১৬৫৩-৫৭ দক্ষিণে সুবাদারি
আওরঙ্গজেবের কান্দাহারের ‘ব্যর্থতা’র দায়ের শাস্তি হল দক্ষিণের দক্ষিণের সুবাদারি। শাস্তির সঙ্গে তীব্র অপমান ছুঁড়ে দেওয়া হল। পুরোনো চাকরি ক্ষেত্র মুলতান সুবায় ফিরে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হল না। মামা শায়েস্তা খানকে ঠিক এই রকম শাস্তি দিয়েছিলেন আওরঙ্গজেব। শিবাজীকে রুখতে ব্যর্থ হওয়ায়। তাকে দরবারে না আসতে দিয়ে দক্ষিণ থেকে সরাসরি বাঙলার নবাবি করতে পাঠিয়ে দিলেন। ভাগ্নের সঙ্গে একবার শুধু দেখা করার আর্জি জানিয়েছিলেন প্রভাবশালী মহলের মাধ্যমে। সেই। আর্জিনামার ঠাঁই হয়েছিল সম্রাটের বাজে কাগজের ঝুড়িতে।
দক্ষিণে শাস্তি পোস্টিং নিয়ে সুবাদারি করতে যাওয়ার আগে দিল্লিতে জাহানারার সঙ্গে [ শোনাযায় রোশেনারার সঙ্গেও বৈঠক করেছেন], আগরায় জাহানারার বাগানে শাহ সুজার সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি যে আগরায় দাদা শাহ সুজার সঙ্গে বৈঠক করেছেন, বা মালবে মুরাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, সে সব গোপন বৈঠক ছিল না। বাবাকে পাঠানো চিঠিতে তিনি স্পষ্ট লিখেছেন বৈঠকের কথা। আগামীদিনে অন্তত আওরঙ্গজেবের জীবনে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের সুদূর প্রসারী ফল ফলবে। বাঙলার সুবাদার শাহ সুজা, দক্ষিণের সুবাদার আওরঙ্গজেব আর গুজরাটের সুবাদার ছোট ভাই মুরাদ বখশ আর বোন রোশেনারা – চার জনেই দরবারে সম্রাটের ওপরে দারা আর জাহানারার নিয়ন্ত্রণে বিরক্ত আর দারার দরবারি ক্ষমতা বিস্তৃতিতে আশংকিত হয়ে উঠছিলেন। পূর্বের সম্রাটদের তুলনায় শাহজাহান অনেক বেশি বছর বেঁচেছেন। পূর্ণবয়স্ক সম্রাটের শরীরে বেশ কিছু নাছোড়বান্দা রোগ গভীরে বাসা বেঁধেছে। চার ভাই বোন আন্দাজ করেছিলেন সম্রাট যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন বা হঠাত প্রয়াত হন তাহলে দরবারে বসে থাকা দারা তিন ভাইয়ের ওপর আঘাত নামিয়ে এনে, নিষ্কণ্টক হয়ে সিংহাসনে আরোহণ করবেন। একমাত্র দারাকেই দরবারে সম্রাটের ময়ূর সিংহাসনের পাশের সোনার সিংহাসনে বসে সুবায় প্রতিনিধি রেখে সুবা চালানোর অধিকার দেওয়া হয়েছিল। চার জনেই ঠিক করলেন কোনও একজন দরবারের ক্ষমতা কেন্দ্রের আগ্রাসনে বিপদে পড়লে, অন্য তিনজন তাঁকে উদ্ধারে ঝাঁপিয়ে পড়বেন। ১৬৫৭-র সিংহাসনের লড়াইয়ের জোট তৈরির সূত্রপাত হয়ে গেল ১৬৫২-তে আওরঙ্গজেবের দক্ষিণ যাত্রার সময়েই।
