মুঘল হিন্দুস্তান তৃতীয় সিংহাসনের লড়াইয়ের মুখে দাঁড়িয়ে
সিংহাসনের লড়াইয়ের পূর্বমুহূর্তে দক্ষিণের সুবাদার এবং মীর জুমলা
৬ সেপ্টেম্বর ১৬৫৭ দিল্লির দরবার থেকে সম্রাট শাহজাহানের অসুস্থতার সংবাদ দাবানলের মত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল। দেশের জনসমষ্টি উথালপাথাল। ঠিক একই রকম ঘটনা ঘটেছিল আকবরের মৃত্যুর পরে। তবে সম্রাটের অসুস্থতা বিষয়ে আলোচনায় ঢোকার আগে তার ঠিক পূর্বের কয়েক মাসের দক্ষিণ সুবায় আওরঙ্গজেব আর দিল্লিতে মুঘল উজির মীর জুমলার কর্মকাণ্ড বুঝে নিতে চাইব। আওরঙ্গজেব আর মীর জুমলার নেতৃত্বে দক্ষিণে ঘটে যাওয়া ঘটনাবলীর রেশ আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে সম্রাটের অসুস্থতার সময়টিকে। এবং একই সঙ্গে মুঘল হিন্দুস্তান কীভাবে তৃতীয় শাহী সিংহাসনের লড়াইতে প্রবেশ করল তারও একটা ধারণা তৈরি হবে।
সম্রাট অসুস্থ হওয়ার কয়েক মাস আগে মুঘল দরবারে মীর জুমলা উজির পদে সাম্রাজ্যের সেবায় যোগ দিয়েছেন। মীর জুমলা শাহী উজির পদের ওজন ব্যবহার করে দরবারে আওরঙ্গজেব এবং সাম্রাজ্যের স্বার্থ দেখছেন। আওরঙ্গজেবের পাঠানো প্রস্তাবগুলোয় দারার বিরোধিতা নিশ্চিহ্ন করলেন বিচক্ষণ, দৌত্যদক্ষ উজির মীর জুমলা। দরবারেই আওরঙ্গজেবের দক্ষিণ সংক্রান্ত নীতিতে সম্রাটের সম্মতি আদায় করলেন। রত্ন-ভিক্ষু সম্রাট শাহজাহানকে নিজের গোলকুণ্ডা খনির দামি এবং প্রকাণ্ড সব রত্ন উপহার দিয়ে মীর জুমলা শাহী ক্ষমতাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন দক্ষিণের রাজ্যগুলোর বিরুদ্ধে মুঘল বাহিনীর সামরিক অভিযান বাচ্চার হাতের মোয়ার থেকে বেশি কিছু নয়। নবনিযুক্ত উজির সম্রাটকে আশ্বাস দিয়ে বললেন দক্ষিণের রাজ্য জিততে সুবাদারের সবল হস্তের প্রয়োজন হবে না, সাধারণ কাজটা তিনি স্বয়ং নিজের হাতে করে দেখাবেন। মীর জুমলার নিয়ন্ত্রণে থাকা হিরের খনি দখলের লোভে দক্ষিণের সুবাদারের বিরুদ্ধে দারা আর জাহানারার সক্রিয় বিরোধিতা নস্যাত করলেন সম্রাট। সম্রাটকে বিজাপুরের অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়ার দারার প্রস্তাব বাতিল করে সম্রাট ২৬ নভেম্বর আওরঙ্গজেবের নেতৃত্বে এবং পরিকল্পনায় মুঘল রণসাজে বিজাপুর অভিযানের অনুমতি দিলেন। দক্ষিণের যুদ্ধে মালওয়া অঞ্চলের সেনা না পাঠনোর দারার প্রস্তাব নাকচ করালেন মীর জুমলা। সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী দারার গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবে সম্রাট সায় দিলেন না।
মীর জুমলা আওরঙ্গজেবের পাঠানো দক্ষিণের যুদ্ধ সংক্রান্ত শর্তে সম্রাটকে রাজি করালেন (প্রায় প্রত্যেকেরই জানা, তবুও রিচার্ড ঈটন, ইন্ডিয়া ইন পারসিয়ানেট এজ থেকে জানালাম, হয়ত এই সময়ে শাহজাহানকে কোহিনুর ভেট দিয়েছিলেন গোলকুণ্ডার হিরের খনির মালিক, মুঘল উজির, খানইখানান, আওরঙ্গজবের সেনাপতি মীর জুমলা [ঈটনের সূত্র বার্নিয়ের স্তোরিয়াদ্যমোগর])। সম্রাট, খানজাহান শায়েস্তা খানকে নির্দেশ দিলেন অতি দ্রুত দৌলতাবাদে পৌঁছে আওরঙ্গজেবের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে। ৬০ জনের বেশি মনসবদার শায়েস্তা খানের নেতৃত্বে ২০ হাজার সেনা নিয়ে দক্ষিণের সুবাদারের হাত শক্ত করতে দক্ষিণে রওনা হল। যে সব সেনানায়ক বাড়িতে বা তাঁবুতে/শিবিরে দূরে সরকারি পদে ছিলেন তাঁদের অবিলম্বে আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে যোগ দিতে সম্রাটের নির্দেশ (ফরমান) পাঠানো হল। উজির, আমীর এবং মনসবদারেরা সরাসরি সম্রাটের যুদ্ধযাত্রার ফরমান পেলেন। দক্ষিণে বীজাপুরের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার আগে মীর জুমলা সম্রাটের থেকে উপহার পেলেন বিশেষ খেলাত, হিরে জহরতে মোড়া ছোরা (খঞ্জর মুরাসসা), সোনা আর রূপোর শৃঙ্খলে মোড়া দুটি ঘোড়া (একটি আরবি, একটি ইরাকি), রূপোর শৃংখলে মোড়া একটি হাতি, রূপোর হাওদাওয়ালা মাদি হাতি এবং আরও কিছু বাছাই উপহার দ্রব্য। প্রথম দিন থেকেই দক্ষিণী উজিরকে সম্রাট মাথায় করে রেখেছেন। দরবারে যোগ দেওয়ার সময় থেকে তিনি সম্রাটের থেকে উপহার পেয়েছেন মোট ৭ লক্ষ টাকা যার মধ্যে ৫ লক্ষ নগদ, বাকিটা ঘোড়া, হাতি এবং রূপোর পাত্র ইত্যাদি মিলিয়ে ২ লক্ষ টাকা। পিতা ফিরে না আসা পর্যন্ত উজির-পুত্র মহম্মদ আমিনকে দেওয়ানি দপ্তর দেখাশোনার ভার দেওয়া হল। মহম্মদ আমিনের পদ (৩০০০ জাট, ১০০০ সওয়ার) বাড়ানো হল ১০০০ জাট।
কূটনীতির প্রয়োগের দক্ষতায় দরবারের লড়াইতে দারার বিরুদ্ধে মীর জুমলা প্রাথমিক যুদ্ধ জিতেছিলেন ঠিকই কিন্তু দক্ষিণে যাত্রার শেষ মুহূর্তে তাঁর জন্যে একটা বিপন্ন বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। দক্ষিণের যুদ্ধক্ষেত্রে রওনা হওয়া উজিরের পরিবারকে দরবারে বন্ধক রাখতে সম্রাটকে রাজি করিয়ে ফেললেন দারা। দারার পাল্টা কূটনৈতিক চালে মীর জুমলার দরবারি সফলতার অনেকটা ম্লান হয়ে যায়। তাঁর বুদ্ধিমন্ত চালে উজির মীর জুমলাকে বাধ্য হয়ে পরিবারকে দরবারে বন্ধক রেখে দক্ষিণের উদ্দেশ্যে রওনা হতে হল। আরও একটা বড় সমস্যার সম্মুখীন হলেন উজির। মানুচি বলছেন দারা বিপুল অর্থ ছড়িয়ে শেষ মুহূর্তে (দক্ষিণে যাত্রার তিন দিন আগে) মীর জুমলার ৮০ জন ফিরিঙ্গি সাঁজোয়া সেনা কিনে নিয়েছিলেন। এই সব দরবারি দাঁওপ্যাঁচ সামলে দক্ষিণে রওনা হতে তাঁর বেশ কয়েক দিন দেরি হয়ে যায়। অন্যদিকে দক্ষিণে আওরঙ্গজেব