| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

ইফতিতাইসুলতানিওয়াশুল-ই-কুল : আকবর এবং আওরঙ্গজেব (১০৪ নং কিস্তি) : বিশ্বেন্দু নন্দ

Reporter
বিশ্বেন্দু নন্দ / ৩২৭ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২২

আওরঙ্গজেবের আগরা অভিযান ও সমুগড়ের যুদ্ধ

এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মুরাদ আর আওরঙ্গজেবের বাহিনীর জেতা হারার কোনও সংবাদ আগরার দরবারে পৌঁছয় নি। অন্য দিকে বাংলার নবাব বিদ্রোহী সুজা হার স্বীকার করে মুঙ্গের কেল্লায় নিজেকে বন্দী রেখেছেন। সম্রাট ভাবলেন বড় পুত্রের সিংহাসনের আরোহনের ওপরে যে বিদ্রোহের ঘন মেঘ জমেছিল সেই দুর্লক্ষ্মণটা সরে গেছে। বড় পুত্র কিছুটা হলেও নিরাপদ। শুধু দক্ষিণের সংবাদ আসা বাকি। বেকাবু শরীর নিয়ে দারার হাত সধরে সম্রাট খুশি মনে ধারামতের যুদ্ধ শুরুর চার দিন আগে ১১ এপ্রিল আগরা থেকে নিজের হাতে তৈরি শহর নয়া দিল্লি পৌঁছনোর পরিকল্পনা করলেন। মাঝে প্রমোদের জন্যে কিছু দিন বেলোচপুরে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হল। জাহাঙ্গীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে এখানেই শাহী বাহিনীর হাতে প্রথম হার হয়েছিল শাহজাদা খুররমের। আশ্চর্যের, এখানেই ধারামত যুদ্ধের ১০ দিন পরে যশোবন্তের বাহিনী বিধ্বস্ত হওয়ার খবর এল। বাবা-পুত্র অবাক হয়ে শুনলেন স্বয়ং যশোবন্ত আহত হয়ে পলাতক। আগরা আসার রাস্তা উন্মুক্ত হয়ে গেছে আওরঙ্গজেবের সামনে। সম্রাট বাবা, ভাবী-সম্রাট ছেলের মাথায় সহসা বাজ পড়ল। কর্তব্য ঠিক করতে পারছিলেন না। এতদিন দারার সিংহাসনের আরোহনের কাঁটা সরে যাওয়ার যে সুখস্বপ্ন দেখছিলেন তাঁরা, সযত্নে তৈরি সেই শিশা ভেঙে চৌচির। আতঙ্কিত সম্রাট দারাকে দুই ভায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করার পরামর্শ দিলেও, দারা সম্রাটের কথা মানলেন না। দারার আশা শাহী বাহিনী যে কোনও মুহূর্তে আওরঙ্গজেবকে হারাতে সক্ষম। দারার চাপে সম্রাট দিল্লি ফিরলেন না, আবার আগরায় পৌঁছলেন ২রা মে ১৬৫৮। এবারেও নতুন করে যুদ্ধ প্রস্তুতি। জীবনে মাত্র একটিবার যুদ্ধ করা শাহজাদা দারা, পোড়খাওয়া যুদ্ধদক্ষ আওরঙ্গজেবের মুখোমুখি হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।

