গোলকুণ্ডা আক্রমণ
শাহজাহান আওরঙ্গজেবকে গোলকুণ্ডা আক্রমণের স্পষ্ট নির্দেশ দিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু দক্ষিণে বসে আওরঙ্গজেবের দিল্লির মতিগতি নিয়ে নিশ্চিত ছিলেন না। তাঁর আশংকা ছিল গোলকুণ্ডার সুলতান, দারা-জাহানারার মত দরবারি ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীকে পেশকাশ দিয়ে, সম্রাটকে প্রভাবিত করিয়ে শেষ মুহূর্তে গোলকুণ্ডা রাজ্য আক্রমণ কেঁচিয়ে দিতে পারে। তিনি নিজের গোলকুণ্ডা আক্রমণের পরিকল্পনা বাঁচানোর জন্যে সম্রাটকে লিখলেন, ‘যদি [দিল্লির দরবারে] সুলতানের উকিলের কৌশল করার সময় শেষ হয়ে থাকে, যদি তাদের উপহার দেওয়ার সময় উত্তীর্ণ হয়ে থাকে, এবং যদি এ বিষয়ে অন্য কোনও পক্ষের মাথা গলানোর সুযোগ না থাকে, তাহলে মীর জুমলার অধীনে থাকা গোলকুণ্ডার আকারের, বিপুল সম্পদে পরিপূর্ণ গোটা কর্ণাটক জয় করে মুঘল সাম্রাজ্যের অধিকারে নিয়ে আসা খুব একটা সমস্যাসঙ্কুল বিষয় হবে বলে আমি মনে করি না’। পরের চিঠিতে তিনি সম্রাটকে আরও স্পষ্টভাবে এবং জোর দিয়ে লিখে অনুরোধ করলেন, সম্রাট এমন একটা পরিবেশ তৈরি করুন, যাতে সুলতান তার সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষমা ভিক্ষার আবেদন করেন। কিন্তু একই সঙ্গে বললেন এই মুহূর্তে দরবারের স্বার্থবাহীদের কথা শুনে, গোলমেলে অবস্থার সুযোগ নিয়ে হায়দারাবাদ অভিযান না করা অভদ্রতা হবে।
সমস্ত দিক ভেবেচিন্তে তিনি শাহজাদা মহম্মদ সুলতানকে বাহিনী নিয়ে ২৬ ডিসেম্বর ১৬৫৫-তে হায়দারাবাদ রওনা হয়ে মহম্মদ আমিনকে কারাগার থেকে ছাড়াতে নির্দেশ দিলেন। মহম্মদ সুলতান নান্দের পৌঁছলেন ১৬৫৬-র ৭ জানুয়ারি। ইতিমধ্যে গোলকুণ্ডার সুলতান বিজাপুরের সামরিক সাহায্য প্রার্থনা করেছেন। মনে হচ্ছিল গোলকুণ্ডার সুলতান মুঘল শাহজাদার গোলকুণ্ডা অভিযানকে ধর্তব্যের মধ্যে আনছিলেন না। দু’সপ্তাহ পরে আওরঙ্গজেব সম্রাটকে জানিয়ে গোলকুণ্ডা অভিযানের রাশ নিজের হাতে তুলে নিয়ে বাহিনী নিয়ে অগ্রসর হলেন। তার আগে যুবরাজের বাহিনী কুচ করছে। বিশাল মুঘল বাহিনী রাজধানীর দিকে এগিয়ে আসার সংবাদে অসহায় কুতুবুল মুলক, গোলকুণ্ডা জেলে বন্দী মহম্মদ আমিনকে বাধ্য হয়ে মুক্তি দিলেন। আওরঙ্গজেব শাহজাদাকে হায়দারাবাদের কিছু দূরে শিবির পাতার নির্দেশ দিলেন, তিনি কিছুটা পিছনে রইলেন। মহম্মদ সুলতান হুসেন সাগরের তীরে শিবির ফেলার মুহূর্তে গোলকুণ্ডার সুলতান অভেদ্য গোলকুণ্ডা কেল্লায় নিজেকে আটকে রেখে সুরক্ষিত বোধ করে প্রায় প্রতিদিনই আওরঙ্গজেবের কাছে মিনতিভরা ক্ষমাভিক্ষা আর শান্তি প্রার্থনা করে চিঠি পাঠাতে লাগলেন। আর গোপনে সমান্তরালভাবে তার বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন মুঘল বাহিনীর বিরুদ্ধে চোরাগোপ্তা আক্রমন শানিয়ে যেতে। দুই বাহিনীর মধ্যে ছোটখাটো লড়াই চলতে লাগল। মহম্মদ সুলতান দেখলেন তাঁর শিবিরের এলাকাটা নিরাপদ নয়। খোলামেলা জায়গায় শিবির পেতে আক্রমণের আশংকায় থাকার থেকে তিনি হায়দারাবাদ অবরোধ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। আক্রান্ত কুতুবুল মুলক মুঘল সেনাপতির সঙ্গে শান্তি আলোচনার প্রস্তাব দিলে শাহজাদা উত্তর দিলেন এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা, তার এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না। ৬ ফেব্রুয়ারি আওরঙ্গজেব হায়দারাবাদ পৌঁছনোর আগে গোলকুণ্ডা কেল্লার পাটাতন থেকে সুলতান নিজের শহরে গোলান্দাজি করতে শুরু করলেন। আওরঙ্গজেব গোলকুণ্ডায় প্রবেশ করলে ১০-১২ হাজার গোলান্দাজ বন্দুকচি মুঘল বাহিনীর ওপর আক্রমন শানিয়ে তাকে যুদ্ধে প্ররোচিত করতে থাকে। দুই সপ্তাহের যাত্রার ক্লান্তি ভুলে আওরঙ্গজেব তার যুদ্ধ হাতির হাওদায় উঠে যুদ্ধ পরিচালনা শুরু করলে সন্ধ্যার মধ্যেই যুদ্ধ খতম হয়ে যায়। বিপক্ষের বাহিনীর বড় অংশ গোলকুণ্ডা শহরের পাশের জঙ্গলে পালিয়ে গেল, বাকিরা নিজেদেরকে দুর্গে বন্দী করল।
গোলকুণ্ডা অবরোধ
যদিও মুঘল বাহিনীর কাছে গোলকুণ্ডা কেল্লার দেওয়াল ফাটানোর জন্যে ভারি কামান ছিল না, তবুও দেরি না করে মুঘল সুবাদার গোলকুণ্ডা কেল্লা অবরোধের নির্দেশ দিলেন। তখনও শাহজাহানের নির্দেশে শায়েস্তা খান বা অন্যান্য আমীর গোলকুণ্ডা পৌঁছন নি। যদিও এটা পুরোদস্তুর অবরোধ ছিল না, শুধু কেল্লা ঘিরে বসে থেকে শত্রুকে আধমরা করাই তার পরিকল্পনা। ১২ ফেব্রুয়ারি দুর্গের কাছে আর ১৩ মার্চ দুর্গ থেকে ২০ মাইল দূরে গোলকুণ্ডার দক্ষিণীরা দু-টি বাহিনী যুদ্ধের খোয়াইশ নিয়ে পাঠালে দুটিই তীব্রভাবে পর্যুদস্ত হয়। গোলকুণ্ডার ক্ষমতাসীনেরা বুঝল মুঘলদের বিরুদ্ধে সম্মুখ যুদ্ধে জেতা সম্ভব নয়। এরপর থেকে শান্তি আর ক্ষমার আবেদন এবং প্রচুর উপঢৌকন পাঠানো হতে থাকলেও আওরঙ্গজেব খুব একটা প্রভাবিত হলেন না। তিনি স্থির নিশ্চয় করেছেন গোলকুণ্ডা দখল করে দক্ষিণি সমস্যা সমাধান করবেনই।
আওরঙ্গজেবের আশংকা সত্যি করে দিল্লিতে কুতুবুল মুলকের মুঘল দরবারের উকিলেরা দারাকে অনুরোধ করলেন, সম্রাটকে দিয়ে আওরঙ্গজেবকে নির্দেশ পাঠিয়ে অবরোধ তুলতে এবং সুলতানকে তার হৃত রাজ্য ফেরত দিতে। আওরঙ্গজেব যখন সুলতানকে তার শর্তে আত্মসমর্পণে রাজি করিয়ে ফেলেছেন, সেই মুহূর্তে দরবার থেকে গোলকুণ্ডা অবরোধ তুলে নেওয়ার জন্যে ফরমান এল। তাছাড়া সুলতানের মা সশরীরে আওরঙ্গজেবের শিবিরে এসে পুত্রের জীবন আর রাজ্য ভিক্ষা করে যান। আওরঙ্গজেব মায়ের অনুরোধে শান্তি ফিরিয়ে আনার শর্ত দেন ১ কোটি টাকা জরিমানা, হাতি এবং অন্যান্য উপহারের সঙ্গে তাঁর কন্যার সঙ্গে আওরঙ্গজেবের পুত্র সুলতান মহম্মদের বিয়ে।
২০ মার্চ ১৬৫৬-য় অবরোধ উঠল। চার দিন পরে কুতুবুল মুলকের বা কুতুব শাহের কন্যার সঙ্গে আওরঙ্গজেবের কন্যার বিবাহ হল। ১০ এপ্রিল কন্যা স্বামীর শিবিরে যোগ দিলেন। সুলতান কোরাণ ছুঁয়ে সম্রাটের নির্দেশ পালনের অঙ্গীকার করলেন। রাজস্ব দেওয়া ছাড়াও তাকে রামগির জেলাও ছেড়ে দিতে হল। মায়ের অনুরোধে প্রথম কিস্তির ২৫ লক্ষ কমে ১৫ লক্ষ হল। শাহজাহান আরও ২০ লক্ষ কমালেন।
লুঠের হিস্যা/অংশ দরবারে না দেওয়ায় আওরঙ্গজেবকে তিরষ্কার
আবদুল্লা কুতুব শাহের প্রতিনিধি, উকিল এবং কিছু মুঘল দরবারী অভিজাত সম্রাটের সামনে বিপুল সম্পদ ব্যবহার করে গোলকুণ্ডা দখল করা এবং শহর লুঠের এক বাড়ানো চড়ানো হিসেব উপস্থিত করলেন। তাদের বয়ান অনুসরণ করে সম্রাট, দক্ষিণের সুবাদারকে গোলকুণ্ডা লুঠের মাল দরবারে পাঠানোর ফরমান জারি করলেন। সম্রাট তাঁকে যা রাখতে বলেছেন, তার বাইরে আওরঙ্গজেবের একটাও লুঠের মাল রাখার ইচ্ছে ছিল না। কিন্তু সম্রাটের কদর্য চিঠিতে গভীরভাবে আহত হয়ে আদত কথা সম্রাটকে জানাবার প্রয়োজনীয়তা বোধ করলেন আওরঙ্গজেব। সম্রাট তাঁকে জানিয়েছিলেন কুতুবুল মালিকের পেশকাশ থেকে গয়না আর হাতি মহামহিম নিজে রাখবেন আর যে সব নগদ পেশকাশ হিসেবে পাওয়া যাবে সে সব সুবা প্রশাসনের কবলে থাকবে। এই নির্দেশ অনুসরণ করে আওরঙ্গজের যুদ্ধ করার জন্যে অর্থ ধার নিয়েছেন। যুদ্ধ শেষে পুরোনো ফরমান ভুলে দিল্লির দরবার নতুন ফরমান জারি করায় আওরঙ্গজেব বিপদে পড়লেন। তাঁর সমস্ত হিসেব চটকে গেল। শাহজাহান আওরঙ্গজেবকে যুদ্ধের পরে শহর লুঠে পাওয়া সম্পূর্ণ অর্থ দৌলতাবাদের শাহী খাজাঞ্চিতে জমা করার নির্দেশ জারি করলেন। যুদ্ধের ব্যয় হিসেবে আওরঙ্গজেব যে ২০ লক্ষ টাকা ধার করেছিলেন সেটি ধার হিসেবে থাকল। শাহজাহান শুধু এই নির্দেশেই থেমে থাকলেন না, তিনি আওরঙ্গজেব এবং তার পুত্রকে তিরষ্কার করলেন উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে তাঁকে লুঠের উপহার না পাঠানোর জন্যে।
আওরঙ্গজেব বাবার পাঠনো চিঠিতে তীব্র হতাশ হলেন। তিনি ঠিক করলেন তার ভেঙে পড়া মনের অবস্থা আর সম্রাটকে আর লিখে জানাবেন না। ততদিনে যেহেতু দিল্লি দরবারের মীর জুমলা উজির হিসেবে পদাধিকার সামলেছেন, উজির আর কিছু দরবারিকে তাঁর সমস্যাগুলো লিখে জানালেন। তিনি চিঠিতে লিখছেন, গোলকুণ্ডার পক্ষ থেকে তাঁকে যে পেশকাশ দেওয়া হয়েছে সেগুলোর গুণমান খুব ভাল ছিল না। তিনি সে সব তৃতীয় শ্রেণীর উপহার সম্রাটের সামনে উপস্থিত করার যোগ্য বলে মনে করেন নি। উপহারের হাতিগুলো কম দামের, কুচকুচে কালো এবং খুঁতওয়ালা। সম্রাট তাঁর বিরুদ্ধে উপহারগুলো লুকিয়ে ফেলার অভিযোগ এনেছেন। তাহলে তো তিনি সেগুলো মীর জুমলা এবং অন্যান্য আমলার সামনে আনতেন না। আওরঙ্গজেব জানালেন উপহারের গুণমান দেখে তিনি সুলতানি উপহার নিতে অস্বীকার করেছিলেন। সুলতানের দূতের বিশেষ অনুরোধে সেগুলো গ্রহণ করেন এবং স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে পেশকাশ আসবে সেগুলো থেকে উপহারের পণ্যের দাম বাদ যাবে না। কিন্তু এর পাশাপাশি আমরা বুঝতে চাইব, গোলকুণ্ডার সুলতান তৃতীয় শ্রেণীর পেশকাশ দেওয়ার গোস্তাখি করলই বা কীভাবে? তাহলে কী গোলকুণ্ডার সুলতান বুঝেগিয়েছিলেন সম্রাট এবং আওরঙ্গজেবের পড়তে থাকা সম্পর্ক নিয়ে বাজারে যে সব রটনা রটেছে সেগুলো সত্যি! হয়ত সম্রাট আর দক্ষিণের সুবাদারের সম্পর্কের মধ্যে যে ফাটল ধরেছে সেটা তিনি দিল্লির দরবার থেকে তাঁর উকিল মার্ফৎ আগেই জানছেন। তাই তিনি জানতেন তৃতীয় শ্রেণীর উপহার দিয়ে বাবা-ছেলের মধ্যে ফাটলটা যদি আরও চওড়া করা যায় তাহলে সেই বিষয়টা গোলকুণ্ডার স্বার্থবাহী হতেও পারে।
এই বাস্তবতা আওরঙ্গজেব জানেন না তা নয়। আওরঙ্গজেব জানেন দক্ষিণে তাঁর সমস্যা হল দিল্লির ক্ষমকতাকেন্দ্রের সক্রিয় বিরোধিতা আর তাঁর কাজের বিষয়ে স্বয়ং সম্রাটের সার্বিক অবিশ্বাস। চরম বাস্তববাদী আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে লিখলেন ‘আমার প্রায় সব ধরণের কাজকর্মে সম্রাটের সম্পূর্ণ অসমর্থন এবং নির্ভরতার অভাব, আমার সম্মান রক্ষার প্রতি তাঁর চরম উদাসীনতা, দরবারের ক্ষমতাসীনদের আমার বিরুদ্ধে সম্রাটের কান ভাঙ্গানো, বাজারে আমার আর সম্রাটের সম্পর্কের অবনতি ঘটতে থাকা বিষয়ে যে সব মুখরোচক গুঞ্জন নিত্যনতুনভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, সে সব নিয়ে আমি কী লিখি, কী বলি সে বিষয়ে নজর দিতে দক্ষিণের শাসকদের বয়ে গেছে। তারা দক্ষিণের সুবাদারের দফতরকে পাত্তাই দেয় না, সরাসরি দিল্লিতে তাঁরা খুঁটী ধরে রেখেছে। গোলকুণ্ডা কর্তৃপক্ষ আমার সঙ্গে আলাপ করতে বিন্দুমাত্র উৎসাহী নয়, আমার হুঁশিয়ারি তারা থোড়াই কেয়ার করে। আমি তাদের প্রতি যে নির্দেশ দিয়েছিলাম সেগুলো তারা মানে নি, এবং ভবিষ্যতে যে তারা সেগুলো মানবে এরকম কোনও ইঙ্গিত তাদের চেহারায় আমি অন্তত দেখতে পাই নি’।
স্বয়ং সম্রাটের বিরোধিতা সত্ত্বেও যে দ্রুততায় এবং দক্ষতায় আওরঙ্গজেব দক্ষিণের এক গুরুত্বপূর্ণ শাসককে মাথা নামাতে বাধ্য করলেন, মুঘল বৈদেশিক নীতির ইতিহাসে এটি অনন্য উদাহরণ হয়ে থাকল। আগামী আধ শতক মুঘলেরা দক্ষিণী সুলতানদের ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাবেন, তাদেরে সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে মুঘলদের সাথী হতে। সুলতানেরা, মুঘলদের প্রতি শত্রুতার মনোভাব কখনও ছেড়ে দেয় নি। (চলবে)