সেনাদের মাইনে বাড়ালেন
যে সব সেনা আমলা মন দিয়ে সাম্রাজ্যের সেবা করেছেন, আওরঙ্গজেব স্পষ্টভাবেই তাদের স্বার্থ পূরণে নানান সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। সম্রাট একটি বিশেষ নির্দেশনামা আবতাইদাগ তৈরি করে দক্ষিণে সেবা করা প্রতি আমলাকে নির্দিষ্ট তালিকাবদ্ধ করলেন । তালিকায় থাকা প্রত্যেক সেনাপতির বাহিনীর ঘোড়া এবং পশু চিহ্নিত (দাগ) করালেন। কোনও সেনানায়কের গুনতিতে ঘোড়া কম পাওয়া গেলে কঠোর হাতে তার থেকে অতিরিক্ত অর্থ ফেরতের নির্দেশ দেওয়া হত। আওরঙ্গজেবের সেনা সংস্কারের ফলে দক্ষিণের সেনা আমলাতন্ত্রে অসন্তোষ ধুমিয়ে ওঠতে শুরু করে। বহু আমলা জায়গির থেকে আদায় উদ্ধার করতে পারছিলেন না। তাদের অর্থ সাহায্য দেওয়া হত। কিন্তু দক্ষিণে যেহেতু মুঘল সাম্রাজ্যকে দুটি শক্তিশালী শত্রু শিবিরের সঙ্গে নিয়মিত লড়াই করতে হয়েছে, ফলে এই নিয়ম মুঘল বাহিনীকে কিছুটা বিপদে ফেলে। দাগ রেগুলেশনের আরেকটা সমস্যা হল কেন্দ্রিয় সরকারের নতুন নিয়ম অনুযায়ী সেনাদের ন্যুনতম মাইনে কমলো। — ২০টাকা থেকে ১৭টাকা, তারপর আরও কমিয়ে ১৫টাকা। শাহজাহান কেন্দ্রিয় খাজাঞ্চির ওপর চাপ কমাতে মাইনে কমাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। কিন্তু আওরঙ্গজেব সম্রাটকে লিখলেন, এই মাইনেতে সাধারণ ঘোড়সওয়ারের যুদ্ধ প্রস্তুতিতে বিপুল খামতি থেকে যাবে। বিশেষ করে যেখানে আগের বছর মাইনে ছিল ৩২টাকা। তিনি সম্রাটকে এই নির্দেশনামা তুলে নিতে অনুরোধ করলেন। শাহজাহান আওরঙ্গজেবের প্রস্তাব মেনে তার সিদ্ধান্ত রদ করলেন।
গোলান্দাজ বাহিনীর সংস্কার
আওরঙ্গজেব সেনা বাহিনীর গোলান্দাজ বিভাগেও তার সংস্কারের নীতি প্রয়োগ করলেন। ১৬৫০-এ দক্ষ আমলা মীর খলিলকে দারোগাইতোপখানা নিযুক্ত করা হল। দারোগা দক্ষিণ প্রদেশগুলো বিস্তৃতভাবে ঘুরলেন, প্রতিটা দুর্গ দেখলেন এবং যেকটা জায়গায় অবহেলার চিহ্ন দেখলেন সেখানে ব্যবস্থা নিলেন। কেল্লাগুলোয় নির্দিষ্ট রসদ আর গোলাবারুদ পাঠানো হল। বন্দুকচিদের নিয়মিত পরীক্ষা নেওয়া শুরু করলেন। তিন গজের চৌখুপি রেখে চল্লিশ পা দূর থেকে চাঁদামারি পরীক্ষা করানোর ব্যবস্থা করলেন। যারা পারল না তাদের নির্মমভাবে ছাঁটাই করা হল। বৃদ্ধদের পেনশন দিয়ে অবসর দেওয়ানো হল। ছসপ্তাহের মধ্যেই সেনাবাহিনীর অবস্থার দৃশ্যমানভাবে উন্নতি ঘটল। দারোগার কর্মদক্ষতায় আওরঙ্গজেব প্রীত হলেন। তার পদোন্নতি ঘটিয়ে সীমান্ত ঘাঁটি ফতাহাবাদের কিল্লাদার বানানো হল। মীর খলিকের পরে দারোগা হলেন হুশধর খান, তারপরে এলেন মুখতার খান।
শাহজাহানের আওরঙ্গজবের প্রতি নির্দয় ব্যবহার
