১৫৮৫
[এর আগে আমরা মির্জা হাকিমের সঙ্গে আকবরের রাজনৈতিক, সামাজিক ইত্যাদি দ্বন্দ্ব বিস্তৃতভাবে বলেছি, সেখানে দেখেছি কীভাবে আকবরের ধর্মনীতি ধর্মনেতা/তাত্ত্বিকেরা খোলাখুলি বিরোধিতা করছিলেন। ১৫৮৫-তে তিনি যখন কাবুল অভিযান করছেন, সে সময় একটা ছোট্ট ঘটনায় এই বিষয়টা প্রতিভাত হবে। এটা আমি নিয়েছি ঘটনায় উপস্থিত ফৈজি শিরিহিন্দির ব্রিটিশ লাইব্রেরির শিরিন মুসভির আকবরনামা অনুবাদ থেকে]
কাবুল অভিযানের উদ্দেশ্যে দিল্লিতে উপস্থিত হলে মহামহিম বিভিন্ন মাজারে মাথা ঠেকাতে গেলেন। বিশেষ করে তাঁর বাবার সমাধিতে তিনি বহুক্ষণ সময় কাটান। ঈদের পর থেকেই তিনি মাজারে মাজারে যাওয়া শুরু করলেন। শিরহিন্দে পৌঁছে তিনি আবুলফজলকে বললেন, ‘এই শিরহিন্দ যুদ্ধক্ষেত্রেই মহামহিম [হুমায়ুন] যুদ্ধ জয় করেছিলেন, তাই কেউ একটা এগিয়ে গিয়ে দান পাওয়াদের [হুজুর, মাঝাদিম] কাউকে আমাদের উপস্থিতির আনন্দ সংবাদ দিন, যাতে তারা এগিয়ে এসে আমাদের পৌঁছনোর জায়গায় অপেক্ষা করতে পারে। অনুগত বিদ্রোহীরা শয়তানি করতে এই সব বেচারাদের হৃদয়ে ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছে, ফলে তাদের আসতে দেরি হচ্ছে।’ অথচ শিরিহিন্দের কাছাকাছি বেহেস্তের বাগানের লজ্জা পাওযারমত বাগান, হাফিজা রাখনায় মহামহিম উপস্থিত হলেও সেখানে কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে রগিয়ে এল না। তাদের উপস্থিত না হওয়ার বিষয়টি মহামহিমকে জানানো হলে তিনি বললেন, ‘এই ভাগ্যহতদের আমরা সম্মান জানাতে চেয়েছিলাম; কিন্তু ভাগ্য তাদের সাথী হল না’। তীব্র বিরক্তিতে তিনি নির্দেশ দিলেন, যতক্ষণ না তারা নতুন সনদ হাতে পাচ্ছে উক্ত হাফিজ সুলতান [হাফিজ রাখনা] ক্রোড়িদের [রাজস্ব আদায়কারী] জন্যে সব ভূমিদান স্থগিত করা হল’। দিন কয়েক পরেই পাঁচ-ছয় জন মহামহিমের সামনে উপস্থিত হলে নির্দিষ্টভাবে তাদের সামনে ভূমিদানের জন্যে আলাদা আলাদা শর্ত রাখা হল। প্রত্যেকের ভূমিদানের কাজে সাহায্য করলেন শেখ আবুলফজল। পরের দিন আবুলফজলের বড়ভাই মালিকুশ শুরা [কবিন্দ্র] শেখ আবুলফয়েজ ফৈজী আমার বাড়ি এসে বললেন, ‘দান যারা পাবে তাদের হৃদয় ভেঙ্গো না। নিজের মনে করে প্রত্যেকের স্বার্থ দেখো। সর্বশক্তিমানের ইচ্ছে, তাদের প্রতি দয়া বর্ষিত হোক। কথায় বলে ‘ভারবহনকারীরা ভার বইতে পারলে, কাজটা সোজা হয়ে যায়’। আমিও সিন্ধুর তীরে শাহী শিবিরে গেলাম। সেখানে আমার মহামহিমের সঙ্গে কাজি বাইজাউইএর তফসিরে আমার টিকা বিষয়ে আলোচনা ছিল।
১৫৯১ পুত্রের প্রশ্নের উত্তরে
[১৫৯১তে সম্রাট আকবরের দ্বিতীয় পুত্র মুরাদ মালওয়া/মালব অঞ্চলের সুবাদার নিযুক্ত হয়। বিভিন্ন বিষয়ে সে প্রশ্ন লিখে মহামহিমের পরামর্শ চেয়ে চিঠি পাঠায়। ব্রিটিশ লাইব্রেরির আকবরনামা সংস্করণে উত্তরগুলি উল্লিখিত হয়েছে। বহু প্রশ্ন-উত্তর প্রশাসনিক ঝামেলা, কচকচি নিয়ে আলাপচারিতা। এই প্রশ্ন-উত্তরগুলোর মধ্যে শিরিন মুসভি বলছেন চারটে প্রশ্ন-উত্তরে আকবরের মন-মানসিকতার প্রতিফলন দেখতে পাই। শিরিন মুসভি, ইকতিদার আলম খানের অনুবাদ থেকে এই অনুবাদটি নিয়েছেন।]