দারার যুদ্ধ প্রস্তুতি বিষয়ে কালিকারঞ্জন লিখছেন, ‘শাহজাদা দারা আগরায় নূতন সেনাবাহিনী গঠন করিবার জন্যে প্রাণপন চেষ্টা করিতে লাগিলেন। তাঁহার বিশ্বাসী মনসবদারগণের মধ্যে অধিকাংশই লাহোর, মুলতান ও কাবুল সুবায় শাসন ও সামরিক কার্যে ব্যপৃত ছিলেন; সুতরাং নূতন অনভিজ্ঞ ও অর্ধবিশ্বাসী সেনাধ্যক্ষগণের উপর তাঁহাকে নির্ভর করিতে হইল। সুবা দিল্লি আগ্রা ও সরকার সম্ভল (মোরাদাবাদ) প্রভৃতি নিকটবর্তী স্থানের ফৌজদারগণকে সেনা সংগ্রহ করিয়া আগ্রায় আসিবার জন্যে হুকুমজারি করিলেন, রাজকোষ দারার সৈন্যসজ্জার জন্যে উন্মুক্ত হইল। …তোপখানার জন্যে দারা মোটা বেতনের ফিরিঙ্গি গোলান্দাজ ভর্তি করিতে লাগিলেন, উহার মধ্যে একজন ছিলেন তরুণ ইটালীয় চিকিৎসক ম্যানুসী [মানুচি]। আগ্রা ও নিকটকর্তী অন্যান্য দুর্গ হইতে বড় বড় তোপ দারার তোপখানায় সামিল করা হইল, কিন্তু তাঁহার মীর-আতস ছিলেন কাশিম খাঁর প্রতিস্পর্ধী চাটুকার বাক্যবাগীশ বরকন্দাজ খাঁ ওরফে মিঞা জাফর। জাফর জাতিতে ইরানী, তোপের নিশানা ঠিক না থাকিলেও কথায় মানুষ ঘায়েল করিতে ওস্তাদ, তুরানী তাঁহার দুই চোখের দুশমন। দারা মনে করিত জাফর বড় কাজের লোক, রুস্তম আফ্রাসিয়াবের মত বেনজির বাহাদুর; তাঁহার আশকারা পাইয়াই জাফর উচ্চপদস্থ আমীরদিগকে সমীহ করিত না। ইহার ফলে তুরানি যোদ্ধারা দারার প্রতি ক্রমশ বিমুখ হইয়া উঠিয়াছিল, আওরঙ্গজেব ইসলামের দোহাই দিয়া ইহাদিগকে হাত করিবার সুযোগ পাইলেন। ভাবী ভ্রাতৃবিদ্রোহে দারার প্রধান ভরসাস্থল ছিল রাজপুতের শৌর্য ও প্রভুভক্তি। দারার মুখে সর্বদা রাজপুতের প্রশংসা এবং তাহাদের প্রতি পক্ষপাতিত্ব তুরাণীগণের ঈর্ষা ও বিদ্বেষের অন্যতম কারণ … অবশেষে সম্রাট একদিন মন্ত্রকক্ষে তাঁহার মাণিকজোড় ভায়রাভাই খলিল্‌-উল্লা খাঁ ও জাফর খাঁ, রাজ্যশ্যালক শায়েস্তা খাঁ এবং উচ্চপদস্থ ইরানী ও তুরানী আমীরগণকে তলব করিলেন, রাও ছত্রশাল তখনও সম্ভবত আগ্রা পৌঁছেন নাই। বিরুদ্ধমুখী চিন্তাধারার সংঘাতে সম্রাটের বুদ্ধি প্রায় লোপ পাইয়াছিল; আসন্ন যুদ্ধের মুখে তিনি আওরঙ্গজেবের চিঠির দ্বারা প্রতারিত হইয়া এই সমস্ত নিমকহারামের সহিত যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব উত্থাপন করিলেন; তাঁহারা আলা হজরতের মুখে এই শান্তির বাণী শুনিয়া প্রশংসায় পঞ্চমুখ হইলেন, এই সর্বনাশা জল্পনা যাঁহাদের মনঃপুত হইল না তাঁহারা চুপ করিয়া রহিলেন; মুখের উপর বাদশাহী মর্জির খেলাপ কিছু বলিবার সাহস হইল না। কিছুক্ষণ বাগবিতণ্ডার পর কথার মারপ্যাঁচে দারার মাথা গরম হইয়া উঠিল; মেজাজ ও জিহ্বার ওপর রাশ টানিয়া ধরিতে তিনি অভ্যস্ত ছিলেন না; রাগে হিতাহিতজ্ঞান হারাইয়া দারা বলিয়া ফেলিলেন, লড়াই করিবার যদি কাহারও হিম্মত না হয়, রাও ছত্রশাল হাড়া ও মীর আতস জাফর, আওরঙ্গজেব মোরাদকে একজোড়া খরগোশের মতো নর্মদা নদীর অপর পারে তাড়াইয়া যাইবে! ইরানী তুরানির বুকে এই শ্লেষ তীরের ন্যায় বিঁধিয়া রহিল, আওরঙ্গজেবের কূটনীতি দারাকে পঙ্কে পাতিত করিয়া আত্মপ্রসাদ লাভ করিল’।

