আওরঙ্গজেবের জোট
সিংহাসনের লড়াইয়ের প্রস্তুতিতে দারার জোট প্রচেষ্টার পরে চোখ ঘোরাব আওরঙ্গজেবের জোট প্রচেষ্টার দিকে।
জাহাঙ্গির থেকে বাহাদুর শাহ, চার প্রজন্মের শাহজাদা তাঁদেরর জীবনের অধিকাংশ সময় প্রাসাদের বাইরে কাটিয়েছেন। উইলিয়াম আরভিন, আর্মি অব ইন্ডিয়ান মুঘলস গ্রন্থে বলছেন মধ্য এশিয়া যাযাবর গোষ্ঠী থেকে উদ্ভুত হওয়ার ফলে তৈমুর প্রধানেরা বরাবরই সেনাবাহিনী নিয়ে দূরদূরান্তে চলেফিরে বেড়াতেন। এই পারম্পরিক পরিযায়িতার অভ্যসটা বজায় রেখে ভারতের প্রথম দিককার মুঘল শাহজাদা এবং সম্রাটেরা ক্রিয়াশীলভাবে সেনাবাহিনী নিয়ে দেশজুড়ে ঘোরাফেরা করেছেন। হস গোমানস বলছেন, বছরে তারা রাজধানীকে ঘিরে ১২০০ কিমি ব্যাসে ঘোরাফেরা করতেন। চার মাস তারা আগরা/দিল্লিতে শিবির পাততেন নদীর ধারে, অধিকাংশ সময় প্রাসাদের বাইরে। বাবর থেকে বাহাদুর শাহ অবদি কোনও সম্রাটই এক জায়গায় বেশি দিন থাকেন নি, তাঁদের জীবনের অধিকাংশ সময় প্রাসাদের বাইরে পাতা শিবিরের তাঁবুতে কেটেছে। পাঁচ বছরের শাসনকালে বাহাদুর শাহ এক রাতের জন্যেও প্রাসাদে ঘুমোন নি। দিনের বেলায় একবার দুবার প্রাসাদে ঢুকেছেন মাত্র। এই অভ্যেসের ফলে তার সময়ে কোনও রাজধানী তৈরি হয় নি, তিনি যেখানেই থাকতেন সেটাই তার রাজধানী হিসেবে গণ্য হত। ফলে সাম্রাজ্য চালাবার জন্যে যতকিছু কাঠামো লাগে সব কিছুই সম্রাটকে সঙ্গে নিয়ে ঘুরতে হত। যাই হোক এই অভ্যেসটা দারার হয় নি। কিন্তু আওরঙ্গজেব পিতৃপুরুষের অভ্যেসটা ছাড়েন নি। সম্রাট হওয়ার পরেও টানা প্রায় আড়াই দশক দক্ষিণে মুঘল সেনা শিবিরে শিবিরে দিন-রাত কাটিয়েছেন, সেখানেই গুলালবর তাঁবুতে দরবার আয়োজন করেছেন। ফলে আওরঙ্গজেব শাহজাদা সময়ের ১৫ বছরের সাম্রাজ্য সেবা কালে অধিকাংশ সময় রাজধানী থেকে যে দূরে কাটিয়েছেন, এবং চাঘতাই-তুর্ক পরম্পরা বজায় রেখেছেন, তাঁর অধিকাংশ জোট প্রচেষ্টা মুঘল শিবিরেই আয়োজিত হয়।
সাধারণত শাহজাদারা যখন সুবায় সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি হয়ে গিয়ে স্থানীয় রাজনীতির নানা বাধাবিপত্তি সামলে নিজের অবস্থান জোরালো করেছেন, শিক্ষা নিয়েছেন, মনুষ্য ধর্ম বুঝেছেন, ঘসেমেজে নিজেকে শাসনের উপযোগী হিসেবে তৈরি করেছেন। দারাকে সেই সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হতে হয় নি। জাহাঙ্গিরের পুত্র পারভেজ ১৬০৬ মেবার অভিযানে যান। অভিযানের তীব্রতা এবং তার সঙ্গে যাওয়া মুঘল অভিজাত আমীরদের প্রভুত্বব্যাঞ্জক ব্যবহারে পারভেজ হতবাক হয়ে যান। এর চার দশক পরে ১৬৪৪-এ আওরঙ্গজেব দক্ষণের সুবাদারিত্ব ছেড়ে সম্রাটের অনুমতি ছাড়াই দক্ষিণ থেকে দরবারে ফিরে আসেন। দীর্ঘকাল দরবারে বাইরে কাটানোর মানসিক যন্ত্রণা এবং প্রশাসনে সংস্কার কর্ম চালানোর ধকল তিনি সহ্য করতে পারেন নি। ১৬৪৬-এ ছোট ভাই মুরাদ উত্তরপশ্চিম সীমান্তের সম্রাটের অনুমতি ছাড়াই বলখ প্রশাসন ছেড়ে চলে আসেন। বালক থেকে যৌবনে পদার্পণ করা শাহজাদাদের পক্ষে দরবারি আদবকায়দা, রাজকীয় ঠাটবাট, অতুলনীয় ঐশ্বর্য, পরিবারের সঙ্গ সর্বোপরি দৈনন্দিনের দরবারি রাজনীতির স্পর্শ থেকে দূরে প্রশাসনিক চাকরিতে দীর্ঘকাল কাটানো খুবই সমস্যার বিষয় ছিল।
কিন্তু ক্রমশ শাহজাদারা বুঝতে শিখলেন তাদের যদি মুঘল রাজনীতিতে সক্রিয় থাকতে হয়, সিংহাসন দখলের লড়ায়ের অংশ নিয়ে নিজেদের যোগ্য করে তুলতে হয়, তাহলে দরবার থেকে দূরে সাম্রাজ্য প্রশাসনে কাজ করাই শ্রেয়। তবেই নিজেদের ভবিষ্যতকে অনেকটা নিজেদের মত করে স্বাধীনভাবে গড়ে তোলা সম্ভব। আকবর পুত্র মুরাদকে দক্ষিণের সুবা থেকে কেন্দ্রে আনার উদ্যম নিলে তিনি বেশ কিছু দিন সম্রাটের ইচ্ছায় সায় দেন নি। অন্যদিকে ১৬২০-র দশকে খুররমের সঙ্গে বাবা জাহাঙ্গীর এবং সৎ মা নুরজাহানের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকলে খুররম নিজে থেকেই দক্ষিণের সুবায় চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দশ বছর সুবাদারের চাকরি করে ১৬৪৫-এ যুবক আওরঙ্গজেব বুঝলেন দিল্লির দরবারে তিনিই একমাত্র অবাঞ্ছিত চরিত্র, তিনি নিজের নিজস্বতাকে খোঁজার কাজে জুটলেন। বাবা শাহজাহান এবং প্রধানমন্ত্রী শাদুল্লা খানকে অনুরোধ করলেন তাঁকে দূর প্রদেশের সুবাদারির কাজে পাঠিয়ে দিতে [‘আপনাদের ইচ্ছা মত আপনি রাজধানী থেকে যে কোন জায়গায় যে কোন কাজের জন্য আমায় নির্বাসন দিন, আমি রাতের ঘুম আর মনের শান্তি হারিয়েছি। মহামহিম শাহজাদার ইচ্ছেতেই লাহোর থেকে দাক্ষিণাত্যের সুবাদার করে পাঠিয়ে দেন (লাহোর নয় মুলতান। আওরঙ্গজেব কখোনোই লাহোরের (পাঞ্জাব) সুবাদার ছিলেন না। ১৪ জুলাই ১৬৫২-তে দাক্ষিণাত্যের সুবাদার নিযুক্ত হন, মুলতান থেকে দক্ষিণে যান) — আহকম-ই-আলমগিরির ২ নম্বর গল্প]।
