| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ইফতিতাইসুলতানিওয়াশুল-ই-কুল : আকবর এবং আওরঙ্গজেব (৯৯ নং কিস্তি) : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ১৯২ জন পড়েছেন
আপডেট রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

মুরাদ আওরঙ্গজেবের জোট

প্রথম দফার অসুস্থতার পরেও সম্রাটের সেরে ওঠার ইঙ্গিত পাওয়া গেল না। অসুস্থ সম্রাটের স্বাক্ষরসহ নিয়মিত শাহী নির্দেশনা প্রকাশ হতে হতে এক দিন হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল। মুরাদ অঙ্ক কষে বুঝলেন যতদূরসম্ভব বাবা আর নেই — দারার হাতে সব ক্ষমতা। মুরাদ নিজেকে সিংহাসনে বসাবার তোড়জোড় শুরু করলেন।

কিন্তু মুরাদের আশেপাশের বন্ধু বলতে একমাত্র দাদা আওরঙ্গজেব। শাহ সুজা বাংলায়, দূর ভূখণ্ডে তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ দুরাশা। বছর ছয়েক আগে ২৩ ডিসেম্বর ১৬৫২ তে দক্ষিণের সুবায় যাওয়ার পথে আওরঙ্গজেবের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। সেই সময় সুজা লাহোরে ছিলেন কান্দাহার আক্রমণের ভার তাঁর কাঁধে অর্পণ করার অনুরোধ নিয়ে। তার অনুরোধ দরবারে সম্রাট-দারা-জাহানারা অক্ষের সঙ্গে তীব্র অপমানজনক আলাপ আলোচনায় শেষ হয়। হতোদ্যম সুজা আর আওরঙ্গজেব একসঙ্গে ফিরছিলেন। কিন্তু নির্দেশ দেওয়া ছিল লাহোর থেকে দিল্লি পর্যন্ত তাদের ব্যবধান ১ মাইল কম হবে না। সম্রাটের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আওরঙ্গজেব আলাদা আলাদা করে দুই ভায়ের সঙ্গে বৈঠক করেন। আগেই বলেছি বৈঠকের সংবাদ বাবাকে লিখেছেন। দুটি বৈঠকেই পরবর্তী কর্মপন্থা তৈরি হল। সিদ্ধান্ত হল, ভায়ে ভায়ে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে সুজার মেয়ে গুলরুখ বানুর সঙ্গে আওরঙ্গজেবের পুত্র মহম্মদ সুলতানের বাগদান হবে [বিয়ে হবে সিংহাসনের আরোহণের লড়াইতে বাংলায় গঙ্গার পাড়ে]।

তিন ভায়ের জোটে আগামী দিনের সিংহাসন লড়াইএর কাঠামো তৈরি হয়ে গেল। দুই ভাই আওরঙ্গজেবের নেতৃত্বে আস্থা পেশ করলেন। সেই জোট নতুন করে জেগে উঠল সিংহাসনের লড়ায়ের সুযোগ দেখা দিতেই। কর্মপদ্ধতি ঠিক করতে অক্টোবর থেকে তিন ভায়ের মধ্যে নতুন করে চিঠি আদান-প্রদান শুরু হল। মুরাদ সুজাকে আওরঙ্গজকেব মার্ফৎ ১৯ অক্টোবর চিঠি পাঠালেন। দশ মাইল অন্তর তৈরি সরকারি ডাক চৌকির কাঠামো এড়িয়ে ব্যক্তিগত হরকরা মার্ফৎ চিঠি দেওয়া-নেওয়ার দীর্ঘস্থায়ী কাঠামো তৈরি হল। সুজার কাছে চিঠি পাঠানো সময় সাপেক্ষ, তাই আওরঙ্গজেব-মুরাদের মধ্যে ভাবনা আদান প্রদান চলল। মুরাদ বড় দাদাকে মুলহিদ মূর্তিপূজক গালি দিয়ে ‘পাদিশা গাজি’ নাম নিয়ে ২০ নভেম্বর সূর্য ওঠার ৪ ঘন্টা ২৪ মিনিট পূর্বের মাঙ্গলিক সময়ে আহমেদাবাদে নিজেকে সম্রাট নির্বাচিত করলেন। সর্বসমক্ষে মারোয়াজুদ্দিন প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সিংহাসনে আরোহণ করলেন ৫ ডিসেম্বর। তাঁর নামে খুতবা পড়া হল। ঘনিষ্ঠদের মধ্যে সম্রাটের মত কাউকে মুর্শিদ পরস্ত খান ফতেহ জঙ্গ, কাউকে সুলতান নিয়াজ খান কাউকে তাহায়ুর খান উপাধি বিলোলেন। জেলাতেও তাঁর নামে খুতবা পড়া হল। জমিদারেরা আহমেদাবাদের দরবারে দৌড়ে এলেন নতুন উদিত সূর্যকে সম্বর্ধনা জানাতে। ১৯ জানুয়ারি চম্পানীর কেল্লায় পরিবারকে সুরক্ষিত রেখে মুরাদ আগরা অভিযানের দিন স্থির করতে চান তড়িঘড়ি। ভায়ের তাড়াতেও আওরঙ্গজেব প্রকাশ্যে কিছু বলছেন না। অধৈর্য মুরাদ আওরঙ্গজেবের নির্দেশের অপেক্ষায় রইলেন।

