দক্ষিণে দেওয়ান হিসেবে প্রথম মুর্শিদকুলি খান
আওরঙ্গজেবের সংস্কার নীতি দক্ষিণের সুবায় প্রযুক্ত করার প্রধানতম আমলা ছিলেন মুর্শিদকুলি খান [ইনি বাংলার প্রথম নবাব মুর্শিদকুলি খান নন, তার জন্ম ১৬৬০-এ, শাহজাদা যখন সবে সম্রাট হয়েছেন। আমাদের কাছে ইনি প্রথম মুর্শিদকুলি, দক্ষিণ সুবার দেওয়ান]। উত্তরে মুজফফর খান তুরবাতি এবং টোডরমল্ল যে রাজস্ব সংস্কার করেছেন, সেই কাজ দক্ষিণে সাধন করেছেন দক্ষিণের দেওয়ান প্রথম মুর্শিদকুলি খান [এবার থেকে শুধুই মুর্শিদকুলি]। মুঘল প্রশাসনে আলিমর্দান খান কান্দাহার শহরের নিয়ন্ত্রণ ২৮ ফেব্রুয়ারি ১৬৩৮-এ মুঘলদের হাতে তুলে দেন। সে সময় আলিমর্দানের প্রশাসনে কাজ করা মুর্শিদকুলি খানও তাঁর হুজুরের সঙ্গে মুঘল প্রশাসনে যোগ দেন। পাঞ্জাবের কাংড়ায় ফৌজদার, লাহোরের গোরার আতাবলের বকশি নিযুক্ত হন। তিনি মুঘল সেনাবাহিনী এবং সাধারণ প্রশাসনেও যোগ্যতা দেখিয়ে কাজ করেছেন। বলখ অভিযানে তিনি আওরঙ্গজেবের বকশি ছিলেন। দ্বিতীয়বারে আওরঙ্গজেব যখন দক্ষিণে সুবাদার হয়ে গেলেন তখন তিনি প্রথমে পনঘাট, তিন বছর পরে বালাঘাটের অর্থাৎ সামগ্রিক মুঘল দক্ষিণের দেওয়ান নিযুক্ত হলেন। সেখানেই তাঁকে খান উপাধি দেওয়া হয়। ধারমতের যুদ্ধে তিনি তোপখানা নিয়ন্ত্রণ করতেন। সেই যুদ্ধেই তিনি মারা যান
দক্ষিণের প্রাশাসনিক দায়িত্ব নিয়ে আওরঙ্গজেব বুঝলেন ১৬৩০-৩২-এর পরে দক্ষিণে বেশ কয়েকটা মন্বন্তরের ধাক্কা কৃষির উৎপাদকতা বিপুলভাবে ধ্বসিয়ে দিয়েছে। শিবাজীর বিরুদ্ধে মুঘলদের আক্রমন প্রাবল্যে বিজাপুরের জনগণের অবস্থা খুব করুন। তবে আরও কিছু প্রশাসনিক বিষয় কৃষকদের বিপক্ষে গিয়েছে। মুঘলেরা উৎপন্ন ফসলের পরিমাণের ওপর রাজস্ব আদায় করত। তাই বিশেষ বিশেষ অঞ্চলের জমির উর্বরতা মাপার ওপর নির্ভর করত মুঘল রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ। মুঘল হিন্দুস্তানের মত দক্ষিণে লোহার বা বাঁশের জারিব বা মাপন দণ্ড দিয়ে জমি মাপন করা হত না, ফলে বিঘা প্রতি কত ফসল উৎপন্ন হত তার নিশ্চয়তা ছিল না প্রশাসনের কাছে। স্থানীয় আমলার আন্দাজের ওপরেই রাজস্ব আদায় চলত। জমির উর্বরতা এবং ফলনের মাপনের কাজ আকবর শুরু করেছিলেন। তাঁর সময়ে রাজস্ব দপ্তর ভূমির চরিত্র, উৎপাদকতা ইত্যাদি তথ্য জড়ো করে যে নথি তৈরি করেছিল, যদি স্থানীয়রা সেই তথ্য পাল্টানোর দাবি করত, সেই অনুযায়ী তদন্ত করে মহাফেজখানার তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছে। কিন্তু দক্ষিণে এই ধরণের উদ্যম নেওয়া হয় নি। স্থানীয় আমলার খোলা চোখে দেখা হিসেবেই জমির রাজস্ব নির্ধারিত হত। বহু সময় রাজস্ব আদায়কারীকে রাজস্ব দেওয়ার ভয়ে চাষী চাষ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছে — এইভাবে বহু গ্রাম বসতিহীন জঙ্গুলে এলাকায় পরিণত হয়েছে। ফলে রাজস্ব আদায় বছরের পর বছর কমেছে দ্রুত হারে। ১৬৩১-এ শাহজাহান খণ্ডেশের রাজস্ব অর্ধেক করে দেন, তবু প্রার্থিত পরিমান রাজস্ব আদায় করা যায় নি।