সে সময় আওরঙ্গজেব আগরায় বাবার চরিত্রের আরেকটা অদ্ভুত দিক দেখলেন। ঘণ বর্ষায় আওরঙ্গজেব দক্ষিণে সুবাদারির দায়িত্ব নিতে বাহিনী নিয়ে চলেছেন। ২৮শে নভেম্বরে আগরা পেরোতে গিয়ে তাঁর চোখ মা আর্জুমন্দ বানু বেগমের সমাধি তাজমহল [রৌজা-এ-মুনাবরার] ওপর পড়তেই বিষ্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন দেশের সুন্দরতম ভবনের বেহাল দশায়। আলোর মুসোলিয়ামের সারা দেহ থেকে পলেস্তরা ঝরে পড়ছে। রৌজা-এ-মুনাবরার দেখাশোনার লোক আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা তো নেই, সেটা তাঁর জীবনের প্রথম আতলিক [বিদ্রোহী খুররম পলিয়ে থাকার সময়, শিশুদের বিধিবদ্ধ আতলিক দেওয়া সম্ভব ছিল না, ঐতিহাসিকেরা মনে করেন বিদুষী আর্জুমন্দ বানু বেগমই আওরঙ্গজেবের জীবনের প্রথম আতলিক], শিক্ষাগুরু মায়ের সমাধিক্ষেত্রের হালত থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়। যে মানুষটা রৌজা-এ-মুনাবরাকে তাঁর কলিজা বলেছিলেন, সেই কলিজার রক্ষণাবেক্ষণের আদৌ ব্যবস্থা আছে কিনা, অর্থ বরাদ্দ আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। এই মানুষটা কান্দাহার দখলে ২ কোটি টাকা বরাদ্দ করেন। মাথায় রাখতে হবে তাজমহলের কাজ শুরু হওয়ার পাঁচ বছর মধ্যেই সম্রাট শাহজাহান আগরার দরবার তুলে নিয়ে যাবেন দিল্লিতে। তিনি ১৮৫৭-য় আওরঙ্গজেবের হাতে বন্দী হওয়ার আগে মাত্র একটিবারই রৌজাএমুনাবরায় আসবেন ১৬৫৪-তে। যে কাঠামোটাকে আমরা ভালবাসার প্রাসাদ হিসেবে গণ্য করি সেটা তৈরি শেষ হয় ১৬৪৩-এ। এই স্থাপত্যকে নিয়ে বিশ্বজোড়া মানুষের আবেগের শেষ নেই। সম্রাটের প্রেমের স্মৃতিস্বরূপ বাংলায় কাব্য লেখা হয়েছে, ছবি আঁকা হয়েছে। কিন্তু বাস্তব অতি কঠোর, করুন।
ডটার্স অব দ্য সান এম্প্রেসেস বইতে ইরা মুখোটি লিখছেন, When Shah Jahan does visit, in 1654, his shadow oblique across the marble floor, he is alone with his memories, for no one is allowed within the mausoleum. The noblemen in attendance must wait in the jamat khana (place of gathering) and even the murmuring priests must remain in the outer chambers. And if Shah Jahan does not return, it may be because he knows he will perforce return, one last and final time. No other mausoleum is ever built by Shah Jahan for himself and it is inconceivable that a man so obsessed with his own magnificence, his image, and sense of destiny would not have thought about his final resting place. The Rauza-i-munavvara will be Shah Jahan’s first great architectural masterpiece and will also be the place where he will lie in eternity. Till then, Shah Jahan returns to Shahjahanabad, where he has created ‘paradise on earth’, while Mumtaz Mahal waits for him, as she has always done, silently.