মুরাদের প্রস্তাব ছিল যততাড়াতাড়ি সম্ভব ভাইরা এক জোট হয়ে দারাকে সম্পদ সংগ্রহের সুযোগ না দিয়ে আক্রমন করে ব্যতিব্যস্ত করে তোলা হোক। আওরঙ্গজেব এ সব হঠকারিতায় কান দিলেন না। তিনি উপযুক্ত সময়ের জন্যে অপেক্ষা করতে জানেন। তিনি জানেন শাহজাহান ৩০ বছর সাম্রাজ্য চালিয়ে মুঘল হিন্দুস্তান জোড়া কী বিশাল বিস্তৃত ক্ষমতাজাল তৈরি করতে করেছেন। তিনি যতদিন জীবিত এবং কর্মক্ষম থাকবেন, ততদিন সাম্রাজ্য কেন্দ্রে আঘাত করা সহজ কাজ হবে না। তিনি সেরে উঠে সক্রিয়তা দেখালেই পুত্রদের সমস্ত বিদ্রোহের আয়োজন চৌপাট হয়ে যাবে। সম্রাট যদি বিশাল বাহিনী নিয়ে মাঠে নেমে বিদ্রোহ দমনে ডাক দেন, তাহলে সাম্রাজ্য জুড়ে যে উথালপাথাল হবে, তাতে বিদ্রোহী বাহিনীর ফুৎকারে উড়ে যেতে বিন্দুমাত্র সময় লাগবে না। মাথা ঠাণ্ডা আওরঙ্গজেব সম্রাটের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে চান। তিনি মুরাদের সুরাটে কেল্লা দখল আর সিংহাসনে আরোহণকে প্রকাশ্যে নিন্দা করলেন। মুরাদের বক্তব্য ছিল তাঁদের বাবা মারা গেছেন, মুরাদ সম্রাটের হস্তাক্ষর নকল করে রাজত্ব করছে। অধৈর্য মুরাদ দাদাকে সতর্ক করে বললেন ‘দরবার থেকে তথ্য পাওয়ার আশা করলে শত্রুকে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে’।

আওরঙ্গজেব শাহী বাহিনীর ক্ষমতা কমাতে, নিজেদের ক্ষমতা বাড়াতে পারস্যের শাহকে কান্দাহার আক্রমনের প্রস্তাব দিলেন। মুরাদ প্রথমে গররাজি হয়েও দ্বিতীয় আব্বাসকে তাকাররুব খানের হাত দিয়ে চিঠি পাঠালেন। শাহ মুরাদের বন্ধুত্ব স্বীকার করে জানালেন তিনি হিন্দুস্তান আক্রমনে সেনাপতিদের তৈরি রেখেছেন এবং তাদের জলপথে সুরাটে গিয়ে মুরাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। তাতেও বড় ভাবে মুঘল হিন্দুস্তান আক্রমনের জন্যে ৪-৫ বছরের দীর্ঘ প্রস্তুতি প্রয়োজন। ৩০ বছর আগে, শাহজাহানের বিদ্রোহের সময় যেমন পারস্যের শাহ শাহজাদার হিন্দুস্তান আক্রমণের প্রস্তাব পেয়ে যেমন নিষ্ক্রিয় থেকেছেন, এবারেও বিদ্রোহী রাজপুরুষদের ডাকেও কার্যত তেমনই নিষ্ক্রিয় রইলেন।

নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে সম্রাট সেরে ওঠার সংবাদ আওরঙ্গজেব পেলেন মাসের শেষে; ডিসেম্বরের শুরুতে নিশ্চিত হলেন; কিন্তু বুঝলেন সম্রাটের হাতে আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার রাশ নেই – দাদা দারাই দরবারে সর্বেসর্বা। আওরঙ্গজেবের কাছে দিল্লি থেকে রোশেনারার দরবারি ইনপুটগুলোও পৌঁছনো শুরু হয়েছে – এতদিনকার দরবারের আবছা রাজনীতির নতুন ক্রিয়াশীলতা স্পষ্ট হচ্ছে তাঁর সামনে। আওরঙ্গজেব বুঝলেন এবার তাঁকে সক্রিয় হতে হবে। তিনি মুরাদকে সক্রিয় হয়ে ওঠার পরিকল্পনা পাঠিয়ে তৈরি হতে বললেন। সাম্রাজ্য যুদ্ধে আওরঙ্গজেবের কোমর বেঁধে ঝাঁপিয়ে পড়ার বার্তায় মুরাদ পূর্ণ উদ্যমে নিজের বাহিনী সাজিয়ে তোলার কসুর করছেন না। দুই ভায়ের মধ্যে সাম্রাজ্য বাঁটোয়ারা রূপায়িত হল। আলমগিরনামায় আওরঙ্গজেবের মুনসি আকিল খান রাজি বলছেন আওরঙ্গজেব ভায়ের সঙ্গে জোট তৈরি করার প্রস্তাব দিয়ে চিঠি পাঠালেন; চিঠিতে স্পষ্টিভাবে পাঞ্জাব, আফগানিস্তান, কাশ্মীর, ভক্কর আর থাট্টা সহ সিন্ধু এবং আরব সাগর এলাকা শাসন করার জন্যে মুরাদকে ছেড়ে দিলেন। নিজের নামে খুতবা পড়ার অধিকার দিলেন। সাম্রাজ্য ভাগের পাশাপাশি যুদ্ধের পরে রোজগার/লুঠের এক তৃতীয়াংশ মুরাদকে দেওয়ার অঙ্গীকার করলেন।

আওরঙ্গজেব ১৬৫৮র ফেব্রুয়ারিতে রণসাজ শেষ করে আওরঙ্গাবাদ থেকে বাহিনী নিয়ে অবশেষে রওনা হলেন। অস্থির মুরাদকে চিঠি লিখলেন, কখন তিনি ভায়ের সঙ্গে নর্মদার তীরে মিলবেন। আওরঙ্গজেবের বার্তা পেয়ে মুরাদও যাত্রার জন্যে তৈরি হলেন — কিন্তু কোন রাস্তায় যাবেন ঠিক করে উঠতে পারছিলেন না। জানুয়ারির শেষের দিকে তাঁর খুফিয়ানবিশেরা সংবাদ দিল শাহী বাহিনীর সেনানায়ক যশোবন্ত সিংহ ৩-৪ হাজার সেনা নিয়ে উজ্জয়নীতে উপস্থিত। মুরাদ ২৫ ফেব্রুয়ারি আহমেদাবাদ থেকে বার হয়ে ১৩ মার্চ মোদাসা পেরোলেন, ১৪তে মান্দাসোর, ১৪ এপ্রিল দোহাদে পৌঁছলেন। খবর পেলেন, প্রথমে যে সংবাদ পেয়েছিলেন, তার তুলনায় যশোবন্তের বাহিনী অনেক বড়। তখনও তিনি জানেন না আওরঙ্গজেব কোন রাস্তায় আসছেন।

আওরঙ্গজেব উজ্জয়নী পেরিয়ে পশ্চিমে বাঁসওয়াড়ার রাস্তা ধরে ৬ কিমি দূরে কাছরুদে মুরাদের অপেক্ষায় শিবির পাতলেন। মুরাদ তখন ১০-১২ দিনের দূরত্বে ছিলেন। যশোবন্তর শিবির পাতার খবর পেয়ে তিনি কাছরুদ হয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা বাতিল করে আওরঙ্গজেবদাদার জন্মস্থান দোহাদ থেকে দক্ষিণ পূর্বের ঝাবুয়া গিরিপথ পেরিয়ে মণ্ডলপুর বা বারমণ্ডলে শিবির ফেললেন। ১৩য় আওরঙ্গজেবের আসার সংবাদ পেয়ে মুরাদ পরের দিন তাঁর সঙ্গে দীপালপুরে যোগ দিলেন।