১
মুরাদ — মহামহিম, আপনার মহিমান্বিত মানসিকতার কাছে আমার নিবেদন, বৌদ্ধিক বিকাশের জন্যে এবং কোনও কিছু বিনা প্রমানে মেনে নেওয়াকে (তাকলিদ) নিরুতসাহিত করতে, দয়াকরে আমায় দুচারটে বই পড়ার উপদেশ(হিদায়েত) দিন
আকবর — পরম্পরাকে মেনে নেওয়ার এই দেশে এই ধরণের বই খুঁজে পাওয়া খুব দুষ্কর। তবে তোমার জ্ঞানতৃষ্ণার জন্যে বলছি অসামান্য অত্যাশ্চর্য কাহিনী মহাভারতের অনুবাদের কাজ চলছে, খুব তাড়াতাড়ি তোমার চাহিদা পূরণ হবে।
২
মুরাদ — মাহাতার ইয়ারি আর বাহাদুরকে কয়েকটা বিশেষ কাজ করার উদ্দেশ্যে যদি পাঠানো যায়
আকবর — আমি মাহাতার ইয়ারিকে পাঠিয়েছি; কিন্তু বাহাদুরের অনুরোধ সম্পর্কে বলি, তোমার প্রশাসনে যাওয়ার প্রস্তাব দিতেই তার স্ত্রী বেঁকে বসেছে। আমরা যদি তাকে মানিয়ে নিতে পারি, তাহলে [বাহাদুর] যাচ্ছে। না হলে আমি তাকে নির্দেশ দেব ঘোড়া্র ডাকচৌকি মার্ফত আমার একটা ফরমান তোমার কাছে নিয়ে যেতে। সে পৌঁছলে তাকে আটকে রেখো।
৩
মুরাদ — আমি দেখছি, আমার শিবিরের জনৈক ধর্মতাত্ত্বিক তুলনাহীন সর্বশক্তিমানের উপাসনার জন্যে নির্দিষ্ট অঙ্গভঙ্গী করছে, একে তারা নামাজও বলছে এবং সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অভুক্ত থাকাকে তারা রোজা বলছে। এদের এইসব কাজ করা থেকে নিবৃত্ত করব? আপনি আমাকে কী নির্দেশ দেন?
আকবর — আমার রাজত্বে বহু গোষ্ঠীর অবস্থানই আদতে সর্বশক্তিমানের প্রকাশভঙ্গী। তারা অধিকংশই নিজেদের মত নিয়ম নীতি যুক্তি বুদ্ধি তৈরি করে সর্বশক্তিমানের উপাসনা করে। শাসক এবং ক্ষমতায় থাকা ব্যবস্থাপকদের শুলইকুল সবার জন্যে শান্তি নীতি অনুসরণ করা প্রয়োজন। যারাই যুক্তির পথে আসতে পারে তারা ভাগ্যবান। আর যারা কোনও কিছু বিনা প্রমানে মেনে নেওয়ার পদ্ধতিকে মান্য করে তারা দুর্ভাগা। যে কোনও পদ্ধতিতে যে কেউ সর্বশক্তমানকে স্বীকার এবং উপাসনা করতে পারে এবং সেটাকে স্বাগত জানানো উচিৎ। একমাত্র স্থূলবুদ্ধির বোকারা মনে করে শুধুমাত্র অঙ্গভঙ্গীই উপাসনার পদ্ধতি, আদতে তারা সর্বশক্তিমানকে ভুলে থাকতে চায়।
৪
মুরাদ — দরবেশ, যোগী এবং সন্ন্যাসী বা অন্যান্য ফকিরদের সঙ্গে আলাপচারিতা বিষয়ে যদি কোনও নির্দেশনা দেন
আকবর — এদের সঙ্গে যে তুমি আলাপচারিতার প্রণোদনা পেয়েছ, তার থেকে প্রমান হয়, তুমি সর্বশক্তিমানের বিষয়ে জানতে আগ্রহী। তাদের সঙ্গে আলাপচারিতা চালিয়ে যাও। কিন্তু এদের সঙ্গে আলাপচারিতা অনেক সময় তোমায় বাস্তব জগত বিমুখ করে দিতে পারে। সে বিষয়ে সাবধান থেকো। কখনো যদি দেখ তাদের চেহারা ইত্যাদি তোমার মনে আতঙ্ক তৈরি করছে, তাদের এড়িয়ে চলবে। তাদের চরিত্র যদি প্রাধান্যপূর্ণ কল্যাণময় হয়, অবশ্যই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে।
১৫৯৪-৯৭ জাহাজ নির্মান