কান্দাহারের ব্যর্থতার পরে আওরঙ্গজেবের সঙ্গে সম্রাটের দুর্ব্যবহার পূর্বের সমস্ত উদাহরণ ছাড়িয়ে যায়। এই সময় শাহজাহানের ওপর দারা প্রভাব চূড়ান্ত আকারে ক্রিয়া করতে থাকে। যদুনাথ সরকার বলছেন, ততদিনে শাহজাহান, দারেয়া শুকোকে তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রকাশ্যে না হলেও, অপ্রাতিষ্ঠানিকভাবেই স্বীকৃতি দিয়েছেন। এর একটা প্রমাণ হল তাঁকে ময়ূর সিংহাসনের পাশে বসার সুযোগ করে দেওয়া। আমার ধারণা দারা আন্দাজ করেছিলেন বা তিনি হয়ত জানতেন।
যদিও অনেকে বলেছেন দাদা আর আওরঙ্গজেবের মধ্যে মূলত ধর্মীয় কারনের বিবাদ ছিল, কিন্তু আমার মনে হয় দারার ভয় অন্য জায়গায় ছিল। মুঘল শাহী পরিবার এবং দরবারি, অদরবারি অভিজাতদের কাছে আওরঙ্গজেবের জনপ্রিয়তা ছিল অপ্রতিহত। আওরঙ্গজেবের জনপ্রিয়তা দারার গ্রহণযোগ্যতাকে ম্লান করে দিতে পারে। আবদুল হামিদ লাহোরি আহকমইআলমগিরিতে বলছেন সম্রাট শাহজাহান মাঝে মাঝে বলতেন, ‘আমার প্রথম পুত্র (দারা শুকো) ভাল মানুষদের শত্রু করে তুলছে; মুরাদ বক্স মদ খেয়েই জীবন কাটিয়ে দেবে; মহম্মদ সুজার ভালত্ব ছাড়া আর কোন গুণ নেই। কিন্তু আওরঙ্গজেবের সঙ্কল্প আর বুদ্ধিমত্তা এবং দরবারিদের তার যথাযোগ্য সম্মান দেওয়া প্রমান করেছে, সেই একমাত্র এক দুর্যোগপূর্ণ কাজটি (মুঘল হিন্দুস্তান শাসন) সামলাতে পারবে। কিন্তু তার রোগভোগ আর দৈহিক অস্বাস্থ্য আমায় চিন্তায় ফেলেছে’। দারা তাঁর মত করে সম্রাটের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রয়োগ করে আওরঙ্গজেবকে অসম্মান, অপদস্থ করার সব রকম চেষ্টা চালিয়েগেলেন।
দারা জানতেন প্রাথমিকভাবে মুঘল সিংহাসনে বড় ছেলের অধিকারের মত প্রাচীন ভারতবর্ষীয় পরম্পরা তখনও তৈরি হয় নি। ফলে দারার সম্রাট হওয়ার একমাত্র রাস্তা হল, ভাইদের হারিয়ে সিংহাসনের অধিকার জিতে নেওয়া। মুঘলেরা সিংহাসনে আরোহণের তৈমুরী-চাঘতাই নীতি তক্ত ইয়া তাবুদ (হয় সিংহাসন নয় কাফন) মেনে চলত। কিন্তু দারা যেহেতু ক্ষমতার গর্বে গর্বিত হয়ে অভিজাতদের নিয়মিত অসম্মান করতেন, নানান বিষয়ে অকারণ গর্ব এবং অহংকার প্রকাশ করতেন, মদ্যপান করতেন — অধিকাংশ অভিজাত তাঁকে অপছন্দ করতেন, প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে এড়িয়ে চলতেন। আওরঙ্গজেব ঠিক উল্টো চরিত্রের শাহজাদা ছিলেন। তিনি অভিজাতদের যথোপযুক্ত সম্মান দিতেন, নিচুস্বরে কথা বলতেন। আদাবইআলমগিরির কোনও চিঠিতেই আমরা তাঁকে কখনও গলা চড়িয়ে সম্রাটের বিরুদ্ধে কথা বলতে দেখি না। দুই শাহী পুত্রের ব্যবহারের তুল্যমূল্য করে অধিকাংশ ক্ষমতাবান অভিজাত আওরঙ্গজেবের শিবিরে যুক্ত হতে চাইতেন। তাই নিজের সম্মান বাড়াতে দারা সম্রাটকে দিয়ে বারংবার খোলা দরবারে উপস্থিত অনুপস্থিত আওরঙ্গজেবকে প্রকাশ্যে অপদস্থ করার চেষ্টা করেছেন। রাজ্ঞী মমতাজ মহলের মৃত্যুর পর শাহজাহান তাঁর বড় কন্যার ওপর নানা বিষয়ে নির্ভর করতেন। ব্যক্তিত্বশালী জাহানারা বেগমের নাম হল বেগম সাহেবা। দারা আর বেগম