আমলা, সেনাপতিদের সঙ্গে যোগসূত্র
আগেই বলেছি আমলা সেনানায়কদের চরম অপছন্দের শাহজাদা ছিলেন দরবারের কেন্দ্রে বসে থাকা, প্রভূত ক্ষমতা, সম্পদের অধিকারী দারা শুকো। সিংহাসনের লড়ায়ের শুরুতেই যে দুটি বাহিনী দুই ভাই মুরাদ আর আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে পাঠাতে চাইছিলেন দারা, তার সেনাপতি তিনি বহু তলাস করেও খুঁজে পাচ্ছিলেন না। ক্ষমতা, মুঘল সম্পদ, পদাধিকার বিতরণের নিয়ন্ত্রক হয়েও দুই ভায়ের বিরুদ্ধে অভিযানের পাঠানো বাহিনীর সেনাপতি খুঁজতে তাঁকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলতে হল। বাধ্য হয়ে অসুস্থ সম্রাটের উপস্থিতিতে একের পর এক সেনানায়ককে নেতৃত্ব দিতে ডাকা হলে প্রত্যেকেই বিনীতভাবে দুই বাহিনীর পদ না নেওয়ার বিনীত সিদ্ধান্ত জানালেন। তাঁদের বক্তব্য দারার নেতৃত্বে তাঁরা শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও লড়াই করতে বদ্ধ পরিকর, কিন্তু অন্য শাহজাদার রক্ত ঝরাতে উৎসাহী নন।
অথচ আওরঙ্গজেবের শিবিরে সেনানায়কদের যোগ দেওয়ার বার্তা আসার বিরাম নেই। আগামী দিনের কর্মপদ্ধতি বিষয়ে মনস্থির করতে না পারলেও দরবারি সেনাপতিদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করলেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই আওরঙ্গজেব আমলা, সেনাপতিদের সম্মান করতেন, তাঁদের সঙ্গে নিচুস্বরে কথা বলতেন, অধিকাংশ আমলার পছন্দের নেতা ছিলেন তিনি। দরবারে অনুপস্থিত থাকা আওরঙ্গজেবের স্বার্থ রক্ষায় তাঁরা সচেষ্ট থাকতেন। সম্রাট জানতেন, দারাও হাড়ে হাড়ে জানতেন। রুকাতইআলমগিরিতে দারা, শাহজাহানের বক্তব্য উল্লেখ করে বলছেন আওরঙ্গজেব ‘অভিজাততন্ত্র আর রাষ্ট্রের রক্ষকদের মন জয় করেছে। সে গোপনে চিঠিপত্রের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে’।
আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে নতুন সেনা ভর্তির কাজ পুরোদমে চলছিল এক মাসের অগ্রিম বেতন দিয়ে। খণ্ডেশে মহম্মদ বেগকে বলা হল যত বেশি সম্ভব বুন্দেলা পদাতিক এবং বাক্সারিয়া [বিহারের বক্সার অঞ্চলের] গোলান্দাজ নিয়োগ করতে। ২০০০ মন সোরা কেনার জন্যে বালাপুরে আর আরসেনিক কেনার জন্যে সুরাটে দুজন আমলা পাঠানো হল। এগুলো দিয়ে বুরহানপুরে বারুদ তৈরি হবে। মোট ৩০০০০ সেনা নিয়ে বহু মারাঠা গোষ্ঠীপতি আওরঙ্গজেবের সঙ্গে যোগ দিলেন। মীর জুমলার ব্রিটিশ আর ফরাসী গোলান্দাজও বাহিনীতে ছিল।
যদুনাথ সরকার বলছেন আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে হাতিয়ারের জোর তো ছিলই, কিন্তু সেনাপতিদের বৈচিত্রও দেখার মত ছিল। কেন্দ্রিয় সরকারে বঞ্চিত গোষ্ঠী, হাবসি গোষ্ঠীকে আওরঙ্গজেব প্রথম ১৬৩৬এ নিজের প্রাসাদে কাজে নিযুক্ত করেন। দক্ষিণের মুঘল বাহিনীতে হাবসিদের অন্তর্ভূক্তি নিয়ে আগে বিশদে আলোচনা করেছি। আওরঙ্গজেবের সিংহাসন যুদ্ধ জয়ে হাবসিদের অবদান কম নয়। আওরঙ্গজেব আফগানদেরও প্রভূত পৃষ্ঠপোষকতা করেন। এই বিষয়টাও আগে উল্লেখ করেছি। আতহার আলির আওরঙ্গজেবের সময় মুঘল অভিজাত শ্রেণী (অনু অরুণ কুমার দে) বই থেকে আফগান-মুঘল সম্পর্ক বিষয়ে আরও কিছু বিষয় উল্লেখ করলাম ‘অল্পস্থায়ী শূর সাম্রাজ্যের পর মুঘল সাম্রাজ্য পুণঃস্থাপিত হইলে, মুঘলগণ তাহাদিগকে সর্বদাই সন্দেহ করিত। আকবর তাহাদের অধিকাংশের সহিত নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখিয়া চলিতেন। তবুও জাহাঙ্গীর খান-ই জাহান লোদীকে যে মর্যাদা দান করিয়াছিলেন তাহা হইতেই প্রমাণ হয় যে তিনি আফঘানগণকে সুনজরেই দেখিতেন। কিন্তু খান-ই জাহান লোদীর বিদ্রোহের পর শাহজাহানের রাজত্বে তাহাদের ক্ষমতা কমিতে থাকে এবং সম্রাটও তাহাদের প্রতি সন্দিহান হইয়া উঠেন। যুবরাজ হিসাবে ঔরঙ্গজেব আফঘানদের স্বপক্ষে টানিতে সচেষ্ট হইয়াছিলেন। একটি পত্র তিনি এই বিস্ময় প্রকাশ করিয়াছেন যে, সম্রাট একজন আফগান কর্মচারীর পদোন্নতির ক্ষেত্রে তাঁহার প্রস্তাব শুধুমাত্র জাতিগত কারণেই অগ্রাহ্য করিয়াছিলেন। আরও উল্লেখযোগ্য ঘটনা হইল এই যে ঔরঙ্গজেবকে সমুগড়ের যুদ্ধ পর্যন্ত সাহায্য করিয়াছিল এরূপ ১০০০ ও তদূর্ধ্ব জাট পদাধিকারী ১২৪ অমাত্যের মধ্যে ২৩ জন ছিল আফঘান। অপর পক্ষে দারা শুকোর অধীনস্থ উক্ত পদাধিকারী ৮৭ জন অমাত্যের মধ্যে তাহাদের সংখ্যা ছিল ১। আবুল ফজল মানুরীর মতে, আফঘানেরা যাহাতে বেশী পদোন্নতি লাভ করিতে না পারে সে জন্যে ঔরঙ্গজেব তাঁহার রাজত্বের গোড়ার দিকে কঠোর দৃষ্টি রাখিয়াছিলেন। ১৬৫৮-৭৮ বর্ষ সীমায় ১০০০ ও তদূর্ধ্ব পদাধিকারী মনসবদারদের তালিকায় মোট ৪৮৬ জনের মধ্যে আফঘান কর্মচারীর সদংখ্যা ৪৩ এবং ১৬৭৯-১৭০৭ বর্ষ সীমায় মোট ৫৭৫ জনের মধ্যে তাহাদের সংখ্যা ৩৪। এই সংখ্যা হ্রাসের কারণ সম্ভবতঃ নিম্নতর মনসবদারদের তালিকার অসম্পূর্ণতা। অতএব দেখা যাইতেছে যে, ১৬৫৮-১৭০৭ ও তদূর্ধ্ব পদাধিকারী আফঘান মনসবদারগণের সংখ্যা ৩ এবং ১৬৭৯-১৭০৭ খ্রীঃ অব্দে সমমর্যাদাভোগী আফঘান মনসবদাররের সংখ্যা কমপক্ষে ১০। ঔরঙ্গজেবের রাজত্বের পরবর্তী বৎসরগুলিতে আফঘান অভিজাতদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যা বৃদ্ধির কারণ এই যে পূর্বে যাহারা বিজাপুরের অধীনে কার্য করিত তাহাদিগকেই অধিক সংখ্যায় নিযুক্ত করা হইয়াছিল’।