আত্মদ্বন্দ্বে দীর্ণ, শুধু রাজকীয় খাজাঞ্চির বলে ইতিউতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা সেনানীদের জড়ো করে দারা যে বিশাল শাহী বানালেন, সেই বাহিনী চলল আগরার অভিমুখে অগ্রসর হয়ে আসা আওরঙ্গজেবের মহড়া নিতে। সেই বিশাল বাহিনীর চম্বল নদী পেরনোর পর ঢোলপুরে পৌঁছনোর সংবাদ পেলেন আওরঙ্গজেব। তিনি আশংকা করছেন, দারার নির্দেশে নদীর সব কটা পায়ে হেঁটে পেরোনোর পথে কড়া পাহারা বসান হয়েছে। তিনি যে পাড়ে আছেন, তার উল্টো দিকে শাহী গোলান্দাজদের উঁচু জায়গায় রাখা হয়েছে যাতে নদী পেরিয়ে আসা বিদ্রোহীদের নদীতেই খতম করে দেওয়া যায়। নদীর তীরে বড় বড় পরিখা কাটা হয়েছে, যাতে নদীতে গোলার আঘাত সয়ে সে কটা সেনা তীরে উঠোতে পারল, তাদের কচুকাটা করার জন্যে। আওরঙ্গজেবের বিদ্রোহী বাহিনীর মুখোমুখি হওয়ার জন্যে শাহী বাহিনীর সেনানায়কেরা উত্তেজিত হয়ে অপেক্ষা করছে। কিন্তু বিকল্প রণনীতি তৈরিতে অসামান্য দক্ষ আওরঙ্গজেব শাহী বাহিনীর মুখোমুখি হলেন না, তিনি অন্য পরিকল্পনা করলেন। অতীত যুদ্ধ অভিজ্ঞতায় তিনি জমিদারদের থেকে জেনেছেন কোন কোন ফেরি অঞ্চলে দারা সেনা পাহারা বসাবেন। সে সব এলাকায় নদী পেরোলে শাহী বাহিনীর হাতে আক্রান্ত হয়ে বিপুল ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা। স্থানীয় জমিদারদের থেকে বিকল্প উপায় জানতে চাইলেন। তাঁকে জানানো হল ঢোলাপুরের ৪০ মাইল পূর্বে কয়েকটা পায়ে হেঁটে নদী পেরোনোর জায়গা আছে। এগুলো দারা সুরক্ষিত করেন নি। হাতে গোণা স্থানীয় মানুষ ছাড়া এই সব ফেরির রাস্তা বাইরের মানুষের কাছে অজানা।

২১মে গোয়ালিয়রে পৌঁছবার পর সময় নষ্ট না করে তিনজন সেনাপতির নেতৃত্বে গোলান্দাজ বাহিনীর একাংশকে নতুন জায়গা থেকে ফেরি পার হতে পাঠিয়ে দিলেন। আওরঙ্গজেব সুরক্ষিত জায়গাগুলো থেকে জমিদারদের সাহায্যে বাকি বাহিনী পার করলেন (২৩ মে)। নতুন পথ নেওয়ার জন্যে বেশ কিছু ক্ষয়ক্ষতি হল ঠিকই, কিন্তু ৪০ বছর বয়সে অসামান্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সেনাপত্যের উদাহরণ পেশ করে তিনি দারার রণনীতি, বিপুল পরিখা খনন, বিশাল বড় বাহিনী মোতায়েন করা, গোলান্দাজদের টিলায় কামান তোলানোর পরিশ্রম সব কিছু বেকার করে দিলেন। আওরঙ্গজেবের সামনে আগরা পৌঁছনোর রাস্তা খোলা। দারার বাহিনী পিছনে বিদ্রোহী বাহিনীর আসার আশায় নদীর দিকে চোখ করে পড়ে রইল।