মাত্র ১৭ বছর বয়সী আওরঙ্গজেবকে শাহজাহান বুন্দেলখণ্ডে সেনা অভিযানে পাঠালেন। অভিযানের সফলয়ে দক্ষিণে তাঁর সুবেদারি জুটল। দরবারে আওরঙ্গজেব যাতে দারাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে না পারেন, তাঁর সেই যোগাযোগ তৈরি না হয়, সে জন্যে তাঁকে শাহজাহান দূরের চাকরিতে পাঠালেন। ১৬৪৪-৪৫-এর সময়ে একাদিক্রমে ১৮ মাস, ১৬৪৭, ১৬৪৯ এবং ১৬৫১-র কয়েক মাস দিল্লি বাস বাদ দিলে ১৬৩৫-এর পর সিংহাসনে আরোহণের আগে সারা সময়টা দরবার থেকে দূরেই কাটিয়েছেন। আওরঙ্গজেব সুবাদার ছিলেন দক্ষিণে দুবার (১৬৩৬-৪৪ এবং ১৬৫২-৫৮), গুজরাটে (১৬৪৫-৪৭) এবং মূলতানে (১৬৪৮-৫২)। তাছাড়া ১৬৩৫-এ বুন্দেলখণ্ডে, ১৬৪৭-এ বলখে, কান্দাহারে (১৬৪৯, ১৬৫২) সেনা অভিযানে গিয়েছেন। দীর্ঘকাল ধরে দরবার থেকে দূরে, আত্মীয় স্বজন থেকে দূরে কাটিয়ে আওরঙ্গজেব নিজে নিজেই হাতে কলমে শিখেছেন কীভাবে অচেনা অজানা গোষ্ঠীকে বাগে আনতে হয়, এদের অনেকেই মুঘল সাম্রাজ্যের বিরোধীপক্ষ ছিলেন। দরবারের বাইরে থেকে তিনি তাদের সঙ্গে কীভাবে বোঝাপড়ার সমীকরণ তৈরি করতে হয় সেই শিক্ষায় নিজেকে শিক্ষিত করেছেন।
আওরঙ্গজেব স্থানীয় মুসলমান ধর্মতাত্ত্বিকদের সঙ্গে বারবার দেখা করেছেন, সে তথ্য পারসিক ইতিহাসে সুপ্রতুল। দক্ষিণে দুটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা কেন্দ্র খুলদাবাদ (এখানেই আওরঙ্গজেবের সমাধি) এবং বুরহানপুরের বহু ধর্মশিক্ষকের সঙ্গে বহুবার বৈঠক করেছেন। মুনিস ফারুকি বলছেন, তিনি যে সব ধর্মীয় নেতা, জ্ঞানী এবং শিক্ষকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন, প্রত্যেকের নামের বিশদ তালিকা তিনি নিজের কাছে রাখতেন। এম জেড এ শাকিব মুঘল আরকাইভস – আ ডেসক্রিভটিভ ক্যাটালগ অব দ্য ডকুমেন্টস পারটেইনিং টু দ্য রেইন অব শাহজাহান, ভল ১-এ বলছেন ১৬৩০-এর দশকে আওরঙ্গাবাদ শহর প্রতিষ্ঠার সময় যে সব মসজিদ এবং মাদ্রাসা তিনি তৈরি করান, সে সব শিক্ষা কেন্দ্রের শিক্ষক কর্মী তিনি সেই তালিকা থেকে নিয়োগ করেছিলেন। ১৬৪১-এ আওরঙ্গজেব বীর অঞ্চলের শেখ ইব্রাহিমকে ৬ একর জমি এবং মসজিদে আলো জ্বালবার জন্যে যে তেল কিনতে হয়, তার জন্যে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করেন। জনৈক ধর্মীয় নেতার নাতনি বিবি আয়েশার জন্যে ছোট পরিমান অর্থ বরাদ্দ করেছিলেন। ১৬৪০-এ দরবার থেকে বেহিসেবি ‘মদদ (ইমাশ)’ দান নিয়ে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলে স্বয়ং আওরঙ্গজেব স্থানীয় ক্ষমতাশালীদের নিজের পাশে টানতে সেই তদন্তের তীব্র বিরোধিতা করে সম্রাটকে সে অভিযোগের তদন্ত করে সত্যি খুঁজে বার করার জন্যে অনুরোধ করেন। মুলতানে থাকাকালীন বিপুল পরিমান অর্থ বরাদ্দ করেন তিনটে সুহরাবর্দী সন্তের মাজার সারাই করারর জন্যে। মুলতানের শেখ বাহাউদ্দিন জাকারিয়া সুহরাবর্দীর উত্তরাধিকারীদের জন্যেও মদদ দান করেন। শেখ আবদুল লতিফ বুরহানপুরীর সাত্তারি অনুগামীরা এবং দিহিবিদি নক্সবন্দীয়া অনুগামীদের নিজের প্রাসাদ এবং প্রশাসনে কাজ দিয়েছেন।