এইরকম অবস্থায় মুর্শিদকুলি রাজস্ব দপ্তরে এলেন। সমস্যার সমাধানের নিদান হিসেবে তার মাথায় ছিল উত্তরে আকবরের রাজস্ব সংস্কারের মানদণ্ড। দেওয়ানের প্রথম কাজ হল অতীতের উর্বর চাষযোগ্য বিরান জঙ্গলে ছেয়ে যাওয়া গ্রামগুলিতে আবার বসতি বসানো। তিনি বেশ কিছু নতুন আমিন নিয়োগ করলেন, নতুন গ্রাম প্রধান, মুকদ্দম নিযুক্ত হল, আর সমীক্ষকদের কাজ হল জমি জরিপ করে, সেই তথ্য নথিকরণ করে লিপিবদ্ধ করে মহাফেওজখানায় পাঠানো। কৃষকদের উৎপাদনের উপকরণ কিনতে খোলা হাতে তাকাভি ধার দেওয়া হল [প্রসন্ন পার্থসারথি হোওয়াই ইওরোপ গ্রিউ রিচ… বইতে লিখছেন ব্রিটিশেরা রাষ্ট্রের দেওয়া ব্যক্তি চাষিকে তাকাভি ধারের বিপুল পরিমাণ দেখে অবাক হয়ে যায়]।
রাজস্ব নির্ধারণে তিনটে পদ্ধতি অনুসরণ করা হল – অধিকাংশ পুরোনো এলাকায় চাষীর হালের সংখ্যা অনুযায়ী কোনও জমির নির্দিষ্ট রাজস্ব নির্ধারিত হত (এটা বাংলা বিহার সুবাতেও ছিল, তার উদাহরণ আমরা পাচ্ছি মুজফফর আলম, ইস্টার্ন ইন্ডিয়া ইন আর্লি এইটিন্থ সেনচুরি প্রবন্ধে। মুজফফর আলম বলছেন হকিকতইসুবাবিহার সমীক্ষায় বলা হয়েছে শাহজাহানের সময় থেকেই (এবং হয়ত তার অনেক আগে থেকেই) ব্যবস্থাটা ছিল। এর একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সাধারণত যে কোনও সেনা অভিযানে কাঠুরে এবং চাষীরা সেনাবাহিনীর সঙ্গে সঙ্গেই থাকত বেলদার হিসেবে[আজকে যাদের রাঢ় বঙ্গে আগুরি পরিবার হিসেবে চিনি], যাতে জঙ্গল পরিষ্কার করা যায়, বিশাল সেনাবাহিনীর জন্যে সব মৌসমের উপযোগী রাস্তা তৈরি করা যায় এবং [দীর্ঘ সময়ের জন্যে শিবির পাতা হলে মাঠ সুসর করে খাদ্য শস্য উৎপাদন করারা জন্যে যোগ্য জমি তৈরি করতে] জমি সুসর করে চাষের উপযোগী করা যায়। বিভিন্ন জঙ্গুলে জমি বাহিনীর জন্যে পরিষ্কার করার সুবাদে কাঠুরে আর চাষীদের সেই জমির পাট্টা দেওয়া হত। এই প্রথা মুঘলদের বহু আগে থেকেই চালু ছিল। মুঘলদের সময় এটাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হল। চাষের জন্যে হাল সরবরাহ করত সরকার। প্রথম বছরের জন্যে প্রতি বিঘায় এক আনা দরে পাট্টা দেওয়া হত। চৌধুরীদের (মধ্যস্থ) নিয়োগ করা হত রিয়ায়াদের (রায়ত) সঙ্গে সুন্দর ব্যবহার করে তার সঙ্গে যোগাযোগ রেখে তার সমস্যাগুলো সমাধান করানোর এবং নতুন এলাকায় নতুন বসতি তৈরি করানোতে সাহায্য করার জন্যে। কেন্দ্রিয় সরকারের নিয়মে যাতে চাষীদের পাট্টাটা দেওয়া হয় সেটা চৌধুরীদের নিশ্চিত করতে হত। আর দেয় সরকারি প্রতিশ্রুতি যাতে রাখা যায় সেটাও তাদের দেখতে হত। যে/যারা জঙ্গুলে জমি হাসিল করে বসতি স্থাপন করতে পারবে, জমিদারি তাকেই দেওয়া হবে, এমন নির্দেশ দেওয়া থাকত প্রশাসনের থেকে[এটা আমরা ঈটনের …বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ারে দেখি]। কানুনগোদের প্রতি নির্দেশ ছিল চৌধুরীদের সঙ্গে মিলে হাসিল নিয়ম তৈরি করবে (settlement regulations) এমনভাবে যাতে এলাকাটি বসতিতে ভরে ওঠে। সেইভাবে রাজস্ব দাবি তৈরি করা হত। তারা প্রতি বছরের চাষের উৎপাদনের হিসেব রেখে বছরের শেষে সেই হিসেবগুলি আমিলকে জমা দিত। আমিলেরা পরগণা settlement-এর আগে রোজানা, দস্তুর, নানকর এবং ইনাম ইত্যাদির দাবি তৈরি করবে যাতে রায়তদের এবং রাষ্ট্রের আর্থিক উন্নতি ঘটে। আইন