রাস্তায় যেতে যেতেই আওরঙ্গজেব বাবাকে লিখলেন, ‘কী দুঃখের কথা এত মহান স্থাপত্যের এই দুর্ভাগ্য হওয়া উচিত ছিল কী! সম্রাটের যত্নশীল মনোযোগের দীপ্তি যদি সেগুলি পুনরুদ্ধারের দিকে পরিচালিত হয় … তবেই এই কাজটা উপযুক্ত গরিমা লাভ করবে’ [এই বাক্যে তিনি প্রায় বাবাকে তিরস্কারই করলেন]। তিনি চিঠিতে রৌজা-এ-মুনাবরার যে ৪টে বিষয় সারানোর সুপারিশ করলেন ১] সামনের কেন্দ্রে চারটি বড় খিলান; ২] ২৪টা খিলান, তিনটে স্থাপত্যের কোণে। উপরের পরিসরে বারোটি এবং নীচের সীমাতে বারোটি; সামনের প্রতিটি বড় খিলানপথের পাশের চারটি খিলান, এবং স্থাপত্যের চার কোণে প্রতিটিতে দুটি সুপারইম্পোজ করা খিলান। আওরঙ্গজেব বলছেন, মূল সমস্যা দেখা দিয়েছে ওপরের পরিসরে; ৩] চার গম্বুজের ভিত্তির চারপাশে অষ্টভুজাকার কিয়স্কের উপরে চারটে গম্বুজ; ৪] মকবরা উত্তর থেকে দক্ষিণে ঢালা। আওরঙ্গজেব হয়ত এর সঙ্গে বলছেন সমাধির নিচতলায় উত্তর-পশ্চিম প্রকোষ্ঠে, নদীর বাঁক বরাবর আগ্রার মুখোমুখি; বা উত্তর-পূর্ব দিকে, আরামবাগ (“রামবাগ”) এবং নদীর ধারের সমাধির কথাও।
কান্দাহার থেকে ফেরার পথে ১৬৫২-র ১৭ জুলাই তিনি দক্ষিণের সুবাদারি পদের নিয়োগপত্র পেলেন। এক মাস পরে তিনি সম্রাটের থেকে বিদায় নিয়ে দ্বিতীয়বার দক্ষিণের উদ্দেশ্যে চললেন। ৯ সেপ্টেম্বরে তিনি সিন্ধুর আটোক পার হলেন। ১৭ নভেম্বরে দিল্লি, ২৮শে আগরা হয়ে ৩ ফেব্রুয়ারি ১৬৫৩-য় বুরহানপুরে পৌঁছলেন [যদিও যদুনাথ বুরহানপুরের পৌঁছবার তারিখ বলছেন ৩০ জানু, কিন্তু আমি রবিউলআহবলএর তারিখটিই উল্লেখ করলাম]। পৌঁছনোর পরে সম্রাটকে চিঠিতে জানালেন ‘আমি এখানকার অবস্থা সামলানোর উদ্যম নিলাম। পন ঘাটের সমস্যা মিটিয়ে ইনশাল্লা আমি দৌলতাবাদের দিকে এগোব’ [দক্ষিণের প্রশাসনিক বিভাগ দুটো ছিল একটি পন ঘাট এবং খণ্ডেশ, যা বেরারের অংশ; বাকি অংশটার নাম বালাঘাট]। শাহজাহান তাঁকে বারবার দৌলতাবাদে যেতে বললেও তিনি বুরহানপুরে ৯ মাস কাটালেন। আমাদের ধারণা দিল্লিতে বসে সম্রাট বুরহানপুরের সমস্যার গুরুত্ব বুঝতে পারেন নি। ১৬৪৪-এ তিনি দক্ষিণ ছেড়ে চলে আসার পরে ৬ জন সুবাদার দক্ষিণে নবাবি করেছেন — খান দৌরান (মে ১৬৪৪-জুন ১৬৪৫), জয় সিংহ (অন্তর্বর্তী ১৭ জুলাই ১৬৪৫ পর্যন্ত), ইসলাম খান (জুলাই ১৬৪৫-নভেম্বর ১৬৪৭), শাহ নাওয়াজ খান (অন্তর্বর্তীকালীন ১৬৪৮এর জুলাই পর্যন্ত), মুরাদ বখশ (জুলাই ১৬৪৮-সেপ্টে ১৬৪৯), শায়েস্তা খান (সেপ্টেম্বর ১৬৪৯-সেপ্টেম্বর ১৬৫২)। আওরঙ্গজেবের সময় পর্যন্ত মুঘল সাম্রাজ্যের রাজস্ব আদায় কম হয়েছে। চারটে দক্ষিণী প্রদেশ থেকে আদায় হওয়ার দরকার