১৫৬৭। মির্জা হাকিমের পাঞ্জাব দখলের উদ্যোগ ব্যর্থ করতে সম্রাট আকবর অন্য ধারার অর্থনৈতিক কৌশল নিলেন। মুঘল হিন্দুস্তানের তৃতীয় রাজধানী, লাহোর টাঁকশাল থেকে রূপোর টাকা জারি করা ছাড়াও বিপুল পরিমান তামার দাম বা দামড়ি, যেটা মূলত খুচরো আর্থ ব্যবস্থার ভিত, জনগনের ট্যাঁকে থাকা মুদ্রা তৈরি করে আশেপাশের এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হল। উদ্দেশ্য পরিষ্কার, মুঘল হিন্দুস্তানের পাঞ্জাব সুবার সীমান্ত লাগোয়া অঞ্চলকে আরও বেশি করে সাম্রাজ্যের বৃহত্তর অর্থনীতির সঙ্গে জুড়ে নেওয়া। এই উদ্যমের ফলে বিপুল অর্থ পাঞ্জাব প্রদেশে বিনিয়োজিত হল। পাঞ্জাব প্রদেশের অভিজাতদের পক্ষে মুঘল হিন্দুস্তান ছেড়ে কাবুলে জুড়ে যাওয়ার উদ্যমে তীব্র দ্বিধা তৈরি হল।
১৫৬৮-য় পাঞ্জাবের ওপর মুঘল হিন্দুস্তানের নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে কায়েম হল। ১৫৬০-এর সম্পাদিত ফরমান ১৫৬৮-তে নতুন ভাবে, নতুন বয়ানে জারি করে আকস্মিকভাবে পাঞ্জাব প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হল সম্রাট ঘনিষ্ঠ আতগা গোষ্ঠীকে। আতগারা ১৫৬৬-র মির্জা হাকিমের হিন্দুস্তান অভিযানের সময় আকবরের অনুগত গোষ্ঠী ছিল। প্রশ্ন উঠল সম্রাট কী তাদের ওপর পাঞ্জাব প্রশাসনের গুরু দায়িত্ব অর্পণ করে আনুগত্যের পুরষ্কার দিয়ে একটু বেশিই আস্থা প্রকাশ করলেন? না কী আতগাদের ওপর আকবর এতটাই ভরসা করতেন যে পাঞ্জাবের মত গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত প্রদেশের শাসন আতগা গোষ্ঠীর হাতে সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দিতে বিন্দুমাত্রও দ্বিধা করেন নি।
মাথায় রাখত্রে হবে আতগারা হিন্দুস্তানের সম্রাটের অতি ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠী ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে কাবুলে তাদের পারিবারিক এবং রাজনৈতিক সম্পর্কের যোগ এতই গভীর ছিল যে, তাদের সাম্রাজ্য আনুগত্য বিষয়ে হয়ত আকবর পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছিলেন না। রাজধানীর ওপর আতগাদের নিয়ন্ত্রণ ঢিলে করার জন্যে তিনি গুরুত্বপূর্ণ নতুন এক প্রশাসনিক রণনীতি গ্রহণ করলেন — আতগা গোষ্ঠীকে আগরার প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে কার্যত নির্বাসন দিলেন। ১৫৬০-এ উজবেগ এবং মির্জা বিদ্রোহ দমনের পরে, দরবারে প্রভূত ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠা এক গোষ্ঠীর বিষদাঁত ভাঙা বিষয়ে এটা তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত; অন্যভাবে