আর্থিক সমস্যা
শাহজাহান দারার প্রভাবে প্রভাবিত হয়ে আওরঙ্গজেবের আর্থিক সমস্যা বুঝতে চেষ্টা করেন নি। মুলতানে থাকাকালীন তাঁর যে জায়গির ছিল, দক্ষিণে যাওয়ার পর তাঁকে স্বাক্ষর করিয়ে নতুন যে জমি দেওয়া হল, সেগুলো মুলতানি জমির মত ততটা উর্বর নয়। হিসেব করে দেখা গেল নতুন ব্যবস্থায় তার আয় ১৭ লক্ষ টাকা কমে গিয়েছে। তিনি সম্রাটকে লিখলেন দক্ষিণের সুবাদারের যে সম্মান এবং দায়িত্ব পালন করতে হবে তার জন্যে তাকে বেশ কয়েকটা উর্বর জমি দেওয়া প্রয়োজন। জায়গিরের মান কমানোর সম্রাটের উদ্যম তাঁর বোধগম্য হয় নি। তিনি সম্রাটের ওপর বেশ কিছুটা প্রভাব রাখা বড় দিদিকে লিখলেন, ‘মহামহিম যদি চান, তার এই চেলা বাংলায় অবসর জীবন যাপন করবে, তার জন্য আল-তামাঘা জমি বরাদ্দই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি তাঁর এই শিষ্য আর চেলাকে একটি বিশাল বড় প্রদেশের শাসনভার অর্পণ করে দয়া এবং অনুগ্রহ বর্ষণ করেছেন। তাই তাকে নিশ্চয় করতে হবে তাঁর প্রতিনিধি যেন তার পরামর্শদাতা এবং দক্ষিণের মানুষের সামনে অসম্মানিত না হয়, এবং তাঁর প্রতিনিধির অদক্ষতা যেন সাম্রাজ্যের পরামর্শদাতাদের কোপের কারন না হয়’। আওরঙ্গজেবের ক্ষোভ অকারণ ছিল না। তাঁকে যে জমি দেওয়া হয়েছিল সেটি রাজস্ব বরাদ্দের সিকি অংশ উৎপাদন দেয় না। সম্রাট তাঁকে যে জমি বরাদ্দ করেছেন, সেই জমির আয়ের বিশদ বিবরণ তিনি সম্রাটকে লিখে পাঠিয়েছেন। তিনি ভর্তুকি চাইলেন দক্ষিণের রিজার্ভ ফান্ড থেকে, না হয় মালওয়া বা সুরাটের রাজস্ব থেকে। তাঁর জমি বরাদ্দ বাবদে শাহজাহানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টা খুবই উদ্ভট ছিল — তিনি আওরঙ্গজেবকে সুবাদারদের ভাল জমি থেকে পছন্দমত জমি বেছে নেওয়ার অনুমতি দিলেন। আওরঙ্গজেব বিনীত স্বরে বললেন এই প্রক্রিয়াটি অন্যায্য এবং অপরিনামদর্শী। যে সব অভিজাতর ভাল জমি তিনি কেড়ে নেবেন, তিনি অবশ্যই ক্ষুব্ধ হয়ে দক্ষিণ ছেড়ে চলে যাবেন, যার প্রত্যক্ষ প্রভাবে সেনাবাহিনীর ক্ষমতা এবং কার্যকারিতা কমে যেতে বাধ্য। তাঁর প্রস্তাব ছিল দক্ষিণে কাজে যাওয়া জায়গিরদারদের জমি থেকে জমি কেড়ে তাঁকে না দিয়ে, তাঁকে অন্য সুবার জমি দেওয়া হোক। শাহজাহান তাঁর প্রস্তাবে কান দেন নি, ফলে তাঁকে বাধ্য হয়ে অনুৎপাদক জমিগুলো রাখতে হয়েছে। তিনি খালিসা আর একটা দুটো জায়গির থেকে কয়েকটা মহাল নিয়েছিলেন। এবং তাঁর এই পদক্ষেপ নিয়ে দরবারে তাঁর বিরোধীরা তাঁর বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছে।
আওরঙ্গজেবের প্রস্তাবগুলো নজরআন্দাজ করা হল