অনুয়ায়ী তাদের কবুলিয়ত সংগ্রহ করে, সেগুলি স্বস্বাক্ষর করে জমা দিয়ে, সেই অনুযায়ী রায়তদের পাট্টা সংগ্রহ করতে সাহায্য করবে। তারা প্রতি চাষ উৎপাদনের তহশিল অনুযায়ী কিস্তিতে রাষ্ট্রের রাজস্ব কেন্দ্রিয় তোষাগারে জমা করবে। এই পদ্ধতিতে চাষের উপযুক্ত খুব ভাল উর্বর জমিতে ২০ বিঘায় একটি হাল রাষ্ট্রের পক্ষে দেওয়া হত। এছাড়াও পড়ে থাকা পতিত জমি বা বহুকাল চাষ না হওয়া জমিতেও হাল দেওয়া হত। এতেও তাকাভি ঋণ দেওয়া হত। নির্দেশ ছিল, তিন বছরের কিস্তিতে হালের দাম উসুল করা হবে জমিদারদের [জমির মালিক, উপনিবেশিক, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সময়ের অর্থে নয়] থেকে। প্রত্যেক হাল মীরকে (যাদের চার বা পাঁচটা হাল আছে) একটি করে দস্তুর বা পাগড়ি সম্মান দেওয়া হবে যাতে সে জঙ্গল হাসিল করে নতুন আরও বেশি চাষযোগ্য জমি তৈরি করতে পারে। এইভাবে যদি প্রত্যেক রিয়ায়ার [রায়ত, প্রজা] সঙ্গে ভাল ব্যবহার করা যায়, তাহলে অন্যান্য অঞ্চল এবং সুবা থেকে মানুষ আকর্ষিত হয়ে এসে জঙ্গল হাসিল অথবা পতিত জমি উদ্ধার করে বসতি স্থাপন করবে)। অন্যান্য জায়গায় আরও পুরোনো বাতাই বা গাল্লা-বখশি বা অংশিদারি পদ্ধতি এবং মাপন বা নাপাই ব্যবস্থা চালু হল]।
বাতাই বা অংশিদারি ব্যবস্থায় অঞ্চল অনুযায়ী উৎপন্ন ফসলের অংশিদারি তৈরি করা হল। যেখানে শুধু বর্ষার ভরসায় চাষ হয় সেখানে উৎপাদনের অর্ধেক চাওয়া হল, যেখানে সেচ দিয়ে জমি চাষ হয় সেখানে দানা শস্যের জন্যে এক চতুর্থাংশ, অন্যান্য উৎপাদনের জন্যে এক তৃতীয়াংশ খাজনা দাবি করা হল। খালের জলে যে সব জমি চাষ করা হয় তার জন্যে কী অংশিদারি দাবি করা হয়েছে সেটা জানা যায় নি। তবে মনে হয় অংশদারি আরও কম ছিল। তৃতীয় পদ্ধতিটা ছিল উত্তরের মত লাঠি দিয়ে জমি মাপন পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে রাষ্ট্র বাজার দরে উৎপন্নের এক চতুর্থাংশ দাবি করত। এর আগের সময়ে রাষ্ট্রের দাবি বেশি ছিল, কিন্তু আওরঙ্গজেব চাষীদের উৎসাহ দিতে চাষীস্বার্থবাহী রাজস্ব ব্যবস্থা প্রণয়ন করলেন।
তবে রাষ্ট্রের আদায় নির্ভর করত দেওয়ানের কর্ম দক্ষতা আর তার রাজস্ব আদায় দলের কার্যকারিতার ওপরে। প্রতিদিন মোট রাজস্ব আদায়ের হিসেব নেওয়ার পাশাপাশি জারিব দণ্ড হাতে স্বয়ং দেওয়ান মুর্শিদকুলি মাঠে নেমে পড়লেন। শাহনাওয়াজ খান মসিরউলউমারায় বলছেন ‘তিনি দক্ষিণের রাজস্ব ব্যবস্থায় অমর হয়ে রইলেন। তিনি দক্ষিণ সুবার জন্যে যে দস্তুরউলআমল তৈরি করলেন সেটি আগামী বহু বছর রাজস্ব আমলাদের নির্দেশনামা হিসেবে ব্যবহৃত হবে। মুর্শিদকুলি খান যে সংস্কার নীতি তৈরি করলেন সেগুলোর নাম হয়েগেল ‘ধারা মুর্শিদকুলি খান’। তাঁর সংস্কার প্রক্রিয়া দক্ষিণের রাজস্ব ব্যবস্থার হালত সম্পূর্ণ পাল্টে দিল।
চার বছর পর ১৬৫৮-য় আওরঙ্গজেব যখন সিংহাসনে উঠছেন, ভীমসেন বুরহানপুরী আওরঙ্গাবাদের কাছে একটাও পতিত জমি দেখছেন না। সেখানে গম বা অন্যান্য দানা শস্য প্রতিটাকায় ২ থেকে আড়াই মন পাওয়া যায়, জোয়ার বাজরা পাওয়া যায় সাড়ে তিন মন, গুড় পাওয়া যায় আধা মন, হলুদ তেল (ঘি?) চার সের। (চলবে)