দেখলে, এই সিদ্ধান্ত বিশ্লেষণে আতগাদের সাম্রাজ্য কেন্দ্র থেকে ‘নির্বাসন’ বই অন্য কিছু ভাবা সম্ভব নয়। কাবুলের বাড়তে থাকা রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রতিষেধক হিসেবে আকবরের এই সিদ্ধান্ত সুদূর প্রসারী ছিল (মুনিস ফারুখি বলছেন, আকবর সফলভাবে, কোনও বাধা-বিপত্তি ছাড়াই আতগা ‘নির্বাসন’এর সিদ্ধান্ত নিতে পেরে গর্বিতও হয়েছেন)। অর্ধশতাব্দ রাজত্বকালে তিনি ক্ষমতাশালী আতগা গোষ্ঠীকে প্রশাসনের প্রান্তে পাঠিয়ে, মুঘল রাজনীতিতে তাদের প্রান্তিক করে দিয়ে নিজের হাতে সমস্ত ক্ষমতা জড়ো করলেন। মধ্য এশিয়ার গোষ্ঠীগুলি জোট বেঁধে কেন্দ্রিয় ক্ষমতার ওপর পারিবারিক, রাজনৈতিক এবং গোষ্ঠীগত যে আধিপত্য বিস্তার করছিল, সেই প্রবণতাকে তিনি সমূলে খতম করলেন। আগে উজবেগ এবং মির্জা এখন আতগাদের মত বিপুল প্রভাবশালী গোষ্ঠী নিষ্ক্রিয় হল। সেই সময় থেকে ১৭১০এ মুঘল সাম্রাজ্য খণ্ড-বিখণ্ড হওয়ার আগে পর্যন্ত আমীর অভিজাতগোষ্ঠীগুলো মুঘল সম্রাটের কর্তৃত্বের বিরুদ্ধাচারণ করার সুযোগ আর সাহস, কোনওটাই অর্জন করে উঠতে পারে নি।
পাঞ্জাব প্রদেশে শাহী সাম্রাজ্যের সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ কায়েম করার উদ্যম চলবে ১৫৭০এর দশক জুড়ে এবং ১৫৮০র দশকের শুরু পর্যন্ত। কাবুলের ওপর মুঘল সাম্রাজ্যের চাপ তৈরি করে নিরন্তর তটস্থ রাখার নীতিতে পরোক্ষ চাপ তৈরি হল পাঞ্জাবের পাশাপাশি অঞ্চলগুলোয় যেমন সিন্ধু (শুরু ১৫৬৭-৬৮), বালুচিস্তান এবং কাশ্মীরে (১৫৭০ দশকজুড়ে)। মির্জা হাকিমের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পাওয়া এবং রাজধানী লাহোরে উঠে আসার ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের প্রণোদনায় আরও বড়, আরও ঘণ রাজনৈতিক, সামরিক এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিকল্পিত হতে থাকে [১৫৭৭-৭৮এ রাজধানী লাহোরে চলে আসার পরের প্রথম কাজ হিসাবে বিভিন্ন ধর্মীয় সংগঠনকে শুল্কমুক্ত মদদইমাশ জমি দানের পরম্পরা শুরু হল, কাশ্মীর আর বালুচিস্তানের শাসককে উচ্ছেদ করা হল; আফগান শাসককেও ছেড়ে কথা বলা হল না। ১৫৮১-৮২-তে এই অঞ্চলে ঢাকঢোল পিটিয়ে বিপুল সামরিক শক্তি জড়ো করে আরও একটি কামারগা শিকার উতসব আয়োজন করা হল; কাবুলের সঙ্গে সীমান্তওয়ালা অঞ্চল আটকে নতুন দুর্গ পরিকল্পিত হল; প্রশাসনকে ঢেলেসাজা হল, সেতু এবং রাস্তাঘাটের বিকাশ উদ্যম নেওয়া হল]। আমরা বলতে পারি, মির্জা হাকিম মুঘল হিন্দুস্তানের ওপর কার্যকর সামরিক হুমকি হয়ে উঠেছিলেন বলেই আকবর উত্তরপশ্চিম সীমান্তে নিজের শক্তিবৃদ্ধি ঘটাতে বাধ্য হলেন।
