| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ইফতিতাইসুলতানিওয়াশুল-ই-কুল : আকবর এবং আওরঙ্গজেব (১০২ নং কিস্তি) : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ২৩১ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২

যশোবন্ত, আওরঙ্গজেবের কাছে প্রণত হলেন

কালিকারঞ্জন কানুনগো শাহজাদা দারাশুকোতে লিখছেন, ‘মহারাজা যশোবন্ত ও কাশিম খাঁ পরিচালিত সেনাবাহিনী আগরা হইতে মামুলি চালে কুচ করিয়া প্রায় দুইমাস পরে ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে (১৬৫৮ খ্রিঃ) শিপ্রাতীরে উপস্থিত হইল। আওরঙ্গজেব তখনও বহু দূরে — খান্দেশের রাজধানী বুরহানপুর অতিক্রম করেন নাই। নর্মদার দক্ষিণ তীর হইতে কোনও সংবাদ বাদশাহী ফৌজের কাছে পৌঁছাইবার সর্ববিধ উপায় অনাগতবিধাতা আওরঙ্গজেব অনেক পূর্বেই বন্ধ করিয়াছেন, অথচ কাশিম খাঁ ও যশবন্তের গতিবিধি তাঁহার নিকট প্রত্যক্ষ্যবৎ, যেহেতু তাঁহার চরের দূরবীনের পাল্লায় আগরাই ছিল নিকটতম স্থান। যুদ্ধ করিতে আসিয়া যশোবন্ত অকূল পাথারে পড়িলেন, শত্রু কোথায় কখন এবং কোন পথে আসিবে তিনি ভাবিয়া পাইলেন না; বাদশাহি হরকরা বা গুপ্তচরসমূহ তাঁহাকে কোনও নির্ভরযোগ্য সংবাদ দিতে পারিল না। একবার পশ্চিমে, একবার দক্ষিণে লক্ষ্যহীনভাবে কুচ করিয়া বাদশাহী ফৌজ হয়রান হইইয়া গেল; অবশেষে উজ্জয়নীতে শিবির স্থাপন করিয়া শত্রুর আগমন প্রতীক্ষা করাই যুক্তিযুক্ত বিবেচনা করিলেন। … কোন বুদ্ধিতে যশোবন্ত উজ্জয়নীতে ঘাঁটি স্থাপন করিয়া আওরঙ্গজেব ও মোরাদকে ঠেকাইবে ভাবিয়াছিলেন বলা যায় না। তাঁহার প্রধান শিবির মাণ্ডুর কাছে থাকিলে তিনি হয়ত আওরঙ্গজেবকে নর্মদার তীরে আটকাইয়া মোরাদকে একাকী যুদ্ধ করিবার জন্যে বাধ্য করিতে পারিতেন। যশোবন্ত মাণ্ডুর ফৌজদার রাজা শিবরামের উপর নির্ভর নর্মদার তীরে পাহারার ভার অর্পণ করিয়া এবং মাণ্ডু ও ধারার মধ্যবর্তী স্থানে কয়েকটি থানা বসাইয়া উজ্জয়নীতে নিশ্চেষ্ট হইয়া রহিলেন, অথচ এই চালে যুদ্ধের পূর্বেই তিনি পরাজয় বরণ করিয়া লইয়াছেন এ কথা বুঝিতে পারিলেন না। …আওরঙ্গজেব বিনা বাধায় দাক্ষিণাত্য বাহিনীকে নর্মদা পার করাইয়া (৩রা এপ্রিল ১৬৫৮) মাণ্ডু ও ধারা অধিকার করিলেন; ইতস্তত বিক্ষিপ্ত বাদশাহি থানা জোয়ারের মুখে বালির বাঁধের ন্যায় ভাসিয়া গেল। রাজা শিবরামের ভগ্নদূত যশবন্তের শিবিরে পৌঁছিবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে আওরঙ্গজেবের অগ্রগামী সেনাদল উজ্জয়নীর বিশ মাইলের মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছিল। তাঁহাকে বাধা দিবার জন্যে যশোবন্ত ও কাশিম খাঁ উজ্জয়নীর ঈষৎ পশ্চিম-দক্ষিণে ১৪ মাইল দূরে ধর্মাত(বর্তমান ফতেয়াবাদ) নামক স্থানে যুদ্ধার্থে অগ্রসর হইলেন। গুজরাট বাহিনীর কোনও সংবাদ তখন পর্যন্ত যশবন্তের কাছে পৌঁছয় নাই; পরে শুনিলেন শাহজাদা মোরাদ ধর্মাত হইতে এক মঞ্জিল (৫/৬ মাইল) ব্যবধানে বাদশাহি ফৌজের কান ঘেঁষিয়া দক্ষিণ দিকে চলিয়া গিয়াছেন এবং ১৪ এপ্রিল চম্বলের উপনদী গম্ভীরার তীরে আওরঙ্গজেবের সহিত একত্র হইয়া যুদ্ধের আয়োজন করিতেছেন’।

কালিকারঞ্জন উক্ত বইতে যশোবন্তের হতবুদ্ধিকর সেনা সজ্জা বিষয়ে লিখছেন, ‘…খোলা ময়দানে অবিলম্বে শত্রুপক্ষকে আক্রমন না করিয়া আত্মরক্ষামূলক যুদ্ধ করিবার জন্যে মহারাজা যশোবন্ত এমন এক স্থানে সেনাব্যুহ স্থাপন করিলেন যেখানে তাঁহার প্রধান ভরসা অশ্বারোহীবাহিনীর গতিবেগ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ এবং যুদ্ধকৌশল নিষ্ক্রিয় হইয়া পড়িল। ধর্মাত বা বর্তমান ফতেয়াবাদের কিঞ্চিৎ পশ্চিমে নিম্নভূমির মধ্যভাগে একটি দ্বীপের মতো অপরিসর উচ্চভূমিতে ঠাসাঠাসি ভাবে বাদশাহি তোপখানা ও অশ্বারোহী স্থান গ্রহণ করিয়াছিল। ইহার প্রায় তিন দিক জলাভূমিবেষ্টিত। ব্যূহের আশেপাশে যে জায়গায় ফাঁক ছিল, নৈশ আক্রমণের ভয়ে সে জায়গায় পরিখা খনন করিয়া ১৪ এপ্রিল দিবাভাগে উহা শত্রুর পক্ষে দুর্ভেদ্য করা হইয়াছিল। ইহাই হইল যেন বোতলের পেটে প্রবিষ্ট যশোবন্তের স্বখাত সলিলে ডুবিবার ব্যবস্থা। সম্মুখে সংকীর্ণ নির্গম পথে বাদশাহি তোপখানা পথ আগলাইয়া রহিল, উহার পশ্চাতে সুসজ্জিত বাদশাহি হরাবল বা অগ্রগামী অশ্বাদি। প্রধানত তোপখানার উপর ভরসা করিয়া বোধ হয় কাশিম খাঁর পরামর্শে যশবন্ত এইরূপ স্থানে সৈন্যসজ্জা করিয়াছিলেন; কিন্তু সিংহের নিরাপত্তা ও বিক্রম গুহার বাইরে অন্তহীন অরণ্যানীর মধ্যে, ভিতরে পশুরাজের অসহায় অবস্থা। আওরঙ্গজেব বুঝিলেন রাজপুত বরাহ ভয়ভীত হইয়া মরণের ফাঁদে পা দিয়াছে’।

