মীর জুমলা
গোলকুণ্ডার পারস্যজাত সেনানায়ক, ব্যবসায়ী অভিজাত মীর জুমলা (Mir Jumla) মুঘল দক্ষিণের রণনীতিতে এবং পরের দিকে শিবির পাল্টে সুবাদার শাহজাদা আওরঙ্গজেবের হয়ে মুঘল সিংহাসনের লড়াইতে বড় ভূমিকা পালন করেছেন। আওরঙ্গজেব দ্বিতীয়বার দক্ষিণের সুবাদারিত্বে এসে দূর থেকেই গোলকুণ্ডার দরবারি অভিজাত মীর জুমলার প্রতি আকৃষ্ট হন। তাঁর রণনৈতিক, কূটনৈতিক, সামরিক দক্ষতা আওরঙ্গজেবকে চমৎকৃত করেছিল। সর্বগুণে গুণান্বিত এই রাজনীতিককে তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের প্রয়োজনে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা করলেন। নিজের শিবিরে কোণঠাসা হয়ে পড়া একজন দক্ষ রাজনীতিবিদ প্রতিপক্ষ শিবিরে তাঁর মতই কোণঠাসা হয়ে পড়া আরেক দক্ষ রাজনীতিবিদকে চিনতে ভুল করেন নি। মুঘল রণনীতিতে দক্ষিণকে হাতের তালুর মত চেনা মীর জুমলার মুঘল সংসর্গ, মুঘলদের দক্ষিণ রণনীতি নতুনভাবে সাজাতে প্রভূত সাহায্য করবে। তিনি ধীরে ধীরে মীর জুমলাকে মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করার পরিকল্পনা করলেন।
ইস্পাহানজাত মহম্মদ সৈয়দ (Mohammed Syed) গোলকুণ্ডায় অভিবাসিত হয়ে শাসক আবদুল্লা কুতুব শাহের (Abdullah Qutb Shah) নজরে পড়েন। গোলকুণ্ডা প্রশাসনে খুব তাড়াতাড়িই তাঁর উন্নতি ঘটতে থাকে। সামরিক, কূটনৈতিক এবং প্রশাসনিক দক্ষতা দেখিয়ে তিনি গোলকুণ্ডার প্রধানমন্ত্রী হলেন। মহম্মদ সৈয়দের অসামান্য সামরিক দক্ষতা তাকে সুলতানের বিশ্বস্ত সভাসদে পরিণত করে। সুলতান তাঁকে কর্নাটক বিজয় অভিযানে নিযুক্ত করেন। তাঁর সামরিক দক্ষতা কাজে লাগিয়ে মহম্মদ সৈয়দ অভেদ্য চন্দ্রাগিরি দুর্গ দখল করেন। হিরের ব্যবসায় বিপুল সম্পদের মালিক হন। কর্নাটকে জয় করে যে জায়গির তিনি পান সেটি এত বড় ছিল যে সেটিকে প্রায় একটা স্বাধীন রাজ্য হিসেবে গণ্য করা হত। কাজের দক্ষতার জন্যে তিনি মীর জুমলা উপাধি পান। এটাই মহম্মদ সৈয়দের পরিচয় হয়ে ওঠে। তাঁর পিতৃদত্ত নাম ইতিহাস থেকে প্রায় মুছেই যায়। সপ্তদশ শতকের অর্ধ শতক জুড়ে বিভিন্ন রাজত্বের সাম্রাজ্য বিস্তারের ইতিহাসে মীর জুমলা হয়ে উঠবেন গুরুত্বপূর্ণ এক ঘটক চরিত্র।
মহম্মদ সৈয়দ মীর জুমলার উত্থানে ঈর্ষায় জ্বলেপুড়ে মরা গোলকুণ্ডার সভাসদেরা তাঁকে দরবার থেকে সরাবার জন্যে সুলতানকে প্ররোচনা দিতে থাকেন। কানপাতলা সম্রাট দরবারি অভিজাতদের কানভাঙানিতে কিছুটা প্রভাবিতও হচ্ছিলেন। মীর জুমলা সম্রাটের শারীরি ভাষাতেও স্বাভাবিকভাবে বদল দেখছিলেন। সম্রাটের ভাবভঙ্গীর লক্ষ্য করে, নিজের এবং পরিবারের নিরাপত্তা বিষয়ে শঙ্কিত হয়ে মীর জুমলা, নিজের নিরাপত্তার রাস্তা নিজেই খুঁজে নেওয়ার পরিকল্পনা করলেন – তিনি একসঙ্গে বীজাপুর, পারস্য এবং মুঘল দরবারে পুনর্বাসনের জন্যে যোগাযোগ করলেন।
আওরঙ্গজেবের ভয় ছিল হঠকারী সম্রাট কুতুবুল মুলক, কুতুব শাহ মীর জুমলাকে বন্দী করতে পারেন। আওরঙ্গজেব মুনিমকে কর্ণাটকে পাঠালেন মীর জুমলার সঙ্গে নির্দিষ্ট রাস্তায় আলাপ আলোচনা করে, মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষ থেকে তাঁকে আশ্বস্ত করার জন্যে। আওরঙ্গজেবের আশংকা সত্যি হল। সুলতান কুতুবুল মুলক (Sultan Qutubul Mulk) মীর জুমলাকে ছল করে ডেকে এনে তাকে বন্দী করার পরিকল্পনা করলেন। মীর জুমলা রাজধানীর অবস্থা আন্দাজ করে কর্নাটকে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছকলেন। মীর জুমলার ছেলে গোলকুণ্ডার মুঘল দূতকে জানাল তার বাবা সুলতানের ব্যবহারে তীব্র অপমানিত বোধকরছেন। তাঁর বাবা চাকুরিজীবি। বাধ্য হয়ে রাজধানীতে গেছেন। তাঁকে যদি মুঘল সাম্রাজ্যের পক্ষে অভয় দেওয়া হয়, তাহলে তিনি মহামহিমের দরবারে যোগ দিতে ইচ্ছুক। ইতিমধ্যে আওরঙ্গজেব মীর জুমলার সেনা বাহিনীর বহর সম্পদ ইত্যাদি বিষয়ে খোঁজ নিয়েছেন। তিনি জেনেছেন মীর জুমলা শুধু খুব বড় রণদক্ষ সেনাপতিই নন, খুব বড় ব্যবসায়িও বটে। তার বাহিনী ৯,০০০ ঘোড়সওয়ার, ৫,০০০ ভৃত্য, ৪,০০০ সুলতানী সেনা, আর ২০,০০০ পদাতিকে সাজানো। আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে শাহী বাহিনীতে নিতে উৎসাহী ছিলেন, মীর জুমলাও গররাজি ছিলেন না। কিন্তু কিন্তু নানান রাজনৈতিক এবং পারিপার্শ্বিক কারনে মীর জুমলা মুঘল বাহিনীতে যোগ দেওয়া বিষয়ে বিন্দুমাত্র তাড়াহুড়ো করতে চাইছিলেন না। মীর জুমলার সিদ্ধান্তে আওরঙ্গজেব (Aurangzeb) হতোদ্যম হচ্ছিলেন।

নিজের, পরিবারের চরম বিপদেও মীর জুমলা কেন মুঘল প্রশাসনে যোগ দিতে সময় নিচ্ছিলেন, সে বিষয়ে ঐতিহাসিকেরা এক মত নন। শাহজাদা আওরঙ্গজেবকে নিয়ে বই লেখা মৈনুল হক বলছেন পারস্যজাত মীর জুমলা শেষ পর্যন্ত হয়ত শিয়া সাম্রাজ্য গোলকুণ্ডার আশ্রয় ছাড়তে চাননি। অন্য দিকে মীর জুমলার জীবনীকার জগদীশ নারায়ণ সরকার বলছেন, সুচতুর সতর্ক রাজনীতিবিদ মীর জুমলা প্রস্তাব দেওয়া প্রত্যেক পক্ষকেই বাজিয়ে দেখতে চাইছিলেন। আওরঙ্গজেব মীর জুমলার দোনোমনা মনোভাব দেখে হতাশ হয়ে দরবারে লিখে পাঠালেন, তিনি হয়ত মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ নন। তবে জগদীশ নারায়ণ সরকার (Jagadish Narayan Sarkar) বলছেন, মীর জুমলার লক্ষ্য ছিল বিশাল ছড়ানো রাজপথ সমুদ্রপথ ব্যবসা, হিরে খনি, হীরের ব্যবসা, নিজের হাতে তৈরি করা কর্ণাটক সাম্রাজ্যের সীমান্ত নিরাপত্তা, রাজস্ব আদায় ইত্যাদি গুছিয়ে নেওয়া। এই জন্যে তাঁকে সময় নিতে হচ্ছিল। পোড়খাওয়া ব্যবসায়ী, সেনাপতি, কূটনীতিবিদ মীর জুমলা জানতেন, অনাবশ্যক তাড়াহুড়ো করার অর্থ সারাজীবন ধরে তিনি যে বিপুল সম্পদ, সম্মানের পাত্রর হয়েছিলেন, সেগুলোকে মুহূর্তের মধ্যে জলাঞ্জলি দেওয়া। কুতুবশাহী রাজত্ব আর তাঁকে কণা মাত্র বিশ্বাস করে না। তাঁকে যে কোনও মূল্যে সপরিবারে, খুব তাড়াতাড়িই সমস্ত সম্পদ গুছিয়ে নিয়ে গোলকুণ্ডা রাজ্য ছাড়তেই হবে। তিনি জানেন দক্ষিণের রাজনীতিতে গোলকুণ্ডার সুলতানের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারে একমাত্র মুঘল সাম্রাজ্যই। মুঘলদের মত বড় গাছের ছায়ার আশ্রয় না পেলে তাঁর পক্ষে বারবার সুলতানের রোষের মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না। গোলকুণ্ডা ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পিঠাপিঠি মুঘল বাহিনী/প্রশাসনে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব গ্রহণ করলেন। শুরু হল আওরঙ্গজেবের সঙ্গে জোট বাঁধার আলাপ আলোচনা।
মীর জুমলার মুঘল বাহিনীতে প্রবেশ
আওরঙ্গজেব বুঝলেন মীর জুমলা পক্ষ পাল্টানোর মন তৈরি করেছেন। মুঘল তাঁবেতে আসা ছাড়া তার সামনে আর অন্য কোনও উপায় খোলা নেই। তাঁর আশংকা হল কুতুবশাহী সুলতান মীর জুমলা বা তার পরিবারের ওপর আক্রমন নামিয়ে আনতে পারেন। মুঘল সুবাদার, দিল্লির সম্রাটকে তার আশংকার কথা জানিয়ে মীর জুমলার নিরাপত্তা এবং মুঘল বাহিনীতে তাঁকে যোগ দেওয়ানোর পরিকল্পনার সমর্থন চাইলেন। দক্ষিণের দুই সুলতানই যখন মীর জুমলাকে ধ্বংস করতে উদ্যোগী হয়েছেন তখন সুবাদার মীর জুমলার সরাসরি মুঘল দরবারে রাজনৈতিক আশ্রয়ের প্রার্থনা জানালেন। সম্রাট সুবাদারের প্রার্থনা মঞ্জুর করে মীর জুমলা এবং তাঁর পুত্রকে মুঘল প্রশসনে অন্তর্ভূক্তির অনুমতি দিলেন। আওরঙ্গজেব সুসংবাদ মীর জুমলাকে দিলেন। একই সঙ্গে সম্রাটকে অনুরোধ করলেন সরাসরি দরবার থেকে মীর জুমলাকে নিয়োগপত্র পাঠানোর জন্যে। মহম্মদ আসিফ কাশ্মীরির দৌত্যে মীর জুমলার জন্যে ৫ হাজারি মনসবদার এবং তাঁর পুত্র মহম্মদ আমিনের জন্যে ২ হাজারি মনসবদারের নিয়োগপত্র পাঠানো হল। মহম্মদ আমিন দক্ষিণ থেকে মুঘল হিন্দুস্তানে রওনা হওয়ার আগে হঠকারী কুতুবুল মুলকের নির্দেশে তাকে গ্রেফতার করা হলে আওরঙ্গজেবের গোলকুণ্ডা আক্রমণের আর বাহানার প্রয়োজন হল না। আওরঙ্গজেব সম্রাটকে লিখলেন দরবারের পক্ষ থেকে গ্রেফতার হওয়া মুঘল সাম্রাজ্যের পদাধিকারীকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ জারি করা হোক। শাহজাহান ফরমান পাঠিয়ে তার সুবাদারকে বাহিনী আওরঙ্গাবাদ এবং হায়দারাবাদের মধ্যে কান্দাহার কেল্লায় [যেখানে আমিনকে এনে বন্দী রাখা হবে] সেনা বাহিনী নিয়োগ করার নির্দেশ দিলেন। তিনি আওরঙ্গজেবকে কুতুবুল মুলককে লিখে হুঁশিয়ারি দিতে বললেন সম্রাট স্বয়ং মীর মহম্মদ সৈয়দ আর তার পুত্রকে সাম্রাজ্যের সেবায় নিয়োগ করেছেন, তাকে বিনা বাধায় দরবারে আসতে দেওয়া হোক, না হলে মুঘল সাম্রাজ্য গোলকুণ্ডায় সেনা পাঠাতে বাধ্য হবে। আওরঙ্গজেবের সাম্রাজ্যবিস্তারী মন এই শাহী নির্দেশের অপেক্ষায় ছিল। তিনি হাজি দাদ খানকে কান্দাহার কেল্লার কাছে নিয়োগ করে পরের নির্দেশ পাওয়ার অপেক্ষা করতে বললেন। কুতুবুল মুলককে চিঠি লিখে আমীনকে ছেড়ে দেওয়ার, তার সম্পত্তি প্রত্যার্পণের নির্দেশ দিয়ে বললেন, তার নির্দেশ অমান্য করা হলে আওরঙ্গজেব তার পুত্রের নেতৃত্বে বাহিনী পাঠাতে বাধ্য হবেন। (চলবে)