আওরঙ্গজেবকে বার বার তিরষ্কার করা ছাড়াও কেন্দ্রিয় সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর নানান প্রকল্পে নিয়মিত হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। তবুও কাজ করতে গিয়ে যে সব পদক্ষেপকে বাস্তজনোচিত মনে করেছেন, সত্যকারের নেতার মত সেই পথে নির্দ্বিধায় হেঁটেছেন। যে সব সমস্যা তার সামনে খাড়া হয়েছিল, সেগ্যুলো নিজে সমাধান করে অন্য সব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেন্দ্রিয় দরবারের হাতে ছেড়ে দিলেন। খণ্ডেশ আর বেরারে বাঁধ তৈরির জন্যে মুলতাফিত খান ৫০ হাজার টাকা চেয়েছিলেন। আওরঙ্গজেব সেই প্রস্তাব কেন্দ্রিয় দপ্তরে বিবেচনার জন্যে পাঠিয়ে দেন। ক্ষিপ্ত শাহজাহান তাঁকে লিখলেন, ‘আমি চেলার থেকে আশা করি, এই ধরণের প্রস্তাবে তিনি দরবারের আবশ্যিক সম্মাতি নিয়ে কেন্দ্রিয় খাজাঞ্চি থেকে অর্থ অগ্রিম করবেন’। সুবাদারের বক্তব্য পরিষ্কার, তিনি অতীতের অভিজ্ঞতার ধাক্কাতেই এই কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন।
তার দৈনন্দিনের কাজকর্মে বার বার দরবার নাক গলিয়েছে। পদোন্নতি এবং নিয়োগ প্রস্তাব বারবারই সম্রাট নাকচ করেছেন। মুলতাফিত খানের পুত্র হুশধারের দারোগাইতোপখানা পদে নিয়োগের প্রস্তাব সম্রাট বাতিল করে মীর আহমেদ রিজভি বা সাফি খানকে নিয়োগ দিতে নির্দেশ দেন। সম্রাটের এই আচরণে তিনি গভীরভাবে আহত হয়েছিলেন। আসির কেল্লাটি আওরঙ্গজেবের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এর কিলাদার হিসেবে তিনি নিজের পছন্দের সেনা আমলা নিয়োগ করতে গেলে তাঁকে আগের মত হতাশ হতে হয়েছে। জাহানারাকে তিনি লিখলেন, কেন তার মত খারিজ করা হল, তার কোনও জুতসই কারন দরবার থেকে দেওয়া হয় নি। ২০ বছর ধরে সাম্রাজ্যের নিঃস্বার্থ সেবা করা সত্ত্বেও দক্ষিণের সুবাদারের ছেলে যতটুকু সম্রাটের মানসিক বিশ্বস্ততা অর্জন করেছেন, তিনি তার কাছাকাছিও পৌঁছতে পারেন নি।
তার আরেকটা হতাশা ছিল তিনি যাদের নিয়োগ করেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে সম্রাটের কানে নিয়মিত অভিযোগের গরল ঢেলে গিয়েছে দরবারে তার বিরোধী পক্ষ [এখানে আপনি নিশ্চিন্তে দারার নাম পড়তে পারেন]। তিনি যখন মুলতানে ছিলেন, সম্রাটকে বলা হল রাকস্ব আমলা মালিক হুসেইন কৃষকদের ওপর অত্যাচার নামিয়ে আনছে, কৃষকেরা ত্রাহি ত্রাহি রব করছে। আওরঙ্গজেব জানেন, তার আমলার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি সম্রাটকে চিঠি লিখে জানালেন ডাকাত আর দুষ্কৃতি দমন করা ছাড়া তার আমলা সুবায় একজনও কৃষকের ওপর অত্যাচার করেন নি; আমি যদি খবর পেতাম সে অনপরাধীর ওপর অত্যাচার নামিয়ে