আওরঙ্গজেব যে বাহিনী নিয়ে উত্তরের সিংহাসনের লড়াইতে অংশ নিতে রওনা হলেন, সেই বাহিনীতে ছিলেন দেওয়ান প্রথম মুর্শিদকুলি খান, শেখ মীর সেনাপতি এবং পরামর্শদাতা, ওয়াকিয়াতইআলমগিরির (সিংহাসন দখল যুদ্ধের ইতিহাস) লেখক সচিব আকিল খান রাজি, সচিব কাবিল খান, খানইখানান এবং গোলান্দাজিখানার ভারপ্রাপ্ত মহম্মদ তাহির, প্রবীণ উজির খান, বিশ্বস্ত মুনসি ঈশা বেগ ভবিষ্যতের মুখলিস খান, উচ্চবংশীয় শামসুদ্দিন মুখতার খান এবং সবার ওপরে মীর জুমলার বাহিনী। শাহী বাহিনী থেকে এলেন মুলতাফত খান এবং তাঁর দক্ষ পুত্র হুসধর খান, নাজাবত খান, সম্প্রতি দক্ষিণের মালওয়ায় আসা কাজি নিজামা। কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন মালওয়ার রাজপুর ধামধেরার রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন। ছিলেন বিকানীরের রাজা কর্ণ রাও, বুন্দেলা দাতিয়া গোষ্ঠীর নেতা দলপত রাওএর বাবা সুবকর্ণও।
আওরঙ্গজেব দক্ষিণ ছাড়ার আগে কর্ণাটক থেকে বাহিনীসহ ডাকিয়ে এনে দক্ষিণের মুঘল ছাউনির নিরাপত্তার ভার দিলেন শাহ বেগ খানকে। দুজন নামী সেনাপতিকে রেখে মুয়াজ্জমকে ভার দিলেন আওরঙ্গাবাদ রক্ষায়।
দারার সমস্যা ছিল তার দরবারের সেনাপতিরা
ঐতিহাসিক কালিকারঞ্জন কানুনগো লিখছেন ‘দরবারে উপস্থিত সেনানীমণ্ডলের মধ্যে দারার মিত্র অপেক্ষা গুপ্ত শত্রুই ছিল বেশি’। শাহজাহান শ্বশুর ইতিমদ্দৌলার সম্পত্তির একাংশ শ্যালক শায়েস্তা খানকে বঞ্চিত করে প্রিয় পুত্র দারাকে দিয়েছিলেন। জামাই সম্রাটের কাজে গুরুত্বপূর্ণ খানজাদা শায়েস্তা খান ক্ষুব্ধ ছিলেন। মালওয়ার সুবাদারি শায়েস্তা খানের হাত থেকে কেড়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে দরবারে ডাকিয়ে আনলেন। সম্রাটকে শিখণ্ডী খাড়া করে মামা শায়েস্তা খানকে বেনজির অপমান করলেন। মুঘল ইতিহাসের তৃতীয় সিংহাসনের লড়াইতে আওরঙ্গজেবের দলে ভিড়লেন মামা শায়েস্তা খান। মেসোমশাই খালিলুল্লা খানকে দারা খোলা দরবারে জুতোর ছোপটি মেরেছিলেন। এই অপমান খালিলুল্লা খান ভোলেন নি। আরেক মেসো জাফর খানও দারার আচরণে পারিবারিকভাবে সুখে ছিলেন না। তার রোষ ছিল দারার ওপরে। মীর আতিশের কাশিম খানের ভয় ছিল দারা ক্ষমতায় এলে তাকে টপকে জাফর খানকে মীর আতিশ করবে। শাহজাহানের মামার বাড়ি রাঠোর, কাছোয়ারাও আকবরের সময় থেকে মুঘল অনুগত। কিন্তু জয় সিংহ মুঘল আক্রমনে ব্যতিব্যস্ত হয়ে আওরঙ্গজেবের দিকে ঝুঁকলেন। তিনি দক্ষিণে আওরঙ্গজেবের কাছে পর পর দুই দূত পাঠিয়ে বন্ধুত্বের প্রস্তাব দিলেন। আওরঙ্গজেব তাঁকে খেলাত, হাতি আর হিরের আংটি পাঠিয়ে সুদিনের প্রতীক্ষা করার জন্যে অনুরোধ করলেন। তাছাড়া জয় সিংহ আর যশোবন্ত সিংহের মধ্যে অহংএর লড়াই চলছিল রাজা, মহারাজা উপাধি নিয়ে। মির্জা রাজা নিজেকে উপেক্ষিত মনে করলেন।
দারা সামগ্রিকভাবে মুসলমান সমাজকে খেপিয়ে তুলেছিলেন। মুনিস ফারুকি, প্রিন্সেস ইন মুঘল ইন্ডিয়ায় বলছেন সাম্রাজ্যজুড়ে অধিকাংশ মানুষ দারাকে ইসলামধর্মতত্ত্ব বিরোধী শাহজাদা হিসেবেই দেখত। জনমানসে দারার ইসলাম বিরোধী শাহজাদা হিসেবে যে ছবি তৈরি হয়েছিল, জীবনের শেষের দিকে বিভিন্ন তরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে সেই ধারণা বদলাবার চেষ্টা করেছেন। সমস্যা হল তিনি শুধুই কাদিরি তরিকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেছেন। কাদিরিদের দারা সর্বশক্তিমানের আশীর্বাদ হিসেবে গণ্য করতেন (দারা শুকো, সাকিনাতুলআউলিয়ায়[সম্পা তারা চাঁদ, রেজা জিলানি নাইনি] God’s grace in this world and the next)। এর প্রভাব আমরা পাই তার ছদ্মনাম নেওয়ার সিদ্ধান্তে। কবিতা লিখতে তিনি কাদিরি সমাজ প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আবদুল কাদির জিলানি, দারার আতলিক মিঞা মীর বা মুল্লা শাহ বখশের স্মরণে কাদিরি’ ছদ্মনাম নিয়েছেন।
তো শেষ পর্যন্ত দুই ভায়ের বিরুদ্ধে দুটি মুঘল সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দিতে পাওয়া গেল কাশিম খান আর যশোবন্ত সিংহকে।
তৃতীয় সিংহাসনের লড়াইতে আওরঙ্গজেব সক্রিয় হলেন
মুরাদ বখশের সিংহাসনের আরোহন আর মীর জুমলার গ্রেফতারির সংবাদে অসুস্থ সম্রাট দুই পুত্রকে তীব্র তিরষ্কার করে আনুগত্য আর দায়িত্ববোধের পথে ফিরতে চিঠি লিখলেন। কিন্তু পুত্রদের বদ্ধ বিশ্বাস চিঠিগুলো লিখছে সম্রাটের বকলমে দারা শুকো। তারা রাজধানীতে সম্রাটের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে সম্মান জানাতে, দারার বিরুদ্ধে মহড়া নিতে বদ্ধ পরিকর।
সম্রাটের অসুস্থতার সংবাদ পাওয়ার সময় থেকে আওরঙ্গজেব উদ্দেশ্যমূলকভাবে চুপ ছিলেন। আমরা আগেই বলেছি চুপচাপ থাকার মধ্যেই নিজের বাহিনীর জোর বাড়িয়েছেন, সামরিক সরঞ্জাম জোগাড় করেছেন, জমিদারদের পাশে টেনেছেন, দারার পাশে থাকা দরবারি অভিজাতদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা চালিয়ে তাদের দলে নিয়েছেন।
নির্বাচিত দুই সেনাপতি যশোবন্ত সিংহ আর কাশিম খানকে শাহী বাহিনী নিয়ে মালওয়ায় যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হল। তাদের মালওয়া পৌঁছনোর সংবাদ পেয়ে আওরঙ্গজেব ঠিক করলেন তাঁর চুপচাপ অপেক্ষার সময় এবার শেষ হয়েছে। এর বেশি সময় নিলে দারাকে জমিদারদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হবে। তাঁর নিষ্ক্রিয়তার বার্তা ছড়িয়ে পড়তেও দেরি হবে না। আওরঙ্গজেব অভিযান শুরু করার জন্যে মুরাদকে বার্তা পাঠিয়ে ২৫ জানুয়ারি ১৬৫৮য় তিনি বড় ছেলেকে অগ্রগামী বাহিনীর নেতা করে বুরহানপুরে পাঠালেন। এর এগারো দিন বাদে ২ ফেব্রুয়ারি বাকি বাহিনী নিয়ে আওরঙ্গজেব স্বয়ং আওরঙ্গাবাদের দিকে এগিয়ে চললেন। এই প্রথম দরবারের প্রাতিষ্ঠানিক অনুমতি ছাড়া তিনি সাম্রাজ্যের পদ বণ্টন করার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলেন। মুয়াজ্জমকে তিনি দক্ষিণের সুবাদার আর ওয়াজির খানকে খণ্ডেশের সুবাদার নিয়োগ করে হিন্দুস্তানের সম্রাট হিসেবে তার প্রথম পদ বন্টনের কাজ শুরু করলেন।
আওরঙ্গজেব, শাহজাহানের শরীরের কুশল প্রশ্ন করে চিঠি লিখে আশা প্রকাশ করলেন সম্রাট নিশ্চয়ই শীঘ্র সেরে উঠবেন এবং সাম্রাজ্য পরিচালনায় তাঁর উপস্থিতি সত্ত্বেও দারা যে দখলদারি চালাচ্ছে, তার থেকে মুক্ত হয়ে নিজেই প্রশাসনের হাল ধরবেন। দরবার থেকে তাঁর কাছে পৌঁছনো ঘটনাবলীর ইঙ্গিতে তাঁর উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠার যথেষ্ট কারন ছিল। ইতিমধ্যে আওরঙ্গজেবের দরবারে উকিল ঈশা বেগ আগরা থেকে উপস্থিত হয়ে তাঁর দুর্বিসহ অভিজ্ঞতা জানালেন। তিনি চাকরিদাতাকে বললেন কীভাবে সম্রাট অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং কীভাবে তিনি নিজেকে নিষ্ক্রিয় রেখে দারাকে তাঁর নামে সমস্ত কাজ সম্পাদন করার অধিকার দিয়েছেন। ঈশা বেগ আওরঙ্গজেবকে আরও সক্রিয় হওয়ার নিবেদন করে বললেন, দিল্লির বহু উচ্চপদস্থ সেনাপতি তাঁর মাধ্যমে অবিলম্বে শাহজাদাকে রাজধানী অভিযান করে দরবারে সম্রাটের উপস্থিতিতে দারার একচ্ছত্র আধিপত্য খর্ব করার আর্জি জানিয়েছেন।
অবশেষে বুরহানপুর থেকে আওরঙ্গজেব ২০ মার্চ রওনা হয়ে বড় ছেলেকে বাগী শ্বশুর শাহনাওয়াজ খানকে বন্দী করার নির্দেশ দিলেন। ২৬ মার্চ থেকে শ্বশুর শাহনাওয়াজ প্রায় ৭ মাস বন্দী থাকবেন। মাণ্ডয়া থেকে দুটি রাস্তা হিন্দুস্তানের দিকে গিয়েছে – একটি উত্তর-পূর্বে নর্মদা পার করেছে হান্দিয়ায় আরেকটি উত্তর পশ্চিমে নর্মদা পার করেছে আকবরপুরে। আওরঙ্গজেব আকবর পুরে নদী পার করে ৩ এপ্রিল উজ্জয়নী দিকে অভিযান চালালেন। ১৩য় দেপালপুরে পৌঁছে খবর পেলেন ভাই মুরাদের বাহিনী তার কয়েক মাইল দূরে আছেন, যেকোনও সময় তাঁর বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিতে পারেন। দেপালপুরেই দুই ভায়ের মিলন হল। তারা চললেন উজ্জয়িনীতে যশোবন্তের বাহিনীর মুখোমুখি হতে। যশোবন্ত এক দিনের রাস্তা আগে ছিলেন। চম্বলের শাখা নদী গম্ভীরায় তারা মুখোমুখি হয়ে পরের দিন থেকে যুদ্ধ আরম্ভের সিদ্ধান্ত নিলেন।
অন্যদিকে যশোবন্ত ধারমতে পৌঁছলেন ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি। তিনি আওরঙ্গজেবের রণনীতি বিষয়ে বহুকাল আঁধারে ছিলেন। মুরাদের এগিয়ে আসার সংবাদ পেলেও আওরঙ্গজেবের অগ্রগতির কোনও সংবাদই পাচ্ছিলেন না, শুধু মাণ্ডু থেকে আসা একটি চিঠিতে সংবাদ পেলেন আওরঙ্গজেব নর্মদা পেরোচ্ছেন। আওরঙ্গজেবের আসার পথে, ধর থেকে একটী বাহিনী খুব তাড়াতাড়ি এসে যশোবন্তকে সেই খবরটাই দিল। আওরঙ্গজেব তাঁর অভিযানকে এতই গোপনীয়তার মুড়ে রেখেছিলেন যে তিনি মালওয়া পেরিয়ে যখন উজ্জয়নীর দিকে অভিযান করছেন, তখনই একমাত্র যশোবন্ত আওরঙ্গজেবের আসার সংবাদ পেলেন। অন্যদিকে মুরাদের অবস্থান থেকে তিনি বুঝলেন দুই ভাই একযোগে শাহী বাহিনীর ওপরে আক্রমন নামিয়ে আনবেন।
যশোবন্ত সিংহ তাঁর অজান্তে আওরঙ্গজবের এতদূর অগ্রগতির সংবাদে হতবাক! রণনীতি ঠিক করতে না পেরে উজ্জয়নী ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করলেন। সেখানে ছিলেন আওরঙ্গজেবের ব্রাহ্মণ দূত কবি রাই। তিনি যশোবন্তকে শান্তিপূর্ণভাবে যোধপুরে ফিরে যাওয়ার আওরঙ্গজেবের বার্তা দিলেন। আওরঙ্গজেব লিখলেন তিনি অসুস্থ বাবার সঙ্গে দেখা করতে রাজধানী যাচ্ছেন, তাঁর অন্য উদ্দেশ্য নেই। যশোবন্ত পাল্টা চিঠিতে লিখলেন, ‘আমি সম্রাটের নির্দেশ পালন করছিমাত্র। অসম্মানসূচক পশ্চাদপসরণে উৎসাহী নই’।
যশোবন্ত দক্ষিণ থেকে শত্রুর আগমন পথ আন্দাজ করে উজ্জয়নের ১৪ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে ধারমতের উল্টো দিকে শিবির ফেললেন। এখানে তিনি আরও একটা প্রবল ভয়ানক সংবাদ পেলেন – ১৪ এপ্রিল মুরাদ, আওরঙ্গজেবের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। দুই শাহজাদার যৌথ বাহিনী এক যোগে শাহী বাহিনীর মহড়া নেওয়ার জন্যে তৈরি। কয়েক দিনের মধ্যেই সেখানে তাঁরা পৌঁছবে। গোয়েন্দাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী যশোবন্তের ধারণা হয়েছিল দুই ভাই আলাদা আলাদা ভাবে শাহী বাহিনীকে আক্রমন করবে – তিনি এবং কাসিম খান আলাদাভাবে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে লড়বেন। এবং দরবার থেকেও যখন তাদের পাঠানো হয়, তখনও তাঁদের দুটো আলাদা আলাদা করে দুই শাহজাদার দুটো বাহিনীকে আলাদা মোকাবিলা করার ধারণা দেওয়া হয়েছিল। সেইভাবে তিনি রণনীতি তৈরি করেছেন। দুই ভাই যে গোপনে হাত মিলিয়ে শাহী বাহিনীর মোকাবিলা করতে পারে, সে ধারণা তার মনে ঘুণাক্ষরেও উদয় হয় নি। তাঁর পক্ষে এক যোগে দুই বাহিনীর মোকাবিলা করা কীভাবে সম্ভব, শিয়রে শমন নিয়ে শাহী সেনাপতি সেই রণনীতি কষতে শুরু করলেন। (চলবে)