আওরঙ্গজেবের দক্ষিণে দরকষাকষি
১৮ অক্টোবর দিল্লি থেকে আওরঙ্গজেবের উকিল প্রতিনিধি, দক্ষিণের সুবাদারকে চিঠি পাঠিয়ে জানালেন কয়েক দিন ধরেই শাহজাহান পুরোপুরি দারার ওপর নির্ভরশীল হয়েপড়েছেন। ২১ তারিখের চিঠিতে তিনি জানলেন সম্রাট সুস্থ হয়ে উঠছেন। ২২-এর চিঠি আওরঙ্গজেবকে সক্রিয় হয়ে ওঠার উৎসাহ দিল। তিনি জানলেন, সম্রাটকে নিষ্ক্রিয় করে দারা সম্পূর্ণরূপে দরবারের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়েছেন। দরবার থেকে আসা শেষ চিঠি থেকে তিনি স্পষ্ট ধারণা করলেন — হয় সম্রাট মারা গিয়েছেন, না হয় অসহায়ভাবে অক্ষম হয়ে দারা নির্ভরশীল হয়েপড়েছেন। ইতিমধ্যে আগরার ফৌজদার গোপনে সমর্থন জানিয়ে আওরঙ্গজেবকে চিঠি পাঠালেন।
কিন্তু যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নিলেও তখনও তিনি যুদ্ধক্রিয়ায় সক্রিয় হচ্ছেন না — পুত্র মহম্মদ সুলতানকে বাহিনী নিয়ে বুরহানপুরে তাপ্তি নদীর ফেরি ঘাটের শিবির তৈরি করে উত্তরের দিকে রওনা হওয়া নাসিরি খানকে গ্রেফতার করা এবং স্থানীয় জমিদারদের থেকে সেনা সংগ্রহের নির্দেশ দিলেন। এ সব গোপন বিদ্রোহ। তাঁর মনে হচ্ছিল শাহজাহান যদি সেরে ওঠেন!
এদিকে উত্তরের রাজনীতির প্রভাব দক্ষিণের রাজনীতিতে মীর জুমলাকে এক কোণে ঠেসে ধরছিল। যত দিন যাচ্ছিল, পারেন্দা কেল্লা দখল আর বিজাপুর থেকে জরিমানা বাবদ অর্থ পাওয়ার বিষয়টা মীর জুমলার হাত থেকে বেরিয়ে যাচ্ছিল। তিনি পারেন্দার কাছে বীর জেলায় তিন মাস অপেক্ষা করলেন। কিন্তু বুঝতে পারছিলেন সেখানে ঘাঁটি গেড়ে থেকে তাঁর কোনও লাভ হচ্ছে না। ২২ ডিসেম্বর সম্রাট তাঁকে দরবারে ডেকে পাঠালেন। ২৭-এ বীর থেকে রওনা হয়ে তিনি ১৬৫৮-র জানুয়ারির প্রথমে আওরঙ্গাবাদে পৌঁছবেন।
আওরঙ্গজেব ১১ নভেম্বর ১৬৫৭-য় আওরঙ্গজাবাদ পৌঁছলেন। সশরীরে সিংহাসনের লড়াইতে যোগ দেওয়ার বিষয়ে ক্রমশ মনস্থির করেফেলছেন। তাঁর একটা চোখ বীরে মীর জুমলার কর্মকাণ্ডের দিকে, অন্য এক চোখ আগরায় সম্রাটের শারীরিক অবস্থার উন্নতি-অবনতির দিকে নিবদ্ধ। দক্ষিণের রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে তার আর তাঁর মনে দ্বিধা নেই। আহমেদনগরে অভিযান করে বেআদপ বিজাপুরের শাসককে উচিৎ শিক্ষা দেওয়ার পরিকল্পনা ভবিষ্যতের গর্ভে তুলে রাখলেন। ২৮ অক্টোবর মালিক হুসেইনকে হান্দিয়ায় পাঠিয়ে ফেরি এবং ফেরিঘাট দখল করে উত্তরের দরবারে দারার সঙ্গে দক্ষিণের মুঘল আমলাদের সমস্ত যোগাযোগের রাস্তা বন্ধ করতে নির্দেশ দিলেন। তাছাড়া দক্ষিণ থেকে উত্তরের দিকে যাওয়া পথের মাঝে দেওগড় আর চান্দার গোন্দ রাজাকে বন্ধুত্বের বার্তা দিলেন। আওরঙ্গজেবের শিবিরের বেশ কিছু গোপন সংবাদ আগরায় পাচার করার চিঠি ধরা পড়ে এক-দুজন শাস্তি পেল, দরবারি গোপন ডাকহরকরাদের চিহ্নিত করা হল। তিনি নিজেও মুরাদ আর দারাকে চিঠি পাঠাচ্ছিলেন। কিন্তু বাংলায় চিঠি পাঠানোর রাস্তা আগরা হয়ে যায় বলে আরও ঘুর পথে ওডিসা হয়ে চিঠি পাঠালেন। কিন্তু খুব সহজে সেখান থেকে উত্তর আসছিল না, শুধু দুজন দুজনের কাজে সমর্থন জানিয়ে আসছিলেন।
আওরঙ্গজেব এখন কীভাবে এগোবেন?
অনুগামীরা অপেক্ষা করে আছেন আওরঙ্গজেবের থেকে আসা বার্তার জন্যে। কিন্তু তখনও দরবার থেকে পরস্পরবিরোধী খবর আসতে থাকায় আওরঙ্গজেবের পক্ষে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া সমস্যা হচ্ছিল। ৬ সেপ্টেম্বর সম্রাট অসুস্থ হলেন। ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত সম্রাটের স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে তিনি অন্ধকারে। ১৮-ই তিনি জানলেন সম্রাট অসহায়। ৫ তারিখের চিঠি এল ২১-এ। তিনি জানলেন অসুস্থতা কমেছে, নিজেই ঘটনাবলী নিয়ন্ত্রণ করছেন। ১০ তারিখের চিঠি এল পরের দিন, ২২-এ। জানলেন দারা সম্রাটের নামে দরবারের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে তুলে নিয়েছেন — আমলাদের বদলি, দপ্তর পরিবর্তন, জায়গির বন্টন, অর্থ এবং বাহিনী সংগ্রহ নিজের সিদ্ধান্তেই করছেন। ফরমানে শুধু সম্রাটের নাম আর পাঞ্জা ব্যবহার করা হচ্ছে।
দরবার থেকেও আওরঙ্গজেবের সমর্থকেদের নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চলছে। ডিসেম্বরের চতুর্থ সপ্তাহে কড়া চিঠি পাঠিয়ে মীর জুমলাকে ডেকে পাঠানো হল। মুরাদও তাঁকে সিদ্ধান্ত নিতে বলছেন চিঠির পর চিঠি পাঠিয়ে। কিন্তু তিনি যতক্ষণ না সম্রাটের মৃত্যু বিষয়ে নিশ্চিত হচ্ছেন, তিনি প্রকাশ্যে বিদ্রোহ ঘোষণা করতে রাজি নন। হয়ত আওরঙ্গজেব বুঝে নিতে চাইছিলেন প্রশাসনে দারার ছায়া কতটা সুদীর্ঘ হতে পারে। প্রশাসনে সম্রাট যত পিছনে যাবেন আর সম্রাট বেঁচে থাকতে থাকতেই দারার ভূমিকা আরও বেশি দৃশ্যমান হবে, তাঁর পক্ষে প্রকাশ্যে বিদ্রোহ করা সুবিধে হবে। তিনি আরও কিছু দিন অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলেন।
এরপরে ঘটনা দ্রুত লয়ে এগোতে থাকবে। ২৪ নভেম্বর তাঁর কাছে খবর এল বাংলায় শাহ সুজার নেতৃত্বে আগরার দিকে এগোনো বাহিনী দমনে দারা শাহী বড় বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সেই মুহূর্তে আওরঙ্গজেবের কাছে সম্রাট শাহজাহানের মানসিক অবস্থা পরিষ্কার হয়ে গেল। আওরঙ্গজেব পরিষ্কারভাবে বুঝলেন, দারার সিংহাসনে ওঠা এখন সময়ের অপেক্ষা। যতদিন সম্রাট জীবিত আছেন, ততদিন যদি দারা বাদে সম্রাটের তিন পুত্রের কোনও পক্ষই দরবার থেকে দারার এই সব সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপই না করে, তাহলে সম্রাট অভিজাত এবং তার প্রিয় প্রজাদের বোঝাবেন তাঁর বড় ছেলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তাঁর হয়ে সাম্রাজ্য চালাচ্ছেন। তিন পুত্র সেই পরিস্থিতি মেনে নিয়েছেন। দারা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করছেন। অন্য তিন পুত্র যেন বড় ছেলেকে আর আঘাত না করে। তারা বড় ভাই দারার ক্ষমতায় আরোহনের বাস্তব অবস্থা নতমস্তকে মেনে নেয়। দারা তাঁর বকলমে সাম্রাজ্য চালাচ্ছিলেন। তিনি অভিজাতদের কাছে আবেদন করছেন দারার সিংহাসনে আরোহণ নিষ্কণ্টক হোক। আওরঙ্গজেব এই অবস্থা মনে নিতে পারেবেন না। ইতিহাস সচেতন আওরঙ্গজেব সিদ্ধান্ত নিলেন পূর্বের দুটি সিংহাসনের লড়াইয়ের অনুসরণে নিজে সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে তৃতীয় সিংহাসনের লড়াইতে ঝাঁপিয়ে পড়বেন।
দক্ষিণে দুই ভাইকে আলাদা করতে আওরঙ্গজেবের মনসবদারি মুরাদকে দেওয়ার কৌশলী চাল চাললেন দারা। আমরা দেখেছি, মুরাদ সেই শিশুসুলভ দরবারি চাল অগ্রাহ্য করলেন। দারার বিভাজনের রাজনীতি দুই ভায়ের কাছে পরিষ্কার হয়ে। তারা চুপ করে তো থাকলেনই না, মুরাদ নিজেকে সম্রাট ঘোষণা করলেন, সুরাট দখল নিলেন। দারা, মালওয়ার দায়িত্ব দেওয়া যশবন্ত সিংহ আর গুজরাটে মুরাদকে সরিয়ে দায়িত্ব দেওয়া কাশিম খানকে ১৮ এবং ২৪ নভেম্বর দক্ষিণ আর গুজরাটে মুরাদ দমনে পাঠালেন। মীর জুমলার মত বড় মনসবদারদের দরবারে এসে রিপোর্ট করার কঠোর বার্তাওয়ালা চিঠি জারি হল। মীর জুমলা আওরঙ্গজেবের অন্যতম প্রধান সেনাপতি। মীর জুমলাকে অবাধে উত্তরে যেতে দেওয়ার অর্থ হল আওরঙ্গজেবের এক হাত কেটে নেওয়া। ১৬৫৮-র ১ জানুয়ারি উত্তরে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়ে আওরঙ্গাবাদে মীর জুমলা ফিরে এলেন। দরবারি হুকুম ব্যর্থ করতে তিনি মীর জুমলাকে গ্রেফতার করলেন। আগেই আমরা বিশদে বলেছি কীভাবে এবং কেন মীর জুমলাকে আওরঙ্গজেব বন্দী করলেন।
কিন্তু তখনও আওরঙ্গজেব সরাসরি সম্রাটের বিরুদ্ধে কীভাবে বিদ্রোহ করবেন, সে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তখনও তিনি মুরাদকে ধীরে চলার উপদেশ দিচ্ছেন। তিনি বাবাকে আর নতুন উজির জাফর খানকে চিঠি লিখে প্রকাশ্যে জানালেন সম্রাট শাহজাহান সম্বন্ধে দেশ জুড়ে যে সব গুজব ছড়াচ্ছে, তাতে তাঁর হৃদয় ব্যথিত, বিরক্ত। বিনীত এবং কর্তব্যনিষ্ঠ পুত্র হিসেবে তাঁর এই মুহূর্তে কর্তব্য হল অসুস্থ পিতাকে দেখতে যাওয়া, সম্রাটকে দারার নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত করা এবং সাম্রাজ্যকে শঙ্কা, বিভ্রান্তি, এবং টালমাটাল অবস্থা থেকে উদ্ধার করা। বাবাকে দেখতে যাওয়ার তীর্থ যাত্রা দারার নিযুক্ত মানুষদের চক্রান্তে এই মুহূর্তে বাধা পাচ্ছে, কিন্তু তার সঙ্গে বাহিনী থাকলেও তাঁর উদ্দেশ্য হল শান্তিপূর্ণভাবে বাবা কোন অবস্থায় আছেন, সেটা দেখা, বোঝা। চিঠি থেকে স্পষ্ট, তিনি সিংহাসনের লড়ায়ের সামরিক সমাধান চাইছেন।
তিনি চুপ করে আছেন ঠিকই কিন্তু তার কূটনৈতিক যোগাযোগ, নিজেকে বিদ্রোহের জন্যে তৈরির প্রস্তুতি থেমে নেই। গোলকুণ্ডা আর বীজাপুরের সঙ্গে আওরঙ্গজেব সমঝোতা করলেন। গোলকুণ্ডায় তাঁর উকিল, প্রতিনিধি মীর আহমদকে সুলতানের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করার জন্যে নির্দেশ দিলেন। বুরহানপুরে অগ্রগামী বাহিনী পাঠিয়ে সুলতান কুতুব শাহকে চিঠি লিখে অনুরোধ করলেন, ‘এই মুহূর্তে আপনার বন্ধুত্ব দেখানোর সময় এসেছে, আশাকরি অবন্ধুত্বজনক পদক্ষেপ নিয়ে সম্পর্ক নষ্ট করবেন না’। উত্তর অভিযানের মুহূর্তে তিনি কুতুব শাহকে চিঠি লিখে দুষ্টু লোকেদের নজর থেকে মুঘল কর্ণাটক সীমান্তকে নজরদারিতে রাখা এবং সীমান্ত না পেরিয়ে কোনও অঞ্চল অধিকার না করতে অনুরোধ করলেন। সুলতান আদিল শাহকে লিখলেন মীর জুমলার পরামর্শে বিভ্রান্ত হয়ে আমি গোলকুণ্ডা আক্রমন করেছিলাম। প্রজাদের সুখী রাখবেন। এছাড়াও তিনি আরও অনেক পরামর্শ দিলেন। বিজাপুরে সুলতানের মাকেও চিঠি পাঠিয়ে বকেয়া তাড়াতাড়ি শোধ করার জন্যেও অনুরোধ করলেন এবং তাঁর প্রতি মৌখিক বার্তাও পাঠালেন। বুরহানপুর থেকে রওনা হওয়ার আগে আবারও সুলতানের মাকে লিখলেন, ‘আশাকরি দক্ষিণী সুলতানেরা [আমার অনুপস্থিতিতে] শান্ত থাকবেন, আপনার [টাকা শোধ করার] প্রতিশ্রুতি রাখবেন যাতে আমি সম্রাট হওয়ার পরে আপনাকে সম্মান জানাতে পারি’।
চাপ তৈরি করার ফলে দুই সুলতানের থেকে কিছু অর্থ আওরঙ্গজেবের হাতে এল। মীর জুমলার সম্পদ আর বিপুল গোলান্দাজ বাহিনী আওরঙ্গজেবের নিয়ন্ত্রণে আছে। জানুয়ারিতে এই বাহিনী আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে জুড়ে যায়। মীর জুমলার উপস্থিতিতে আওরঙ্গজেব তার আগামী দিনের পরিকল্পনা বিষয়ে ক্রমশ মনস্থির করতে শুরু করেছেন। (চলবে)