মুনিস ফারুখি প্রিন্সেস অব মুঘল ইন্ডিয়ায় বলছেন দাদা, দারার হানাফি সুন্নির মত একটিমাত্র তারিকার সঙ্গে আলাপ আলোচনার পথ না ধরে আওরঙ্গজেব অন্যান্য তরিকার সঙ্গেও দীর্ঘকাল ধরে আলাপ আলোচনা চালিয়েছেন। আজ আমরা জানি তিনি চিস্তি সুফি সৈয়দ মহম্মদ ঘাউস দারাজের (প্র ১৪২২) উত্তরাধিকারী, সন্তর মাজারের রক্ষাকর্তা এবং দক্ষিণের স্থানীয় অঞ্চলের জনপ্রিয় শাহ ওয়ায়িউল্লাহ হুসেইনির সঙ্গে বহুবার দেখা করেছেন। দক্ষিণে থাকার সময় আওরঙ্গজেব বিখ্যাত সাত্তারি পীর শায়েখ আবদুল লতিফ বুরহানপুরী এবং কাদিরি পীর সৈয়দ শের মহম্মদ কাদিরি বুরহানপুরীর সঙ্গে নিয়মিত দেখাসাক্ষাত করেছেন। গুজরাটে তিনি বার বার চিস্তি পীর অভিজাত মুইহুদ্দিনের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। এছাড়াও সেখানে তিনি বহু কাদিরি উত্তরাধিকারী যেমন পাটনের অভিজাত হাসানজী কাদিরির সঙ্গে এবং আহমেদাবাদে সৈয়দ মহম্মদ আলআয়দারুসএর সঙ্গে আলাপ করেছেন। কাদিরি সন্ত ছিলেন দারা শুকো এবং শাহজাহানের সমর্থক হজরত সাহ আলমের বংশের তীব্র বিরোধীপক্ষ। ১৬৪০-এর দশকের শেষের দিকে আওরঙ্গজেবের সঙ্গে নক্সবন্দী শিক্ষকের মধ্যে উপহার আদানপ্রদান, যুদ্ধ ইত্যাদির সংবাদ দেওয়ানেওয়া এবং নির্দিষ্ট কিছু অভিজাতর গতায়াত বিষয়ে নিয়মিত চিঠি আদানপ্রদান হত। মুনিস বলছেন আওরঙ্গজেব সিংহাসনে আরোহণের লক্ষ্যে বহু বছর ধরে এই ধরণের যোগাযোগ সফলভাবে রেখে চলেছেন, এবং সিংহাসনের যুদ্ধে এইসব যোগাযোগ আওরঙ্গজেবকে শক্তিশালী করেছে।
সমুগড়ের যুদ্ধে দারা পরাজিত হলে মুলতান অঞ্চলের কোনও ধর্মীয় তরিকা তার সমস্যা উদ্ধারে উদয় হয় নি অথচ তিনি শেখ বাহাউদ্দিন যাকারিয়াকে ২৫০০০ টাকা দান দিয়েছিলেন। আর নক্সবন্দীয়ারা আওরঙ্গজেবের প্রতি তাদের সমর্থনে সেনা এবং অঞ্চলের বাইরে থেকে ঘোড়া আর উট সরবরাহ করে। গুজরাটেও দারা আহমেদাবাদ বা পাটন অঞ্চল থেকে কাদিরি অনুগামীদের থেকে কোনও সাহায্য পান নি। মুলতানের মতই আওরঙ্গজেবের পূর্ব সময়ে কাদিরি তরিকার পাশে দাঁড়ানোর প্রতিক্রিয়ায় এবং কাদিরিদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে দারা কাদিরিদের থেকে সিংহাসনের লড়াইতে বিন্দুমাত্র সাহায্য পান নি।
ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে আলাপ আলোচনা করা, তাদের সহায়তা করা যেমন আওরঙ্গজেবকে সাহায্য করেছে, তেমনি তিনি সিংহাসনের লড়ায়ের জন্যে প্রভাবশালী ধর্মীয় নেতা গোষ্ঠী ছাড়াও আরও কিছু অধর্মীয় গোষ্ঠীকে কাছে টেনে ছিলেন। এই যোগাযোগগুলো তাঁর আস্তিনে তলায় লুকোনো বিষ্ময়কর তাস হিসেবে অভিহিত করতে পারি। মীর জুমলাকে দক্ষিণী সুলতানদের রোষ থেকে বাঁচিয়ে প্রথমে নিজের দিকে টেনে আনা এবং কেন্দ্রে উজির পদে নিযুক্ত করা ছিল তার জীবনের অন্যতম প্রধান মাস্টার স্ট্রোক। তিনি কীভাবে মীর জুমলাকে বশ করলেন, সে বর্ণনা আমরা আগে বিশদে লিখেছি। সিংহাসনের লড়াইতে মীর জুমলার বন্ধুত্ব তাঁর সিংহাসনে আরোহণের লক্ষ্যপূরণে বড় সহায়ক হবে — বিশেষ করে শাহ সুজার বিদ্রোহ দমনে তিনি আওরঙ্গজেবের সহায়ক হন এবং বাংলার সুবাদার পরে বৃত হন। বিভিন্ন সময় বিভিন্ন এলাকায় বিশেষ করে দক্ষিণে সরকারি চাকরিতে থাকার সময় সেই অঞ্চলের ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী আফগান, দখিনি এবং মারাঠাদের নানান সমস্যার পাশে দাঁড়ানোর সদর্থক প্রতিফল পেয়েছেন সিংহাসনের লড়াইতে। সিংহাসনের লড়াইতে অংশ নিতে যখন ১৬৫৭-৫৮-য় উত্তরে আসছেন সেই বাহিনীতে আফগানদের বহু গোষ্ঠী — আনসারি, খসোগি, নিয়াজি, লোদি, তারিন, কক্কর, খতিয়ার, ঘুরি, সারওয়ানি, দাউদজাই, ওরাখজাই, মাসুদ, মহম্মদ এবং উইলাকজাই অংশ নেয়। Tarikh-i Khan Jahani wa Makhzan-i Afghani বলা হচ্ছে দক্ষিণের একটি প্রচণ্ড গরীব এক আফগান গোষ্ঠীর সাত ভাইও আওরঙ্গজেবের অভিযাত্রী বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। আমরা দেখলাম আওরঙ্গজেবেরসামরিক সাফল্যে আফগানদের যোগদান খুব কম ছিল না। অবশ্যই আওরঙ্গজেবের আফগানদের পাশে টানার সাফল্য খুব সহজে আসে নি। দীর্ঘকাল ধরে তিনি নিজের বাহিনীতে আফগানদের নিয়োগ করেছেন, তাঁদের নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। যে সব গোষ্ঠী এর আগে মুঘলদের বাহিনীতে অন্তর্ভূক্ত হয় নি, তাঁদের সঙ্গেও আওরঙ্গজেব নিয়মিত আলাপ আলোচনা চালিয়েছেন।
আওরঙ্গজেবের আগে কেন্দ্রিয় দরবারে আফগানদের খুব একটা সুযোগ সুবিধে দেওয়া হত না। দক্ষিণে প্রথমবারের চাকরিতে তিনি আনসারি গোষ্ঠীর প্রধান হাদিদাদ খান, তার ছেলেদের এবং গোষ্ঠীর মাথাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করলেন। ১৬৫৩-য় আওরঙ্গজেব উসমান খান রোহিলার মনসব বাড়িয়ে ১০০০/১০০০ করে তাঁকে সুলতানপুর আর নন্দুরবারের ফৌজদার নিযুক্ত করেন। ১৬৫৩ থেকে ১৬৫৫র মধ্যে উসমান খানের ভাইপো ফাতাহ খান রোহিলা খুব তাড়াতাড়ি মনসবদারি সিঁড়িতে চড়ে ১০০০/১০০০ মনসবদারিতে পৌঁছন। কেন্দ্র আফগানদের এ ধরণের মনসব বৃদ্ধির বিরোধিতা করে ফাতাহ খান রোহিলা এবং তার ভাই হায়াত রোহিলার উচ্চপদের দাবি বাতিল করে দিলে, আওরঙ্গজেব ১৬৫৭-য় লেখা এক চিঠিতে কেন কেন্দ্র তাঁর এই ধরণের নিয়োগের বিরোধিতা করছে, সে বিষয়ে তিনি সরাসরি দরবারের জবাবদিহি চান। তিনি লেখেন গোলকুণ্ডা যুদ্ধে আফগানেরা যে ভূমিকা নিয়েছে, তার জন্যে তাদের এইটুকু পুরষ্কার পাওয়া উচিৎ। তিনি জানতে চান কোন আইনে আফগানদের পদোন্নতি করিয়ে তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের প্রথাভঙ্গ করেছেন?
আমরা দেখলাম শাহী দরবার যে সব গোষ্ঠীর দিকে এত দিন নজরই দেয় নি, দক্ষিণে আওরঙ্গজেব তার চাকরির সময় সেই সব গোষ্ঠীগুলোকে দরবারের রক্তচক্ষুর সামনে দাঁড়িয়েই পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, তাদের মুঘল তাঁবেতে টেনে এনেছেন। মুঘল আমলে আরেক বঞ্চিত গোষ্ঠী, হাবসি। তাদের তিনিই প্রথম মুঘল সাম্রাজ্যে জুড়লেন। ১৬৩৬-এ নিজের প্রসাদে হাবসিদের নিযুক্ত করেন। তাদের মধ্যে একজন প্রখ্যাত সিদ্দি, মিফাত হাবাস খান তার সেনানায়ক হন। আওরঙ্গজেব যেহেতু নিজে উদ্যম নিয়ে হাবসি হাবাস খানের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন, সে জন্যে মুঘলদের মধ্যে তিনিই একমাত্র দক্ষিণের রাজনীতিতে খুব সহজেই আপনার লোক হয়ে যান। হাবাস খানের কন্যার সঙ্গে মালিক অম্বরের পুত্রের বিবাহ হয়। আরেক হাবসি নেতা ইয়াকুত খান হাবসির সঙ্গে মালিক অম্বরের দ্বিতীয় কন্যারও বিবাহ হয়। আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে হাবাস খানের অন্তর্ভূক্তি এবং সেনা বাহিনীতে তাঁর দ্রুত উত্থানের ফলে মুঘল বাহিনী আর প্রশাসনে হাবসিদের অন্তর্ভূক্তি সহজ হয়ে যায়। হাবাস খানের পারিবারিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে আফ্রিকার আবিসেনিয়া থেকে প্রচুর হাবসি দক্ষিণে আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে যোগ দেয়। দারার বিরুদ্ধে সামরিক সাফল্যে হাবসিদের অবদান খুব কম নয়। দক্ষিণে হাবসিদের মত আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ সামরিক গোষ্ঠী কোনও দিনই মুঘল বাহিনীতে ছিল না, মুঘল নিরপেক্ষ জীবনযাপন করত। তাদের একটা বড় অংশ আওরঙ্গজেবের উদ্যমে মুঘল বাহিনীতে প্রবেশ করে। অহাবসি দক্ষিণীরাও আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে যোগ দেয় – যেমন গাজি বিজাপুরী এবং আবদুল রহমান খানকে আওরঙ্গজেব উচ্চশ্রেণীর উপাধি দেন এবং তার প্রশাসনে উচ্চপদেও নিযুক্ত করেন। আওরঙ্গজেব দক্ষিণে একের পর এক ক্ষমতাবান গোষ্ঠীকে মুঘল সাম্রাজ্যের অংশিদার করায় দক্ষিণের রাজনীতিতে এক সময় মুঘল সাম্রাজ্যের বিরোধিতা প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।
দক্ষিণের আরেক ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী মারাঠারাও সিংহাসনের লড়াইতে বড় ভূমিকা পালন করেছে। যদিও সে সময়ে মারাঠারা দক্ষিণে রাজনৈতিক অভিজাত হিসেবে গণ্য হত না। দক্ষিণে রাজনৈতিক অভিজাত হিসেবে গণ্য হত মুসলমান সমাজ আর তাদের তৈরি সাম্রাজ্যে জুড়ে থাকা হাবসিরা। পরের দিকে পারসিক আর তুর্কিরাও অভিজাত চিহ্নিত হবে। কিন্তু দক্ষিণে অমুসলমান বাহিনীর মধ্যে মারাঠারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং তারা গেরিলা যুদ্ধে অসম দক্ষ। ১৬৩৭-এর নভেম্বরে দক্ষিণে আওরঙ্গজেবের বিস্তৃত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড তৎকালীন এবং পরবর্তী সময়ের পারসিক ইতিহাসে বিশদে লেখা আছে। এই সময়ে তাঁর এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বদৌলত তিনি দক্ষিণের রাজনীতির অন্যতম আকর্ষণ হয়ে ওঠেন। শাহজাদার জন্মদিন উপলক্ষ্যে মারাঠা সেনানায়ক লিঙ্গুজী ভোঁসলে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন। সে সময় শক্তিশালী মারাঠা সেনানায়ক ছিলেন সাহুজী ভোঁসলে। আওরঙ্গাবাদে আয়োজিত আওরঙ্গজেবের ১৯তম জন্মদিনে আমন্ত্রিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মধ্যে অর্ধেকই ছিলেন মারাঠা গোষ্ঠীপতি। এই তালিকায় শাহী প্রশাসনে কাজ করা এবং মুঘল তাঁবের বাইরে থাকা গুরুত্বপূর্ণ মারাঠা নেতার নাম ছিল। ১৬৩৮-এ বগলনা অভিযানে এদের অনেকেই যোগ দিয়েছিলেন। ১৬৪৪-এ তার বদলির আগে জমিদারদের বিদ্রোহ দমনে স্থানীয় মারাঠা নেতারা তাঁকে সহায়তা দেন।
১৬৫৩-য় তিনি দ্বিতীয়বার দক্ষিণের চাকরিতে ফিরে এসে নতুন করে মারাঠাদের শাহী প্রশাসন এবং বাহিনীতে অন্তর্ভূক্তির উদ্যম নিলেন। তাঁর নিজের প্রশাসনে এবং প্রাসাদে যদিও উচ্চপদে মারাঠারা কাজ করত না, কিন্তু তিনি নিয়মিত মারাঠা প্রখ্যাতদের সঙ্গে দরবারে দেখা করতেন। ১৬৫৫-৫৬-র দেওগড় অভিযানে তিনি মারাঠা সেনানায়ক মালুজীর নাম সুপারিশ করেন। ১৬৫৭-তেও আওরঙ্গজেবের সুপারিশে আরেক মারাঠি যশবন্ত রাও, করতলব খান উপাধিতে ভূষিত হয়ে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার আগেই তাকে দায়িত্ব দেওয়া হল দেওগড়ে বয়েয়া উদ্ধারে অভিযানে যাওয়ার জন্যে। এই ধরণের স্পর্শকাতর শাহী অভিযানে মারাঠা সেনাপতিদের মুঘল বাহিনীতে জুড়ে নেওয়ার জন্যে আওরঙ্গজেব যেভাবে শাহী প্রশাসনকে সুপারিশ করেছেন, সেটা মারাঠা রাজনীতিতে মহান অনুগ্রহের চিহ্ন হিসেবে গণ্য হয়েছে।
১৬৫৭-য় আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে করতলব খান, যদু রাই, রুস্তম রাইএর মত গুরুত্বপূর্ণ মারাঠা সেনানায়ক দারার বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নিয়েছেন। অভিযানে ছিলেন মারাঠা গোষ্ঠী নেতা যেমন দেয়ামাজী, নাটুজী, নেতুজী ভোঁসলে, বাবাজী ভোঁসলে, দাদাজী, শাকুজী, বিয়াস ভোঁসলে, বেটুজী এবং মানুজী। এরা কেউ শাহী বাহিনীর চাকরিতে যোগ দেন নি। এদের অধিকাংশকে উচ্চ মনসব দিয়ে আওরঙ্গজেব তাদের মধ্যে উচ্চনীচ ভেদাভেদ বন্ধ করে দিলেন। ধারমত এবং সামুগড়ের যুদ্ধে মারাঠারা শাহজাদা আওরঙ্গজেবকে সক্রিয়ভাবে জিততে সাহায্য করে। এছাড়াও দিল্লি আগরা অবরোধেও তারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। তবে আওরঙ্গজেবের মারাঠা গোষ্ঠীগুলোর তুমুল পৃষ্ঠপোষকতার ফল হিসেবে ১৬৬০-এর পরে মুঘল সমর্থিত মারাঠা এবং শিবাজী নামে এক মারাঠার নেতৃত্বে মুঘল বিরোধী মারাঠা গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র লড়াই শুরু হয়। সেটা পরের সময়ে আলোচ্য।
দক্ষিণের মতই গুজরাট, বলখ, মুলতান, কান্দাহার — স্থানীয় শাহী প্রশাসনিক এবং মুনসি/কায়স্থ, সওদাগর এবং বানিয়া [পণ্য পরিবহক], আফগান, উজবেগ, হাজারা, রাজপুত, বুন্দেলা, বালুচ গোষ্ঠী, সিন্দি এবং কোলি জমিদারেরা আওরঙ্গজেবের মাধ্যমে মুঘল বিশ্বে ঢুকেছে বেরিয়েছে। কোনও কোনও সময় তিনি তাদের তার সঙ্গে জুড়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন, কখনও বা স্থানীয় রেশারেশি, আত্মীয়দের মধ্যে লড়াই অথবা মুঘলদের সঙ্গে জুড়তে না চাওয়া গোষ্ঠী অথবা মুঘল দরবারে অংশ নিতে অনুৎসাহী দলকে প্রভাবিত করতে পারেন নি। যাই হোক তার সুবায় এবং যুদ্ধ যাত্রার অভিজ্ঞতা তাঁকে শুধু চূড়ান্তভাবে সিংহাসনের লড়াইতেই প্রস্তুত করে নি, তাকে রাজনৈতিকভাবেও জোটবাঁধার কাজে পরিপক্ক করে তুলেছিল। ইতিহাস সাক্ষী অষ্টাদশ শতক পর্যন্ত যে সব শাহজাদা যত বেশি সাম্রাজ্যজোড়া স্থানীয় শক্তির সঙ্গে সমঝোতা করতে পেরেছে, সেই ব্যক্তিই অবশ্যম্ভাবী সম্রাটের পদ দখল করেছেন। (চলবে)