মীর জুমলার আসতে দেরিতে হওয়ায় অস্থির হয়ে উঠছিলেন। সাধারণত ঠাণ্ডা মাথা আওরঙ্গজেব অধীর হয়ে মীর জুমলাকে লিখলেন ‘আমাদের আর আর দেরি করা চলে না, এরকম সুবিধেজনক অবস্থা হয়ত আর পাব না। খুব তাড়াতাড়ি এস, আমরা দুজনে মিলে যুদ্ধ জয় সম্পন্ন করি। আমি এখনও তোমার জন্য অপেক্ষা করছি’। সত্যিকারের তাই হয়েছিল। মীর জুমলার আসার দেরি দেখে মানসিক টানাপড়েনে অস্থির আওরঙ্গজেব জ্যোতিষীদের উজির আসার সম্ভাব্য দিন গুণতে বসিয়ে দিলেন।
আওরঙ্গজেব মনে করতেন [মীর জুমলাকে ছেড়ে] তাঁর একা বিজাপুর এবং গোলকুণ্ডা অভিযানে যাওয়া ঠিক হবে না। যতক্ষণ মীর জুমলা এসে না পড়েন, সেই সময়টুকু তিনি শিকার (বীজাপুর সীমান্তে রামদোয়ায়) করে দিন কাটালেন। ১৬৫৭র জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে জানতে পারলেন মীর জুমলা ১৮ তারিখের দিকে নিশ্চিতভাবে এসে পড়ছেন। ঠিক হল উজির এলেই বীজাপুর অভিযানের পরিকল্পনা তৈরি হবে। আওরঙ্গজেবের প্রস্তাব ছিল প্রথম মোলাকাতের দিনেই যৌথভাবে শিকার উৎসবে যাওয়া হবে এবং সেই সুযোগে রণনীতিও ঠিক হবে। যদি ঠিক হয় বীজাপুরের দিকে যাওয়া হবে তাহলে তো অন্য কিছু ভাবার নেই, না হলে গোলকুণ্ডার দিকে যাওয়া হবে।
১৮ জানুয়ারি মীর জুমলা আহমদনগরে পৌঁছে আওরঙ্গজেবকে নিয়ে প্রথমে বীজাপুর রওনা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। যুদ্ধ শেষ হল মুঘল জয়ে। ৩১ জুলাই দুর্গ রক্ষক দিলাওয়ার হাবসি আত্মসমর্পণ করলেন। ১ আগস্ট কেল্লাদার, মুঘলদের হাতে দুর্গের চাবি তুলে দিলেন। বিজাপুর জয়ের সংবাদে খুশি হয়ে সম্রাট, পুত্র আওরঙ্গজেব এবং অন্যান্য সেনানায়ককে দরাজ হাতে উপযুক্ত উপঢৌকন দিলেন। মীর জুমলাকে বিশেষ আংরাখা দিয়ে সম্মান জানিয়ে তাকে কর্ণাটক রাজ্যের ৪ কোটি দামের রাজস্বওয়ালা কয়েকটি মহলের অধীশ্বর (মহল-ই-ওয়ালিয়ত) নিযুক্ত করলেন।
আওরঙ্গজেবের সাফল্যে আর উন্নতিতে ঈর্ষায় জ্বলেপুড়ে মরা দারার সামনে আওরঙ্গজেবকে অপমান করার সুবর্ণ সুযোগ চলে এল। মুঘল আক্রমণে বিপর্যস্ত বীজাপুরীরা দারার মাধ্যমে সম্রাটের কাছে শান্তি আবেদন করলেন। কয়েক মাস আগেই মীর জুমলার উদ্যোগে যে সম্রাট বীজাপুর আক্রমণের নির্দেশ দিয়েছিলেন, সেই সম্রাটই মীর জুমলার অনুপস্থিতিতে দারার প্ররোচনায়, যুদ্ধ বন্ধ রেখে উজির মীর জুমলাকে বীজাপুরের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু করার নির্দেশ দিলেন। আওরঙ্গজেবের কাছে এই নির্দেশ বিনা মেঘে বজ্রাঘাতের সামিল। সেনাপতি যুদ্ধ জেতার দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন, তিল তিল পরিকল্পনায় গড়ে তোলা স্বপ্ন বিজাপুর দখল এখন সময়ের অপেক্ষা, অথচ যুদ্ধ বন্ধ করে বিপক্ষের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু করতে নির্দেশ দিলেন সম্রাট! আগস্টে বিজাপুরের বিজয় মাস থেকেই মুঘল দরবারে সম্রাটকে সামনে রেখে দারার উদ্যোগে নতুন করে আওরঙ্গজেবকে অপমানের সময় শুরু হতে পারত। কিন্তু সব কিছুই হেঁটমুণ্ডঊর্ধ্বপদ হয়ে গেল ৬ সেপ্টেম্বর সম্রাটের অসুস্থতায়।
শোনা যায় অসুস্থ সম্রাট দারাকে মুঘল সাম্রাজ্যের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনীত করলেন। দরবার থেকে ফরমান পাঠিয়ে মীর জুমলাকে কোঙ্কণের দুর্গগুলির দায়িত্ব দিয়ে আওরঙ্গজেবকে বিদরে ফিরে যেতে বলা হল। দারা, মীর জুমলাকে উজিরত পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত পাকা করলেন। শাহী ফর্মান জারি করে মীর জুমলাকে উজিরত থেকে সরিয়ে দেওয়া হল। মীর জুমলার অবর্তমানে উজিরতে নিযুক্ত পুত্রের ওপর উজির দপ্তরে যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা জারি হল। মহবত খান বা রাও ছত্রসালের মত সেনানায়ককে অবিলম্বে দক্ষিণ থেকে দরবারে ফিরে আসার ফরমান পাঠানো হলেও মীর জুমলাকে পারেনদা কেল্লা দখল শেষ করে দরবারে যোগাযোগ করার নির্দেশ জারি হল।
শাহজাহানের অসুস্থতা
১৬৫৬-র ডিসেম্বরে দিল্লির দরজায় মন্বন্তর হঠাৎ হাজির। শাহজাহান বেশ কিছু রোগে বেশ কিছুকাল ধরে ভুগছেন। শহরের জনস্বাস্থ্য এতই ভেঙ্গে পড়ল যে দৃশ্যত অসুস্থ শাহজাহানের শরীর ভাল রাখতে, হেকিম-কবিরাজেরা বায়ু পরিবর্তনের জন্যে গঙ্গার তীরে গড় মুক্তেশ্বরে শিকারে যেতে নিদান দিলেন। মুঘলদের অন্যতম বিনোদন ছিল শিকার করা — এবং সেই বিনোদন শুধুই সম্রাটদের জন্যে সংরক্ষিত ছিল। মুক্তেশ্বরে এক মাস শিকার বিনোদনে কাটিয়ে তিনি দিল্লিতে ফিরে এলেন। দিল্লিতে তখনও মহামারীর প্রকোপ কমে নি। ১৬৫৭-র ফেব্রুয়ারিতে আবার হেকিম-কবিরাজদের নিদানে বাধ্য হয়ে সম্রাট দিল্লি ছাড়লেন। এবারে গেলেন ১০০ মাইল উত্তরে যমুনার তীরে মুখলিসপুরে। শরীরে যাতে ধকল না লাগে তার জন্যে নৌকো বিহারে সম্রাটকে নিয়ে যাওয়া হল দিল্লির কাছে শিরমুর পাহাড় সংলগ্ন মুখলিসপুরের ঠাণ্ডা পরিবেশে। সেখানে দিল্লির ভ্যাপসা গরম নেই। মুঘল সম্রাটেরা বহুকাল থেকেই মুখলিসপুরকে গ্রীষ্মকালের অস্থায়ী আবাসস্থল হিসেবে ব্যবহার করতেন। সেই পরম্পরা অনুসরণ করে শাহজাহান আর দারা উভয়েই মুখলিসপুরে বেশ কয়েক দিন থাকলেন। দৃশ্যত সুস্থ শাহজাহান এলাকার নাম দিলেন ফৈজাবাদ।
১৬৫৭-র ৭ মার্চ সম্রাট শাহজাহান ৩১ বছরের রাজত্বকাল সম্পূর্ণ করেছেন। তাঁর রাজত্বকালের প্রত্যেক দশকের পঞ্জিকা লেখা হয়েছে। নাম দেওয়া হয়েছে দাওয়ার (dawwar)। তিন দশক জুড়ে যে ইতিহাস তৈরি হল, তার নাম দেওয়া হল যুগ, কারন (qarn)। শাহজাহানের কাছে তিন দশকের যুগের মাহাত্ম্য অসীম। তাঁর রাজত্ব আবার নতুন যুগে পড়ল। আবার নতুন করে পঞ্জিকা লেখা শুরু হবে। নতুন অর্থ বরাদ্দ হবে তার জন্যে। নতুন সময়, নতুন ঐশ্বর্য। মুঘল হিন্দুস্তান, বিদেশীদের চোখ ইন্ডের সম্পদ চোখ জ্বালানো। বুখারা, পারস্য, তুর্কি, আরবের দূতেরা, ব্রিটিশ ফ্রান্স এবং ইতালির মুসাফিরদের চোখে ময়ূর সিংহাসন বা কোহিনুর অত্যাশ্চর্য আজুবা। দুটি বিদেশি অভিযানের ব্যর্থতা মুছে দিতে সম্রাট সাম্রাজ্যের ঔজ্জ্বল্য প্রচারের কার্পণ্য করেন নি। দরবারি কবি লিখলেন ‘সম্রাট উন্মুক্ত হৃদয়ে প্রজাদের জীবনের মালিন্য ধারণ করেছেন, তিনি জেগে আছেন বলেই দুঃসময় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন’। তাঁর নেতৃত্বে যোগ্য আমলা আর সেনাপতিরা সাম্রাজ্যের বিস্তৃতি, সমৃদ্ধির জন্যে দিন রাত খেটেছেন, প্রজাদের আরও একটাটু ভাল রাখবার জন্যে মাথা খাটিয়ে চিন্তা ভাবনা করেন।
কিন্তু এত ঔজ্জ্বল্য প্রচার ঐশ্বর্যের মধ্যেও শাহজাহান দেখছিলেন, তাঁর রাজত্বে কোথাও যেন তাল কেটে যাচ্ছিল — ছড়িয়ে পড়ছিল বিষাদ সিন্ধুর স্বর। সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি, বিস্তারের জন্যে দায়ি একের পর এক মন্ত্রী সান্ত্রীর মৃত্যু হচ্ছে। চোখের সামনে মরণ তাঁর সহযোগীদের কেড়ে নিচ্ছে নির্মমভাবে। শাহজাহানের তিন উচ্চপদস্থ আমলা, ঘনিষ্ঠ বন্ধু বিগত পাঁচ বছরে প্রয়াত হয়েছেন — ১৬৫২-র ৪ জানুয়ারিতে মারা গিয়েছেন সৈয়দ খান বাহাদুর জাফর জঙ্গ, তাঁর সময়ের আবুলফজল শাদুল্লা খান মারা গেছেন ৭ এপ্রিল ১৬৫৬-য় এবং ঘনিষ্ঠতম বন্ধু আলিমর্দান খান মারা গেছেন ১৬ এপ্রিল ১৬৫৭-য়।
২৪ জানুয়ারি ১৬৫৭-য় তাঁর ৬৭ বছর পূর্ণ হয়েছে। মুঘল সম্রাটদের মধ্যে একমাত্র আকবরই ৬৭ বছর বেঁচেছেন। তিনি বাঁচবেন ঠকুর্দার থেকেও বেশি সময়। বাবা জাহাঙ্গিরের আমলের শেষের ৬/৭ বছর, সম্রাটের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডাতুলে দেশজুড়ে পালিয়ে বেড়াতে তিনি শরীরকে নির্মমভাবে বিপদে ফেলেছেন। যৌবনের সেই উদ্দাম শারীরি অভিচারের প্রভাব সম্রাটের বৃদ্ধ শরীরে দৃশ্যমানভাবে ফুটে উঠছে। বয়স এবং অসুস্থতা শরীরে তীব্র কামড় বসিয়েছে। তাঁর অবর্তমানে কোন সন্তান মুঘল সাম্রাজ্যের সমৃদ্ধি বয়ে নিয়ে যাবে, সেই ভাবনা তাঁকে কুরে কুরে খায়। তিনি চোখ বুজলে কী হবে সেটাও তিনি আন্দাজ করতে পারছেন না। দারাকে যদিও তিনি মনে মনে তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেছেন, কিন্তু তিনি দারার দৌড় জানেন। রুকাতইআলমগিরিতে আমরা পাচ্ছি যে তিনি সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। সেটাও তাঁর অসুস্থতার অন্যতম কারণ হলেও হতে পারে। (চলবে)