১৫ এপ্রিল সকালে আওরঙ্গজেব-মুরাদের যৌথ বাহিনী যশোবন্ত সিংহের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে রওনা হওয়ার মুহূর্তে, প্রধান সেনাপতি আওরঙ্গজেব যশোবন্তের ক্ষমাভিক্ষার চিঠি পেলেন। হয়ত যুবা যশোবন্ত শাহী সেনা সজ্জার সমস্যা বুঝে কিছুটা সময় চেয়ে কৌশলে ক্ষমাভিক্ষার চিঠি পাঠালেন  ‘আমি যুদ্ধ চাইনা, আপনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ধৃষ্টতা যেন আমার না হয়। আমার উদ্দেশ্য আপনার সঙ্গে দেখা করে আপনার সেবা করা। আপনি যদি আমায় ক্ষমা করেন, তাহলে আমি সশরীরের আপনার শিবিরে উপস্থিত হয়ে, আপনার ডাকের জন্যে অপেক্ষা করব’। এই কৌশলী চিঠি পাঠিয়ে তাঁর হয়ত ধারণা হয়ে ছিল আওরঙ্গজেব তাঁর ‘আর্তি’ শুনে হয়ত যুদ্ধ মুলতুবি রেখে তাঁকে দু’চারদিন সময় দিয়ে ডাকবেন। কিন্তু ৪০ বছরের মাঠেঘাটে পোড় খাওয়া যুবা সেনানায়ক আওরঙ্গজেব এই ধরণের কৌশলে প্রতারিত হন না। তিনি জানেন তাঁর বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে যথেষ্ট শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। শত্রুর কোনও ছলে পা দিয়ে, তাকে সমরসজ্জা গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিতে তিনি অনাগ্রহী। আওরঙ্গজেব যশোবন্ত সিংহকে স্পষ্ট জানালেন তাঁর বাহিনী যুদ্ধের জন্যে তৈরি। তিনি ধরেই নিচ্ছেন, সেনানায়ক যশোবন্ত সত্য বাক্যে ক্ষমাভিক্ষার আবেদন করেছেন। যশোবন্ত যদি সত্যি সত্যি ক্ষমা চান, তাহলে তাঁর প্রস্তাব হল, শাহী সেনাধ্যক্ষ অশস্ত্র অবস্থায় একা এসে সেনাপতি নাজাবত খানের সঙ্গে দেখা করুন; নাজাবত খান তাকে শাহজাদা মহম্মদ সুলতানের কাছে নিয়ে যাবেন এবং সেখানেই তিনি বিধিবদ্ধভাবে ক্ষমা অর্জন করবেন।

হয়ত রাঠোড় গোষ্ঠীর যুবা প্রধান, আওরঙ্গজেবের থেকে এই ধরণের পেশাদারি, চক্রান্ত উন্মোচনকারী উত্তর আশা করেন নি। সুবাদারের অসম্মানজনক প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তিনি কী পদক্ষেপ করবেন ভেবে পেলেন না। সেনাপতির আত্মবিশ্বাস তলানিতে পৌঁছল। তিনি মালওয়া ফিরে এলেন। তিনি সম্রাটের মত তখনও আশা করেন মালওয়ায় বিশাল শাহী বাহিনী দেখে বিদ্রোহী দুই শাহজাদা নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে সুবায় ফিরে যাবেন। উলটে তিনি মালয়ায় পৌঁছে শুনলেন যুক্ত বাহিনী তাঁর পিছু ছাড়ে নি। তাছাড়া যশোবন্ত শাহী নির্দেশে তড়িঘড়ি যে বাহিনী বাধ্য হয়ে এককাট্টা করেছেন, সেই বাহিনীর সব সেনাপতি তার নেতৃত্ব নিঃসঙ্কোচে মেনে নিতে উৎসাহী নন। তিনি জয় সিংহের মত সর্বজনমান্য সেনাপতি নন। তাছাড়া আওরঙ্গজেব লড়ছেন নিজের প্রণোদনায় আর যশোবন্ত লড়ছেন শাহজাহানের নির্দেশে, বাধ্য হয়ে।

শুরু হল তৃতীয় সিংহাসনের লড়ায়ের প্রথম যুদ্ধ, ধারমতের যুদ্ধ প্রস্তুতি

শেষ পর্যন্ত যশোবন্তের আর পিছিয়ে যাওয়ার উপায় না থাকায় শাহী আর বিদ্রোহী যুক্ত বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ শুরু হল। যশোবন্তের গোলান্দাজেরা ইতিমধ্যেই নানান কারনে ক্ষুব্ধ; তাছাড়া শত্রুকে মোকাবেলা করার জন্যে যে পরিমান গোলান্দাজ বাহিনী থাকার দরকার সেটা শাহী বাহিনী গুছিয়ে উঠতে পারে নি। তাছাড়া আগেই বলেছি খোদ প্রধান সেনাপতিই হতদ্যম। গোটা বাহিনীই যেন যুদ্ধের আগে হেরে বসে আছে। যদুনাথ সরকার ঈশ্বরদাসকে নাগরকে উদ্ধৃত করে লিখছেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের রাতে জনৈক গোলান্দাজ প্রধান আসকরণ কীর্তিবন্ত রাতেই গোপনে শত্রুর কামান দখলের প্রস্তাব দিলে যশোবন্ত সে প্রস্তাব উড়িয়ে দিয়ে বললেন তিনি এমন রণনীতি তৈরি করেছেন যে তার ফলে বিপক্ষের গোলন্দাজেরা গোলা ফেলারই সুযোগ পাবে না। শাহী বাহিনীর একজনও সেনা হতাহত হবে না।

