সিংহাসনের যুদ্ধ
আমরা এবারে প্রবেশ করব সিংহাসন দখলের রাজনীতির কর্মকাণ্ডে — শাহজাদা আওরঙ্গজেব দরবার থেকে দূরে মাঠে-ঘাটে-প্রশাসনে যে জ্ঞান, দক্ষতা অর্জন করেছেন, শাহেনশাহ শাহজাহানের অসুস্থতার পরবর্তী সময়ে সফল হতে যে সিংহাসনের লড়াই শুরু হল, সেই মাঠে তাঁর অধীত বিদ্যা আর দক্ষতা উজাড় করে দেওয়ার সময় ঘনিয়ে এল। তিনি সেই কাজে চূড়ান্তরূপে সফল। উপনিবেশিক বাঙলার ইতিহাসে শুধু আওরঙ্গজেবকেই দানব বানানো হয় নি, সিংহাসনের লড়াইকেও নানান ইসলামোফোবিক মুসলমানফোবিক লব্জে ভূষিত করা হয়েছে। সিংহাসনের লড়ায়ের মধ্যে কেউ দেখেছে শাহজাদা আওরঙ্গজেবের রক্তপায়ী সত্ত্বা, কেউ দেখেছে মুসলমান সমাজের ক্ষমতা দখলের জন্যে আত্মীয়স্বজনকে খুন করার উদগ্র বাসনা, কেউ দেখেছেন হিন্দু-মুসলমান লড়াই ইত্যাদি। সমস্যা হল অধিকাংশ লেখকের মনে সুপ্ত ছিল জৈষ্ঠাধিকার বা জৈষ্ঠপুত্রের সিংহাসন আরোহণের দীর্ঘকালীন প্রথা – কিন্তু এই প্রথা যে প্রথম থেকেই মুঘল শাহী পরিবার স্বীকৃতি দেয় নি, এই বিষয়টা অনেকের মাথায় আসে নি। বর্তমান সময়ে সিংহাসন দখলের রাজনীতিকে নিয়ে বিশদে কাজ করেছেন মুনিস ফারুখি : দ্য প্রিন্সেস অব মুঘল এম্পায়ার (Princes of the Mughal Empire) গ্রন্থে। তিনি বলছেন, স্তেপের নিষ্করুণ জীবনযাত্রায় মুঘলেরা সিংহাসন দখলের জন্যে রাজপরিবারের বৃহত্তর যুবা সদস্যদের প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিত — প্রতিযোগিতায় যারা উত্তীর্ণ হত, সিংহাসনে বসার অধিকার তারই ছিল। সেই পরম্পরা মুঘলেরা হিন্দুস্তানে এসে ভুলে যায় নি — সেই প্রথাকেই তারা আঁকড়ে ধরেছে। মুনিস বলছেন সিংহাসনের লড়াই শুধু ভায়ে ভায়ে যুদ্ধ নয়, এতে মুঘল সাম্রাজ্য যথেষ্ট শক্তিশালী হয় — কেন হয় এ সব ক্রমশঃ আলোচ্য। মুনিস ফারুখির এই তত্ত্ব অবলম্বনে আমি শাহজাহানের রাজত্বকালে মুঘল রাজপুত্রদের মধ্যে সিংহাসন লড়াইএর পিছনের রাজনীতি ব্যাখ্যা করব। তারপরে আমরা মূল ঘটনাক্রমে ঢুকব।
দারা-আওরঙ্গজেবের জোটসঙ্গী খোঁজার তাগিদ
শাহজাহানের রাজত্বে মুঘল সাম্রাজ্যের সিংহাসন দখলের প্রতিযোগিতার দুই প্রধান কুশীলব ছিলেন বড় ভাই দারা শুকো এবং তৃতীয় ভাই আওরঙ্গজেব। প্রথম জনের জোর সম্রাটের বিশ্বাস, সাম্রাজ্যের সম্পদ, দীর্ঘকাল ধরে দরবারে অধিষ্ঠানের জন্যে অভিজাতদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আর অন্যজনের জোর মাঠে ঘাটে, মুঘল প্রশাসনে, মুঘল সেনাবাহিনীতে রক্ত ঝরানোর অভিজ্ঞতা এবং মুঘল আমলাতন্ত্রে সামরিক, প্রশাসনিক আমলাদের সঙ্গে সুমধুর ব্যবহার এবং তার জ্ঞান আর দক্ষতার ওপর মুঘল আমলাদের আস্থা। অন্য দুই ভাই শাহ সুজা আর মুরাদও সিংহাসন দখলের লড়াইতে ছিলেন। তাঁরাও এই ঘটনাক্রমে বড় ভূমিকা পালন করেছেন — যদিও ইতিহাস তাদের কৃতির প্রতি খুব সদয়, এমন কথা হলফ করে বলা যাবে না। শাহ সুজার সমস্যা ছিল, তিনি রাজধানী দিল্লি থেকে বহু দূরে বাঙলার সুবাদার হিসেবে সিংহাসনের আগে পর্যন্ত নিস্তরঙ্গ জীবনযাপন করেছেন, দিল্লির ক্ষমতা দখলের রাজনীতিতে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিলই না বলা চলে – ফলে দিল্লি কেন্দ্রিক ইতিহাসে তিনি প্রায় ব্রাত্যই থেকেছেন। আর ছোট ভাই মুরাদ দিল্লির কাছাকাছি সুবাগুলোয় সাম্রাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করলেও বড় দাদার প্রভাবে তিনি সম্রাটের ক্ষমতা বলয় থেকে দূরে হঠতে থাকেন। ক্ষমতার আশেপাশে ক্রমশ জায়মান হয়ে উঠতে থাকেন দুই শাহজাদা ভাই, সম্রাটের অভয়হস্ত নিয়ে দারা আর দরবারি ক্ষমতাশালী সম্রাট-জাহানারা-দারা অক্ষের চরম বিরোধিতা সয়ে, চাতুর্যপূর্ণভাবে এই বিরোধিতার রাজনীতি থেকে যথোপযুক্তভাবে শিক্ষা নিয়ে নিজের ভাগ্য গড়ে নেওয়া আওরঙ্গজেব।
মুঘল শাহজাদাদের ছোটবেলার পড়াশোনায় শুলইকুল (সকলের জন্যে শান্তি) আর তখত ইয়া তাবুদ (হয় সিংহাসন নয় কবরস্তান) তত্বে বিশ্বাসী করিয়ে তোলা হত। চার শাহজাদাই সেই তত্ত্বে নিষিক্ত ছিলেন, কিন্তু আমরা আলোচনার সুবিধের জন্যে এই পর্বে দুই শাহজাদা দারা শুকো আর আওরঙ্গজেবের বেড়ে ওঠার ঘটনাক্রমে দৃষ্টিনিবদ্ধ করব। এই দুই মহাতেজ বাল্যকাল থেকে তিলে তিলে সিংহাসনের লড়াইএর জন্যে কীভাবে নিজেদের প্রস্তুত করছেন সেটা এই পর্বে চুম্বকাকারে আলোচনা করে ফিরে যাব সিংহাসন লড়াইয়ের ঘটনাক্রম বিবৃত করতে।
মুনিস ফারুকি প্রিন্সেস অব মুঘল এম্পায়ার বইতে বলছেন, মুঘল সাম্রাজ্য সম্রাটদের সাম্রাজ্য বাড়ানো যুদ্ধ এবং বিজয় ইত্যাদির চোখে দেখা ইতিহাস। কিন্তু মুঘল সাম্রাজ্যের ভিত্তি আর জনপ্রিয়তা আন্দাজ করতে চোখে দেখা যুদ্ধ-বিগ্রহের ইতিহাস বোঝাটাই যথেষ্ট নয়। মুঘল সামরিক বিজয় কাহিনীর ভেতরে আরও অদেখা নানান উদ্যম জড়িয়ে থাকে – সেই উদ্যমের কেন্দ্রবিন্দু হলেন শাহজাদা আর খানজাদারা। মুঘল সাম্রাজ্যের কাঠামো বুঝতে সেই সব অদেখা ঘটনাক্রম বোঝা জরুরি। আকবর, বাবা হুমায়ুনের দুর্ভাগ্যের উদাহরণে, সুবার স্বনির্ভরতা কেড়ে, সেটিকে কেন্দ্র নির্ভর ভৌগোলিক প্রশাসনিক এককে পরিণত করলেন। হুমায়ুনের সময়ের সুবা আর সুবাদারের প্রশাসনিক স্বনির্ভরতা লোপ পেল আকবরের রাজত্বকালে। সুবাদারেরা আগরা/দিল্লি নির্ভর হলেন। সুবায় সুবাদার প্রশাসক হিসেবে মূলত শাহজাদারাই যেতেন, আর যেতেন খানজাদারা। খানজাদারা শাহী বৃহত্তর শাসক পরিবারের অংশীদার। কিন্তু খানজাদাদের, সম্রাটের আইনি স্ত্রীদের পুত্র শাহজাদাদের মত সিংহাসনের লড়াইতে অংশ নেওয়ার অধিকার থাকল না। খানজাদারা সিংহাসনের লড়াইতে শাহজাদাদের সঙ্গী হতে পারতেন মাত্র।
বাল্যকাল থেকে শাহজাদা, খানজাদাদের সুবায় পাঠিয়ে সাম্রাজ্য বিস্তারের দায়িত্ব দেওয়া হত। সাম্রাজ্য বিস্তার দুভাবে হত — চোখে দেখা সৈন্য সামন্ত নিয়ে হামলা; আর যেটা চোখে দেখা যেত না, সেটা হল জোট সঙ্গী তৈরি করে ল্যাটারাল সাম্রাজ্য বিস্তৃতি। শাহজাদারা, খানজাদারা সুবায় চাকরি করতে গিয়ে মুঘল তাঁবের বাইরে থাকা, মুঘল নিরপেক্ষ শক্তি, মুঘল বিরোধী শক্তি, ব্যক্তি, গোষ্ঠী, সমাজ ইত্যাদিকে ক্ষমতার তাঁবেতে নিয়ে আসার কাজ করেছেন। এই কাজটা যেমন তাঁরা সাম্রাজ্যের ভিত্তিকে জোরদার করার জন্যে করেছেন, তেমনি বিভিন্ন গোষ্ঠীকে মুঘল তাঁবেতে নিয়ে আসার উদ্যম শাহজাদাদের ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণে সহায়ক হয়েছে।
আমরা এর আগে আলোচনা করে বলেছি মুঘল সাম্রাজ্যে জৈষ্ঠাধিকার বা সিংহাসনে বড় ছেলের প্রাথমিক অধিকারের স্বীকৃতি মেনে নেওয়া হয় নি — জাহাঙ্গীর, শাহজাহানের রাজত্বই এই তত্ত্বের প্রমাণ। সম্রাটের বৈধ স্ত্রীদের পুত্রসন্তানেরাই একমাত্র সিংহাসনের লড়াইয়ের নেতৃত্ব দিতে পারতেন এবং তারাই বাহুবলে সিংহাসন জিতে নিতে পারতেন। অর্থাৎ আগরা/দিল্লির সিংহাসনে দখল নিতে, সিংহাসনের জন্যে যোগ্য বৈধ ভাইদের নেতৃত্বে সিংহাসনের লড়াই অবশ্যম্ভাবী যে ছিল, শাহজাদারা এই সাধারণ তথ্য বাল্য বয়স থেকেই জানতেন। সুবায় কাজ করার সময় নিজের পক্ষকে জোরদার করতে তারা জোট সঙ্গী খুঁজতেন। সুবা এবং তার আশেপাশের মুঘল তাঁবের বাইরে থাকা ব্যক্তি গোষ্ঠী সমাজকে নানান সুযোগ সুবিধে দিয়ে শাহজাদারা নিজেদের পার্ষদ বানিয়েছেন, সুবার দরবারে বা কেন্দ্রে নিজের প্রতিনিধি হিসেবে স্থান দিয়েছেন, উপাধি দিয়েছেন, চাকরি দিয়েছেন, নানাভাবে স্বীকৃতিও দিয়েছেন। এইভাবে প্রত্যেক সুবায় শাহজাদার দরবার ঘিরে দুরন্ত বিস্তৃত ক্ষমতা বলয় তৈরি হয়েছে। সুবা-দরবারগুলোয় তৈরি হওয়া ক্ষমতা বলয় মুঘল সাম্রাজ্যকে ভেতর থেকে শক্তিশালী করেছে। যার ক্ষমতা বলয় জোরদার তিনিই সিংহাসন যুদ্ধে এগিয়ে থাকা নেতা। এইভাবে মুঘল তাঁবের বাইরে থাকা বহু গোষ্ঠী, ব্যক্তি মুঘল সাম্রাজ্যে জুড়েছে – মুঘল সাম্রাজ্য শক্তিশালী হয়েছে। এখানে আমরা দুই প্রধান যুযুধান পক্ষ আওরঙ্গজেব এবং দারা শাহজাদা থাকা অবস্থায় কীভাবে নিজেদের জোটকে জোরদার করেছেন, সেটা মুনিস ফারুখির সূত্রে দেখব।
শাহজাদা আওরঙ্গজেবের সুবায় থাকার সময়ে যে বিস্তৃত নেটওয়ার্কিং ব্যবস্থা তৈরি করেন নিজের অবস্থান জোরদার করার জন্যে, সে সম্বন্ধে মুনিস ফারুখি খুব ইন্টারেস্টিং তত্ত্ব দিচ্ছেন। দাদা দারা যেমন শুধুই হানাফি-সুন্নি মতাবলম্বীদের সঙ্গেই আলাপ আলোচনা চালিয়েছেন তাঁর জীবনজুড়ে, আওরঙ্গজেব কিন্তু সে পথ ধরেন নি, বরং যত রকমের ইসলামি পথ আছে সবার সঙ্গে তিনি সমানভাবে স্বচ্ছন্দ ছিলেন, সুযোগ পেলেই নানান পন্থের সন্ত, সন্ত গোষ্ঠীর সঙ্গে আলাপ করতেন। আওরঙ্গজেব যখন সাম্রাজ্যের কর্মকর্তা হিসেবে বিভিন্ন সুবার দায়িত্বে যাচ্ছেন, তখন তিনি কাদের সঙ্গে আলাপ করছেন, মুনিস তার বিশদ তালিকা দিয়েছেন। সেটা আমরা পরে বিশদে আলোচনা করব আওরঙ্গজেবের জোট তৈরির সময়ের বাখানে। মুনিস প্রিন্সেস অব মুঘল এম্পায়ারে বলছেন দাদা, দারার রাস্তায় হানাফি সুন্নির মত একটিমাত্র তারিকার সঙ্গে আলাপ আলোচনার পথ না ধরে আওরঙ্গজেব অন্যান্য তরিকার সঙ্গেও দীর্ঘকাল ধরে আলাপ আলোচনা চালিয়েছেন। আজ আমরা জানি তিনি চিস্তি সুফি সৈয়দ মহম্মদ ঘাউস দারাজের (প্র ১৪২২) উত্তরাধিকারী, সন্তর মাজারের রক্ষাকর্তা এবং দক্ষিণের স্থানীয় অঞ্চলের জনপ্রিয় শাহ ওয়ায়িউল্লাহ হুসেইনির সঙ্গে বহুবার দেখা করেছেন। দক্ষিণে থাকার সময় আওরঙ্গজেব বিখ্যাত সাত্তারি পীর শায়েখ আবদুল লতিফ বুরহানপুরী এবং কাদরি পীর সৈয়দ শের মহম্মদ কাদিরি বুরহানপুরীর সঙ্গে নিয়মিত দেখাসাক্ষাত করেছেন। গুজরাটে চিস্তি পীর অভিজাত মুইহুদ্দিনের সঙ্গে বহু বার ধর্মালোচনা করেছেন। কাদিরি উত্তরাধিকারী যেমন পাটনের অভিজাত হাসানজী কাদিরির সঙ্গে, আহমেদাবাদে সৈয়দ মহম্মদ আলআয়দারুসএর সঙ্গে আলাপ করেছেন। মাথায় রাখতে হবে রাজনীতিটাও — কাদিরি সন্ত ছিলেন দারা শুকো এবং শাহজাহানের সমর্থক হজরত সাহ আলম বংশের তীব্র বিরোধীপক্ষ। ১৬৪০-এর দশকের শেষের দিকে আওরঙ্গজেবের সঙ্গে নক্সবন্দী শিক্ষক-সন্তদের মধ্যে উপহার আদানপ্রদান, যুদ্ধ ইত্যাদির সংবাদ দেওয়ানেওয়া এবং নির্দিষ্ট কিছু অভিজাতর গতায়াতের তথ্য আদানপ্রদান বিষয়ে নিয়মিত চিঠি চালাচালি হত। মুনিস বলছেন আওরঙ্গজেব সিংহাসনে আরোহণের লক্ষ্যে বহু বছর ধরে এই ধরণের সফল যোগাযোগ রেখে চলেছেন, এবং সিংহাসনের যুদ্ধে এইসব যোগাযোগ তার পক্ষে গিয়েছিল। (চলবে)