ছিল ৩ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা, আদায় হত ১ কোটির আশেপাশে। ২/৩ অংশ আদায় হত না। দক্ষিণে মুঘল সাম্রাজ্যকে ভর্তুকি দিয়ে রাজত্ব চালাতে হয়েছে (খানদৌরান এক বছর উদ্বৃত্ত রোজগার দেখান, সেটা শুধুই কৃষি ক্ষেত্রে। কৃষকদের ওপর অত্যাচার করে তিনি রজস্ব বেশি আদায় করেন। কেন্দ্রে উদ্বৃত্ত পাঠানোয় তাকে সম্মান জানানো হল, কারন অধিকাংশ সুবাদার ভর্তুকিতে রাজত্ব চালাত)। আওরঙ্গজেব বুরহানপুরের সমস্যাগুলো বিশদে সম্রাটকে লিখে জানিয়ে বলেন, তাঁর সে সব সমস্যা সমাধান করতে সময় লাগবে। শাহজাহান তাঁর আবেদন মানেন নি, বুরহানপুরে আওরঙ্গজেবের পৌঁছনোর তিন মাসের মধ্যে চিঠি লিখে তাঁকে অবিলম্বে দৌলতপুরে পৌঁছনোর নির্দেশ দেন। তিনি সম্রাটকে সম্মান জানিয়ে লেখেন ‘গত দশ বছরে দক্ষিণের প্রশাসনের কোনও সমস্যারই সমাধান হয় নি। এত কম সময়ে পাহাড়প্রমান সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। তাছাড়া দৌলতাবাদে সুবাদারের সেরকম গুরুত্বপূর্ণ কাজও ছিল না, যে খুব দ্রুত আওরঙ্গজেবকে সেখানে পৌঁছতে হবে’।
আওরঙ্গাবাদ প্রতিষ্ঠা
আওরঙ্গাবাদের আগের নাম ছিল খিরকি। মালিক অম্বর, আহমদনগরে নতুনভাবে নিজাম শাহী বংশ চালু করার পরে এই গ্রামে তিনি শাহী বাজারের (সাহাগঞ্জ) পাশে সবুজ বাংলো তৈরি করান। শুরুতে আওরঙ্গজেব দৌলতাবাদ কেল্লায় থাকতেন। সেখানে দরবারে বেশি মানুষ ধরত না। তিনি নতুন জায়গায় বাস তুলে নিয়ে যাওয়ার কথা মাথায় রাখছিলেন। খিরকি এলাকাটা তাঁর চোখ পড়ল। আরশুল নদীর থেকে বেরোনো খালের জলে যে হ্রদ তৈরি হয়েছে তার পাশে তিনি প্রাসাদ তৈরি করলেন। অভিজাত, আমীরদের জমি বিলোলেন যাতে তারা নিজেদের বসস্থান বানিয়ে নিতে পারেন। কেল্লা থেকে উঠে গিয়ে নতুন শহরে বাস করতে শুরু করায় শহরটির নাম মানুষের মুখে মুখে আওরঙ্গাবাদ হল। মুঘল দক্ষিণে সুবাদারের বসতি উপলক্ষ্যে এটি ক্রমশ দক্ষিণের রাজধানী হিসেবেও পরিচিতি পেল।
জামা মসজিদের কাছে দিলরাস বানু রাবেয়াউদ্দুরানির মুসোলিয়ামটি পরে তার পুত্র মহম্মদ আজম সারাবেন। আজও আলমগিরের প্রাসাদটিকে পরের বাসিন্দারা অনেকটাই পাল্টে দেবেন কিন্তু যদুনাথ লিখছেন আজও যারা আওরঙ্গাবাদ ঘুরতে যান, তাদের অনেকেই তারঁ প্রাসাদটিকে আলমগিরি মহল আখ্যা দেন। ১৬৮২-তে তিনি আবার যখন দক্ষিণে যাবেন, মারাঠাদের আক্রমণের থেকে শহরটা রক্ষা করার জন্যে, শহর ঘিরে ৪ মাইল দীর্ঘ দেওয়াল তোলার নির্দেশ দিলেন। এই দেওয়ালটা চার মাসে তিন লক্ষ টাকার বিনিময়ে সম্পূর্ণ করলেন দিয়ানত খান কাফি। পরের সময় নিজামেরা শহরে বহু বদল আনবেন। (চলবে)