরি খানের (বা নুসরত খান ছিলেন শাহজাহানের বাহিনীর খানই দৌরানের ছেলে। খানই দৌরান দক্ষিণেই আওরঙ্গজেবের প্রথম দফার দক্ষিণের সুবাদারিত্বে দক্ষিণে ছিলেন। ১৬৪৪-এ আওরঙ্গজেবের সুবাদারি চলে যাওয়ার পরে দক্ষীণের সুবাদার হন কিন্তু ১৬৪৫-এ নিহত হন। ১৬৫৭-য় বিজাপুর অভিযানে নাসিরি খানকে দক্ষিণে পাঠানো হয়। আওরঙ্গজেব ক্ষমতায় আসার পরে তার আর নাম পাওয়া যায় না, মসিরইআলমগিরি সূত্রে জানা যাচ্ছে ১৬৬৭তে তিনি ওডিসার সুবাদার হন। ওডিসার সুবাদারিত্ব হল শাস্তির পদ। আওরঙ্গজেবের প্রথম যুগে তাঁকে বাবার উপাধি খানইদৌরান দেওয়া হয়) দায়িত্ব হল পদাতিক আর ঘোড়সওয়ার বাহিনীর।
প্রায় দুর্ভেদ্য কান্দাহার জয় করতে সেনাপতি আওরঙ্গজেবকে সম্রাট যে রসদ দিয়েছেন, হতোদ্যম না হয়ে তাই দিয়েই কান্দাহার অবইরোধের রণনীতি তৈরির করলেন। কেল্লার সামনে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ শুরু হল। তাদের নিরাপত্তা দিতে দূর থেকে কেল্লার দেওয়ালে আঘাত হানছে মুঘল বাহিনী। ২০ জুন রাজরূপ এবং মহবত খান সেনাপতিকে না জানিয়ে কেল্লায় হঠাত আক্রমণ শানায়। রাজরূপ তার সেনাকে কেল্লায় ঢোকার জন্য নিকষ অন্ধকারে পাহাড়ের চূড়ায় চড়িয়ে দিল। শত্রুপক্ষের পাহাড়ে চড়ার আওয়াজে পারসিকেরা পাল্টা আক্রমন করে তাদের এই আক্রমন প্রতিহত করে; পালিয়ে আসার সময় শত্রুর আক্রমনে বহু সেনা নিহত হয়। রাজরূপকে এই বেহুদা কাজের জন্যে শাস্তি দিয়ে বসিয়ে রাখা হল। এখন মুঘল বাহিনীর একমাত্র কাজ হল কান্দাহার দুর্গের দেওয়ালে ফাটল ধরানো। কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছিল না। এতে শাদুল্লা খানের বাহিনীর বহু সেনা মারা গেল। মুঘলদের দুটো বড় কামান অদক্ষ গোলান্দাজদের হাতে পড়ে ফেটে বহু সেনা নিহত হল। আওরঙ্গজেব বুঝলেন তাঁকে যে অস্ত্র দেওয়া হয়েছে সে সব দিয়ে দেওয়াল ভাঙা সম্ভব নয়। তাকে নতুন রণনীতি নিতে হবে। তিনি কান্দাহারে পারসিকদের বিরুদ্ধে মুখোমুখি যুদ্ধের পরিকল্পনা করলেন। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হল, বাধা এল কাবুলে ঘাঁটি গেড়ে বসা সম্রাটের পক্ষ থেকে।
সম্রাট আওরঙ্গজেবকে সম্মুখ যুদ্ধের অনুমতি দিলেন না। ফলে যুদ্ধ প্রকরণে নিমরাজি আওরঙ্গজেবকে বারবার দেওয়াল ভাঙার চেষ্টা করতে হল। প্রতিবারই তিনি ব্যর্থ হলেন। তাঁর ব্যর্থ হওয়া ভবিতব্য। তিনি যুদ্ধের প্রকরণ আর সম্রাটের যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণের কর্মকাণ্ড দেখে বুঝে গিয়েছিলেন, কান্দাহার যুদ্ধে ব্যর্থ হওয়া সময়ের অপেক্ষা। অকুস্থলে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বুঝে, রণনীতি তৈরি করার ক্ষমতা তাঁর হাতে নেই। হাত বাঁধা অবস্থায় তিনি কান্দাহারে লড়ছেন। মুঘল বাহিনী একচুলও এগোতে পারছিল না। অনাবশ্যক প্রচুর লোকক্ষয় হল। [আদাব-ই-আলমগিরির চিঠিতে, যুদ্ধ চলাকালীন সম্রাটের অযথা নাক গলানোর উদাহরণ পাচ্ছি। তিনি লিখছেন, ‘[কেল্লার] দেওয়ালের দুদিকে কামান বসিয়ে গোলা ছোঁড়ার যথেষ্ট উপকরণ মজুদ ছিল না। আমার হাতে যদি যথেষ্ট রসদ মজুত না থাকে তাহলে যুদ্ধ করা নিষ্ফল’। শাদুল্লা খানের সঙ্গে রণনীতি নিয়ে আলোচনা করে আওরঙ্গজেব ঠিক করলেন তিনি দেওয়ালের কাছে বাহিনীকে নিয়ে গিয়ে দেওয়াল ভাঙ্গার চেষ্টা করবেন। কিন্তু কাবুলে বসে থাকা শাহজাহান, সেনাপতির এই সিদ্ধান্তও বাতিল করে বললেন ‘দেওয়ালটা দু’পাশ থেকেই ভাঙার চেষ্টা কর’। স্বাভাবিকভাবে সম্রাটের নির্দেশ মেনে সেইভাবেই যুদ্ধ পরিচালনা করলেন। তিনি বাবাকে লিখলেন, ‘যদিও আমি মনে করি আমার কাছে যে দুটো সুরাট কামান আছে (যার একটা অকেজো) সেদুটো দিয়ে দেওয়ালের গায়ে একটুও আঁচড় কাটা যাবে না, কিন্তু মহামহিমের নির্দেশ সারা বিশ্ব মেনে চলে, এবং তাঁর নির্দেশ কোনও ভাবেই প্রশ্নযোগ্য নয়’।
মুঘল বাহিনী দিনের বেলায় দেওয়ালে কামান দেগে যতটুকু আঁচড় কাটছিল, পারসিক বাহিনী রাতজুড়ে সেই ক্ষত সারিয়ে দিচ্ছিল খুব সহজেই। ইতিমধ্যে পারসিকেরা রাতে ছোট ছোট বাহিনী নিয়ে মুঘলদের ওপর পাল্টা হামলা শুরু করল। ১৯ জুন তারা বড় বাহিনী নিয়ে পরিখার উল্টো দিক থেকে আক্রমন শুরু করে। আক্রমন রুখে দেওয়া গেলেও বহু মুঘল সেনা হতাহত হল এবং ধরাও পড়ল বহু। আওরঙ্গজেব ৩ জুলাই সম্রাটের কাছে আওরঙ্গজেব শেষ বারের জন্যে বড়ভাবে কেল্লা আক্রমনের অনুমতি চাইলেন। এর দুদিন আগে সম্রাট শাদুল্লা খানের থেকে নিষ্ফল কামান দাগার সংবাদ পেয়ে কান্দাহার অবরোধ তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। আওরঙ্গজেবের অনুরোধ মেনে কন্দাহার অবরোধ তোলার নির্দেশ এক মাসের জন্যে স্থগিত রেখে, বাহিনীর জন্যে নতুন পরিকল্পনা পাঠালেন। কিন্তু সমস্যা হল কান্দাহার থেকে বাহিনী তুলে নেওয়ার নির্দেশ বহু আগে কান্দাহারে মুঘল বাহিনীর শিবিরে পৌঁছে যাওয়ায় [এই সংবাদটা জানতে পারছি আওরঙ্গজেবের চিঠি সংকলন আদাবইআলমগিরি থেকে] বাহিনীর সব সেনাপতিই হাল ছেড়ে দিল। আওরঙ্গজেব বুঝলেন এই ব্যর্থ মনোরথ সেনানী নিয়ে অবরোধ চালানো বৃথা। তিনি সম্রাটের নির্দেশ মেনে অবরোধ তুলে নিলেন।
কান্দাহার থেকে বাহিনী তুলে নেওয়ার ক্ষেত্রে সম্রাটের পক্ষে কী কী যুক্তি ছিল? কাবুলে সম্রাটের কাছে খবর আসে গজনির দক্ষিণ জেলার পশ্চিমের পাহাড় থেকে ১০ হাজার উজবেগ সেনা মুঘলদের আক্রমণ করতে আসছে। তাঁর আশংকা হল এর ফলে কাবুল আর কান্দাহারের মধ্যে যোগাযোগ মাধ্যম ভেঙে পড়তে পারে। যদিও কাবুলের দরবারে সম্রাটকে আওরঙ্গজেবের বিপক্ষ গোষ্ঠী আশংকাটা বাড়িয়ে চড়িয়ে দেখিয়েছেন। কাবুল থেকে রওনা হওয়ার আগে প্রধান সেনাপতি আওরঙ্গজেব সম্রাটকে আশ্বস্ত করে যান, সম্রাটের নামে যে মুঘল বাহিনী অভিযানে যাচ্ছে, তার পক্ষে ১০-২০ হাজার সেনার মহড়া নেওয়া খুব কিছু কঠিন কাজ হবে না। তিনি সম্রাটকে বলখের আবদুল আজিজ খানের উদাহরণ দিয়ে বলেন কয়েক বছর আগেই সম্মুখ যুদ্ধে উজবেগীদের মাত করেছিলেন। পরে জানা যায় শাহী বাহিনীর অভিযানের সংবাদ পেয়ে উজবেগীরা তাদের অভিযান স্থগিত রেখে গজনীতে ফিরে যায়।
সম্রাটের নির্দেশক্রমে আওরঙ্গজেব ৯ জুলাই কান্দাহার অবরোধ তুলে একটা ছোট বাহিনী পিসিন-ছোটিয়ালি-মুলতান রাস্তা ধরে কাবুলে ফেরত পাঠান। তারা রাস্তা থেকেই সংবাদ পাঠায় আফগানিস্তানের বালুচ গোষ্ঠীরা নতুন করে এই রাস্তায় উৎপাত আরম্ভ করেছে। এই সংবাদে আওরঙ্গজেব আর দেরি না করে পিসিন আর দুকি থেকে মুঘল বাহিনীর থানা তুলে বাহিনীকে কাবুলে নিয়ে আসেন। সেখানে তিনি ৭ আগস্ট সম্রাটের সঙ্গে মিলিত হন। অগ্রগামী বাহিনী আর শাদুল্লা খানের বাহিনী আরও ৮ দিন পরে কাবুল পৌঁছবে। (চলবে)