৪ নভেম্বর ১৬৫৬ আদিল শাহ মারা যান। সিংহাসনে বসানো হল এক বালক উত্তরাধিকারীকে। মুঘল শাসন বটেই খোদ বীজাপুরের জনগণের মনে নতুন বালক শাসকের বংশমর্যাদা নিয়ে ঘোরতর সংশয় ছিল। আদিল শাহের মৃত্যু সংবাদ এবং নতুন ‘বিতর্কিত’ শাসকের সিংহাসনে আরোহণে আওরঙ্গজেবের সাম্রাজ্যবাদী সত্ত্বা লকলক করে জ্বলে উঠল। তিনি বুঝলেন বিজাপুর দখল করা এখন সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু প্রয়োজন সম্রাটের সমর্থন। সেটা তার পাওয়া সমস্যা হওয়া উচিত নয়। দিল্লিতে সম্রাটকে আগলে বসে আছেন তাঁর বিশ্বস্ততম বন্ধু-সেনাপতি।
মতবিরোধের কারন
সম্রাটের অনুমতি ছাড়াই সুলতানের দত্তক পুত্রকে তড়িঘড়ি সিংহাসনে বসিয়ে সুলতানের মৃত্যু সংক্রান্ত ঘটনা সম্রাটকে জানানো হল। বিজাপুরের দরবারী অভিজাতরা যে অদরবারি পদ্ধতিতে সুলতানের মৃত্যুর খবর সম্রাটকে জানিয়েছেন আর ‘দত্তক’ পুত্রকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন — উভই সম্রাটের তীব্র নাপসন্দ। বিজাপুর দখল সময়ের অপেক্ষা, আওরঙ্গজেবের প্ররোচনা উপলক্ষ্য মাত্র। কৌশলী আওরঙ্গজেব আদিল শাহর মৃত্যুর সংবাদ সম্রাটকে পাঠিয়ে লিখলেন, ‘এই দেশে [বিজাপুরে] নতুন যে ছোকরাটি সিংহাসনে বসেছে তার বংশের ঠিক নেই। তার ওপর সুলতানের মৃত্যু সংক্রান্ত সংবাদ সম্রাটকে বিধিবদ্ধভাবে জানানো হয় নি’। শাহজাহান কড়া পদক্ষেপ করলেন — আওরঙ্গজেবকে বিজাপুর অভিযানের নির্দেশ দিলেন। এই অভিযান মীর জুমলার দিল্লিতে শাহী প্রশাসনে যোগ দেওয়ার পরে ঘটনা। ঠিক হল মীর জুমলা দক্ষিণের এই যুদ্ধে আওরঙ্গজেবের সঙ্গী হবেন। তিনি দিল্লি থেকে বিজাপুর দখল অভিযানে যোগ দিতে রওনা হলেন।
শাহী সেনাপতিদের উদ্যমে বীজাপুর সীমান্তে নিরাপত্তা আঁটোসাঁটো হল। সেনাপতিদের উদ্দেশ্যে সুবাদারের নির্দেশ ছিল যদি কোনও বীজাপুরী সেনানায়ক পক্ষ পাল্টে মুঘল বাহিনীতে যোগ দিতে চায় তাহলে তাদের বাহিনীতে স্বাগত জানানো হবে। ১৬৫৭-র ১৬ জানুয়ারির আগে মীর জুমলা বিজাপুর যুদ্ধে যোগ দেওয়ার জন্যে আওরঙ্গাবাদ পৌঁছতে পারেন নি [মীর জুমলা মুঘল বাহিনীতে যোগদেওয়ার আগে শিবাজীআর আওরঙ্গজেবের মধ্যে বেশ কয়েকবার শান্তি আলোচনা হয়। শিবাজী সুবাদারকে জানান তাকে যদি কোঙ্কণ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয় তাহলে তিনি মুঘলদের সঙ্গে যোগ দিতে ইচ্ছুক। আওরঙ্গজেব শিবাজীর প্রস্তাব মানেন নি। বহু পরে স্মৃতিকণ্ডুয়ন করে আওরঙ্গজেব লিখছেন, ঠিক এইরকম প্রতিশ্রুতি শিবাজী এর আগে শাহজাদা মুরাদকে দিলেও, শেষ পর্যন্ত নিজের দেওয়া শর্ত বারবার উল্লঙ্ঘন করেছেন। ফলে ভায়ের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী আওরঙ্গজেব কোনও দিনই শিবাজীকে বিশ্বাস করেন নি]।
বিজাপুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ — বিদর এবং কালিঞ্জর দখল