শুরু হল তৃতীয় সিংহাসন লড়াই-এর প্রথম পর্ব।

আওরঙ্গজেবের দক্ষিণে দরকষাকষি

৪ অক্টোবর ১৬৫৭-য় বিজাপুর যুদ্ধ শেষ থেকে ২৫ জানুয়ারি ১৬৫৮-য় হিন্দুস্তানে সিংহাসনের দাবিদার হিসেবে যুদ্ধযাত্রার দিন পর্যন্ত তিনি আমরা আগেই দেখেছি আওরঙ্গজেব উদ্বিগ্ন এবং সঙ্কটময় দিন কাটিয়েছেন। তিনি এমনই সিদ্ধান্ত না নিতে পারার সমস্যায় ভুগছিলেন যে তাঁর মত অহংওয়ালা মানুষ মীর জুমলাকে পথ দেখানোর অনুরোধ অবদি করেছেন। দক্ষিণ এবং মুঘল হিন্দুস্তানে নানান পরস্পর বিরোধী ঘটনা এত দ্রুত গতিতে ঘটে চলছিল যে সেই মুহূর্তে দক্ষিণ এশিয়ার সব থেকে মাথা ঠাণ্ডা রণনীতি বিশারদ, তাঁর উল্টো দিকে মানুষকে বোঝা এবং বোঝাবার ক্ষমতাওয়ালা রাজনীতিবিদও ঘটনাবলী অনুসরণে খেই হারিয়ে ফেলছিলেন। ভাগ্যের হাতে ঘটনাম বর্তমানকে ছেড়ে দিয়ে নিজের মত করে নিজের শিবির গুছিয়ে নেবার উদ্যম নিলেন।

সম্রাটের খামখেয়ালি নির্দেশে বিজাপুরে শান্তি ঘোষণা করে বিদর থেকে মুঘল বাহিনী নিয়ে আওরঙ্গজেবের পিছিয়ে এলেন। এই পশ্চাদপসরণকে মুঘলদের হার হিসেবে গণ্য করল বিজাপুরীরা। বিজাপুরের রাজনৈতিক ইতিহাস বাসাতিনইসালাতিন লিখছে উজির খান মহম্মদকে ঘুষ দিয়ে আওরঙ্গজেব হেরে পালিয়ে গেলেন। বিজাপুরীদের ধারণা হল তাঁরা শেষ পর্যন্ত মুঘলদের ধাক্কা দিয়ে হিন্দুস্তানে পাঠানোর সময়ের সূচনা করলেন। সুলতান পূর্ণ উদ্যোগে কর্ণাটকের উদ্গীর কেল্লা সংলগ্ন কিছু শাহী এলাকা দখল নিলেন। আওরঙ্গজেব জানেন তাঁকে পূর্ণ মহিমায় দক্ষিণে সুবাদারি করতে গেলে বিজাপুরীদের এই সক্রিয় হয়ে ওঠার প্রচেষ্টাকে ধাক্কা দিতে হবে। অথচ সম্রাটের নির্দেশে তাকে শান্তি আলোচনা শুরু করতে হচ্ছে। যে অতিরিক্ত বাহিনী যুদ্ধের পাঠানো হয়েছিল, সেটিকেও ফেরত পাঠানোর নির্দেশ পালন করতে হচ্ছে। কিন্তু আওরঙ্গজেব জানেন, বিজাপুরীরা যাই ভাবুন না কেন, তিনি বিজাপুরে জেতার মুখে দাঁড়িয়েছিলেন, দরবার থেকে তাঁর বিজয় গতিপথ রুদ্ধ করা হল। আদিল শাহ পারেন্দা কেল্লা আর বিপুল জায়গা মুঘলদের হস্তান্তর এবং লক্ষ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্যে তৈরি ছিলেন। সব আপাতত জলাঞ্জলি গেল। এদিকে শিবাজী ক্রমশঃ তাঁর মাথা ব্যথা হয়ে উঠছেন।

