১৫৬১-৬২ হাতির লড়াই
[সম্রাট আকবর বন্য হাতি ঘোড়াকে বশ করে, সেই প্রাণীটিতে চড়তে ভালবাসতেন। এটা ছিল তাঁর প্রিয় বিনোদনকর্ম। আবুলফজল আকবরনামায় ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন। আকবরের নাম নিয়ে এই ঘটনাটি তুজুক-ই-জাহাঙ্গিরিতে জাহাঙ্গিরও প্রত্যায়িত করেছেন। আকবর বলছেন তিনি মাতালের অভিনয় করছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হল, একবার মাতালের ছদ্মবেশ ধারণ করার পর, বিপদ এলেও সে সময় তার পক্ষে সেই মাতলামির ছদ্মবেশ ঝেড়ে ফেলার উপায় ছিল না।]
ঘটনাটি ঘটে যখন মহামহিম হাওয়াই [উল্লেখ পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে ৫ নভেম্বর ১৫৫৬ হিমু যে হাতিটিতে চড়ে মুঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন, তার নামও ছিল হাওয়াই। আমাদের আলোচ্য হাতি হাওয়াই, সেই হিমুর হাওয়াই কী না, সে সম্বন্ধে ইতিহাস নীরব— লেখক] নামে একটি হাতির ওপরে উঠে তাকে অন্য হাতির সঙ্গে লড়িয়ে দিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত বলে রাখা দরকার হাতির লড়াই মুঘল বাদশাদের খুব প্রিয় খেলা ছিল। বাদশারা সকালে উঠে প্রাতকৃত্য সেরে আগরা বা দিল্লির যমুনার পাড়ে সমবেত হওয়া বহু মানুষের সামনে হাতির লড়াই দেখতেন। কোনও কোনও সময় সেই লড়াইতে স্বয়ং সম্রাট বা শাহজাদা অংশ নিতেন। আকবরের নাতি সম্রাট শাহজাহানের পুত্র আওরঙ্গজেব জীবন আলোচনায় এ রকম একটি ইন্টারেস্টিং গল্প উল্লেখ করব।
হাওয়াই বড়সড় আকারের সাম্রাজ্যের ফিলখানার [হাতিশাল] হাতি। হাতিটা একটূ পাগলাটে গোছের। সাধারণ চলাফেরা করতে করতে হঠাত হঠাত সে খেপে উঠে তীব্র ভয়ঙ্কর আর আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করাই তার স্বভাব ছিল। এইধরণের বদরাগি হাতিকে সামলানোর দক্ষতাওয়ালা মাহুতও বিশাল হাওয়াইকে সামলাতে সমস্যায় পড়তেন। কিন্তু যুদ্ধেগেলে একে সামলানো যায় কী প্রকারে? সে আরেক গল্প এবং প্রক্রিয়া, যদি কোনও দিন সুযোগ আসে তো জানাব। আমাদের নায়ক এবং সাহসী সম্রাট বিন্দুমাত্র দ্বিধা না রেখেই আগরা কেল্লার বাইরে তাঁর বিনোদনের জন্যে তৈরি পোলো খেলার মাঠে, পতাকার আকারের লম্বা হাতি হাওয়াইএর পিঠে চড়েবসলেন। স্বয়ং সম্রাট ঠিক করলেন তিনি হাতির লড়াই লড়বেন। সক্কলে উত্তেজিত। হাওয়াইকে তিনি, তাঁর উল্টো দিকে তেড়ে আসা হাতি রান বাঘার দিকে তাক করলেন। উপস্থিত সম্রাট-অনুগামী আর হাতির লড়াইএর অভিজ্ঞ মানুষেরা এই অবস্থায় হতবাক। কারন হাতির লড়াই-এর নানান প্রস্তুতি থাকে, বহু স্তরীয় নিরাপররা, সরঞ্জাম ইত্যাদি থাকে। সেই মুহূর্তে তো কোনও কিছুই আয়োজন করা নেই। তাঁর সঙ্গীরা কোনও দিনই চাইবেন না, প্রস্তুতিউ হাড়া আকস্মিকভাবে এই ধরণের ঘটনা ঘটুক।
উল্টো দিকের হাতিটা ছুটে আসা দেখে দাঁড়িয়ে থাকা দরবারিরা বুঝতে পারছিলেন তারা ঘটনাক্রম সামলাতে পারবেন না। সকলেই সম্রাটের বিপদের আশংকায় অধীর হয়ে উঠলেন। বেপরোয়া হয়ে তারা সে সময়ের আকবরি দরবারের বড় আমলা সম্রাটের প্রিয় সৎ বাবা আতকা খানকে ডেকে নিয়ে এল; তাদের আশা, আতকা খান হয়ত সম্রাটকে এই মৃত্যুমুখী লড়াই থেকে নিরস্ত করতে পারবেন। এই সময়ের প্রত্যেকেরই রক্ত শুকিয়ে জল হচ্ছিল। কার কী ভূমিকা হবে কেউই ঠিক করতে পারছিলেন না। আতকা খান চলতে থাকা বিশাল গোলযোগের মধ্যে উপস্থিত হয়ে হাতির নিয়ন্ত্রণহীন অবস্থা দেখে হতাশ হয়ে মাথা থেকে টুপিটা খুলে মাঠে ফেলে মাথা-ন্যাংটো হয়ে, দরবারে উপস্থিত বিচার না পাওয়া প্রার্থীর মত কান্নাকাটি শুরু করে সব কিছু মাথায় তুললেন। ছোট বড় তুচ্ছ সকলেই সর্বশক্তিমানের দিকে হাত তুলে জগতসংসারের উদ্ধারকর্তা, শান্তি আর স্থিতিশীলতার পাঠানো মানুষটার সুরক্ষার জন্যে ঐশ্বরিক সাহায্য প্রার্থনা শুরু করল। মহামহিমের আকুল আতকা খানের দিকে চোখ পড়ল। তিনি ধমকে বলে উঠলেন, ‘তুমি হাহাকার করবেনা। তুমি যদি কান্না না থামাও এক্ষুণি আমি হাতির তলায় লাফিয়ে পড়ব’। আতকা খান বুঝলেন তাঁর প্রভু মিথ্যে হুমকি দিচ্ছেন না। তাঁর চিৎকার এবং বাইরে তাঁর উদ্বেগী সমস্ত প্রকাশভঙ্গীই অদৃশ্য হল।
যতক্ষণনা উত্তেজিত হাওয়াই-এর পিঠে চড়া সম্রাট তাঁর শক্তি, সামর্থ্য এবং ঐশ্বরিক সহায়তায় বিপক্ষের হাতিটিকে বশ না করতে পারলেন, ততক্ষণ সিংহহৃদয় তিনি ভীতিপ্রদ এই খেলা চালিয়ে গেলেন। রান বাঘা বাঁধা কাছির সমস্ত নিরাপত্তা বেড়াজাল ছিঁড়ে ফেলে পালিয়ে গেল। পিঠে সম্রাটকে নিয়ে বিপুল বিশাল হাওয়াই পলাতক হাতিটির পিছনে মাতাল বাতাসের মত ওলটপালট খেয়ে ধাওয়া করতে থাকে। মহামহিম, যেন জানতেন ভবিষ্যতে কী ঘটনা ঘটতে চলেছে, তিনি পাথরের মত শক্ত হয়ে হাওয়াইএর পিঠে বসে রইলেন। শেষ পর্যন্ত হাতি দুটি, দীর্ঘ পথ দৌড়ে পৌঁছল যমুনার তীরে পৌঁছল নৌকো দিয়ে তৈরি পনটুন সেতুর মুখে। তাড়া খাওয়া হাতি রান বাঘা ভ্যাবাচেকা হয়ে নৌকো সেতুর ওপর উঠে পড়ে, আর সাম্রাজ্যের নায়ককে পিঠে নিয়ে শাহী হাতি হাওয়াইও তার পিছন পিছন পনটুন সেতুতে উঠেপড়ে। দুই মত্ত হাতির চাপে পনটুন সেতুর সব কটা নৌকো ডুবে যায়। শাহী ভৃত্যেরা সেতুর দুপাশের জলে লাফিয়ে পড়ে হাতিগুলোর পিছনে সাঁতার কেটে হাতিগুলোর সঙ্গে অন্যতীরে ওঠেন। জড়ো হওয়া দর্শকেরা বিষ্মিতচিত্তে ঘটনাবলী দেখতে থাকেন কীভাবে আগুণের গোলা হাওয়াই নামক হাতিকে ক্রমশ নিজের বশে এনে সম্রাট তাকে পালতু, শান্ত হাতিতে পরিণত করছেন। প্রাণ হাতে নিয়ে রণ বাঘা পালিয়ে যায়।
সকলের ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে এল। কয়েকজন দূরদৃষ্টিহীন মানুষ মনে করেছিলেন সম্রাট মাতাল ছিলেন এবং এই ঘটনাটি স্রেফ সম্রাটের মাতলামির বহিঃপ্রকাশ। তারা এখন বুঝতে পারল তাদের চর্চিত অজ্ঞতা দিয়ে তারা কখনোই মহামহিমের জ্ঞানার্জিত চিন্তাধারার কাছাকাছি পৌঁছতে পারবে না।
১৫৬১-৬২ উন্মার্গগামী আমলাকে ক্ষমা
[বৈরাম খানের সহায়ক মুজফফর আলি তুরবাতি সম্রাটের ক্ষমা পেয়েছেন। এরপর সম্রাট আকবরের রাজত্বে তিনি উচ্চপদে আসীন হবেন, তার উপাধি হবে মুজফফর খান। বায়াজিদ এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। ঘটনাটি নিয়েছি তাজকিরাতইহুমায়ুনওআকবর থেকে।]
পরেরদিন খানইখানান [মুনিম খান] মাহাম বেগের [সম্রাট আকবরের সৎমা] প্রাসাদের দিকে রওনা হচ্ছিলেন, আমি বায়াজিদ, তাঁকে স্মরণ করিয়ে দিলাম [বৈরাম খানের প্রশাসনের আমলা খাজা মুজফফর আলি তুরবাতিকে ক্ষমা করার বিষয়টি]। মাহাম বেগ তাঁকে অভ্যর্থনা করে জানালেন, ‘অপরাধীকে ক্ষমা করার থেকে সম্মানের আর কিছুই হতে পারে না। আমি কাউকে দরবেশ উজবেগের বাড়ি পাঠিয়ে মুজফফর আলিকে কারাগারের বন্দীদশা থেকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করছি’। খানইখানান জানালেন, ‘এটা যদি আপনার মত হয় তাহলে এই আবেদনটি মহামহিমের সামনে পেশ করা দরকার’। মাহাম বেগ বললেন, ‘তাই করব’।
তাঁদের আলোচনার মধ্যেই মহামহিম তাঁর সৎমায়ের প্রাসাদে, এই আলোচনার মধ্যেই কোনও একটা কাজে উপস্থিত হলেন। তিনি দস্তান খানের মায়ের সেলাই বাক্স থেকে একটি সূচ বের করে হিসারে শিকারের সময় পায়ে গেঁথে থাকা একটা কাঁটা বার করছিলেন। কাঁটা তোলার সময়ে তাঁর মা সম্রাটের কাছে এসে খানইখানানের আবেদনক্রমে খাজা মুজফফর আলিকে ক্ষমা করার বিষয়টি আরও একবার তুললেন। মহামহিম সম্রাট তাঁর আবেদন স্বীকার করে বললেন, ‘লোকে বলে মানুষটি দক্ষ লেখক। তোমার [খানইখানান] যদি তাঁকে পছন্দ হয়, তাহলে তুমি তাকে চাকরি দিতে পার’। (চলবে)