মীর জুমলার দক্ষিণে পৌঁছনোর দুদিন পরে বিজাপুরের উদ্দেশ্যে মুঘল বাহিনী যুদ্ধ অভিযান শুরু করল। ২৮ ফেব্রুয়ারি বিদর অবরোধ শুরু হল। শক্তপোক্ত বিদর দখল নিতে প্রায় এক মাস কাটল। হয়ত অবরোধ ৩০ মার্চ ছাড়িয়ে যেত। দুর্ভাগ্যক্রমে বিজাপুরী কেল্লার বারুদ গুদামে ফুলকি পড়ে কেল্লায় বিষ্ফোকরণ হয়। কেল্লার একাংশ এবং কেল্লাদার সৈয়দ মারজান ভয়াবহ জ্বলে পুড়ে যান। অবরোধ প্রতিরোধ করার জন্যে বারুদ আর অবশিষ্ট রইল না — সব বারুদ নষ্ট হয়ে গেল। তিনি ৭ পুত্রের হাতে কেল্লার চাবি দিয়ে আওরঙ্গজেবের কাছে আত্মসমর্পণের প্রস্তাব পাঠালেন। আওরঙ্গজেবের বিদর কেল্লা দখল করে বিপুল সম্পদ লাভ করলেন — পেলেন ২৩০টা বড় কামান এবং নগদ ১২ লক্ষ টাকা।
তাঁর পরের লক্ষ সম্পশালী এলাকা কল্যাণী। তিনি মহাবত খানকে নির্দেশ দিলেন কল্যাণী পৌঁছনোর রাস্তা তৈরি এবং পরিষ্কার করতে। রাস্তার নিরাপত্তাবিধান করে এপ্রিলে যাত্রা শুরু করে পরের মাসে কেল্লা অবরোধ করলেন। কেল্লার গোলাবারুদ এবং চারপাশে ডাকাতদের আক্রমন সহ্য করে মুঘলেরা পাল্টা আক্রমন চালিয়ে গেল। বিদরের মত অবরোধের দিন বাড়ছিল। আওরঙ্গজেবের লক্ষ দ্রুত কেল্লা দখল। শিবিরের কাছে বিজাপুরী বাহিনীর ছোটখাটো গেরিলা আক্রমণ পাত্তা না দিয়ে মুহুর্মুহু কেল্লার দেওয়ালে বিশাল কামান নিয়ে আক্রমণ শানাতে থাকলেন। বিজাপুরী সেনার মনে হল, আওরঙ্গজেব হয়ত বিজাপুর দখলে অতটা উৎসাহী নন। ফলে বিজাপুর থেকে ৩০,০০০ বিজাপুরী সেনা মুঘল শিবিরের কাছে এগিয়ে আসতে থাকে শাহী বাহিনীর বিরুদ্ধে মহড়া নেওয়ার জন্যে। তারা যখন মুঘল বাহিনীর থেকে ১ ঘন্টা দূরে মুঘল সুবাদার তাদের আক্রমন করার পরিকল্পনা করলেন। বিশাল বাহিনী নিয়ে আওরঙ্গজেব ভালকির দিকে চলে যাওয়ার ভান করে কেল্লার দিকে একটি পর্দা টাঙ্গিয়ে তিনি অপ্রস্তুত অবাক বিজাপুরী বাহিনীকে ২৮ মে আক্রমন করলেন। মুঘল অগ্রবাহিনীর নেতা মীর জামাল এবং দিলির খানকে, বিজাপুরী সেনানায়ক বাহালুল খানের বাহিনী আক্রমন করেও ব্যর্থ হয়। বিজাপুরীরা ছ’ঘন্টা ধরে যুদ্ধ চালিয়ে সামলাতে না পেরে ছত্রখান হয়ে যায়। মুঘল বাহিনী তাদের পিছন নিয়ে শিবির লুঠ করে পুড়িয়ে দেয়।
কল্যাণী দখল
দুমাসেও বিজাপুরীরা নিজেদের গুছিয়ে উঠতে পারল না। জুলাইএর তৃতীয় সপ্তাহে আওরঙ্গজেবের কাছে বিজাপুরী বাহিনীর ছন্নছাড়া অবস্থার সংবাদ পৌঁছল। তিনি আর সময় নষ্ট করতে রাজি নন। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মীর জুমলা এবং তার সন্তান মহম্মদ সুলতানকে বিজাপুর অভিযানে পাঠালেন। ৪৮ মাইল যাওয়ার পর পথে মুখোমুখি হয়ে যাওয়া বেশ কয়েকটা বিজাপুরী বাহিনীকে হারিয়ে দিলে বিজাপুরীরা পালাতে থাকে। শাহী বাহিনী বিজাপুরীদের পিছন নিলে বিজাপুরীরা বাহমনি সাম্রাজ্যের রাজধানী গুলবর্গায় আশ্রয় নেয়। মুঘল বাহিনী এক দিকের নিরাপত্তার বেড়া ভেঙে, অন্যদিকে বুর্জে চড়তে শুরু করে। দুদিন তীব্র লড়াইএর পর ১ আগস্ট বিপক্ষের সেনানায়ক দেলওয়ার খান নিরাপদে চলে যাওয়ার শর্তে কেল্লা মুঘলদের হাতে তুলে দিলেন। সত্যিকারের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছাড়াই মুঘলেরা, আদিল শাহের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের দুটো রক্ষক কেল্লা বিদর এবং কল্যাণী দখল নিল। মুঘল বাহিনী বিজাপুর পৌঁছনো এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। কিন্তু আওরঙ্গজেবের জন্যে অন্য খারাপ খবর অপেক্ষা করছিল। আওরঙ্গজেব মীর জুমলাকে দক্ষিণে নিয়ে এসেছেন। সম্রাট অরক্ষিত এবং দারার প্রভাবে নতুন করে প্রভাবিত হওয়ার অবস্থায়। গোলকুণ্ডার পথ অনুসরণ করে বিজাপুরের উকিল দরবারে দারাকে প্রভাবিত করে সম্রাটকে বিজাপুরে যুদ্ধ বন্ধ করার নির্দেশ জারি করায়।
বিজাপুরের পতন যখন সময়ের অপেক্ষা, সে সময় সম্রাটের বাহিনী তুলে নেওয়ার ফরমানে আওরঙ্গজেব হতাশ হলেন। প্রথমে গোলকুণ্ডা, পরে বিজাপুর বিজয় মুঘলদের সফল বিদেশনীতি হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা। কিন্তু সমস্যা হল সম্রাট সাম্রাজ্যের হিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে তীব্র পক্ষপাতিত্ব করে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের ভালর জন্যে কাজ করলেন। দারার ভয় ছিল, দীর্ঘকালের দক্ষিণ সমস্যার দুই কেন্দ্র গোলকুণ্ডা এবং বিজাপুর আওরঙ্গজেবের হাতে পতন হলে দক্ষিণে আর মুঘলদের বড় প্রতিদ্বন্দ্বীর অস্তিত্ব থাকবে না। আওরঙ্গজেবের ক্ষমতা অপ্রতিহত হয়ে উঠবে। আদিল শাহের উকিল ইবরাহিম খান বাখতার, দারার সঙ্গে দেখা করে সম্রাটকে শান্তি চুক্তিতে উপনীত হতে রাজি করায়। শাহজাহানের শর্ত ছিল যুদ্ধ বন্ধের জন্যে মুঘল খাজাঞ্চিতে দেড় কোটি টাকা জরিমানা দিতে হবে। বিদর, কালিঞ্জর, পারেন্দা, কোঙ্কন এবং ওয়াঙ্গি দুর্গ হাত বদল করতে হবে। সুলতান শর্তে রাজি হলেন। দরকষাকষি চলল। শাহজাহান জরিমানার পরিমান ১ কোটি নামালেন। অসহায় আওরঙ্গজেবের কাজ হল কল্যানীতে থানা গেড়ে লক্ষ্য করা বিজাপুরীরা নতুনতম চুক্তি শর্ত মানছে কী না।
ইতিমধ্যে হঠাতই দিল্লিতে শাহজাহানের শরীর খারাপের সংবাদ দাবানলের মত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। সম্রাটের অসুস্থতার গুজবে সবার সব পরিকল্পনা উথালপাথাল হয়ে গেল। আওরঙ্গজেব যতটা পারা যায় অর্থ বিজাপুরের থেকে আদায় করার চেষ্টা করলেন। মীর জুমলাকে পারেন্দা কেল্লা দখলে পাঠালেন। ৪ অক্টোবর তিনি কল্যাণী ছেড়ে বিদরে এক সপ্তাহের কিছু বেশিদিন থেকে বাহিনীর নানান সমস্যা সমাধান করে ১৮ই আওরঙ্গাবাদের দিকে রওনা হলেন।
শুরু হল নতুন সময় নতুন পর্ব — সিংহাসনের লড়াই। (চলবে)