মির্জা হাকিমের চ্যালেঞ্জ, আকবরকে অন্যান্য বিষয়েও তটস্থ হতে বাধ্য করল। মির্জা, নিজেকে বাবরের উত্তরাধিকারী ঘোষণা করার পরিপ্রেক্ষিতে, সাম্রাজ্যের বৈধতার ভিত্তি হিসেবে আকবর অবলম্বন করলেন হুমায়ুনের সম্রাট ইমেজকে। তিনি হুমায়ুনের সফল উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজেকে চিহ্নিত করলেন। মুঘল হিন্দুস্তান থেকে পিতার স্মৃতি যাতে জনমানস থেকে মুছে না যায়, সে ব্যবস্থাও তিনি করলেন। ১৫৬২ থেকে ১৫৭১-এর মধ্যে দিল্লিতে তিনি হুমায়ুনের বিশাল আকারের স্মৃতিসৌধ তৈরি করালেন শুধু নিজের ভাইকে দেখাতেই নয়, মির্জা হাকিম হয়ে ওঠার পিছনে যে মানুষটার অবদান সব থেকে বেশি সেই মাহ চুচক বেগমকে দেখাবার জন্যেও। হুমায়ুনের মাজার তৈরি করে আকবর, তাঁর স্বপ্নের নতুন হিন্দুস্তান গড়নকর্ম সময়ের সূচনা করলেন। এই মুসোলিয়ামটি হয়ে উঠল আকবরের সাম্রাজ্যের নতুন ভৌগোলিকতার কেন্দ্রবিন্দু। ১৫৬০ থেকে ১৫৮০ পর্যন্ত আকবর ঢাক ঢোল পিটিয়ে বেশ কয়েকবার বাবার সমাধিস্থলে যাবেন। এবং ১৫৬৬, ১৫৭৭, ১৫৭৮ এবং ১৫৮২-র প্রত্যেকটা মাজার ভ্রমণ কিন্তু আয়োজিত হয়েছিল মির্জার সঙ্গে তৈরি হওয়া বিপুল টেনশনের প্রেক্ষিতে।
মাজারটির স্থাপত্যরীতিতেও সম্রাট আকবর হিন্দুস্তানের নতুন মুঘল সাম্রাজ্যে সবাইকে নিয়ে চলার পরিবেশ তৈরি করার বার্তা দিলেন। মির্জা যেভাবে কাবুলে বসে মধ্য এশিয় চরিত্র আবলম্বনে তার সাম্রাজ্যকে ঢেলে সাজাতে চাইছিলেন, সেই ধারণার বিপরীতে আকবর খুব স্পষ্টভাবে মধ্য এশিয়ার সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার রেণুগুলোকে সাম্রাজ্যের সঙ্গে মেলানো-মেশানো অংশিদারিত্বের যৌতার বার্তা পেশ করলেন। যদিও তার সময়ের মানুষেরা এই উদ্যমকে খুব একটা নতুন বা দূরদৃষ্টির পদক্ষেপ বলে স্বীকৃতি দেন নি। তারা মনে করতেন হুমায়ুনই প্রথম সম্রাট যিনি মুঘল হিন্দুস্তানে মধ্য এশিয় অভিজাততন্ত্রে ফাটল ধরিয়ে, তার দরবার আর প্রশাসনে রাজপুতদের অংশ নেওয়ার পথ খুলে দিয়েছিলেন। হুমায়ুনই প্রথম বলেছিলেন শুধুই যদি মধ্য এশিয় স্টাইলে মুঘল রাজত্ব চালানো হয়, তাহলে হিন্দুস্তানে মুঘল সাম্রাজ্য টিকে থাকার সম্ভাবনা খুব কম। হুমায়ুনই প্রথম মধ্য এশিয় নক্সবন্দী অনুগামিতা থেকে বেরিয়ে এসে দক্ষিণ এশিয় শাত্তারি তারিকার অনুগামী হলেন। মুনিস ফারুখি সমালোচকদের উত্তরে বলছেন এ সব যুক্তির কোনওতাই ভুল নয়, সমালোচকেরা প্রত্যেকেই তাদের জায়গাতে ঠিক। তবুও মুনিস মনে করেন, আকবর নিজেকে হয়ত উপস্থাপিত করতে চেয়েছিলেন যতটা না নতুন ধারণা প্রবর্তনের মানুষ হিসেবে, তার থেকে অনেক বেশি পূর্বজর ধারণাগুলি ঠিকঠাক প্রয়োগ করার অধীশ্বর হিসেবে — যে প্রচেষ্টার উদ্দেশ্য ছিল কাবুলের সঙ্গে দ্বন্দ্বের প্রেক্ষিতে জরুরি রাজনৈতিক বৈধতা অর্জন করা এবং একই সঙ্গে পারিবারিক দ্বন্দ্বে অবতীর্ণ মির্জা হাকিমের মত আত্মীয়ের সফল বিরুদ্ধাচরণ করা।
এই আত্মসচেতন প্রতীকবাদ অবলম্বন করে আকবর, তাকে লক্ষ্য করে মির্জা হাকিমের আক্রমনগুলোকে [মুঘল ঐতিহ্য থেকে বার হয়ে এসে মুঘল সাম্রাজ্যকে দক্ষিণ এশিয় করণের উদ্যোগের সমালোচনা] তাঁদের যৌথপিতার স্মৃতি এবং দূরদৃষ্টির প্রতি আক্রমন হিসেবে তুলেধরলেন। তিনি মির্জার ‘পুত্রোচিত অনানুগত্য’র ঘটনাগুলোকে ব্যবহার করবেন তাকে হিন্দুস্তানের সিংহাসনে দখল করতে না দেওয়ার যুক্তি হিসেবে। এই সময়েই আকবর আরও একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবেন। ১৫৬৯এ আকবর নাটকীয়ভাবে সিংহাসনের দাবিদারিত্বের ধারণাটিতে পরিবর্তন আনলেন। বেশ কিছুকাল পুত্র সন্তান না হওয়ার উদ্বেগ (এই উদ্বেগ বাড়ছিল আকবরের রাজত্বের স্পেসে মির্জা হাকিমের সরব উপস্থিতির জন্যেও বটে) নিরসন ঘটল আকবরের স্ত্রী মারিয়মুজ্জামানির পুত্রসন্তান সেলিম ভূমিষ্ঠ হওয়ায়। আকবর সেলিমকে উত্তরাধিকারী ঘোষণা করলেন।
আকবরের সিদ্ধান্ত দীর্ঘকালের তৈমুরী-মুঘল সিংহাসন দখলের প্রথা থেকে বেরিয়ে আসার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে হবে। পুরোনো প্রথাটি ছিল বৃহত্তর মুঘল পরিবারের প্রত্যেক সন্তান সিংহাসনের বৈধ উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচিত হবে। স্বাভাবিকভাবে মির্জা হাকিম আকবরের এই প্রথা পরিবর্তনকে স্বীকৃতি দেন নি। কিন্তু আকবর ১৫৮২-তে কাবুল আক্রমণের নেতৃত্বে দ্বিতীয় পুত্র মুরাদকে বরণ করে নেওয়ায় সিংহাসন আরোহনের বিতর্কে দাঁড়ি পড়ল — আকবরের তৈরি নতুন প্রথা স্বীকৃত হল। ভাইপোর হাতে মির্জার হারে সিংহাসনের ওপর আকবরের পারিবারিক দাবিকে মেনে নিতে বাধ্য হলেন মির্জা। এখানেই মুঘল হিন্দুস্তানের সিংহাসন দখলের মির্জা হাকিমের স্বপ্নের ইতি ঘটল। রাজত্বের শুরু থেকে সিংহাসনের দাবিদারি নিয়ে যে তত্ত্বটি আকবর খাড়া করতে চেয়েও পারছিলেন না, সেটা বাস্তবায়িত হল ১৫৮০র দশকের পরের সময়ে। মোটামুটি ঠিক হয়েই গেল, সিংহাসনের দাবিদার হবেন একমাত্র সম্রাটের বৈধ পুত্ররাই। আকবরের এই সিদ্ধান্তের দূরসময়ের প্রভাব পড়বে মুঘল সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণে — এর আগে মাঝেমধ্যেই মুঘল-তৈমুরী বংশের উত্তরাধিকারীরা বিদ্রোহী হয়ে রাজত্বে বিভেদ এনে নতুন রাজত্ব তৈরি করতেন, সে প্রচেষ্টা বন্ধ হল। (চলবে)