বিজাপুর বা গোলকুণ্ডার মত নগণ্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আওরঙ্গজেবের পেশিফোলানোর উদ্দেশ্য হল মুঘল হিন্দুস্তানে তাঁর সামরিক গরিমা প্রকাশ করা। মূল লক্ষ্য মুঘল হিন্দুস্তান। সেখানে তাঁর যুদ্ধ হুনর প্রদর্শন করা। মুঘলদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা দক্ষিণের সুবাদার হিসেবে তাঁর কাজ হল উত্তরকে বোঝানো তিনি যে কোনও পরিস্থিতির যুদ্ধ মোকাবেলায় এখনও সেরা মাথা। এ বিষয়ে তাঁকে মোকাবিলা করার কাজে মুঘল হিন্দুস্তানে কেউ নেই। তিনি এটাও জানেন দক্ষিণে তাঁর পেশি ফোলানোর সময়ও সীমিত। তাঁর প্রতিভার স্ফূরণের জন্যে আরও বড় মঞ্চ মুঘল হিন্দুস্তানে অপেক্ষা করে আছে। তিনি দক্ষিণে আটকে আছেন আর মুঘল রাজনীতির রাশ, দারা হাতে ধরে ক্রমশঃ আওরঙ্গজেবের নিয়ন্ত্রণ থেকে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। তিনি যতদিন দক্ষিণে অপেক্ষা করবেন, ততদিন তিনি দাদা দারাকে মুঘল কেন্দ্রের মঞ্চ দখল করে বাগাড়ম্বর প্রকাশের সুযোগ করে দেবেন। তিনি যত বেশি দিন দক্ষিণে থাকবেন, আওরঙ্গজেবের সঙ্গে থাকা উচ্চাকাঙ্ক্ষী সেনাপতিরা দিল্লির রাজনীতিতে অংশ না নিতে পারার হতাশায় দারার পক্ষে ঝুঁকবেন। আওরঙ্গজেব শাঁখের করাতের মাঝে পড়েছেন। ফলে সাময়িক ক্ষুদ্র অপমান সহ্য করেই তিনি বিজাপুর থেকে হঠে গিয়ে সিংহাসনের লড়াইতে ভাইদের মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

আওরঙ্গজেব ৪ অক্টোবর কল্যানী থেকে বদর হয়ে আওরঙ্গাবাদ ফিরলেন। দরবারের নির্দেশে মহাবত খান এবং রাও ছত্রশাল তাদের বাহিনী নিয়ে দিল্লি ফেরত গেল। সরকারি নির্দেশে নাসিরি খান আওরঙ্গজেবকে ছেড়ে মালওয়ায় গেলেন। কেন্দ্রের পিছু হটার নির্দেশে মুঘল সুবাদারের শুধু সম্মান হানিই হল না, বিজাপুরীরা যেখানে পারল মুঘল বাহিনীকে আক্রমন করতে শুরু করল। মীর জুমলাকে পাঠানো আওরঙ্গজেবের কিছু সাংকেতিক চিঠি বীজাপুরীদের হাতে পড়ে যাওয়ায় তারা কিছুটা দিল্লির অবস্থা আঁচ পেতে থাকে। শাহজাহান তাঁকে বিদরে থাকার নির্দেশ দিলেও আওরঙ্গজেব প্রথমা স্ত্রী মারা যাওয়ার সূত্র ধরে তিনি আওরঙ্গাবাদ ফেরার যুক্তি সাজিয়ে নিলেন — কিন্তু তিনি সম্রাটকে চিঠিও দিলেন না, আর আওরঙ্গাবাদে ফেরার যুক্তিও দেখালেন না। আওরঙ্গজেবকে পাঠানো মুরাদের প্রথম চিঠি ১৯ অক্টোবর আর আওরঙ্গজেবের মুরাদকে লেখা প্রথম চিঠি ১৫ অক্টোবর। চিঠি আদান প্রদানের মধ্যে দিয়ে তৃতীয় সিংহাসন যুদ্ধের সূচনা হল। ভাই মুরাদকে বললেন ‘বিচক্ষণতা জরুরি, চলতি অক্ষরে চিঠি লেখা উচিৎ নয়’। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev