কর্ণাটক নিয়ন্ত্রণ
গোলকুণ্ডার সুলতানের মীর জুমলার কর্ণাটক দখলে রাখার দুর্দম ইচ্ছে। এই সুলতানি দাবিতে গোল বাধল। মুঘল সাম্রাজ্যকে সুলতান কুতুবুল মুলক কর্ণাটক নিজের তাঁবেতে রাখার যুক্তি দিলেন। আওরঙ্গজেবের বক্তব্য কর্ণাটক যেহেতু মীর জুমলার বিধিবদ্ধ জায়গির, এবং মীর জুমলা বর্তমানে শাহী মুঘল প্রশাসনিক সেবায় যোগ দিয়েছেন, তাই কর্ণাটক মহাল স্বাভাবিকভাবে শাহী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত হয়েছে। কুতুবুল মুলক কর্ণাটকের ওপর দাবি ছাড়তে নারাজ। বোঝা গেল তিনি প্রয়োজনে আঙ্গুল বাঁকাতেও পিছপা হবেন না। দক্ষিণের মুঘল সুবাদারের সঙ্গে সরাসরি যুক্তিযুদ্ধে হেরে চরম অস্ত্র প্রয়োগ করলেন কুতুবুল মূলক, কুতুব শাহ, সরাসরি মুঘল সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় ক্ষমতাধর ব্যক্তি দারার দ্বারস্থ হলেন। তিনি জানেন কোনও একটা ইস্যু, সেটা যতই মুঘল সাম্রাজ্য স্বার্থ বিরোধী হোক না কেন, সেটিকে যদি আওরঙ্গজেব বিরোধিতার মোড়ক দিয়ে দারার দরবারে ফেলা যায়, চোখ বুজে সেটিকে লুফে নেবেন সম্রাটের বড় ছেলে। মুঘল দরবারে দারা-অস্ত্র ব্যবহার করে কর্ণাটকের মত গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড নিজের কোলে টেনে আনার পরিকল্পনায় কুতুব শাহের বাধা হল দরবারে এখন আওরঙ্গজেব বেসাহারা নন। তিনি দরবারে দারার সমান্তরাল ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী তৈরি করেছেন। দরবারে উজির, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যোগ দিয়েছেন আওরঙ্গজেবের আবিষ্কার, ডান হাত মীর জুমলা। সম্রাটের কাছে কর্ণাটক কুতুব শাহকে ফিরিয়ে দেওয়ার দারার দাবি অগ্রাহ্য হল। উজির, মীর জুমলা শাহজাহানকে বোঝালেন, তাঁর জায়গির কর্ণাটককে মুঘল তাঁবেতে রাখার আওরঙ্গজেবের প্রস্তাবের গুরুত্ব। মুঘল সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে কর্ণাটক রেখে দেওয়ার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রভাবও তিনি সম্রাটের সামনে তুলে ধরলেন। মীর জুমলার প্রভাবে আওরঙ্গজেবের কর্ণাটক রক্ষার প্রস্তাবে শাহজাহান রাজি হলেন। সেই অনুযায়ী কর্ণাটকে মুঘল নিয়ন্ত্রণের নির্দেশ জারি হল। সেই নির্দেশ মাঠে প্রয়োগ করলেন আওরঙ্গজেব। তা সত্ত্বেও মাঝমধ্যে উটকো ঝামেলা তৈরি করতে কর্নাটক সীমান্তে ঢুকে এসে জমি দখল করতে থাকল কুতুবুল মুলকের সেনা বাহিনী। সিংহাসনের যুদ্ধ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওরঙ্গজেব এই ঝুটঝামেলামূলক সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান করে উঠতে পারেন নি।
বিজাপুরের যুদ্ধ, বিজাপুর দখলে খুব বেশি গা ঘামাতে হয় নি
১৬৩৬-এ মুঘল-বিজাপুর চুক্তির সূত্র থেকে বার হয়ে বিজাপুরের সুলতান আদিল শাহকে সম্রাট শাহজাহান অধীনস্থ রাজার তুলনায় অনেক বড় সম্মান দিচ্ছিলেন। সম্রাট তাঁকে খান উপাধিতে সম্বোধন না করে, শাহ নামে ডাকতেন। সে জন্যে তিনি ইতিহাসে আদিল খান নয়, আদিল শাহ নামে প্রখ্যাতি লাভ করেছেন। দক্ষিণের রাজ্যগুলোয় সুলতানের সম্মান বাড়ল। বিজাপুরের সুলতান যে মুঘলদের অধীনস্থ সামন্ত রাজা, সেটা মুঘল সম্রাট তাঁর আচার আচরণে বিজাপুরের সুলতানকে বুঝতে দিতেন না। আদিল শাহ আর শাহজাহানের সুসম্পর্ক কাজে লাগিয়ে, বিজাপুর দক্ষিণজুড়ে অবাধে সাম্রাজ্য বিস্তারের সুবিধে পেয়েছে। দক্ষিণে আওরঙ্গজেব দ্বিতীয়বার আসার আগে আদিল শাহ পশ্চিমে কোঙ্কণ আর দক্ষিণে মহীশূর রাজ্য দখল করেন। ১৬৫৪-তে গোয়ার পর্তুগিজদের রাজত্বে বাহিনী পাঠিয়ে গোয়ার একাংশ আর আজকের মুম্বাইএর সালসেট দ্বীপ দখলে নেন। বিজাপুরের সীমান্ত এখন দুই সাগর বিস্তৃত — পশ্চিমে আরব সাগর আর পূর্বে বঙ্গোপসাগর।
আগেই বলেছি মুঘল সম্রাট, বিজাপুরী সুলতানের সঙ্গে স্বাধীন সুলতানের মত ব্যবহার করতেন। তাই প্রথা ভেঙে যে সব আচার-আচরণ সুলতানের অনুসরণ করার কথা নয়, মুঘল সম্রাটের জন্যে সংরক্ষিত ছিল, অবলীলায় সে সব কাজ সুলতান সম্পাদন করতেন — যেমন বিজাপুরী দরবারিদের খানইখানান উপাধি দেওয়া, হাতির যুদ্ধ করানো, ডঙ্কা বাজানো ইত্যাদি। বিজাপুরের সুলতানের বিপদ শুরু হল মুঘল ফরমানকে প্রার্থিত সম্মান না দেখানোয়। অধীনস্থ রাজাদের সম্রাটের মুঘল ফরমান নেওয়ার রীতি ছিল দরবার থেকে দূরে গিয়ে ফরমানটিকে সম্মান দেখিয়ে গ্রহণ করা। আদিল শাহ সেই সম্মান দেখাতেন না — সিংহাসনে বসেই ফরমান নিচ্ছেন, এমন অভিযোগ সম্রাটের কাছে পৌঁছচ্ছিল। এত সম্মান পাওয়ার যোগ্য যে আদিল শাহ নন এটা ক্রমশ শাহজাহান বুঝতে পারছিলেন। সম্রাট নিজের তৈরি করা ফাঁদ থেকে বেরোতে মরিয়া। আওরঙ্গজেবের হাজিব খবর পাঠাল সম্রাটের ফরমান বীজাপুরে যথেষ্ট সম্মান পাচ্ছে না। শেষতম ফরমানটি পাঠিয়ে সম্রাট আওরঙ্গজেবকে নির্দেশ দিলেন, সুলতান তার ফরমানটি কয়েক পা হেঁটে গ্রহণ করছেন কী না সেটা লক্ষ্য করতে। আওরঙ্গজেব সম্রাটকে লিখলেন, ‘এবারেও সম্রাটের ফরমানকে যোগ্য সম্মান দেওয়ার সুলতানের অভিপ্রায় ছিল না… যে মুহূর্তে শাহী ফরমানের আগমনের বার্তা পেয়ে নিজেকে অসুস্থ ঘোষণা করলেন। তিনি মনে করলেন ফরমানটা হেঁটে গিয়ে হাতে নেওয়ার দরকার হবে না’। কিন্তু আওরঙ্গজেব অন্য খেলা খেললেন। আওরঙ্গজেবের হাজিব ফরমান নিয়ে যাওয়া সম্রাটের দূতের সঙ্গে বিজাপুরের দরবারে উপস্থিত হলেন। ফলে ‘সুলতান এগিয়ে না এসে ফরমান গ্রহণের বহু চেষ্টা করলেও, তার সেই খোয়াইশ পূর্ণ হয় নি’।
মুঘল সাম্রাজ্য ক্রমশ বিজাপুরের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে উঠছিল। দ্বন্দ্ব চরমে উঠল গোলকুণ্ডার বিরুদ্ধে যুদ্ধ প্রস্তুতিতে। আশ্রিত রাজ্য হিসেবে বিজাপুরের সুলতান, মুঘলদের বিরুদ্ধে গোলকুণ্ডাকে গোপনে সামরিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিলেন। সেটা মুঘল দরবারের পছন্দ হয় নি। বীজাপুর প্রকাশ্যে মুঘল-গোলকুণ্ডা যুদ্ধে যোগদানের খবর গুজব হিসেবে অস্বীকার করলেও ওয়াকিয়ানবিশ আর হরকরার মার্ফৎ আওরঙ্গজেব নিশ্চিতভাবে জানতেন গুজবটা তথ্যই। এটা বাস্তবে রূপ নিতে চলেছে। আওরঙ্গজেব সম্রাটকে জানালেন গোপনে বিজাপুর, গোলকুণ্ডাকে সামরিক সাহায্যের পরিকল্পনা করছে, ‘আমি বিজাপুরকে একটি কঠোর মন্তব্য পাঠিয়ে বলেছি, তারা যদি সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে না আসে তাহলে প্রয়োজনীয় শাস্তি (তানবিহ) তাদের ওপর বর্ষিত হবে’। পরের চিঠিতেও সম্রাটকে একই বিষয় লিখলেন। সমস্যা ঘিরে আসছে বুঝতে পেরে আদিল খান আওরঙ্গজেবকে লিখলেন গোলকুণ্ডাকে সামরিক সাহায্য করার কোনও ইচ্ছেই তার নেই। কিন্তু আওরঙ্গজেবের কাছে খবর ছিল, ‘গোপনে আদিল খান বাহিনী পাঠাবার প্রস্তুতি নিয়ে সীমান্তে সেনা সজ্জার নির্দেশ দিয়েছেন’। আওরঙ্গজেবের শঙ্কাই সত্যি হল, তার কাছে খবর এল ‘মাথামোটা আদিল খান, ভাতিয়াড়া পদের জনৈক আফজলের নেতৃত্বে ১৫ হাজার ঘোড়সওয়ার মুঘলদের বিরুদ্ধে পাঠিয়েছেন, তারা হায়দারাবাদের ২০ মাইল দূরে শিবির করে আছে’। আওরঙ্গজেব গোলকুণ্ডা আক্রমণের রাস্তায়, মুঘলদের বিরুদ্ধে পাঠানো আদিল খানের বাহিনীর শিবির থেকে একটু দূরে শিবির ফেললেন। মুঘল বাহিনীর অগ্রগমনের সংবাদে আতঙ্কিত বিজাপুরীর সুলতান বাহিনী তুলে নিতে বাধ্য হল। আওরঙ্গজেবও তাঁর শিবির তুলে নিলেন।
আদিল শাহ শয়তানি বুদ্ধি প্রয়োগ করে জুন্নাইরের সীমান্তে মুঘলদের বিরুদ্ধে চোরাগোপ্তা গোলযোগ চালিয়ে যেতে শিবাজীকে প্ররোচিত করছিলেন। একই সঙ্গে বিজাপুরী বাহিনীতে কাজ করা শিবাজীর বাবা শাহজীকে আদিল শাহ নির্দেশ দিলেন কর্ণাটকের যে অংশটা মীরজুমলার জায়গির ছিল সেটি বিজাপুরের হয়ে দখল নেওয়ার জন্যে। শিবাজী, শাহজী, আদিল শাহ তিনজনেই জানেন সেই মুহূর্তে মুঘল প্রশাসনিক সেবার সব থেকে ক্ষমতাশালী ব্যক্তির নাম উজির মীর জুমলা। তাঁর কর্নাটক জায়গির এখন শাহী সাম্রাজ্যের অধীনে। আওরঙ্গজেব চাইছেন দক্ষিণের রাজাদের অবিমৃষ্যকারিতায় কর্ণাটক দখল নিয়ে যে সব বালখিল্যপনা চলছে, সেটা আরও বেশি করে পেকে উঠুক। তিনি দূর থেকে বিষয়টার ওপর নজর রাখছিলেন। যখন দেখলেন বিষয়টা পেকে উঠে যুদ্ধের দিকে যাওয়ার ইঙ্গিত করছে, তিনি অবিলম্বে শাহী বাহিনীকে নির্দেশ দিলেন মীর জুমলার উকিল মহম্মদ হাসিমকে কর্ণাটক রক্ষায় সাহায্য করতে। মুঘল বাহিনী মারাঠাদের আক্রমন রুখে শাহজীকে মীর জুমলার অঞ্চল থেকে তাড়িয়ে দেয়। আওরঙ্গজেবের তড়িৎ আক্রমনে সুলতান আর তার বাহিনীর কর্ণাটক দখলের শয়তানি পরিকল্পনা কাজে এল না। আওরঙ্গজেব, দরবারে আদিল শাহের বিরুদ্ধে কড়া অবস্থান নেওয়ার দাবি জানালেন।
দিল্লিতে এখন শাহজাহানের মূল পরামর্শদাতা মীর জুমলা — সেই মুহূর্তে দারা কিছুটা পর্দানসীন। মীর জুমলা আওরঙ্গজেবের অনুরোধ সম্রাটকে জানালে, তিনি প্রস্তাব মেনে নিলেন। আদিল শাহকে কড়া চিঠি লিখে আওরঙ্গজেব অভিযোগ করলেন, আদিল শাহ চুক্তির শর্ত বারংবার লঙ্ঘন করছেন। আদিল শাহের আমলারা, মুঘল নিশান প্রেক্ষিতে দুপুরে সুলতানকে দরবারে আশ্বাস দিয়ে জানাল তারা মুঘল বাহিনীর যে কোনও আক্রমন রুখে দিতে প্রস্তুত। দরবারিদের ফাঁকা আওয়াজের ওপর নির্ভর করে বিজাপুরী সুলতান সম্রাটকে কড়া ভাষার চিঠি পাঠালেন। সন্ধ্যা বেলা খোলা দরবারে তিনি মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ যাওয়ার বিষয়ে আফজল খানের কাছে খোলামেলা পরামর্শ চাইলেন। আফজল খান সুলতানকে বললেন মুঘল বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইতে গেলে সম্ভাব্য কী কী দূরবস্থা তৈরি হতে পারে। আদিল খান অবস্থা বুঝলেন। বহুদূর চলে যাওয়া চিঠি বাহক ডাকহরকরাকে ডাকিয়ে আনলেন। আদিল শাহ ক্ষমা চাওয়া নতুন বয়ানে চিঠি পাঠালেন। (চলবে)