নিজের পদাতিক আর অশ্বারোহীকে সক্রিয় করে হাতাহাতি যুদ্ধ করে বিপক্ষের গোলান্দাজদের নিষ্ক্রিয় করার নীতি জলে গেল। তার জন্যে দরকার ছিল সুচারু রণনীতি – যা তার মত চাকুরীজীবীর পক্ষে করা সম্ভব হয় নি। শাহী বাহিনী আক্রমন করার আগেই বিদ্রোহী আওরঙ্গজেবের ব্রিটিশ আর ফরাসি গোলান্দাজেরা শাহী বাহিনীতে ত্রাস ধরিয়ে দিল। বিপক্ষের কিছু পদাতিক আর ঘোড়সওয়ার আওরঙ্গজেবের বাহিনীর কামান এড়িয়ে বিদ্রোহী এলাকায় ঢুকে পড়ার পড়ায় ব্রিটিশ আর ফরাসি গোলান্দাজেরা কামান পাশে ঘুরিয়ে তাদের ওপর তীব্র গোলান্দাজ করতে থাকে। বহু শাহী সেনা নিহত হল।

আমরা কালিকারঞ্জন কানুনগোর উদ্ধৃতি থেকে জানিয়েছি যশোবন্ত যে জমিতে দাঁড়িয়েছিলেন সেটি সমান ছিল না, এবড়োখেবড়ো ছিল। তাছাড়া তিনি অদ্ভুত রণনীতিতে নিজের বাহিনীর সামনের অঞ্চলে ২০০ গজের বিশাল পরিখা খুঁড়ে, তাতে জল ভর্তি করে রেখেছিলেন। ফলে গোটা এলাকা কাদা হয়েছিল। তার ধারণা হয়েছিল এর ফলে শত্রুর বাহিনী এগোবার সুযোগ পাবে না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখাগেল তারাই নিজেদের খোঁড়া পরিখায় বদ্ধ হয়ে আছেন।

দুই বাহিনীর সেনার পরিমান ছিল আওরঙ্গজেবের ২০,০০০, মুরাদের ১০,০০০। শাহী বাহিনীর পরিমান নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতৈক্য হয় নি, যদুনাথ সরকার আন্দাজ করছেন ৩৫,০০০। আওরঙ্গজেবের বাহিনীর অগ্রগামী সেনার নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন শাহজাদা মহম্মদ সুলতান, নাজাবত খান, আর সামনের কামানের দায়িত্বে জুলফিকার খান। মুরাদের ডান দিকে মুর্শিদকুলি খান গোলান্দাজ বাহিনীর নেতৃত্বে আর বাঁদিকে মুলতাফত খান এবং বালক শাহজাদা মহম্মদ আজম। সামনের রক্ষণব্যুহ ইলতিমসতে আছেন মুর্তাজা খান এবং কেন্দ্রে স্বয়ং আওরঙ্গজেব। তাঁর ডান দিকে শেখ মীর আর ডান দিকের রক্ষণে আছেন সৈফ সিখন খান। সিখন খানের বাহিনীতে বেশ কিছু কামান দেওয়া ছিল। এক্কেবারে সামনে ছিল শাহী শিকার বাহিনী আর স্কাউট সেনারা।

যশোবন্তের ১০০০০ সেনার অগ্রগামী বাহিনী দুটি কলমে বিভক্ত ছিল। এক দিকে কাশিম খান অন্য দিকে মুকুন্দ সিংহ হাদার নেতৃত্বে বেশ কিছু অমুসলমান সেনানী। যশোবন্ত ২০০০ সেনানী নিয়ে মাঝখানে অবস্থান করছেন। ডান দিকে রাজা রাই সিং শিশোদিয়া আর বাঁদিকে ইফতিকার খান। গৌড় আর রাঠোড় সেনাদের এক্কেবারে সামনে রাখা হল।

যুদ্ধ শুরু

১৫ এপ্রিল ১৬৫৮ দুই বাহিনী মুখোমুখি হল। শুরু হল গোলান্দাজি, বন্দুকবাজি আর রকেট যুদ্ধ। আওরঙ্গজেবের বাহিনী তুলনামূলকভাবে পরিকল্পিত ফরমেশনে ধীর গতিতে এগোচ্ছিল। হঠাতই তীব্র আওয়াজে রণডঙ্কা বেজে উঠলে মূল যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। গাদাগাদি করে দাঁড়ানো শাহী এবং রাজপুত সেনারা বিপক্ষের ওপর খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারল না। আওরঙ্গজেবের পরিকল্পনায় বরকন্দাজ, ধনুর্ধরদের তুমুল আক্রমন শাহী বাহিনীর সেনারা সামলাতে পারছিল না। প্রতি মুহূর্তে শয়ে শয়ে রাজপুত মারা যেতে থাকে। রাজপুত নেতা মুকুন্দ সিংহ হাদা,  রতন সিংহ রাঠোড়, দয়াল সিংহ ঝালা, অর্জুন সিংহ গৌড় সুজন সিংহ শিশোদিয়া এবং অন্যান্য সেনাপতি বুঝল সার্বিক আক্রমন না করতে পারলে অবধারিত হার অপেক্ষা করছে। তারা অকুতোভয় হয়ে রাম রাম ধ্বনিতে এগিয়ে গেল। আওরঙ্গজেবের বাহিনীর প্রথম শহীদ হলেন গোলান্দাজ বাহিনীর প্রধান, দেওয়ান মুর্শিদকুলি খান। যুদ্ধের প্রাবল্যে গোলান্দাজেরা পালিয়ে গিয়েছিল। শাহী বাহিনী আওরঙ্গজেবের কামান বাহিনীর ক্ষতি করতে পারে নি। যুদ্ধের প্রাবল্য অন্য দিকে সরে যাওয়ার পরে গোলান্দাজেরা ফিরে আসে। শুরু হল হাতে হাতে যুদ্ধ। জুলফিকার খান হাতি থেকে নেমে এসে সাধারণ যোদ্ধার সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়তে থাকেন। রাজপুতেরা তখন বীর বিক্রমে আক্রমণ শানাচ্ছে। এটাই ছিল যুদ্ধের মোড় ঘোরানোর সময়। শাহী বাহিনীর সেনাপতি আওরঙ্গজেব জানেন\ রাজপুতদের তীব্র আক্রমণ আটকানো না গেলে বিদ্রোহী বাহিনীর হার অনিবার্য। আক্রমণকারীরা বিদ্রোহী বাহিনীর শেষ নিরাপত্তা বেড়া ভেঙে ফেললে বাহিনীর মধ্যে যে প্যানিক তৈরি হবে তাতে সেনাদের যুদ্ধ ক্ষেত্রে টিকিয়ে রাখা সমস্যা হয়ে যাবে।