আনছে, তাহলে ‘…সর্বাগ্রে আমিই তাকে হুঁশিয়ারি দিতাম এবং অত্যাচার করার সুযোগ দিতাম না; যতদূরসম্ভব নির্দিষ্ট কোনও স্বার্থান্বেষী পক্ষ, তথ্য বেঁকিয়েচুরিয়ে আপনার সামনে উপস্থাপন করেছে’। পরে দরবার থেকে চিঠি পাঠিয়ে চাষিদের ওপর অত্যাচার নামিয়ে আনায় অভিযুক্ত মুলতান প্রশাসনের আমলা মালিক হুসেইনকে অবিলম্বে পদোন্নতি দিয়ে কেন্দ্রিয় প্রশাসনে যোগ দিতে বলা হল। আওরঙ্গজেব দিদিকে লিখলেন, ‘আমার প্রশাসনে কাজ করা আমলাদের যদি তাদের যোগ্যতার বেশি পদোন্নতি দিয়ে কেন্দ্রিয় প্রশাসনে ডেকে নেওয়ার পরম্পরা শেষ না হয়, তাহলে এক সময় দেখা যাবে আমার প্রশাসনে কাজ করার জন্যে কোনও যোগ্য আমলাই পাওয়া যাচ্ছে না; গত বিশ বছর আমার সঙ্গে যারা কাজকরেছে, তাদের আমি আর চোখের সামনে দেখতে পাই না। ফলে আমার পক্ষে কোনও কাজই সফলভাবে শেষ করা সম্ভব হয়ে উঠছে না। কিন্তু কেন্দ্র যদি সেটাই চায় তাহলে আমাকে ফরমান জারি করে বলা হোক, আমি যোগ্য আমলাদের (নৌকরন-ই-কারামাদানি) নির্দেশ দেব তারা যেন আমার ‘বন্ধুদের’ (আজিজান) খোয়াব পূর্ণ করতে কেন্দ্রিয় প্রশাসনে চলে যায়। মহামহিম যদি আমাকে সত্যিকারের বিশ্বাস করেন, তাহলে এই সব কাজকর্মের মানে কী?’ চিঠির শেষে তিনি দিদিকে অনুরোধ করলেন তাঁর বিষয়ে সম্রাটের সঙ্গে ব্যক্তিগতস্তরে কথা বলতে এবং তাঁর ক্ষমাভিক্ষার মনোভাব সম্রাটকে জানাতে।
মহম্মদ সুলতানের বাগদান
আওরঙ্গজেবেরর নানান প্রস্তাব, আচরণ নিয়ে সম্রাট প্রকাশ্যে যত অসন্তোষ দেখাতে থাকেন, সেই অসন্তোষের ধোঁয়ার আড়ালে দরবারে আওরঙ্গজেবের বিরোধী গোষ্ঠী আরও বেশি করে সুযোগ খুঁজতে থাকে সম্রাটকে আরও বেশি আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে উত্ত্যক্ত করার। তাদের হাতে এরকম একটা পড়ে পাওয়া চৌদ্দ আনা সুযোগ চলে এল হঠাতই। দক্ষিণে চাকরিতে যাওয়ার আগে, সম্রাটকে জানিয়েই ১৬৫২-র এক বর্ষার রাতে শাহ সুজার সঙ্গে আগরায় বৈঠক করেছেন আওরঙ্গজেব। ঐতিহাসিকেরা মনে করেন এই বৈঠকে সম্ভাব্য সিংহাসনের যুদ্ধের জোট তৈরির ধারণার ভ্রূণের জন্ম হয়েছিল। দুই ভায়ের প্রস্তাব ছিল তাদের সন্তানদের মধ্যে বিবাহ অনুষ্ঠিত হলে তাদের পারিবারিক সম্পর্ক আরও জোরদার হবে, বোঝাপড়া আরও গভীর হবে। ঠিক হল আওরঙ্গজেবের সন্তান মহম্মদ সুলতান সুজার কন্যাকে বিয়ে করুক, আর শাহ সুজার পুত্র জৈনুদ্দিন বিয়ে করুক আওরঙ্গজেবের কন্যাকে। নতুন করে শুরু হল দুই পরিবারের বিবাহের কথাবার্তা। আলাপ আলোচনা চলার মধ্যেই ছোট একটা অনাড়ম্বর পারিবারিক অনুষ্ঠান করে বাগদান সম্পন্ন হল।
দরবারে আওরঙ্গজেবের বিরোধী গোষ্ঠী আওরঙ্গজেব-দাদার সন্তানদের মধ্যে বিবাহের প্রস্তাবে সিঁদুরে মেঘ দেখলেন। তাদের মনে হল চার ভাইয়ের মধ্যে দুই ভাই আগে থেকেই জোট বেঁধে ক্ষমতা দখলে নিজেদের অবস্থান জোরদার করছেন সন্তানদের বিবাহবন্ধনে জড়িয়ে নিয়ে। তাদের নেতা দারার সামনে মুরাদের সঙ্গে জোট করার দরজা বাস্তবিক বন্ধ। দারা কে আওরঙ্গজেব ‘দাদা ভাই’ সম্বোধন করলেও বড় আর ছোটর মধ্যে বাক্যালাপ ছিল না। জোট তো দুরস্ত।
দারাকে ভবিষ্যতের সম্রাটের পরে প্রায় বসিয়ে দেওয়া সম্রাট আওরঙ্গজেবকে চিঠি লিখে জানালেন এই বিয়েতে তাঁর সায় নেই। বর্তমান বিয়ে ভেঙে যাক। মহম্মদ সুলতানের বিয়ে অন্য কোনও খানজাদা পরিবারের সঙ্গে হোক। লক্ষ্যণীয়, বিয়ে ভাঙ্গার প্রস্তাব দেওয়া হল কিন্তু আওরঙ্গজেবকেই, শাহ সুজাকে নয়। ভায়ের পরিবারে বাগদানের আশ্বাস দেওয়ার পর আওরঙ্গজেবের পক্ষে সামাজিকভাবে পিছু হটা অসম্ভব ছিল। তিনি সমস্যার কথা সম্রাটকে জানালেন। সম্রাট তাঁকে এই বিবাহবন্ধনের পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বললেন। সম্রাটের প্রস্তাব আওরঙ্গজেব মানলেন না। শাহী প্রস্তাবে পুত্রের প্রত্যাখ্যান, সম্রাটের পক্ষে ভালভাবে নেওয়ার কথা নয়। আওরঙ্গজেবকে শাস্তি দিতে তিনি দক্ষিণের আসির কেল্লা নিয়ন্ত্রণের অধিকার সুবাদারের হাত থেকে কেড়ে নিলেন। কেল্লা কেড়ে নেওয়ার ফরমানের আওরঙ্গজেবের প্রতিক্রিয়ার উত্তরটা খুবই ইন্টারেস্টিং ছিল, ‘বিবাহের আপনার প্রস্তাব নাকচ করার প্রতিক্রিয়ায় আপনি যে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছেন, তাতে আমি তীব্র অসহায় বোধ করছি। কারন [অতীতে] মহামহিম সম্রাট আমার সামনে যে কোনও প্রস্তাব এনে, আমায় সেটা গ্রহণ বা বর্জনের সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু সম্রাট নির্দিষ্ট প্রস্তাব পাঠিয়ে শুধুই তাঁরই প্রস্তাব গ্রহণের জন্যে আমার মত নম্র চেলাকে চাপ দিলেন, বর্জনের সুযোগ দিলেনই না। আমার সামনে অন্য কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ খোলা থাকল না [আমি তাই প্রস্তাবটা বর্জন করতে বাধ্য হলাম]’। বোঝা যাচ্ছে তিনি ক্রমশঃ খোলস ছেড়ে বেরোচ্ছেন। সেই মুহূর্তে বিয়ে হল না, বিয়েটা বেশ কয়েক বছর পরে আরও জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হবে ঠিকই, কিন্তু দরবারে বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর চাপে সম্রাটের সক্রিয়তাতেও বিয়ে ভাঙ্গলও না, দুই ভায়ের জোট আরও ঘণবদ্ধ হল।
শাহজাহানকে লেখা আওরঙ্গজেবের চিঠিগুলো পড়লে দরবারে এমন এক অদৃশ্য তৃতীয় পক্ষর সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করি। বুঝতে ভুল হয় না, তাদের কাজ হল দরবারে প্রবাসে থাকা আওরঙ্গজেবের যে কোনও প্রস্তাবে হয় বাধা দেওয়া, আর বাধা দেওয়ার সুযোগ না থাকলেও, পায়ে পা লাগিয়ে আওরঙ্গজেবের বিরোধিতা করা। এই গোষ্ঠী আওরঙ্গজেবের প্রতিটা পদক্ষেপ কালিমালিপ্ত করে বাবার সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে উদগ্রীব হয়ে থাকত। স্বাভাবিকভাবে দারা এই দলের নেতা; জাহানারা যদিও আওরঙ্গজেবেকে পছন্দ করতেন, কিন্তু তিনিও অনেক বেশি পছন্দ করতেন পরিশীলিত, তার ধর্মমতের অনুগামী বড় ভাই দারাকে। এই দলের কাজ করার পদ্ধতি ছিল চতুর এবং অদ্ভুতভাবে কার্যকর; প্রতিটা পদক্ষেপ ভেবেচিন্তে গ্রহণ করত। হয়ত শাহজাহান অজান্তেই এদের ফাঁদে পা দিতে বাধ্য হতেন; কোনও কোনও ঘটনায় মনে হত তিনিই যেন আওরঙ্গজেব বিরোধী দলের সর্বোচ্চ নেতা। কিন্তু সম্রাট বুঝলেন না, শাহী সাম্রাজ্যের সর্বোচ্চ কর্তা হিসেবে, তাঁর পক্ষে কোনও গোষ্ঠীর স্বার্থ পূরণে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পক্ষপাত করা অতীব ভয়ঙ্কর পরিবেশ তৈরি করতে পারে। এর ফলে প্রশাসনের কর্মদক্ষতা বারংবার প্রশ্নের মুখে পড়ছিল। অবাক কাণ্ড শাহজাহানের দীর্ঘ প্রশাসনিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তিনি শেষ বয়সে ভুল পথে যাওয়া থেকে নিজেকে নিবৃত্ত করেন নি। তার ইচ্ছা ছিল দারাই তার সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হবে। ইচ্ছে পূরণে তিনি যে পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, সেগুলো সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্যের পক্ষে খুব কাঙ্ক্ষিত ফল দেয় নি। মুঘলদের মত আদিবাসী পরিবারে সন্তানদের মধ্যে একটা স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা তৈরি করা হত, যাতে তারা নিজেদেরকে সিংহাসনের জন্যে যোগ্যভাবে তৈরি করতে পারে; নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের পরিবেশ তৈরি করে কোনও একজন যোগ্যতম হিসেবে উঠে আসে। এবং এই পথ সফল করতে শাহী প্রধান সম্রাটকে নিরপেক্ষ থাকা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু শাহজাহান সেটা পারেন নি। তিনি সর্বসমক্ষেই নির্দিষ্ট একজন শাহজাদার পক্ষ নিয়েছেন। অতীতের সম্রাটেরা প্রাথমিকভাবে যে শাহজাদাকে তার উত্তরাধিকারী হিসেবে বেছেছিলেন, পরের দিকে তাদের পছন্দ বদল হয়েছিল। কিন্তু শাহজাহানের দৃষ্টিকটু পক্ষপাতিত্ব দারা এবং আওরঙ্গজেবের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর বিবাদ বাড়িয়ে দেয়। পক্ষ নেওয়ার বিষ ফল কয়েক বছরের মধ্যেই স্বয়ং সম্রাট হাতে হাতে পেয়ে যাবেন। (চলবে)