[আমার মাত্র কয়েক বছরের ইতিহাসচর্চায় মনে হয়েছে, মুঘলদের নৌবিদ্যার দখল ছিল না, এবং আকবর এবং অন্যান্য সম্রাট নাকী সমুদ্রই দেখেন নি, জনমানসে এরকম একটা ধারণা আছে। যদিও আকবর সম্রাট ১৫৭২এ একমাত্র গুজরাট বিজয়ের সময়তেই সমুদ্র উপকূলে উপস্থিত হয়েছেন তবুও সমুদ্রে যাওয়া জলযান বিষয়ে তাঁর উৎসাহের শেষ ছিল না। কারন সে সময় দক্ষিণ এশিয়া ছিল বিশ্ব বাণিজ্যের তিন কেন্দ্রের মধ্যে অন্যতম গন্তব্যস্থল। তাঁর পক্ষে সমুদ্র বাণিজ্য বা নৌবহর ইত্যাদি নিয়ে চোখ বন্ধ করে রাখা সম্বব ছিল না। ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে পাওয়া, তাহির মহম্মদ সাবজওয়ারির রাউজাতাত তাহিরিন-এ [এশিয়ার ইতিহাস] পাচ্ছি ১৫৯৪-তে তিনি হিমালয়ের কাঠ [টিম্বার] প্রাচুর্যের সুবিধে কাজে লাগিয়ে লাহোর বন্দরে জাহাজ তৈরি করান। ১৫৯৬-তে দ্বিতীয় জাহাজটা তৈরি করান। এই জাহাজের নির্মাণ পদ্ধতি অনেক বেশি আকর্ষণীয় কারন নদীর কম জলের দরুন একটি নৌপাটাতন, বার্জের ওপর নতুন জাহাজকে বয়ে সমুদ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এই প্রযুক্তিটা সম্রাট আকবরের উদ্ভাবন। এই প্রযুক্তির প্রথম ইওরোপিয় বর্ণনা পাচ্ছি সপ্তদশ শতকের শেষে ডাচ নৌনির্মাণে। এই দুটি জাহাজ তৈরির বর্ণনা পাচ্ছি আকবরনামার তৃতীয় খণ্ডে; অনুবাদ শিরিন মুসভি]
১/১৫৯৪
২১ জুন ১৫৯৪তে [লাহোরে] ইরাবতী বা রবি নদীর পাড়ে একটা সমুদ্রগামী জাহাজ তৈরির কাজ শেষ হয়। জাহাজের তলদেশের কাঠটি [কীল], যার ওপর জাহাজটা দাঁড়িয়ে থাকে, তার দৈর্ঘ হল ৩৫ গজই-ই-লাহি বা ৯৩ ফুট। জাহাজ তৈরিতে ২০৩৯টা শাল কাঠের বড় তক্তা, পাইন কাঠ এবং ৪৬২ মন ২ সের ওজনের লোহা ব্যবহার হয়েছে। ২৪০ ছুতোর, লোহাকম এবং অন্যান্যরা এই কাজে জুড়েছিল। মহামহিম জাহাজটি দেখতে যান। বিভিন্ন যন্ত্রের সাহায্যে এক হাজার মানুষ এটিকে টেনে নিয়ে যায় এবং সমুদ্রে ভাসাতে অন্তত দশ দিন সময় লাগে। [সিন্ধুর সমুদ্র বন্দর] লাহোরি বন্দরে পাঠানো হয়। জলের অপর্যাপ্ত নাব্যতার জন্যে একে সমুদ্র পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে খুব সমস্যা হয়।
২/১৫৯৬
এই সময়ে একটি বিশাল মহান জাহাজ তৈরি মোটামুটি শেষ পর্যায়ে পৌঁছয়। এর আগে নদীর জলতলের সমস্যার দরুন জাহাজ টেনে নিয়ে যেতে সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। এবারে মহামহিম বললেন নদীতে একটি মাচা তৈরি করে পন্টুনের ওপর জাহাজটি তৈরি করতে যাতে ১৫০০ মন [৩৭০ মেট্রিক টন] জাহাজকে খুব সহজে তার [লাহোরি বন্দরের] গন্তব্যে টেনে নিয়ে যাওয়া যায়। কাজ শুরু হয় ২৬ জুন ১৫৯৬ এবং শেষ হয় ২১ ডিসেম্বর ১৫৯৬। এতাএর দৈর্ঘ ছিল ৪৭ গজ [৯৯ ফুট]। জাহাজটা তৈরি করতে ১৬,৩৩৮ টাকা ব্যয় হয়েছে। একে এত সহজে লাহোরি বন্দরে টেনে নিয়ে যাওয়ার পদ্ধতি দেখে মানুষ হতবাক হয়ে যায়।
৩/১৫৯৭
এবারে কাশ্মীরে সমুদ্রগামী জাহাজ তৈরির নির্দেশ দিলেন মহামহিম। তৈরি জাহাজ দেখে ছোট বড় সকলে অবাক হয়ে যায়। ১৩ জুলাই ১৫৯৭-তে মহামহিম তৈরি জাহাজে চেপে বিহাত [ঝিলম] নদীতে আশেপাশের দৃশ্য দেখতে বেরোন। (চলবে)