কিন্তু আওরঙ্গজেব-মুরাদের অগ্রগামী বাহিনীর ৮০০০ বর্ম পরা যুদ্ধঅভিজ্ঞ সেনা তখনও দাঁড়িয়েছিল। তারা তখনও মূল যুদ্ধে অংশ নেয় নি। তদের অধিকাংশ বংশ পরম্পরার আফগান সেনা — যাদের আওরঙ্গজেব প্রথম মুঘল বাহিনীতে পুনর্বাসন দিয়েছিলেন। মহম্মদ খান, নাজাবত খান এবং অগ্রগামী বাহিনীর অন্যান্য সেনাপতি হস্তি বাহিনী নিয়ে যেন জমিতে শেকড় গেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। তাদের অমিতবিক্রম রাজপুত বাহিনীর আক্রমন প্রতিহত করতে করতে যুদ্ধ ভূমি রক্তে রঞ্জিত হয়ে যেন টিউলিপ ছড়ানো বিছানার মত লাল হয়ে গেল। রাজপুতেরা যেহেতু এক একটা ছোট ছোট দলে বিদ্রোহী বাহিনীকে আক্রমন করছিল, এক যোগে জমাট বাঁধা বাহিনীর মত ছিল না, তারা এগোতে এগোতে যখন আওরঙ্গজেবের কাছে কেন্দ্রীয় ঘেরাটোপে পৌঁছল তাদের আক্রমণের ঝাঁঝ কমে গিয়েছে, আক্রমণের ধার প্রায় শেষ হয়েগিয়েছে কারন সেনার অপ্রতুলতা — কেন্দ্রে আসার পথেই বহু সেনার মৃত্যু ঘটে। শাহী বাহিনীর ক্রমাগত আক্রমণ শানানোর আরও একটা বড় একটা সমস্যা ছিল, পিছনের রক্ষণ ব্যূহ থেকে সামনে দিকে কোনও রকম সাহায্য আসছিল না। শাহী বাহিনীর এই ঝটিকা আক্রমনে আওরঙ্গজেবের বাহিনী ছড়িয়ে ছিটিয়ে যাওয়ার ফলে যে ফাঁকফোঁকর তৈরি হল, সেই রাস্তায় যশোবন্ত-শাহী রাজপুত বাহিনী আওরঙ্গজেবের বাহিনীর অক্ষহৃদয়ে ঢুকে পড়লেও, বিদ্রোহী শাহজাদাদের যৌথ বাহিনী কিন্তু হেরে যায় নি। বিদ্রোহী বাহিনীর যে সব সেনা-যুথ ছড়িয়ে ছিটিয়ে শাহী বাহিনীর রাজপুত যোদ্ধাদের, তাদের বাহিনীর ভিতরে ঢুকতে দিয়েছিল, তারা আবার নতুন করে ফাঁকা জায়গা ভরাট করায় বিপক্ষের বাহিনীর অক্ষস্থলে চলে আসা রাজপুত বাহিনীকে পিছন থেকে নতুন রসদ, সেনা সাহায্য পাঠানো বন্ধ হয়ে যায়। তাদের ঘিরে ধরে আওরঙ্গজেবের বাহিনী। তারা যেমন পিছন থেকে সাহায্য পেল না, তেমনি যুদ্ধ সেরে চলে এই অঞ্চল যাওয়ারও সুযোগ বন্ধ হয়ে গেল। তারা দেখল সামনে স্বয়ং সেনানায়ক আওরঙ্গজেবের সেনা টুকরিটা তখনও অবিকৃত অবস্থায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। শেখ মীর ডান দিক থেকে আর সৈফ সাইখান খান বাঁদিক থেকে কেন্দ্রে রাজপুত বাহিনীকে ঘিরে আক্রমন শানাতে শুরু করে। ক্রমশ রাজপুতেরা বুঝতে পারে তারা শত্রুর চক্রব্যুহে বন্দী হয়ে পড়েছে। ইতিমধ্যে আরও একটা ধাক্কা খায় চক্রব্যূহে ঢোকা সেনার সেনানায়ক, মুকুন্দ সিংহ হাদার চোখে তীর ঢুকলে, সে মারা যায়। যে ছজন রাজপুত সেনাপতি এই আক্রমনটা আক্রমণ শানিয়েছিল, প্রত্যেকেই মারা গেল। যুদ্ধক্ষেত্রে শাহী বাহিনীর মৃতদেহের পাহাড় তৈরি হল। মুকুন্দ সিংহ হাদা না থাকায় ছত্রভঙ্গ বাহিনী ঘিরে কচুকাটা শুরু হয় – যেমন প্রদীপের শিখার ডাকে মথের মৃত্যু ঘটে। বিদ্রোহী বাহিনীর পরাক্রমে বড় সেনাপতিদের মৃত্যুমুখে ঢলে পড়তে দেখে হতোদ্যম হয়ে ডান দিক থেকে রায় সিংহ শিশোদিয়া, অগ্রগামী বাহিনীর সুকন সিং বুন্দেলা, অমর সিংহ চন্দ্রাবত যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে গেল।

কিন্তু কেন্দ্রে আটকে পড়া ২০০০ রাজপুত বাহিনীর ভাগ্য তখনও সরু সুতোয় ঝুলে আছে। মুরাদ বখশ দেবী সিং বুন্দেলাকে নিজের দিকে টেনে আনলেন এবং বাকিদের তাড়িয়ে দিয়ে শাহী সেনার বাঁদিকে আঘাত করলেন। ইফতিকার খান লড়াই করতে করতে মারা গেলেন। তার সঙ্গীদের কিছু পালাল, কিছু বিশ্বাসঘাতকতা করে আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে যোগ দিল। শাহী সেনার বাঁদিকের কলাম বলে আর কিছুই থাকল না। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev