শাহজাহান-আওরঙ্গজেবের তিক্ততা
দ্বিতীয়বার কান্দাহার দখলে মুঘল সেনাবাহিনী ব্যর্থ হওয়ার সম্রাটের সম্মানে আঘাত লাগল। হতাশায় তিনি ঠিক করলেন আওরঙ্গজেবকে শাস্তি দেবেন। শাস্তির সঙ্গে আরও বড় অপমানের সংবাদ আওরঙ্গজেবের জন্যে অপেক্ষা করছিল মুঘল দরবারে।
কান্দাহার অভিযানের ব্যর্থতার সমস্ত দায় শাহজাদার ওপরে চাপিয়ে শাস্তি হিসেবে আওরঙ্গজেবকে দক্ষিণের সুবাদারি পদে নির্বাসন দিলেন। এই পদে যোগ দেওয়া শাস্তি বলে মনে হত না, যদি না একটা অদ্ভুত শর্ত বদলির নির্দেশের সঙ্গে জুড়ে থাকত। আওরঙ্গজেবের দক্ষিণের সুবাদারির প্রথম পর্ব শেষ হয়েছিল সুবাদারি কেড়ে ৭ মাস নির্বাসনের তীব্র অপমানে। দ্বিতীয়বার আওরঙ্গজেবকে দক্ষিণে সুবাদারিত্বে যোগ দিতে পাঠানো হল সরাসরি কান্দাহার থেকে তাঁর কর্মস্থল মুলতানে যেতে না দিয়ে। কান্দাহার থেকে তাঁকে সোজা দক্ষিণে সুবাদারির কাজে যোগ দিতে বলা হল। সাধারণত মুঘল আমলে সুবাদার বা বড় পদের আমলার বদলির ফরমানে উল্লিখিত পুরোনো সুবায় ফিরে না যেতে দেওয়ার নির্দেশের অর্থ হল, মুঘল কর্তৃপক্ষ আমলাকে শাস্তি বদলি করলেন। আওরঙ্গজেব কোনও অপরাধ না করে শাস্তি পেলেন। দক্ষিণে সরাসরি বদলির নুনের ছিটে ছড়ানো হল কান্দাহারে ব্যর্থতার কাটা ঘায়ের ওপর।
কান্দাহার অভিযান সমীক্ষা করে সম্রাটের মনে হয়েছে আওরঙ্গজেব বড় সেনা অভিযানের যোগ্য সেনাপতি নন। তিনি কঠোর ভাষায় আওরঙ্গজেবকে লিখলেন ‘অবাক হয়ে যাচ্ছি এত বিশাল প্রস্তুতি নেওয়া সত্ত্বেও তুমি কান্দাহার দখলে ব্যর্থ হলে’! সম্রাট শপথ নিয়ে বললেন মুঘল সাম্রাজ্য, ‘কান্দাহার উদ্ধারের প্রকল্প ত্যাগ করবে না। যে কোনও উপায়ে আমরা কান্দাহার দখল নেবই’। দারার নেতৃত্বে যে তৃতীয় কান্দাহার অভিযান পাঠান সেটাও ব্যর্থ হয়। চিঠিতে আওরঙ্গজেবের প্রতি ব্যঙ্গের হুল ফুটিয়ে সম্রাট বললেন, ‘আমার যদি মনে হত তুমি জেতার উপযুক্ত যুদ্ধ করছ, তাহলে কী আমি বাহিনী তুলে নেওয়ার নির্দেশ দিতাম?’ সম্রাটের উত্তেজক বার্তার উত্তরে আওরঙ্গজেব নম্র এবং সম্মান দেওয়ার ভাষায় বললেন, তাঁকে সম্রাট অবরোধ করার জন্যে যতটুকু হাতিয়ার দিয়েছেন, তিনি সে সব যথোপযুক্ত কাজে লাগিয়ে বিজয়ী হওয়ার যথাসম্ভব চেষ্টা করেছেন। দুর্ভাগ্য তাঁকে সফল হওয়ার সুযোগ দেওয়া হল না। সেনাপতি হিসেবে কান্দাহারের ব্যর্থতায় তাঁর সম্মানে কালির দাগ লেগেছে। তিনি অনুরোধ করলেন, পাঞ্জাব বা আফগানিস্তানে তাঁকে থাকার সুযোগ দেওয়া হোক। সেখান থেকে তিনি আরও একবার চেষ্টা করে দেখতে চান। প্রয়োজনে দক্ষিণের সুবাদারিত্ব তিনি ছেড়ে দিতে প্রস্তুত।
আওরঙ্গজেব জানতে পারলেন কান্দাহারের তৃতীয় অভিযানের নেতৃত্ব দারার ওপর ন্যস্ত করা হচ্ছে। আওরঙ্গজেব সম্রাটকে চিঠিতে মনে করিয়ে দিলেন, কান্দাহার অভিযান শুরুর আগে তিনি নিজের জায়গায় তাঁর দাদা ভাইয়ের নাম প্রস্তাব করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে তিনি মুঘল অগ্রগামী বাহিনীর নেতৃত্ব দিতে আজও প্রস্তুত। আমরা দেখলাম তিনি প্রকাশ্যে অন্তত দারার অধীনে কাজ করতে ইচ্ছে প্রকাশ করলেন। সম্রাটের উত্তর ছিল আরও কঠোর, ‘প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু কাজের যোগ্যতা থাকে। জ্ঞানীরা বলেন যাকে একবার পরীক্ষা করা হয়েছে, দ্বিতীয়বার আর তার ক্ষমতার পরীক্ষা নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না’। উত্তরে আওরঙ্গজেব বাবাকে মনে করিয়ে দিলেন, তিনি জানতেন কান্দাহার অভিযানের সফলতা বিফলতার ওপরে সেনাপতি হিসেবে তাঁর মান-সম্মান নির্ভর করবে। তিনি যে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে অবরোধে শিথিলতা দেখয়েছিলেন, এই অভিযোগ সর্বৈব অসত্য।
আওরঙ্গজেবের চিঠিগুলো পড়লে আমাদের মনে হয় তিনি বিনম্র ভাষায় পরোক্ষে সম্রাটকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, কান্দাহার বিফলতার দায় দরবারের। দরবার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আট দিনের দূরত্বে বসে যুদ্ধপরিস্থিতির বাস্তবতা বুঝতে চান নি বরং অনাবশ্যকভাবে মাথা গলিয়ে যুদ্ধকে জটিল করেতুলেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে না থেকে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নির্ণয় করতে চাওয়াই কান্দাহারে মুঘল বাহিনীর ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। তার হাতে কেল্লার দেওয়াল ফাটল ধরাবার মত বড় কামান ছিল না। সম্রাটের দরবারি নির্দেশে মুঘল বাহিনীকে অবরোধ তুলে পিছিয়ে আসতে হয়েছে। তিনি শেষ চেষ্টা হিসেবে পারসিকদের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরের প্রস্তাব দিয়েছিলেন, সেটা সম্রাটের পছন্দ হয় নি। তিনি যেখানে নিজের ইচ্ছেয় যুদ্ধ পরিচালনা করতে পারেন নি, তার ওপর ব্যর্থতার দায় চাপিয়ে দেওয়া অর্থহীন।
স্বাভাবিকভাবে সম্রাট শাহজাহান আওরঙ্গজেবের এই দুর্বিনীত মন্তব্য পছন্দ করেন নি। আমরা আজ স্পষ্ট বুঝতে পারছি সম্রাট শাহজাহান দরবারের সম্রাটের পরে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠা দারা এবং তার পরামর্শদাতাদের পরামর্শে প্রভাবিত হতেন। সম্রাটের প্রভাবিত হওয়ার বড় উদাহরণ হল আওরঙ্গজেবকে একবারও তাঁর পুরোনো কাজের জায়গা মুলতানে যেতে না দিয়ে সরাসরি কান্দাহার থেকে দক্ষিণে সুবাদারিতে পাঠানোর নির্দেশ। দরবার থেকে আওরঙ্গজেবকে কান্দাহারের হিসেব নিকেশ বুঝিয়ে সরাসরি দক্ষিণে যাওয়ার নির্দেশ জারি করা হল। তিনি সম্রাটের সঙ্গে ৭ আগস্ট দেখা করলেন। তিন দিন পরে ১০ই দক্ষিণে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হল। কান্দাহার থেকে তাঁর ফেরার পথে বর্ষা, বন্যা, কাদা, রাস্তা ভেঙে যাওয়া ইত্যাদির জন্যে অনাবশ্যক বেশ কিছুটা দেরি হয়। সেই দেরিও দরবার সহ্য করে নি। দেরির জন্যে তাকে তীব্র তিরষ্কার করা হয়। সেই সময় দরবারে জাহানারা ছাড়া আওরঙ্গজেবের সমর্থক ছিল না – জাহানারাও পরোক্ষে দারা-শাহজাহান অক্ষের সঙ্গেই থাকতেন। দারার প্রতি তাঁর ভ্রাতৃস্নেহ ছিল প্রবল। আমরা মুলতানে ইসমাইলের ক্ষেত্রে দেখেছি কীভাবে বারবার দারা মুলতানের সুবাদারের নানা সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন দুর্বিনীত গোষ্ঠীপতির পাশে দাঁড়িয়ে। দক্ষিণে আওরঙ্গজেবের দ্বিতীয় দফার সুবাদারিত্বে দেখব দরবারে দারা স্পষ্টতই একাই অধিকাংশ সিদ্ধান্ত নিতেন, সম্রাটের সিদ্ধান্তকেও প্রভাবিত করতেন। দরবারে দারার কাছে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে কোনও প্রস্তাব নিয়ে গেলেই, অধিকাংশ সময়ে সেই আর্জি মকবুল হত। আওরঙ্গজেব কোনও দিনই দরবারে সুবিচার পান নি। একসময় নিজের বেদনা জানিয়ে জাহানারাকে লিখলেন, হায় গোলাপ! তুমি যদি পাপিয়ার অস্ফূট রব শুনতে/তাদের ব্যথা বোঝ, যারা নিজের বাগানেও কথা বলতে ভয় পায়।
কান্দাহারে আওরঙ্গজেবের প্রস্তাব মত পারসিকদের বিরুদ্ধে মুখোমুখি যুদ্ধ হলে কী হত সেটা বলা মুশকিল। কিন্তু কান্দাহারে মুঘল ব্যর্থতার কারন হিসেবে আগে যা আলোচনা করেছি, তার সঙ্গে আরও কিছু মন্তব্য জুড়ব। মুঘলদের থেকে পারসিকদের প্রস্তুতি, রসদ অনেক জোরদার ছিল, রসদ সরবরাহ পরিকল্পনাও ঝামেলাহীন ছিল। গোলান্দাজি বিভাগেও তারা মুঘলদের থেকে দক্ষ পেশাদার নিয়োগ করেছে। শিবির থেকে মুঘলদের যুদ্ধক্ষেত্র দূরত্ব বড় সমস্যা হয়ে দেখা দেয়। হেরাট থেকে কান্দাহার কেল্লার দূরত্ব ৩৬০ মাইল যে রাস্তা পার করতে খুব কম হলে ১০ দিনে সময় লাগাত — কিন্তু রাস্তা দুর্গম ছিল না, পারসিকেরা সহজে রসদ পাঠাতে পারত। অন্যদিকে কাবুল থেকে কান্দাহারের ৫৬০ মাইল রাস্তা দুর্গম পাহাড় শ্রেণী, সংকীর্ণ গিরিখাতে ভরা। কাবুল শিবির থেকে মুঘল বাহিনীকে কান্দাহারে দীর্ঘকালধরে অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার মত রসদ পাঠানো সমস্যার ছিল।
যদুনাথ সরকার নিজেই স্বীকার করেছেন, কান্দাহারে আওরঙ্গজেবকে প্রধান সেনাপতির পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া যায়। তাঁর নির্দেশ অনেক সময়ই সেনারা শোনে নি, কারন কাবুল থেকে স্বয়ং সর্বশক্তিমান সম্রাট নিজে যুদ্ধ নিয়ন্ত্রণ করছেন — আওরঙ্গজেব ক্রীড়ানক মাত্র। আগেই আমরা আওরঙ্গজেবকে অন্ধকারে রেখে রাজরূপের কেল্লা আক্রমণের ঘটনা উল্লেখ করেছি। সম্রাট কাবুল শিবিরে বসে শাদুল্লা খান মার্ফত সিদ্ধান্ত নিতেন যুদ্ধক্ষেত্রে কামান কোথায় বসানো হবে, কোন কামান কবে কোথায় সরানো হবে ইত্যাদি। এই সব গুরুত্বপূর্ণ একটাও সিদ্ধান্ত অকুস্থলে বসে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি বুঝে আওরঙ্গজেবকে নিতে দেওয়া হয় নি। বরং আট দিনের দূরত্বের শহরে বসে রোজকার যুদ্ধ বিষয়ক রণনৈতিক সিদ্ধান্ত সাদুল্লা খানকে জানাতেন সম্রাট। যে যুদ্ধে এক ঘন্টার মধ্যে সিদ্ধান্ত না নিতে পারলে যুদ্ধের গতিপ্রকৃতি পাল্টে যায়, সেই যুদ্ধে সম্রাট সিদ্ধান্ত জানাচ্ছেন ৪ দিন খবর যাওয়া আর ৪ দিন খবর আসা মোট আট দিন পরে। সম্রাটের ফরমান পৌঁছচ্ছে প্রথমে শাদুল্লা খানের কাছে। তারপরে সম্রাটের সিদ্ধান্ত সেনাপতি আওরঙ্গজেব জানতেন।
তাছাড়া মুঘলেরা ভুলে গিয়েছিল, তারা কিন্তু কোনও দিনই সম্মুখ সমরে কান্দাহার দখল নিতে পারে নি। আকবর এবং শাহজাহান কান্দাহার দখল নিয়েছিলেন দল পাল্টানো পারসিক প্রশাসকের সৌজন্যে। এশিয় যুদ্ধক্ষেত্রে একটা প্রবাদ চাউর ছিল, একবার কান্দাহারে কোনও শক্তিশালী বাহিনী ঢুকে পড়ে দখল নিতে পারলে, অন্য বাহিনীর পক্ষে সেটা দখল নেওয়া খুব কঠিন কাজ। কান্দাহারে তৃতীয় অভিযানে দারা আওরঙ্গজেবের তুলনায় অনেক বেশি বাহিনী নিয়ে অবরোধ করলেও তিন বছরের মাথায় তাকেও খালি হাতে ফিরতে হয়।
কান্দাহারের দ্বিতীয়বারের অভিযানে পরাজয়ের ক্ষত আওরঙ্গজেবের মনে বহুকাল টাটকা জেগে ছিল। তিনি শেষ বয়স পর্যন্ত কান্দাহারের যুদ্ধ ব্যর্থতা ভোলেন নি। রুকাতইআলমগিরির একটি চিঠতে দেখছি এক্কেবারে শেষ বয়সে, শরীর যখন আর চলতে চাইছে না, তিনি যে কোনও সময় মৃত্যুর আশায় বসে আছেন — পুত্ররা সিংহাসনের লড়াই লড়ার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছেন, সে সময় তিনি কাবুলের সুবাদার, ছেলে শাহ আলমকে কিছুটা ঠুকে লিখলেন, ‘শুনলাম টাকা না থাকলেও তুমি দামি দামি সেনাপতি নিয়োগ করছ। আমার মনে হচ্ছে, তুমি যেন কান্দাহার উদ্ধার করতে চাইছ! সর্বশক্তিমান তোমার আশ্রয় হোন!’ (চলবে)