সাহেবার জোট তৈরি হল, যদিও জাহানারা আওরঙ্গজেবকে সম্মান দিতেন, জাহানারাকেও আওরঙ্গজেব সম্রাটের সঙ্গে আলোচনার জন্যে দরবারে একমাত্র ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন। জাহানারা বহু সময় শাহজাহানের তিরষ্কার থেকে আওরঙ্গজেবকে বাঁচালেও দারা আর জাহানারার জোট বাস্তবিকভাবে আওরঙ্গজেবকে দরবারে কোণঠাসা করে রেখেছিল। কিন্তু সম্রাট আওরঙ্গজেবের প্রতি কী নির্দয় ব্যবহার করছেন, তার একটা মাত্র উদাহপরণ পেশ করা যাক। এটা আগেও ব্যবহার করেছি, এবারে আরেকটু বিশদে উপস্থিত করলাম। পরে আরও ক্রমাগত আসতে থাকবে, প্রাসঙ্গিক আলোচনায়।
মুলতানে সুবাদারিত্বের সময় এক বছর তীব্র বন্যা হয়। ফলে সে বছর চাষিদের রোজগার প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে যায়। মুঘলেরা যেহেতু ফসল উৎপাদনের পরিমাণের ওপরে রাজস্ব আদায় করত, তাই আওরঙ্গজেবের পক্ষে সে বছর রোজগার কম হয়। তিনি সম্রাটকে চিঠি পাঠিয়ে তার আদায় না হওয়া আয়ের কিছু অংশ ভর্তুকির আবেদন করেন — না হলে তার প্রশাসনিক, সামরিক সেবায় থাকা মানুষদের মাইনে দেওয়া সমস্যা হয়ে যাবে। সম্রাট ব্যঙ্গ করে লিখলেন ‘তুমি কেন বাহিনীকে মোহরের মাধ্যমে মাইনে দাও না?’ এবং তিনি সিংহাসনে আরোহণ করার পরে আওরঙ্গজেরকে কী কী সুবিধে দিয়েছেন, সে সবও সমীক্ষা তদন্ত করে লিপিবদ্ধ করতে নির্দেশ দিয়েছেন! সম্রাটের এই ধরণের উত্তরে এবং পদক্ষেপে অত্যান্ত দুঃখ পেয়ে দিদি জাহানারাকে লিখলেন, ‘আপনার চিঠি থেকে জানতে পারলাম, মহামহিম বলেছেন, আমায় তার পক্ষ থেকে যতটুকু দেওয়ার ছিল, সব তিনি দিয়েছেন। আমার হাতে যদি কোনও উদ্বৃত্ত না থাকে তার দায় তিনি নিতে পারেন না। তিনি সিংহাসনে আরোহণ করার পর থেকে আমি দরবার থেকে যে সব সুযোগ সুবিধে পেয়েছি তার বিস্তৃত তালিকা তিনি উমদাতুলমূলককে তৈরি করার নির্দেশ দিয়েছেন। সম্রাট আমায় যা দয়া করে এত বছর ধরে দিয়েছেন, সে সব আমার পক্ষে আশাতীত উপহার ছিল। আমি অন্যান্য শাহজাদার মত রত্ন খরিদ করি না [এবং বিলাস ব্যসনে অর্থও ব্যয় করি না]। আমায় তিনি যা দেন সব আমি ব্যয় করি আমার সেনা বাহিনীর পরিচর্যায়। কান্দাহার অভিযানের পরে আমার বাহিনীতে ৫,০০০ অশ্বারোহী রয়েছে। বর্তমানে আমার আর্থিক সমস্যা হল আমি গত বছরে দশ মাসের বেতন পেয়েছি, আমার জায়গিরের রোজগারে ৭ মাসও চলে না… এর উত্তরে তিনি ব্যঙ্গ করে বললেন, কেন আমি বাহিনীকে সোনার মোহরে বেতন দিই না! আমি আপনাকে জানাতে বাধ্য হচ্ছি, আমার কর্জ শোধ করার পর আমার হাতে এক মাসের বেতন দেওয়ার জন্যেও সোনার মোহর জমা থাকে না। তা সত্ত্বেও আমি আমার সাধ্যের বাইরে গিয়ে আমার বাহিনীর বেতন যতটা পারা যায় শোধ করার চেষ্টা করি। কিন্তু এই অবস্থায় জীবন ধারণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে’। (চলবে)