দারা বহুক্ষণ অপেক্ষা করে আওরঙ্গজেবের বাহিনীর দেখা না পেয়ে বুঝলেন তাঁর দুই ভাই বুদ্ধি করে শাহী বাহিনীকে পাশ কাটিয়ে আগরার উদ্দেশ্যে রওনা হয়েগেছেন — যে কোনও সময় আগরা থেকে রসদ পৌঁছনোর রাস্তা কেটে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তাঁর বাহিনী যাতে আগরার মূল শিবির থেকে বিচ্ছিন্ন না হয়ে যায় তার জন্যে তিনি আওরঙ্গজেব পৌঁছবার আগে যতশীঘ্র সম্ভব আগরা পৌঁছনোর উদ্যম নিলেন। তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে নদীর তীরে প্রচুর ভারি কামান ছেড়ে যেতে হল। দ্রুত বেগে চলার সিদ্ধান্ত নিয়ে তিনি পরের যুদ্ধের রণনীততে অনেকটা পিছিয়ে পড়লেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী আওরঙ্গজেব চম্বল পেরিয়ে উত্তর দিকে যমুনার পানে চলেছেন। তিন দিনের মধ্যে সমুগড়ে আওরঙ্গজেব, দারার নেতৃত্বে শাহী বাহিনীর মুখোমুখি হলেন। শাহজাহান যমুনা নদীর তীরে রায়পুর ফেরির কাছে ইমাদপুরে বাদশাহী মহল তৈরি করেছিলেন শিকারের উদ্দেশ্যে। বাদশাহী মহলের এক মাইল পূর্বে সমুগড়। সমুগড়ের দক্ষিণ এবং পূর্বে যমুনা তীব্র বাঁক নিয়েছে। যদিও ধারামতের যুদ্ধে জিতে আওরঙ্গজেব অনেকটা এগিয়ে আছেন, কিন্তু সমুগড় মুঘল হিন্দুস্তানের শাসকের ভাগ্য গড়ে দেবে। আওরঙ্গজেব জানেন এই যুদ্ধ মোটেই সহজ হবে না — দারা যতই যুদ্ধ-নভিস হোন না কেন। তিনি যুদ্ধ-প্রশিক্ষিত শাহজাদা। নিজের হাতে অন্তত ১৫ বছর বাবার পাশে ঠাণ্ডা মাথায় বসে মুঘল সাম্রাজ্য চালানোর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন রাজপুরুষ — যিনি শত অনভিজ্ঞতা সত্ত্বেও যুদ্ধের মাঠে তাঁর ব্যক্তিত্ব প্রয়োগ করে জেতা-হারার মধ্যে পার্থক্য গড়ে দিতে পারেন। আওরঙ্গজেবের এই চিন্তা খুব একটা ভুল ছিল বলা যাবে না। দারা যে যুদ্ধভিজ্ঞ আওরঙ্গজেবকে যুদ্ধক্ষেত্রে বেগ দেবেন, সেটা আমরা যুদ্ধ আলোচনাতেই দেখব। মুঘল সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার বেছে নেবে সমুগড়ের যুদ্ধ। দারা না আওরঙ্গজেব মুঘল হিন্দুস্তান শাসন করবেন, সেটা নির্ধারিত হয়ে যাবে সমুগড়ের যুদ্ধে।

সমুগড়ের যুদ্ধ, জঙ্গইসমুগড় ২৯ মে, ১৬৫৮

শাহজাহান আগরায় রয়েছেন ১৬৫৭র নভেম্বর থেকে। তিনি এখনও পুরোপুরি সেরে ওঠেন নি। পুরোনো রোগের সমস্যাগুলো এখনও চাড়া দিয়ে ওঠে। মুঘল হিন্দুস্তানের গ্রীষ্ম এগিয়ে আসছে। হাকিমরা জানিয়ে দিয়েছেন যে রোগ সম্রাটের দেহে বাসা বেঁধেছে আগরার গ্রীষ্ম তাপে তার উপসর্গগুলো চাড়া দিয়ে উঠতে পারে। হেকিমেরা সম্রাটকে এই সময় আরও একটু ঠাণ্ডা, বাগান ঘেরা শহর দিল্লিতে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। ১১ এপ্রিল ১৬৫৮-য় দরবার ফেলা হয়েছিল ৮০ মাইল উত্তর পশ্চিমে বালুচপুরে। ২৫ এপ্রিল সেখানে যশোবন্তের বাহিনীর পরাজয়ের খবর আসে — যশোবন্তের বিজয়ী হওয়ার সমস্ত আশা মুহূর্তের মধ্যে ধ্বসে পড়ল। সম্রাট তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতায় বুঝলেন আওরঙ্গজেবের নেতৃত্বে বিজয়ী বাহিনীর অপ্রতিহত গতিতে এগিয়ে আসাকে যদি রোধ করতেই হয়, তাহলে সেই মুহূর্তে দারাকে আগ্রায় পৌঁছতে হবে। শাহজাহানের পক্ষে এক্ষুণি খুব কিছু করা সম্ভব নয়। তিনি তাঁর প্রিয় বাচ্চা দারাকে আগরার উদ্দেশ্যে পাঠালেন। দারা আগরা পৌঁছলেন ২ মে।

তাড়াহুড়ো করে আর জোড়াতালি দিয়ে নতুন শাহী বাহিনী তৈরি করা হল। স্থানীয় যত জায়গিরদার ছিল প্রত্যেকের কাছে সর্বোচ্চ পরিমান বাহিনী চাওয়া হল। আগরা কেল্লার অস্ত্রভাণ্ডার থেকে বাহিনীর সেনাকে অস্ত্রশস্ত্রে সাজানো হল। মুঘল বাহিনীর পিলখানায় যত যুদ্ধ হাতি ছিল আর গোলাবারুদখানায় যত কামান ছিল সব বাহিনীকে দেওয়া হল। ৬০,০০০ সেনা জমায়েত হল আগরা কেন্না প্রাঙ্গনে। যদুনাথ সরকার বলছেন বাহিনী দেখতেই গায়েগতরে বিশাল তাগড়া কিন্তু তাদের মধ্যে কোনও যোগসূত্র তৈরি হয় নি। তাদের প্রয়োজন ছিল আওরঙ্গজেবের কাছাকাছি দক্ষতার এক সেনানায়ক, যিনি বাহিনীয় মধ্যে একতার রেশ ছড়িয়ে দিতে পারবেন। বহু সেনানায়কই দরবারে কাটানো অভিজাত। শেষ তারা কবে যুদ্ধে গিয়েছেন, তাঁদের নিজেদেরই  স্মরণে নেই। দারা নির্ভর করেছিলেন রাজপুত আর সৈয়দদের ওপরে। কিন্তু তারাও তাঁকে সঙ্গ দেয় নি। যদুনাথ বলছেন তাঁর প্রতি নিষ্পৃহ ছিল। তাঁর সব থেকে ভুল সিদ্ধান্ত ছিল তার পুত্র সুলেইমান সুকোকে সুজার বিরুদ্ধে যুদ্ধে পাঠানো।

শাহজাহান তখনও দারাকে আওরঙ্গজেবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে নিরুতসাহ করছেন। সম্রাটের তখনও বিশ্বাস, তাঁর কাছে বিদ্রোহী ছেলেরা এলে, তিনি স্বব্যক্তিত্বে এবং বড় আমলাদের দিয়ে প্রভাব খাটিয়ে বুঝিয়েসুঝিয়ে তাদের সুবায় পাঠিয়ে দিতে পারবেন। তখনও সাম্রাজ্যের ত্রিপক্ষ সম্রাট-দারা-জাহানারা জানেন না আওরঙ্গজেব বহুকাল ধরে দারা পক্ষীয় আমলাদের ঘরে সিঁধ কেটেছেন। শাহজাহান যখন বার বার দারাকে তার যুদ্ধ না করা ইচ্ছের কথা বলছেন, আওরঙ্গজেবের সঙ্গে সাঁট করা আমলাদের অনেকেই সম্রাটের কথায় সায় দিচ্ছেন। দারা তাদের বিশ্বাসঘাতক, ভিতু বলছেন, আরও কঠিন বিদ্রুপবাণী ছুঁড়ে দিচ্ছেন এবং যুদ্ধের মুখে দাঁড়িয়ে স্রেফ অদূরদর্শীর মত মন্তব্য করছেন, তাঁরা যদি তার সঙ্গে নাও আসেন, তাহলে তিনি ছত্রশাল হাদাকে দিয়ে আওরঙ্গজেবের সেনাকে শশকের মত তাড়া করে নর্মদার অপরপ্রান্তে দূর করে দেবেন। দারার বকমবাজি হঠকারিতা আর অহং প্রকাশের তরিকায় পারসিক আর তুর্কি সেনানায়কেরা দারার পাশ থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। সুযোগ পেলেই আওরঙ্গজেবের বাহিনীতে যোগ দেওয়ার ফ্যাকড়া খোঁজার তাল শুরু হল। ইরাণী-তুরাণীদের বিস্বেষী মনোভাব আন্দাজ করে দারা জানিয়ে দিল পরের যুদ্ধগুলোয় জয়ের জন্যে রাজপুত বন্ধুরাই যথেষ্ট। তাঁর আশা সুলেইমান শিকোহ তড়িঘড়ি ফিরে শাহী বাহিনীতে যোগ দেবে।

দারার অগ্রগামী বাহিনী ঢোলপুরে যাত্রা শুরু করল ৯ মে চম্বলের ফেরিঘাট সুরক্ষিত করার উদ্দেশ্যে। বাকি বাহিনী ১৮য় রওনা হল তাঁর নেতৃত্বে। দারা যুদ্ধ অভিযানে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মক্কার দিকে মুখ করে পুত্রের সাফল্য কামনায় ফাতিহা পড়া শুরু করলেন সম্রাট। দারা প্রথমে রথে উঠলেন, পরে সেটি বদল করে হাতির পিঠে ছড়লেন। পিছনে পড়ে রইলেন এক বিধ্বস্ত পিতা। দারা ঢোলপুরে পৌঁছলেন ২২ মে। আগেই বলেছি তিনি চম্বলের সমস্ত ফেরিঘাট সুরক্ষিত করলেন, জমিদারদের দিয়ে নদীর সামনে পরিখা খোঁড়ালেন। তার আশা যতটা কম পারা যায় যুদ্ধ করে বিপক্ষের বাহিনীকে আঘাত করা, যাতে তাদের যুদ্ধ পরিকল্পনা যতটা পারা যায় পিছিয়ে দেওয়া। যাতে বিহার থেকে দ্রুত আসতে থাকা পুত্রের বাহিনী শাহী বাহিনীতে যোগ দিতে পারে।

সমস্যা হল দরবারে অমিত ঐশ্বর্যে, নফর আমলাদের স্তুতির মধ্যে থাকতে থাকতে অহংকারে মট মট দারা, তাঁর প্রতিপক্ষের রণনৈতিক পরিকল্পনা উদ্ভাবনের যোগ্যতা ছোট করে দেখেছিলেন। আওরঙ্গজেবের আবির্ভাবের আশায় বেশ কয়েক দিন হাপিত্যেস করে বসে থাকা দারা হঠাত অবাক হয়ে শুনলেন আওরঙ্গজেব ৬০-৭০ কিমি দূরে চম্বল নদী পেরিয়ে ২৩ মে আগরার উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছেন। মুহূর্তের মধ্যে দারার বিশাল বাহিনী পিছনটা উদোম হয়ে গেল — আগরার রসদ সরবরাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার আশংকা দেখা দিল শাহী বাহিনীতে। (চলবে)

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev